তানিম নূরের ডিটেকটিভ থ্রিলার ওয়েব সিরিজ ‘কাইজার’ ২০২২ সালে মুক্তির পর ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। আফরান নিশো অভিনীত এ সিরিজটির জনপ্রিয়তার জেরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ‘কাইজার টু’ নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই বাংলাদেশ। তবে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এর কাজ শুরু হয়নি।
সম্প্রতি সিরিজটির মেধাস্বত্ব বা আইপি (ইন্টেলেক্টচুয়াল প্রপার্টি) রাইটস নিজের কাছে না থাকায় সামাজিক মাধ্যমে আক্ষেপ প্রকাশ করেন নির্মাতা তানিম নূর। এর জেরে প্রশ্ন ওঠে, তবে কি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বের কারণেই আটকে গেল ‘কাইজার টু’?
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তরুণ নির্মাতাদের নিজেদের গল্পের কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব নিজের কাছে রাখার পরামর্শ দেন তানিম। সেই পোস্টে নির্মাতা লেখেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা বলে তরুণ ফিল্মমেকারদের জন্য আইপি রাইটস বা মেধা সম্পদ অধিকার কিন্তু স্রেফ কোনো আইনি প্যাঁচ নয়, এটা আপনার ক্রিয়েটিভ ফ্রিডম আর ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
নির্মাতার কথায়, গল্পের রাইটস নিজের কাছে থাকলে প্রযোজক বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চাইলেই স্ক্রিপ্ট বা চরিত্র নিজের মতো বদলে ফেলতে পারবে না বা অন্য কাউকে দিয়ে বানাতে পারবে না। সিনেমা বা সিরিজ বানানোর লোভে একবারে বিনামূল্যে বিক্রি করে দেওয়ার চেয়ে আইপি নিজের কাছে রাখলে সারাজীবন রয়্যালটি আসতে থাকে। তাই তিনি সবাইকে নিজের গল্প বা চরিত্রকে স্থায়ী সম্পদ বানানোর আহ্বান জানান এবং তার মতো ভুল করতে বারণ করেন।
ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে এক দর্শক ‘কাইজার টু’ প্রসঙ্গে জানতে চান। জবাবে তানিম নূর লেখেন, “উপায় নেই ভাই। ‘কাইজার’ আর করা হবে না আমার। বহুবারই করতে চেয়েছি; কিন্তু যেহেতু কপিরাইট আমার কাছে নেই, তাই সম্ভব হচ্ছে না।”
হইচই কেন সিক্যুয়েল আনতে চাচ্ছে না? এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে তানিম লেখেন, ‘তাদেরকে জিজ্ঞেস করাই ভালো হবে। আমি জানি না। আমার কাছে রাইট থাকলে এতোদিনে কাইজার ২, ৩ এমনকি সিনেমাও চলে আসতো।’
দুই মন্তব্যে তানিমের আক্ষেপ স্পষ্ট। তবে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপে তিনি জানালেন, বিষয়টি নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। তানিম নূর বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘চুক্তিতে কোনো সমস্যা হয়নি। খাতাপত্রেই সাইন করেছিলাম এবং কারও সঙ্গেই আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি মূলত ভবিষ্যতে যারা কাজ করবে, সেই তরুণ লেখকদের উদ্দেশে কথাগুলো বলেছি। তারা যেন সৃষ্টির আইপি রাইটস নিজেদের কাছে রাখে।’

লেখকদের অধিকারের বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে তানিম নূর আরও বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের কোনো বইয়ের কাজ করতে গেলে যেমন কপিরাইট অফিসে দেখতে হয়, কপিরাইট হোল্ডার হিসেবে তার পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি বা স্বত্ব কিনে নিতে হয়, তরুণদেরও নিজেদের সৃষ্টির আইপি রাইটস করে রাখা উচিত। আমাদের দেশের স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রি ছোট, বিনিয়োগও হয় খুব কম। এখানে লেখকরা খুব অবহেলিত, তারা ঠিকমতো পারিশ্রমিক পান না। তাই ভবিষ্যতের লেখকরা যেন তাদের সঠিক সম্মান ও অধিকার পান এবং আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই পোস্টটি দেওয়া।’
‘কাইজার টু’ নির্মাণ না হওয়া নিয়ে নিজের কোনো আক্ষেপ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তানিম নূর স্পষ্ট করেন, “আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমি তো এখন ‘কাইজার টু’ বানাচ্ছিও না। আমি এখন শুধু সিনেমা নির্মাণেই মনোযোগী। বাংলাদেশের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করছে, এটা অবশ্যই ভালো দিক। আমি বিষয়টিকে পজিটিভলি দেখি, এর মধ্যে বিতর্কের কোনোরকম কোনো অবকাশই নেই।”
নির্মাতা তানিমের পোস্ট ও মন্তব্যের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় ‘হইচই বাংলাদেশ’-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর সাকিব আর খানের সঙ্গে। তিনি ঢাকা পোস্টকে জানান, কারও আইপি রাইটস তারা জোর করে নেননি বরং চুক্তির মাধ্যমেই সব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যেকোনো ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যখন কোনো কন্টেন্ট বানায়, তা মূলত কমিশনড ওয়ার্ক হয়। এর মানে হলো, প্ল্যাটফর্ম পুরো নির্মাণের খরচ—যেমন রাইটিং, ডিরেকশন, আর্টিস্টদের রেমুনারেশন থেকে শুরু করে সবকিছু বহন করে। চুক্তিতেই স্পষ্টভাবে লেখা থাকে, এর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস হইচইয়ের থাকবে। তানিম নূর জেনেই এতে সাইন করেছেন। তানিম নূরের পোস্টটি দেখার পর হয়তো কেউ অতি উৎসাহী হয়ে ব্যাপারটি অন্যভাবে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

দর্শকের আগ্রহ থাকার পরও তাহলে কেন ‘কাইজার টু’ হচ্ছে না? সেটার জবাবও দিলেন ‘হইচই’-এর এই কর্মকর্তা, “কাইজার টু’ নির্মাণের ইচ্ছে ছিল, ঘোষণাও দিয়েছিলাম। তবে আমরা চেয়েছিলাম, ৭-৮ এপিসোডের কনটেন্ট বানাতে। কিন্তু চিত্রনাট্য ১৩-১৪ এপিসোডে চলে গিয়েছিল। এতে বাজেটের চেয়েও ৮০-৯০ লাখ টাকা বেশি খরচ দাঁড়াচ্ছিল। কমার্শিয়ালি সাকসেসফুল করার জন্য বাজেট বড় ফ্যাক্টর, তাই ‘কাইজার’ আর হয়নি। পরে এটা নিয়ে সিনেমাও করতে চেয়েছিলাম, সেটাও সম্ভব হয়নি।”
‘কাইজার টু’ প্রসঙ্গ ধরে উঠে আসা মেধাস্বত্ত্ব বিষয়ে তানিমের কথার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলেন সাকিব। তার ভাষ্য, ‘তানিম নূর তরুণ নির্মাতাদের আইপি নিজেদের কাছে রাখার যে পরামর্শ দিয়েছেন, তার সঙ্গে আমিও একমত। কেউ যদি রাইটস রাখতে চান, তবে তাকে নির্মাণ বাজেটে আমাদের সঙ্গে সেভাবেই আপস করতে হবে।’
ডিএ/কেআই
