বিজ্ঞাপন

জন্মশতবর্ষে ভূপেন হাজারিকা

ব্রহ্মপুত্রের কণ্ঠস্বর : যতটা আসামের, তারও বেশি পৃথিবীর

ব্রহ্মপুত্রের কণ্ঠস্বর : যতটা আসামের, তারও বেশি পৃথিবীর

হিমালয়ের কোলে ছোট্ট এক শহর শদিয়া। লাল নদীর তীরে অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী এটি। এই নদীর কোলঘেঁষে তার বেড়ে ওঠা। প্রকৃতি তাকে যতটা প্রভাবিত করেছে, মানুষের জীবন করেছে তারও বেশি। আর তাই, জীবনের পুরোটা সময় তিনি বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের জন্য লিখে, মানুষের জন্য গেয়ে।

তিনি ভূপেন হাজারিকা। আসামের ইতিহাসে অন্যতম সফল কিংবদন্তি শিল্পী। আজ তার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে জীবনের একশ বছর পূর্ণ করতেন। তবে দেড় দশক আগেই, ২০১১ সালে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

না থাকলেও জন্মশতবর্ষে ভূপেন হাজারিকাকে স্মরণ করছেন শ্রোতা-ভক্তরা। কারণ তিনি এমন এক শিল্পী, যার গান শুধু ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়। তার গানের বাণী পৃথিবীর জন্য, গোটা জগতের সবার জন্য। তিনিই গেয়েছেন, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ সেই গান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার গান হয়ে উঠেছে, পেরিয়েছে কালের সীমানা।

ভূপেন হাজারিকা

মানুষের দুঃখ, দুর্দশা তাকে আহত করত। কিন্তু কার কাছে জবাব চাইবেন? কোথায় জানাবেন আক্ষেপ। গানই তো তার ভরসা। তাই গানেই তুললেন প্রশ্নের সুর—‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও/ নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন/ নৈতিকতার স্খলন দেখেও, মানবতার পতন দেখেও, নির্লজ্জ অলসভাবে বইছো কেন?’

নদী তো উত্তর দিতে পারে না। কিন্তু সেই গান মানুষের বিবেকে ধাক্কা দিয়েছে, মানুষকে ভাবিয়েছে। এটুকুই চেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। তার সংগীতের সাধনা ছিল মানুষেরই জন্য, মানবতার জন্য।

ভূপেন হাজারিকার পুরো নাম ভূপেন্দ্র কুমার হাজারিকা। ১৯২৬ সালের আজকের দিনে আসামের শদিয়ায় জন্ম তার। বাবা-মায়ের দশ সন্তানের মধ্যে সবার বড় ভূপেন। পড়েছেন বারণসীর কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে; পিএইচডি করেছেন নিউ ইয়র্কের কমল্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভরাট কণ্ঠ কিন্তু কোমল উচ্চারণ—এর জন্য পরিচিত ভূপেন হাজারিকা। প্রতিবাদ, সাম্য, মানবতা কিংবা রাজনীতি, যা কিছু নিয়েই গাইতেন, সেটাকে ঝাঁজালো নয়, যেন নরম সুরেই তুলে আনতেন কণ্ঠে।

সাদাকালো যুগে ভূপেন হাজারিকা

মাত্র ১০ বছর বয়সে গান লেখা ও সুর করা শুরু করেন ভূপেন হাজারিকা। আর মাত্র ১২ বছর বয়সেই অসমীয়া চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে অভিষেক হয় তার। এরপর ক্রমশ তিনি হয়ে ওঠেন আসামের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শিল্পী। তার কণ্ঠ ও গান ছড়িয়ে পড়ে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল এবং বাংলাদেশে। অসমীয়ার পাশাপাশি তিনি হিন্দি ও বাংলা গানও গাইতে থাকেন সমানতালে। যা তাকে উপমহাদেশে সার্বজনীন করে তুলেছিল।

ভূপেন হাজারিকার নন্দিত কিছু বাংলা গানের মধ্যে রয়েছে, ‘মানুষ মানুষের জন্যে’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘ও গঙ্গা তুমি বইছো কেন’, ‘হে দোলা হে দোলা’, ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল’, ‘সহস্র জনে মোরে প্রশ্ন করে মোর প্রেয়সীর নাম’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’ ইত্যাদি।

ভূপেন হাজারিকা

২০০৬ সালে বিবিসির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের মধ্যে ভূপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছিল। বর্ণাঢ্য সংগীত জীবনে তিনি অনেক সম্মাননা লাভ করেছেন। ভারতের জাতীয় পুরস্কার ছাড়াও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণ, আসাম রত্ন পেয়েছেন। এছাড়া মৃত্যুর আট বছর পর ২০১৯ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ম’তে ভূষিত করা হয়।

কেআই