লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি)। এরই মধ্যে নতুন ডিজাইনের আহ্বান করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দর্শকের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক তৈরি করা বিটিভির চিরচেনা লোগো বদলের চিন্তাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে সংস্কৃতির মানুষেরাও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের মতে, লোগো পরিবর্তনের আগে বিটিভির অনুষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রচারের মানোন্নয়নে নজর দেওয়া জরুরি।
১৯৮০ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকারের আমলে রঙিন সম্প্রচার যুগে প্রবেশ করে বিটিভি। ওই সময় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের হাতে নতুন রূপ পায় বিটিভির রঙিন লোগো। দেখতে দেখতে ৪৬ বছর ধরে সেই লোগোই হয়ে উঠেছে দেশের দর্শকদের কাছে বিটিভির অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মতামত জানিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানেরই সাবেক উপমহাপরিচালক ও নন্দিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খ ম হারূন। তিনি লিখেছেন, ‘বিটিভির স্বর্ণালী সময়ের একটি আবেগ এখনো টিকে আছে, সেটি হলো বিটিভির লোগো। এই লোগোকে আরো আকর্ষণীয় করা যেতে পারে, কিন্তু সেটা হতে হবে ঐতিহাসিক ‘লোগো’টিকে টিকিয়ে রেখে।’
বিটিভির বর্তমান লোগোর সঙ্গে দেশের প্রখ্যাত শিল্পীদের সম্পৃক্ততার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘মনে রাখতে হবে বর্তমান লোগোটিতে শিল্পী কামরুল হাসান ও মুস্তাফা মনোয়ারের হাতের স্পর্শ আছে। শিল্পী ইমদাদ হোসেন ১৯৭১ এর ডিসেম্বরে বিটিভির লোগো নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বিটিভি যখন রঙিন যুগে প্রবেশ করে তখন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আগের লোগোটিকে আবার নতুন রূপে অঙ্কিত করেন।’
লোগো পরিবর্তনের বদলে বিটিভির কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন খ ম হারূন। বিটিভির অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা, মেধাবী মানুষদের দিয়ে নতুন কনটেন্ট তৈরি, তথাকথিত ‘অডিশন’ প্রথা বাতিল করে গুণী শিল্পীদের আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করা এবং ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠান পরিকল্পনার ভিত্তিতে আবারও ‘টিভি গাইড’ প্রকাশের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া বিটিভির সব চ্যানেলের শূন্য পদ পূরণ, সব স্তরে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, শিল্পীদের সম্মানী কাঠামো যুগোপযোগী করা এবং টেলিভিশন সংযোগ ও টেলিভিশন সেটের ওপর আরোপিত লাইসেন্স ফির যথাযথ হিসাব রাখার কথাও বলেছেন এই গুণী টিভি ব্যক্তিত্ব।
পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং অর্গানাইজেশন হিসেবে বিটিভিকে বিজ্ঞাপনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন খ ম হারূন। একই সঙ্গে বিটিভির ওয়েবসাইটকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিটিভি এনালগ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরিত হলেও সম্প্রচারকর্মীদের সেভাবে প্রস্তুত করতে না পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে খ ম হারূন লিখেছেন, ‘এভাবে আরো অনেক কথা বলা যায়। এখন এনালগ থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে গেছে বিটিভি। প্রতিদিন প্রযুক্তি আরে আধুনিক হচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের সম্প্রচার কর্মীদের সেভাবে প্রস্তুত করতে পারিনি এটা আমাদের ব্যর্থতা।’
এদিকে খ ম হারূনের পোস্টের কমেন্ট বক্সে বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক ও সুরকার শেখ সাদী খান। তিনি লিখেছেন, ‘একটা কিছু না করলে নাম থাকবে কেমন করে? এ ধরনের নতুন কিছু করতে গেলে প্রথমে একটা বিজ্ঞ কমিটি গঠন প্রয়োজন! সেই কমিটির যুক্তি মতামত কে প্রাধান্য দিয়েই সীদ্ধান্ত নেয়া উচিত! এটা তো কারো ব্যক্তিগত সংসার না। এসব চিন্তা ছেড়ে মান সম্মত অনুষ্টান এবং সুস্থ সমাজ গড়ার দিকে নজর দিলে দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে! সবচেয়ে আগে বিটিভির স্বচ্ছতা প্রয়োজন। অভিশপ্ত জাতির মঙ্গল হোক।’
লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন নাট্যকার শাকুর মজিদও। একই পোস্টের মন্তব্যে তিনি লিখেছেন, ‘বিটিভি লোগো বদলানোর নোটিশ দিয়েছে। চরিত্র বদলানোর কথা কিছু বলে নাই। লোগো বদলানোর চিন্তাটা প্রথম অবিবেচনাপ্রসূত একটা চিন্তা। বিটিভিকে দর্শকবান্ধব করুক আগে। লোগো না বদলেই বিটিভির খাসলত বদলানো যাবে।’
অন্যদিকে অভিনেত্রী আলিফ আলাউদ্দিনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক পোস্টে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বিটিভির লোগো কেন বদলাতে হবে?’ তার পোস্টেও অনেকে বিষয়টির সমালোচনা করেছেন, শিল্পীরাও বলছেন, বিটিভির এই লোগোর সঙ্গে তাদের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে বিটিভির লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতিপ্রেমী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চার দশকের ঐতিহ্য বহন করা এই লোগো পরিবর্তন নয়, বরং সংরক্ষণ করেই বিটিভির অনুষ্ঠান, দর্শকসম্পৃক্ততা ও সার্বিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
এমআইকে/কেআই
