বিজ্ঞাপন

সালমান শাহকে হারানোর তিন দশক

টিভিতে স্ক্রল ভেসে উঠল, সালমান শাহ আর নেই : ছটকু আহমেদ

টিভিতে স্ক্রল ভেসে উঠল, সালমান শাহ আর নেই : ছটকু আহমেদ
সানোয়ার আমাকে একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে খবরটা দিচ্ছিলেন, যাতে শুনে হঠাৎ আমার হার্ট অ্যাটাক না হয়।

সালমান শাহ—বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এবং আক্ষেপের নাম। মাত্র তিন বছরের ক্যারিয়ারে বদলে দিয়েছিলেন ঢালিউডের গতিপথ। কিন্তু তার আচমকা রহস্যমৃত্যুতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে সেই সম্ভাবনা। আজ এই কালজয়ী অভিনেতার রহস্য-মৃত্যুর তিন দশক। ১৯৯৬ সালের আজকের দিনেই তিনি চলে গেছেন অনন্তলোকে।  

সিনেমার মানুষদের জন্য কেমন ছিল সেই ৬ সেপ্টেম্বর? কে কিভাবে পেয়েছিলেন সালমানের মৃত্যুর খবর? তারপরের পরিস্থিতিও বা কেমন ছিল? ঢাকা পোস্টের কাছে সেসব শুনিয়েছেন নির্মাতা ছটকু আহমেদ; যিনি সালমানকে নিয়ে সিনেমাও বানিয়েছিলেন। 

সালমান শাহর মৃত্যুর খবরটা যখন পাই, তখন আমি বাসায় বসে ক্রিকেট খেলা দেখছিলাম; ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা চলছিল। ৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল আমার স্ত্রীরও জন্মদিন। খবরটি আমাকে জানান আমার বন্ধু সানোয়ার মোর্শেদ, যিনি তৎকালীন পরিচালক-প্রযোজক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সানোয়ারের স্ত্রী এবং আমার স্ত্রী উভয়েই আমার চলমান একটি সিনেমার প্রযোজক ছিলেন। সালমান শাহকে নিয়ে আমার নতুন ছবির শিডিউল ছিল।

সানোয়ার আমাকে একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে খবরটা দিচ্ছিলেন, যাতে শুনে হঠাৎ আমার হার্ট অ্যাটাক না হয়। তিনি বলছিলেন, ‘সালমানকে যদি শিডিউলে না পাও, ছবি কীভাবে বানাবে?’ আমি বললাম, ‘কেন পাব না? না পেলে ওর সাথে কথা বলব।’ তিনি আবার বললেন, ‘যদি কথা বলতে না পারে, তখন কি করবে?’ এভাবে নানাভাবে তিনি আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিলেন। কারণ তখন আমার নিজের পরিচালিত একটি রানিং ছবির শুটিং ও ডাবিং চলছিল, বুকের ভেতর এমনিতেই একটা উত্তেজনা ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে টিভিতে খবর দেখতে দেখতে নিচে স্ক্রল ভেসে উঠল, সালমান শাহ আর নেই। টিভিতে সরাসরি দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

ছটকু আহমেদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা

আরও পড়ুন

ওর কোনো শত্রু থাকতে পারে, এটাই আমার বিশ্বাস হয়নি। ওর মতো ছেলে, এত ভালো ছেলে, এত সুন্দর, এত কো-অপারেটিভ, তার এরকমটা হবে, ভাবতে পারিনি। 

ঋণ-দেনা করে অনেক কষ্টে সিনেমাটি শুরু করেছিলাম, তাই ছবি আটকে যাবে সেই চিন্তা তো ছিলই; কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক ও মর্মাহত হয়েছিলাম ওর মতো একটা প্রাণবন্ত তরুণকে হারিয়ে। সে সময় ধসে পড়া চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে যারা টিকিয়ে রেখেছিলেন, সালমান ছিলেন তাদের অন্যতম। চলচ্চিত্র যেন ওর নামেই চলত। সে যখন মারা গেল, তখন পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গন এক গভীর অন্ধকারে ঢেকে গেল। সালমানের জীবনটা ছিল অসাধারণ আনন্দের জীবন। স্বল্প পরিসরে সে সুন্দরভাবে কাজ করত। সকাল-বিকাল কাজ করত। ওর দম ফেলার সময় ছিল না। ওর কোনো শত্রু থাকতে পারে, এটাই আমার বিশ্বাস হয়নি। ওর মতো ছেলে, এত ভালো ছেলে, এত সুন্দর, এত কো-অপারেটিভ, তার এরকমটা হবে, ভাবতে পারিনি। 

আমার রচনা ও পরিচালনায় সালমান বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছে। তার মধ্যে ‘সত্যের সন্ধান’, ‘বুকের ভেতর আগুন’ ছাড়াও আমার লেখা ‘মহামিলন’, ‘সহধর্মিণী’, ‘দেনমোহর’, ‘সবকিছুই তো কাড়লে আমার’, ‘আশা ভালোবাসা’সহ অনেক চলচ্চিত্রে সে অভিনয় করেছে। ওর সাথে যত কাজ করেছি, ততই দেখেছি সে কত সহজে একটা চরিত্রকে নিজের ভেতর ধারণ করে ফেলত। সে চরিত্রকে নিজের মধ্যে নিয়ে এসে প্রকাশ করত, ফলে ওর বিভিন্ন চরিত্রগুলো কেবল চরিত্রের চিত্রায়ন হতো না, চরিত্রগুলো সালমান হয়েই পর্দায় ফুটত।

