বিজ্ঞাপন

আসাদুজ্জামান দুলাল : নিভৃতচারী এক থিয়েটারযোদ্ধার গল্প

আসাদুজ্জামান দুলাল : নিভৃতচারী এক থিয়েটারযোদ্ধার গল্প
দিনের আলো ফুরিয়ে এলে বদলে যায় তাদের পরিচয়। সারাদিন কেউ মাঠে কৃষিকাজ করেন, কেউ শ্রম দেন, কেউ কামারের কাজ করেন তো কেউ নাপিতের কাজ। জীবিকার তাগিদে যে যার পেশায় ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর সেই মানুষগুলোই জড়ো হন, হারিয়ে যান অন্য এক জগতে। বদলে যায় তাদের পরিচয়। তারা হয়ে ওঠেন থিয়েটারের মানুষ।

সেই মানুষগুলোর মধ্যমণি হয়ে থিয়েটার করেন আসাদুজ্জামান দুলাল। পাবনার চাটমোহরের এই মানুষ জীবনের পুরোটা সময় ধরেই শিল্প-সংস্কৃতি তথা থিয়েটার চর্চায় যুক্ত রয়েছেন। না, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা খ্যাতির জন্য নয়, স্রেফ ভালোবাসা আর আত্মার টান থেকেই আঞ্চলিক থিয়েটারে বিলিয়ে দিচ্ছেন একটা জীবন। দুলালের কাছে থিয়েটার কেবলই অভিনয় নয়। মঞ্চ, আলো কিংবা দর্শকের হাততালির মধ্যেই থিয়েটারের সীমা দেখেন না তিনি। তার কাছে থিয়েটার হলো মানুষের কথা বলার ভাষা, প্রশ্ন করার জায়গা, সমাজকে নতুন করে দেখার সুযোগ। তাই তার নাটকে নিছক বিনোদনের গল্প খুব একটা নেই। 

প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে একটি উদ্দেশ্য, একটি বার্তা। সেই বার্তা মানুষকে ভাবানোর, সচেতন করার এবং পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়ার। আসাদুজ্জামান দুলালের কথায়, ‘আমি কখনোই মজাদার বা শুধু বিনোদনের কোনো থিয়েটার লিখিনি, করিও না। যেভাবেই করি না কেন, আমার থিয়েটারের একটা উদ্দেশ্য থাকে। একটা মেসেজ থাকে’—এই বিশ্বাস নিয়েই কয়েক দশক ধরে থিয়েটারের সঙ্গে তার পথচলা।

আসাদুজ্জামান দুলাল

থিয়েটারের সঙ্গে আসাদুজ্জামান দুলালের সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। বাবা থিয়েটার করতেন। বাবার হাত ধরেই খুব অল্প বয়সে থিয়েটারের সঙ্গে পরিচয়। তখন হয়তো তিনি জানতেন না, এই মঞ্চই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠবে।

১৯৮৫ সালে সরাসরি থিয়েটারে যুক্ত হন দুলাল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। পথনাটক করেছেন, মুক্তনাটক করেছেন, সমন্বয় থিয়েটার, স্টুডেন্ট থিয়েটার নানা ধারায় কাজ করেছেন। বদলেছে সময়, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম। কিন্তু থিয়েটারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং থিয়েটারই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তার জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে ‘সমন্বয় থিয়েটার’ দলের হয়ে নাটক করছেন। এ দলের নাটক লেখা, নির্দেশনার পাশাপাশি অভিনয়ও করেন তিনি। সঙ্গে রয়েছেন আর জনা পাঁচেক সদস্য। 

