সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু ঢাকার চলচ্চিত্র অঙ্গনকে সে সময় কতটা ‘নিঃস্ব’ করে দিয়েছিল, তা বলার বাকি রাখে না। ১৯৯৬ সাল, অর্থাৎ যে বছর সালমান শাহর মৃত্যু হয়, তখন তার বেশ কয়েকটি সিনেমার কাজ চলছিল। এর মধ্যে কয়েকটি সিনেমার শুটিং শেষ হলেও অনেকগুলোর শুটিং, ডাবিং কিংবা শেষের দিকের কিছু কাজ বাকি থেকে গিয়েছিল।
কিন্তু সালমান শাহ তো না ফেরার দেশে, কি করে সিনেমার কাজগুলো সম্পন্ন হবে এখন! শোকের পাশাপাশি নির্মাতাদের মনে দানা বাঁধতে থাকে এমনই শঙ্কা। কার্যত বিপাকেই পড়েন তারা। পরে অবলম্বন করা হয় নানা কৌশল; নেওয়া হয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। এমন নয়টি সিনেমা ছিল তখন ‘অসমাপ্ত’-এর তালিকায়। পরে সে সিনেমাগুলো অবশেষে আলোর মুখ দেখে।
সালমান শাহর মারা যাওয়ার বছরেই চার সিনেমার মুক্তি
যে বছর সালমান শাহ মারা যান, একই বছরে মুক্তি পায় তার অভিনীত চারটি সিনেমা। সেগুলো হলো- ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’ ও ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’। যদিও এই সিনেমাগুলো নিয়ে নির্মাতাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। ফলে গল্পের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ছবিগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রেক্ষাগৃহে আসে। যদিও এই সিনেমাগুলোকে ‘অসমাপ্ত’ প্রোজেক্ট বলা যায় না।
চিত্রনাট্য বদল, ডামির ব্যবহার ও অভিনয়শিল্পী পরিবর্তন
কিন্তু আসল লড়াই শুরু হয় বাকি সিনেমাগুলো শেষ করা নিয়ে। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে মুক্তি পাওয়া ‘প্রেম পিয়াসী’র মূল কিছু অংশ, শেষ দৃশ্য ও গানের দৃশ্যধারণ অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরিচালক গল্পের নজর ঘুরিয়ে দেন নায়িকা শাবনূরের দিকে। সালমানের অভাব মেটাতে ব্যবহার করা হয় ডামি শিল্পী, দূর থেকে ধারণ করা হয় তার দৃশ্য। সঙ্গে চিত্রনাট্যে পরিবর্তন এনে শেষ পরিণতিতে নায়ক-নায়িকার আত্মহনন দেখানো হয়।
প্রায় একই রকম কৌশল দেখা যায় ‘স্বপ্নের নায়ক’ সিনেমায়, যেখানে অর্ধেক কাজ বাকি থাকতেই সালমানকে হারাতে হয়। গল্পে নাটকীয় মোড় এনে মাঝপথেই তার চরিত্রটির সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু দেখানো হয় এবং পরবর্তীতে কাহিনি অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে আমিন খানকে যুক্ত করা হয়।
অন্যদিকে, ‘শুধু তুমি’ সিনেমার মাত্র ৩০ শতাংশের মতো শুটিং হয়েছিল। বাধ্য হয়ে গল্প বদলে ডামি দিয়ে কাজ চালানো হলেও দর্শকরা সেটি সহজেই ধরে ফেলেছিলেন। তবে, শিবলি সাদিক পরিচালিত ‘আনন্দ অশ্রু’র বড় অংশের কাজ আগেই প্রস্তুত ছিল; শুধু ডাবিং ও শেষ কিছু দৃশ্য সালমানকে ছাড়াই গুছিয়ে নিয়ে এটি পর্দায় আনা হয়।
গল্পে প্লাস্টিক সার্জারির ‘ছলাকলা’
তবে অভিনব এক সমাধান এসেছিল ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘বুকের ভিতর আগুন’ চলচ্চিত্রে। সিনেমাটির বিশাল অংশের কাজ বাকি থাকায় শুধু ডামি দিয়ে তা সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল। বাধ্য হয়ে গল্পে বড়সড় এক কল্পকাহিনির সংযোজন করা হয়। স্ক্রিপ্টে দেখানো হয়, দুর্ঘটনার পর প্লাস্টিক সার্জারি করানোর ফলে নায়কের পুরো চেহারা পালতে গেছে! আর সেই বদলে যাওয়া চেহারায় আগমন ঘটে নবাগত ফেরদৌস আহমেদের। এই চলচ্চিত্রে ফেরদৌসের অভিনয় দেখে পরবর্তীতে প্রখ্যাত নির্মাতা বাসু চ্যাটার্জি ফেরদৌসকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে চূড়ান্ত করেছিলেন।
দৃশ্য ছাঁটাই ও নতুন মুখের সংযোজন
সব সিনেমা ডামি বা গল্প পরিবর্তনের মাধ্যমে শেষ করার ঝুঁকি নেননি অনেক নির্মাতা। কিছু ক্ষেত্রে সালমানের ধারণকৃত দৃশ্যগুলো পুরোপুরি বাদ দিয়ে একদম নতুনভাবে শুটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘মন মানে না’ সিনেমাটির বেশ কিছু অংশের কাজ সালমান করে গেলেও, তার প্রয়াণের পর সেই ফুটেজ ফেলে দিয়ে রিয়াজকে মূল চরিত্রে নিয়ে পুরো সিনেমাটি নতুন করে বানানো হয়। একই পথ অনুসরণ করে নির্মিত হয় ‘কে অপরাধী’ ও ‘তুমি শুধু তুমি’। প্রথমটিতে সালমানের করা অংশ বাদ দিয়ে ওমর সানীকে এবং দ্বিতীয়টিতে অমিত হাসানকে স্থলাভিষিক্ত করে নতুন করে দৃশ্যধারণ সম্পন্ন করা হয়।
সালমান নেই জেনেও পর্দায় নায়ককে খুঁজে বেড়ায় দর্শক
সব অসমাপ্ত গল্পের পরিণতি আবার শুভ হয়নি। ‘প্রেমের বাজি’ নামের চলচ্চিত্রটি সালমানের চলে যাওয়ার পর আর কখনোই শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। অন্য কোনো নায়ককে নিয়েও এর বাকি অংশ বা নতুন শুটিং করা হয়নি, ফলে সিনেমাটি অসমাপ্ত হিসেবেই থেকে যায়।
প্রযোজক-পরিচালকেরা সিনেমা বাঁচাতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। ডামি এনেছিলেন, গল্প বদলে দিয়েছিলেন, কিংবা নতুন তারকা দিয়ে বড় পর্দা সাজিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু রূপালী পর্দায় তিন দশক পরও যখন সিনেমাগুলো ভেসে ওঠে, দর্শক আজও সেই আসল রাজপুত্রকেই খুঁজে বেড়ান।
ডিএ
