সময় গড়ায় তার নিজের আপন গতিতে। পরিবর্তন আসে সুরের ধারা আর শ্রোতার রুচিতেও। তবে কিছু মানুষের কণ্ঠ আর সৃষ্টি সময়ের সমস্ত হিসেব-নিকাশ ভুলিয়ে দিয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নেয় মানুষের অন্তরে। এমনই এক কিংবদন্তি সংগীতসাধক ‘শাহেনশাহ-ই-কাওয়ালি’ নুসরাত ফতেহ আলী খান। মৃত্যুর আড়াই দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও, তার গান আজও প্রতিটি প্রজন্মকে একইভাবে শিহরিত করে।
নিখাদ প্রেম, বিরহ কিংবা আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা সব অনুভূতি প্রকাশের এক সর্বজনীন আশ্রয় হয়ে উঠেছেন তিনি। ১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে এক ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবারে জন্ম নেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। পারিবারিক সূত্রে তার রক্তে বইছিল শতাব্দী প্রাচীন কাওয়ালি ঘরানার ঐতিহ্য।
যদিও বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে ডাক্তার বা প্রকৌশলী হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, কিন্তু ভেতরের সুরের টানকে চেপে রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তীব্র সাধনা আর অদম্য মেধা দিয়ে বাবার সিদ্ধান্তকে বদলে দিয়ে বিশ্বসংগীতকে এক নতুন পথ দেখান।

নুসরাতের গায়কির মূল ভিত্তিই ছিল আবেগের তীব্রতা ও সুনিয়ন্ত্রিত সুরের বিস্তার। তার পরিবেশনায় ছিল এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক টান, যা ক্ষণিকের মধ্যেই শ্রোতাকে জাগতিক সীমানা থেকে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত। এই মেলোডির বহুমুখীতার কারণেই আধুনিক পপ, রক কিংবা ইলেকট্রনিক বিটের সঙ্গেও তার গানগুলো সমানভাবে মানিয়ে যায়।
বলিউড চলচ্চিত্রে আবেগের ঘনত্ব বাড়াতে যুগের পর যুগ তার সুর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এমনকি 'কোক স্টুডিও'র মতো আধুনিক প্ল্যাটফর্ম থেকে শুরু করে বর্তমানের টিকটক ও রিলসের যুগেও নুসরাতের মেলোডি দারুণ ট্রেন্ডি। হৃদয়ের বেদনা উপশম কিংবা জীবনের গভীর উপলব্ধিতে তরুণ সমাজ আজও তার সুরকে নিজেদের অনুভূতির ভাষা বানায়।
প্রথাগত সুফি কাওয়ালিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জনপ্রিয় করার মূল কারিগর ছিলেন নুসরাত। পশ্চিমা সংগীতজ্ঞদের সঙ্গে তার যুগান্তকারী ফিউশন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের মেলবন্ধনে এক নতুন ধারার জন্ম দেয়, যা বিশ্বসংগীতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪৮ বছর বয়সে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সুরসাধক। তার মৃত্যুতে বিশ্বসংগীতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হলেও, তার রেখে যাওয়া সুরের উত্তরাধিকার আজও অমর। তার ভাইয়ের ছেলে রাহাত ফতেহ আলী খানসহ বহু শিল্পী সেই ধারাকে বয়ে নিয়ে চলছেন।
এমআইকে