নেশা থেকে পেশা

একজন মানুষের কাছে কোনো কাজ কখনো নেশা, কখনো পেশা। দুলালের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় যেন একই জায়গায় এসে মিশেছে। ছোটবেলা থেকে থিয়েটারের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক একসময় নেশায় পরিণত হয়। পরে সেই নেশাই হয়ে ওঠে জীবিকার অংশ। বর্তমানে বেসরকারি কয়েকটি বিদ্যালয়ে কাজ করেন তিনি। সেখানে শিশুদের অভিনয় ও থিয়েটারচর্চার শেখান। নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

অন্য কোনো পেশা কেন বেছে নেননি? এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। তবে উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি ফিরে যান সেই শুরুর দিনগুলোর কাছে। ‘অন্য কাজ পারিনি বিধায় ভাবলাম, আমি এ কাজটাই বোধহয় করতে পারি। অন্যদিকে কোনো নেশাও ছিল না। থিয়েটারটা করাই আমার নেশা’—বলেন দুলাল।

‘আসলে থিয়েটার করে তো পেট চলে না। আমাদের দেশে থিয়েটার এখনো পেশাদার হয়ে ওঠে নাই। যার ফলে এখনো এটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আরকি।’

তারপর একটু থেমে যেন নিজের জীবনকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করলেন, ‘এখন থিয়েটারটাই আমার পেশা, নেশাও বটে।’ 

আসাদুজ্জামান দুলালের থিয়েটারের গল্প এক জায়গায় আটকে থাকে না। কখনো গ্রাম, কখনো শহর; বিভিন্ন জায়গা ও বাস্তবতা থেকে গল্প তৈরি হয়। কিন্তু গল্পের স্থান বদলালেও তার থিয়েটারের মূল উদ্দেশ্য বদলায় না। তিনি বিনোদনকে একেবারে বাদ দিতে চান, এমন কিন্তু নয়। শুধু বিনোদনের জন্যই থিয়েটার করার পক্ষপাতী নন তিনি। তার প্রতিটি কাজের মধ্যে থাকতে হবে একটি বক্তব্য, একটি প্রশ্ন কিংবা একটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। দুলালের ভাষ্য, ‘মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তন আনা এবং মানুষকে সামাজিক সচেতন করে তোলা, রাজনৈতিক করে তোলার একটি মেসেজ আমার থিয়েটারে থাকে। প্রত্যেকটা থিয়েটারেই থাকে।’

দুলালের থিয়েটারের আলাদা বৈশিষ্ট্য এখানেই। তার মঞ্চে শুধু প্রচলিত অর্থে অভিনয়শিল্পীরা থাকেন না। জায়গা করে নেন সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, কামার, নাপিত যারা সারাদিন নিজেদের পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তারাই দিনের কাজ শেষে উঠে আসেন মঞ্চে। ক্ষেত-খামার কিংবা সেলুনের কাজ সেরে তারা সন্ধ্যার পর এক হন, অভিনয়ের চর্চায়। সমাজ বাস্তবতার চিত্রই তারা বয়ান করেন গল্পে, অভিনয়ে। 

হারানো সুরে ফিরে আসা

থিয়েটারের বাইরে দুলালের আরেকটি গভীর টান রয়েছে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি। ছোটবেলায় পুঁথি পাঠের আসরে বসেছেন। শুনেছেন হাটুরে কবিতার সুর, জারি-সারি। গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা আয়োজনের সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়েছে তখনই। তবে দর্শক হিসেবে। সরাসরি পুঁথি পাঠ করা হয়নি কখনো। কিছুদিন আগে প্রথমবারের মতো তিনি পুঁথি পাঠ করলেন ‘হানিফ পালোয়ান ও বিবি সোনাভান’। চাটমোহরে সম্প্রতি অনুষ্ঠানটি হয়েছে, এর খবর উঠে এসেছে গণমাধ্যমেও। 

পুঁথি পাঠের সুর তার কাছে অবশ্য একেবারেই নতুন নয়। বিভিন্ন নাটকে আগে থেকেই পুঁথির ব্যবহার করেছেন। কখনো আংশিকভাবে, কখনো নিজের মতো করে লিখে। তবে এই প্রথম নিজেই পুঁথি পাঠ করলেন, ঘটা আয়োজনে।

