বিজ্ঞাপন

মেঘদলের ‘মুল্লুক’

যে গানের নেপথ্যে চা শ্রমিকদের নির্মম বাস্তবতার ইতিহাস

যে গানের নেপথ্যে চা শ্রমিকদের নির্মম বাস্তবতার ইতিহাস

কোক স্টুডিও বাংলার নতুন গান এসেছে দুদিন আগে। ‘মুল্লুক’ শিরোনামের গানটি করেছে ব্যান্ড ‘মেঘদল’; সঙ্গে রয়েছে রঞ্জু তাঁতি ও রণজিৎ তাঁতির পরিবেশনা। বিস্তারিত না জানালেও গান প্রকাশের সময় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ গানের সঙ্গে মিশে আছে শতবছরের ইতিহাস।

কী সেই ইতিহাস? একটি গান কিভাবে শত বছরের নির্মম বাস্তবতার দলিল হয়ে উঠল? তা-ই জানা যাক…

ঘটনা ১৯২০ সালের। রাওলাট আইন বাতিলের দাবিতে এবং খিলাফত আন্দোলনের সমর্থনে ভারতীয় কংগ্রেস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। তাতে সাড়া দিয়ে অনেকেই ব্রিটিশদের চাকরি ও পণ্য ত্যাগ করা শুরু করে। অন্যদিকে চা বাগানে অধিক পরিশ্রম আর অল্প পারিশ্রমিকের কারণে স্থানীয় শ্রমিকরা কাজটি করতে চাইতেন না। সে সময় নানা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালালের মাধ্যমে ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, বিহার, ওডিশা, যুক্ত প্রদেশ (উত্তর প্রদেশ), অন্ধ্র প্রদেশ থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আনা হয় আসামে (বর্তমান সিলেট অঞ্চলে)।  

তিন বছরের চুক্তির কথা বলে শ্রমিকদের আনা হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও ঘরে ফেরা আর হয় না তাদের। একদিকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম, মানবেতর জীবন; অন্যদিকে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে থাকা। অনেকটা ক্রীতদাসের মতো কাটত শ্রমিকদের জীবন।

‘মুল্লুক’ গানের দৃশ্য

এর মধ্যেই ব্রাহ্মসমাজের মিশনারি ও কংগ্রেসের কর্মীদের তৎপরতায় শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা জাগে। ন্যায্য পারিশ্রমিকের জন্য আওয়াজ তুলতে থাকেন তারা। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে সামিল হন শ্রমিকরা। তাতে মালিকপক্ষের সাড়া মেলেনি, অতঃপর আন্দোলন রূপ নেয় ‘মুলুকে চলো আন্দোলন’-এ। প্রথমে আনিপুর চা–বাগানের ৭৫০ জন শ্রমিক তাদের স্ত্রী–পুত্রকে নিয়ে যাত্রা করে নিজেদের বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। এরপর আশেপাশের বহু চা বাগানের শ্রমিকও বেরিয়ে আসতে থাকে। সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় দশ হাজারে।

চা বাগান থেকে পায়ে হেঁটে তারা পৌঁছায় করিমগঞ্জ রেলস্টেশনে। কিন্তু চা বাগান মালিকদের চাপে শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। সে সময় কেবল নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের রেলগাড়িতে চড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তাতেও আর কতটুকু সংকুলান হয়!

তাই অধিকাংশ শ্রমিক পায়ে হেঁটেই করিমগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের দিকে যাত্রা করে। কারণ সে সময় সিলেট অঞ্চল থেকে বিহার, ওড়িশার দিকে যাওয়ার জন্য চাঁদপুর ছিল বন্দর। এদিকে করিমগঞ্জের খবর ছড়িয়ে পড়ায় অন্যান্য এলাকার চা বাগান থেকেও শুরু হয় শ্রমিকদের মিছিল। ঘরে ফেরার মিছিল। শোনা যায়, ৩০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক সেই ‘মুলুকে চলো’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিল।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১৯২০ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে চাঁদপুর রেলস্টেশনে হাজির হয় হাজার হাজার শ্রমিক। এবার পালা নদী পার হওয়ার। প্রথমে কিছু শ্রমিক জাহাজে ওঠার সুযোগ পান। কিন্তু পরে আবার চা বাগান মালিকদের প্রভাবে পরিস্থিতি বদলে যায়। অসহায় শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র সৈন্যরা। সরিয়ে দেওয়া হয় জাহাজের পাটাতন। মেঘনার জলে ভেসে যায় শত শত শ্রমিক, শিশু, বৃদ্ধ ও নারী। সঠিক সংখ্যা কত, তা জানা যায়নি আর।

