নির্মাতা পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্মাণে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার। তারও আগে পলাশ যখন সহকারী পরিচালক ছিলেন, তখন থেকেই উত্তমের সঙ্গে পরিচয়। কাছ থেকে দেখেছেন মহানায়ককে। সেই দেখা দেখেই উত্তমের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতার গণমাধ্যমকে জানালেন কিছু অজানা ঘটনা।
তপন সিনহার নির্মাণে ‘জতুগৃহ’ (১৯৬৪) করেছিলেন উত্তম কুমার। সে ছবির সহকারী পরিচালক ছিলেন পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই পরিচয়ের সূত্রপাত। শুটিংয়ের ফাঁকে শিল্পী-কুশলীদের সঙ্গে একদম সাধারণভাবে মিশতেন উত্তম। কখনো নিজের দামি সিগারেট ধরিয়ে দিতেন অন্যদের, কখনো আবার অন্যদের কমদামি বিড়িই তুলে নিতেন ঠোঁটে।
‘জতুগৃহ’-এর বছর কয়েক পর ‘হাটে বাজারে’ (১৯৬৭) করেছেন তপন সিনহা। ছবির চিত্রনাট্য লেখা শেষ করলেন, ঠিক করলেন ছবিতে অভিনয় করবেন অশোক কুমার ও বৈয়জন্তীমালা। টালিগঞ্জে এ খবরে উত্তেজনার পারদ চরমে।
একদিন স্ক্রিপ্ট শুনতে ‘নিউ থিয়েটার্স’-এর দুই নম্বর স্টুডিওতে আসেন বৈজয়ন্তীমালা। সেখানেই তপন সিনহার অফিস। পলাশ বলেন, ‘তপনদা আর বৈজয়ন্তীমালা ছাড়া অফিস ঘরে তৃতীয় কারোর প্রবেশাধিকার নেই। তপনদা চিত্রনাট্য পড়বেন, বৈজয়ন্তীমালা শুনবেন। প্রয়োজনে প্রশ্ন করবেন, পরিচালক উত্তর দেবেন। আমাদের সবার সঙ্গে বৈজয়ন্তীমালার পরিচয় করিয়ে দিলেন তপনদা। পরিচয়পর্ব শেষ হতেই আমরা সুবোধ বালকের মতো রুমের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে কাজ করব–এই খবরেই আমরা দারুণ উত্তেজিত। তার ওপর তাকে চাক্ষুষ দেখা, পরিচয় হওয়া–আনন্দ সীমাহীন!’

টিমের সদস্যরা তখন স্টুডিওর বাইরে অপেক্ষায়। এর মধ্যেই একটা হইচই পড়ে গেল, উত্তম কুমার আসছেন। পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য, “সেই আশ্চর্য হাসিতে স্টুডিওর মাঠ মাতিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। হাতে ধরা ৫৫৫ সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে সক্কলের হাতে একটি করে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খা।’ কী কারণে জানি না, আমাকে দিলেন না। বরং ডানহাতটা আমার কাঁধে রেখে মৃদু টানে কাছে এনে বললেন, ‘পলাশ, তোমার সঙ্গে কথা আছে, একটু এদিকে এসো।’ সবার থেকে একটু দূরে সরে এলেন আমায় নিয়ে। আমার মনের মধ্যে তখন উদ্বেগের বুদ্বুদ তৈরি হচ্ছে। আমি তপনদার থার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, আমার মতো একজন সাধারণ সহকারীর সঙ্গে মহানায়কের এমন কী কথা থাকতে পারে? রহস্য উধাও হলো নিমেষে। কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে উত্তমদা বললেন, ‘বৈজয়ন্তীমালাজি এসেছেন। তপনদার কাছে ‘হাটে বাজারে’-র স্ক্রিপ্ট শুনছেন। কিন্তু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করা খুব দরকার। বলাইয়ের (বলাই সেন, তপনদার প্রধান সহকারী পরিচালক) থেকে শুনলাম, এখন তপনদার অফিসঘরে প্রবেশ নিষেধ। অথচ মালাজির সঙ্গে একবার দেখা না করলেই নয়।’ আমি বিস্মিত! মহানায়কের এমন প্রয়োজন, আর সেই প্রয়োজন মেটানোর দায় এসে পড়েছে আমার মতো এক সামান্য ছবি-করিয়ের ওপর! হঠাৎ উত্তমদা আমার দু’হাত চেপে ধরে বললেন, ‘তুমি একটু মালাজির সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও। তুমি ছাড়া ওখানে কেউ ঢুকতে পারবে না। পলাশ, প্লিজ, না বোলো না।’ গলায় অনুরোধের স্বর, যেন খানিকটা আকুতিও।”
এখন পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স ৯১ বছর। সব ঠিকঠাক মনে করতে না পারলেও কানে বাজে উত্তমের সেই অনুরোধ, ‘পলাশ, প্লিজ, না বোলো না’।
অতঃপর পলাশ কী করলেন? বললেন এভাবে, “বোধহয় আমার বাহ্যজ্ঞান লোপ পেয়েছিল। এক দৌড়ে তপনদার অফিসঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে সটান ঢুকে পড়েছিলাম। অনুমতি নেওয়া তো দূরের কথা, দরজায় নক করে জানানও দিইনি। আমাকে এভাবে আচমকা ঢুকতে দেখে তপনদা কিন্তু বিরক্ত হলেন না। মিষ্টি হেসে সস্নেহে বললেন, ‘কী রে, কিছু বলবি?’ বললাম, উত্তমদা এসেছেন। মালাজির সঙ্গে দেখা করতে চান। বৈজয়ন্তীমালা বাংলা জানতেন না, কিন্তু আমার কথা বুঝেছিলেন। তপনদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আমাকে বললেন, ‘প্লিজ আস্ক হিম।’ সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আমি যেন যুদ্ধজয় করেছি! তপনদার অফিস ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেই দেখি সামনেই উত্তমকুমার দাঁড়িয়ে। মুখে ঈষৎ উদ্বেগের ছাপ। আমি উত্তমদাকে বলেছিলাম–যান, আপনি ভিতরে যান। উত্তমদা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তপনদার অফিস ঘরে ঢুকে যেতেই প্রোডাকশন অ্যাসিস্টেন্ট গৌরবদা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।”
পলাশসহ অন্য যারা স্টুডিওর বাইরে ছিলেন, প্রত্যেকের মনেই তখন কৌতুহল, কী এমন হলো, উত্তম কুমারের মতো তারকা এভাবে আকুল হয়ে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন!

ঘটনার রহস্য জানা গেল পরের দিন। পলাশ জানান, উত্তমকুমার প্রযোজক হিসেবে ‘ছোটি সি মুলাকাত’ ছবি করছেন হিন্দিতে, বৈজয়ন্তীমালা সে ছবির নায়িকা। এদিকে তৎকালীন বম্বের হাবভাব না বুঝতে পেরে অনেক টাকা লগ্নি করে ফেলেছেন উত্তম। কিন্তু নানা কারণে নায়িকার শিডিউল নিয়েও শুটিং শুরু করতে পারেননি। এ কারণে বৈজয়ন্তীমালা খানিক বিরক্ত হয়েই আর কোনও ডেট দিচ্ছিলেন না এ ছবির জন্য। নতুন প্রযোজক হিসেবে তাই দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন উত্তম। আর সে কারণেই বৈজয়ন্তীমালাকে বোঝানোর জন্য তপন সিনহার স্ক্রিপ্ট রিডিং সেশনে তার আচমকা আগমন ঘটেছিল।
কেআই