পুঁথি পাঠের আসরে আসাদুজ্জামান দুলাল

 একসময় গ্রামীণ জীবনের পরিচিত সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল পুঁথি পাঠের আসর। মানুষ জড়ো হতো, শুনত, দেখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চর্চা হারিয়েই গেছে। তার মতে, ‘এগুলো আসলে সংস্কৃতির পালাবদল। সংস্কৃতি তো একটা জায়গায় থাকে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে, ৪০ বছর আগে পুঁথি পাঠ হতো বা যে আদলে আমাদের সংস্কৃতিটা ছিল, আজ সেখানে নেই। এটাই স্বাভাবিক। সংস্কৃতি এক জায়গায় থাকার তো জিনিস নয়। তবু সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যটার কেমন আদল ছিল, কেমন তার পরিবেশনা ছিল, সেই পরিবেশনাটাকে মূলত তুলে আনার জন্যই আমরা এই পুঁথি পাঠের আসর করেছি।’

তার প্রত্যাশা, সংস্কৃতি মানুষকে একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখাবে। দুলালের ভাষ্য, ‘যে সংস্কৃতি মানুষকে চিন্তাশীল করে তুলবে, যে সংস্কৃতি মানুষকে প্রশ্ন করাবে, যে সংস্কৃতি মানুষকে ভাবাবে, মানুষকে ধরে রাখবে, মানুষকে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখাবে, সুন্দর সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেই সংস্কৃতিই দরকার।’

শহর নয়, শিকড়েই স্বপ্নের খোঁজ

বয়সের খাতায় ৬৪ পার হয়েছে। কিন্তু কাজ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিরতি নেননি তিনি। খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু, শিক্ষার্থী ও মধ্যবিত্তদের জীবনের নানা টানাপোড়েনকে মঞ্চে এনেছেন আসাদুজ্জামান দুলাল। প্রতিকূল স্রোতের মুখে দাঁড়িয়ে আজও তিনি আগলে রেখেছেন তার আজীবনের স্বপ্নের দল ‘সমন্বয় থিয়েটার’।

নব্বইয়ের দশকে নাটক কেন্দ্রিক আন্দোলন যখন ঢাকামুখী, তখন ঢাকার দল ‘আরণ্যক’ ও নাট্যজন মামুনুর রশীদের সঙ্গে নিবিড় সক্ষতা গড়ে উঠেছিল তার। চাইলে সেখানেই থিতু হতে পারতেন। কিন্তু গ্রাম আর শিকড় ছেড়ে যাননি। নিজের ভাবনা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, সবাই তো ঢাকাতেই থিয়েটার করবে। আমি না হয় গ্রামেই করব। আমার এলাকার মানুষ নিয়েই থিয়েটারের আন্দোলনটা চালিয়ে যাব; এটাই আমার ইচ্ছা ছিল। এখন পর্যন্ত তাই আছে।’

আসাদুজ্জামান দুলাল

থিয়েটার চর্চার এ পথ মোটেও মসৃণ ছিল না, ছিল না কোনো বড় অনুদানও। তাই খরচ কমাতে নাটককে মিলনায়তন থেকে নিয়ে আসেন সাধারণ মানুষের আঙিনায়; শুরু করেন ‘উঠান শো’। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আর্থিকভাবে ওইরকম সংকট হয়নি, কারণ উঠানে একটা শো করতে তেমন কোনো খরচ হয় না। যা খরচ হয়, দেখা গেল দলের লোকজনের অল্প অল্প অংশগ্রহণে সেটা পুষিয়ে যায়। আবার কখনো এমন হয়েছে, আমরা চাদর পেতে মানুষের কাছে দিয়ে বলেছি, আপনারা যা পারেন আমাদের থিয়েটারের জন্য দেন। এভাবেই চলছে আমাদের থিয়েটার যাত্রা।’

