১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যু পুরো দেশকে শোকস্তব্ধ করেছিল। মৃত্যুর পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০ বছর, কিন্তু সেই মৃত্যুরহস্যের জট আজও খোলেনি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে নিভে যাওয়া এই জীবনপ্রদীপ ‘আত্মহত্যা’র কারণে নিভেছিল নাকি তাকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করা হয়েছিল, এই প্রশ্নের চূড়ান্ত আইনি মীমাংসা গত তিন দশকে হয়নি। তবে দীর্ঘ ২৯ বছরের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মামলাটি অপমৃত্যু থেকে হত্যা মামলায় রূপ নিয়েছে এবং বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এর তদন্তভার সামলাচ্ছে।
অপমৃত্যু দিয়ে শুরু দীর্ঘ আইনি লড়াই
সালমান শাহর নিথর দেহ রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধারের পর তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী প্রথম দিকে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে পরিবারের দাবি ছিল, এটি আত্মহত্যা নয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এনে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। আদালত অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটিও তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। সিআইডির সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমর উদ্দিন চৌধুরী আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন
সিআইডির প্রতিবেদনের পর ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট দাখিল করা বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। এরপর সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান এবং ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ওই প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি সুনির্দিষ্ট ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, ‘তারাই হত্যার সঙ্গে জড়িত।’ এরপর তদন্তভার র্যাবের কাছে গেলে রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানালে আদালত র্যাবকে আর তদন্ত না করার নির্দেশ দেন।
এরপর ২০১৬ সালে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মাকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন। ২০২১ সালের অক্টোবরে আদালত এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
২৯ বছর পর নতুন মোড় ও হত্যা মামলা দায়ের
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পরও আইনি লড়াই থামায়নি সালমান শাহর পরিবার। নীলা চৌধুরীর পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবারও রিভিশন আবেদন করা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সেই রিভিশন মঞ্জুর করে মৃত্যুকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের এই আদেশের পরদিন ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, শিল্পপতি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, লতিফা হক লুছি, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদসহ অজ্ঞাতপরিচয় অনেককে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে তারা সালমানকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন এবং সে সময় কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
চলমান এই হত্যা মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতি
হত্যা মামলা দায়েরের পর তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। চলতি বছরের ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মামলার অন্যতম আসামি অভিনেতা ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০২০ সালে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের পর এই ডনই স্বস্তি প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ২৪ বছর পর তিনি বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্ত হলেন। অথচ সেই বক্তব্যের ছয় বছর পর হত্যা মামলাতেই তাকে কারাগারে যেতে হলো। ডনের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করার কথা জানালেও বাদীপক্ষের দাবি ভিন্ন। বাদীপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্যমতে, এই মামলার আরেক আসামি রেজভি আহমেদ ফরহাদ ১৯৯৭ সালে একটি অপহরণ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি সালমান শাহকে হত্যার কথা এবং ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে সেই জবানবন্দির বিষয়টি আবারও তুলে ধরা হয়েছে।
বর্তমানে সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানিয়েছেন মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এখন পর্যন্ত নয়বার পিছিয়েছে। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
ডিএ