এখানেই শেষ নয়, পরদিন জাহাজে করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ৫০ জন গোর্খা সৈনিক আসে। তখনো চাঁদপুর স্টেশনে হাজারো শ্রমিক। রাতের আঁধারে ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সৈন্যরা। শ্রমিকের রক্তে ভেসে যায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।

এই গণহত্যা নিয়ে খুব একটা চর্চা হয়নি। তবে ইতিহাসের পাতায় এখনো কালো অধ্যায় হয়ে আছে সেই নৃশংস ঘটনা। ওই আন্দোলনের প্রভাবে চা শ্রমিকরা যদিও ‘ক্রীতদাস’ জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল কিছুটা। কিন্তু আজও কি তারা স্বাধীন? ন্যায্য মজুরি পায়?

সেই ‘মুলুকে চলো’ আন্দোলন থেকে বর্তমান সময়ের চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, যুগে যুগে শ্রমিকদের এই বঞ্চনার শোকগাথাই যেন ‘মেঘদল’-এর গান ‘মুল্লুক’।

‘মুল্লুক’ গানের পোস্টার

গানের কথা ও সুর ব্যান্ডটির ভোকাল শিবু কুমার শীলের। সংগীতায়োজনে ‘মেঘদল’; মিক্স ও মাস্টার করেছেন রাশীদ শরীফ শোয়েব ও আমজাদ হসেন। এ গানের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে চা শ্রমিকদের ইতিহাসে জড়িয়ে থাকা কালজয়ী এক গান ‘পিঞ্জরাকে পুষুল ময়না’; জংলি ভাষার এই লোকগান শ্রীমঙ্গলের চা বাগান থেকে সংগৃহীত। গানটি সংগ্রহ করেছিলেন নন্দিত শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক।

গানটি নিয়ে ‘মেঘদল’-এর কণ্ঠস্বর শিবু কুমার শীল নিজের মন্তব্য দিয়েছেন এভাবে, “চা বাগানের শ্রমিকরা এক একজন যন্ত্রণার উত্তরাধিকার। সেই কলোনিয়াল সময় থেকে আজ অবধি যেখানে নিপীড়ন চলমান। ১৯২১ সালের ‘মুলুকে চলো’ আন্দোলন থেকে আজকের মুজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন পর্যন্ত একই ধারাবাহিকতায় এই জনগোষ্ঠী যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। মেঘদলের ‘মুল্লুক’ গানটি মূলত সেইসব দুঃখী মানুষের বঞ্চনার প্রতি এক বিন্দু শ্রদ্ধাঞ্জলি। কালী দাস গুপ্ত যে কাজ শুরু করেছিলেন সেই ১৯৪০-এর দশকে, একটি কলি দুটি পাতাই তো, রেলগাড়ি ক্যায়সা না সুন্দর, চল মিনি আসাম যাবো এই সমস্ত গান সংগ্রহের ভেতর দিয়ে। আমরা সেই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’য় ব্যবহৃত একটি গানকে আবার খুঁজতে গিয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলে, রাজঘাট চা বাগানে। আবারও তাদের কন্ঠে বেজে উঠেছে একই বেদনার সুর, কবীরের ভজন। আমরা সেই সুরের অনুষঙ্গে জুড়ে দিয়েছি তাদের রক্ত-চায়ের ইতিহাস। তাদের মুল্লুকে ফেরার বাসনা হয়ত আজ ফুরিয়ে গেছে; কিন্তু মানুষের ইতিহাস বলে সেই আদিকাল থেকে মানুষ নিজের মুল্লুকের খোঁজে এক জনপদ থেকে আরেক জনপদে ছুটে বেড়াচ্ছে কিসের আশায়। মানুষের এই কাফেলা কী কোনো দিন তার মঞ্জিলে ফেরে?”

‘মুল্লুক’ গানটির ভিডিও নির্দেশনা দিয়েছেন কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। এতে ‘মেঘদল’ সদস্যদের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন রঞ্জু তাঁতি ও রণজিৎ তাঁতিও।

কেআই