তাহলে জীবিকা? এভাবেই কি নির্বাহ হয়? নিভৃতচারী দুলাল জানালেন, জীবিকা নয়, আত্মার খোরাক আর সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে থিয়েটার করেন তিনি। বাবার ভিটেমাটি-জমিতে ভরসা আর থিয়েটার; সব মিলিয়ে কোনোভাবে জীবনটাকে কাটিয়ে দিচ্ছেন এই গুণীজন। সংগ্রামী এ জীবন নিয়ে তার ভাষ্য, ‘আসলে থিয়েটার করে তো পেট চলে না। আমাদের দেশে থিয়েটার এখনো পেশাদার হয়ে ওঠে নাই। যার ফলে এখনো এটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আরকি।’

ঘরের দুলাল

নাটক ও সংস্কৃতির পেছনেই কি নিজেকে বিলিয়ে দিলেন? ঘরের দিকে কি তাকানোর সুযোগ হলো? হলো বৈকি। তাও বেশ পরে। ২০০৬ সালে বিয়ে করেছেন আসাদুজ্জামান দুলাল। সেটাও এই নাটকের সূত্রেই। থিয়েটারের এক বন্ধুর বোনের সঙ্গেই সামাজিকভাবে সম্পন্ন হয় তার বিয়ে। এখন দুই ছেলে নিয়ে তাদের সংসার। বড় ছেলে পড়েন উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে আর ছোট ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ছেলেরাও কি বাবার পথ ধরে নাটকে আসবেন? তা নিয়ে এখনো দুলাল কিংবা তার সন্তানেরা ভাবেননি। নাট্যকার ও অভিনেতার মতে, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এসব ছেলেদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। তাড়াহুড়ো বা কোনো চাপ দিয়ে নিজের পথে আনার পক্ষপাতী নন। তাদের মন টানলে থিয়েটারে আসবেন, নতুবা পছন্দসই পেশা বেছে নেবেন। সেটা সময়ের ওপর নির্ভরশীল। 

ক্যামেরায় বন্দী দুলালের ‘পথ’

দুলালের দীর্ঘ এই থিয়েটারজীবন এবার উঠে আসছে নির্মাতা নিয়ামুল মুক্তার ক্যামেরায়। তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘পথ’। মুক্তার সঙ্গে দুলালের পরিচয় প্রায় চার বছর আগে। একই এলাকার মানুষ তারা, কিন্তু আগে তেমন পরিচয় ছিল না। একসময় নিয়ামুল মুক্তাই তাকে খুঁজে বের করেন। এরপর আসে কাজের প্রস্তাব। তবে প্রথমেই রাজি হয়ে যাননি দুলাল। একবার-দুবার নয়, প্রায় দুই বছর ধরে তাকে প্রস্তাব দিয়েছেন নিয়ামুল মুক্তা। এর মধ্যে তাদের নিয়মিত যাওয়া-আসা হয়েছে, তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব। শেষ পর্যন্ত সেই বন্ধুত্বই তাকে কাজটিতে রাজি করায়।

‘পথ’কে প্রচলিত অর্থে সিনেমা বলতে চান না দুলাল। তার কাছে এটি তার জীবন ও থিয়েটারের পথচলাকে ঘিরে তৈরি একটি ডকুমেন্টারি। তার থিয়েটার কীভাবে গড়ে উঠেছে, তিনি কীভাবে কাজ করেন, কারা তার সঙ্গে কাজ করেন, এসবই নির্মাণটির মূল বিষয়। কৃষক, শ্রমিক, শ্রমজীবী মানুষ যাদের নিয়ে তিনি বছরের পর বছর কাজ করছেন, তাদের জীবনও উঠে এসেছে সেখানে। ডকুমেন্টারি ফিল্মটি রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়। 

এমআইকে/কেআই