সালমান অসাধারণ একজন অভিনেতা ছিল। সে তার স্টাইল নিজে তৈরি করত; ড্রেস, ফ্যাশন, এমনকি মেকআপটাও নিজের পছন্দ অনুযায়ী করত। হিরোইন কাকে নেওয়া হবে, এমন সিদ্ধান্তেও সে সুন্দর পরামর্শ দিত এবং আমরা তার মতামতকে প্রাধান্য দিতাম। কারণ তার মতো প্রাণবন্ত ও চকচকে তরুণ নায়ক আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে খুব কম ছিল। জাফর ইকবাল ভাইয়ের পর সুদর্শন ও রোমান্টিক নায়ক বলতে সালমান শাহ-ই ছিল প্রধান। তাই তাকে আমরা সবাই বিশেষ স্নেহ ও মমতা করতাম, যাতে সে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। সে যখন কোনো গল্প পছন্দ করত, তখন সেটাকে নিজের মতো করে লালন করে চরিত্র তৈরি করত। এটি ছিল তার এক অনন্য অভিনয়-নৈপুণ্য ও শৈলী, যা আমরা পরবর্তীতে খুব মিস করেছি।

সালমান শাহ

অনেকে সালমানের সাথে বলিউডের সমসাময়িক বিষয়গুলো তুলনা করেন। তবে বলিউড বা ঢালিউড যা-ই বলি না কেন, সালমানের নিজস্ব যে স্টাইল ছিল, তা অনেক উঁচুতে। যেমন শাহরুখ খানের সাথেও ওর পরিচয় ছিল। কিন্তু সালমানের চুলের স্টাইল, চশমা পরা বা টুপি পরার ধরণগুলো পরবর্তীতে এমনকি শাহরুখ খানকেও অনুকরণ করতে দেখা গেছে। শাহরুখ খানের স্ত্রী গৌরীর সাথেও সালমানের একটা দারুণ ছবি আছে। শাহরুখ অবশ্যই অনেক বড় অভিনেতা, তাদের সাথে তুলনা করার দরকার নেই; তবে সালমানও কোনো অংশে কম ছিল না। ওদের ছিল ১০০ কোটি টাকার বাজেট আর গ্ল্যামার, আর আমরা মাত্র ৫০ লাখ বা ১ কোটি টাকায় কাজ করতাম। বাজেটে না পারলেও, অভিনয়ের দিক দিয়ে সালমান শাহ কারো চেয়ে পিছিয়ে ছিল না।

মৃত্যুর ৩০ বছর পরও যে আজকের তরুণ প্রজন্ম সালমানের সিনেমা দেখছে, তা কিন্তু তাকে সরাসরি দেখে নয়। তারা তাকে ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যমে দেখছে।

একটা ভালো স্টাইল তৈরি করলে সেটা যে কেউ গ্রহণ করে, চাই সেটা ঢালিউড হোক, বলিউড হোক বা হলিউড। সালমানের স্টাইল, টুপি কিংবা গলায় রুমাল বাঁধার যে ট্রেন্ড, তা সর্বজনীনভাবে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল, অনেকেই তা গ্রহণ করেছিল। কেবল ফ্যাশন নয়, তার অভিনয়ের স্থান ও মর্যাদা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

মৃত্যুর ৩০ বছর পরও যে আজকের তরুণ প্রজন্ম সালমানের সিনেমা দেখছে, তা কিন্তু তাকে সরাসরি দেখে নয়। তারা তাকে ইউটিউব বা অন্যান্য মাধ্যমে দেখছে। তার অভিনয়, সুদর্শন চেহারা, চালচলন ও ব্যক্তিত্ব দেখেই তরুণরা আজও তার ভক্ত। আমি সবসময়ই বলি, তুমি যদি ভালো কাজ করো, তবে তা ৩০-৪০ বছর ধরে টিকে থাকবে। সালমানের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে। ৩০ বছর পরও নতুন প্রজন্ম তাকে নিয়ে আলোচনা করছে, তার ভক্তরা তার স্মরণে সেমিনার করছে। কজন অভিনেতার ভাগ্যে এমনটা ঘটে?

সালমান শাহ

তাই আমরা তরুণদের সব সময় বলি, অভিনয় ও কাজকে প্রাধান্য দাও, জীবনের বাকি হিসাব এমনিতেই মিলে যাবে। এখন আর এসব আলোচনা বা বিতর্ক না বাড়িয়ে সালমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করাই আসল কাজ। আল্লাহ যেন তাকে পরকালে শান্তিতে রাখেন, জান্নাত নসিব করেন এবং তিনি যেন মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া পান।

এমআইকে/কেআই

বিজ্ঞাপন