ভাদ্রের দুপুর। আকাশে রোদ বৃষ্টি-বাদলের লুকোচুরির মাঝে ঘণ্টা খানেক অপেক্ষার পর বেবি ট্রাক্সিতে চেপে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোট চত্তরের বটতলায় পৌঁছালাম, সেখানেই দেখা মিলল গম্ভীরার সেই পরিচিত ‘নানা’র। কুশল বিনিময়ের পর কথার শুরু গম্ভীরা দিয়ে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বোঝা গেল, এই গল্প লোকসংগীতের ইতিহাসের পাশাপাশি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন মানুষের ছয় দশকের পথচলা।
মঞ্চের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, সহশিল্পীদের হারানোর বেদনা, নিজের জায়গা তৈরি করার সংগ্রাম এবং একটি লোক ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা। তিনি মাহবুবুল আলম—চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রবীণ গম্ভীরা শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী। বয়স এখন প্রায় ৭৪। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজের গল্প, মানুষের কথা আর হাসি-রসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন গম্ভীরার মঞ্চে।
প্রথমে গম্ভীরা নিয়ে কথা, তারপর ধীরে ধীরে খুলে গেল স্মৃতির ঝাঁপি। কথার ফাঁকে ফিরে এলেন সেই ছোট্ট মাহবুবুল আলম যিনি ১৯৬২ সালে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রথমবার মঞ্চে উঠেছিলেন ‘নাতি’ হয়ে। সেই যে মঞ্চে পা রাখা, এরপর কেটে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়।
শুরুটা হয়েছিল ‘নাতি’ হয়ে
১৯৬২ সাল। তখন মাহবুবুল আলম চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। স্কুলে একজন ইন্সপেক্টর আসবেন। তাকে কিছু একটা পরিবেশন করে দেখাতে হবে। সেই আয়োজনেই গম্ভীরার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। মাত্র ১৫ মিনিটের সেই পরিবেশনা হয়তো তখন একটি স্কুল অনুষ্ঠানের অংশ ছিল। কিন্তু মাহবুবুল আলমের জীবনে সেটিই হয়ে যায় নতুন এক অধ্যায়ের শুরু।

স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘আমার গম্ভীরার সঙ্গে পথ চলা শুরু বহুদিনের কথা, স্কুলে একজন ইন্সপেক্টর আসবেন ইন্সপেকশনে। তাকে কিছু দেখাতে হবে এবং তার কাছে কিছু দাবি জানাতে হবে। তখন সবাই বলল, নানা কে হবে? নানা হিসেবে এক দাদুকে দেখা গেল, তিনি খুব চটপটে ছিলেন। তাকে নানা বানানো হলো। আর নাতি হিসেবে আমাকে দেওয়া হলো। ১৫ মিনিটের ছোট্ট একটা পরিবেশনা ছিল। এই আমার প্রথম গম্ভীরা পরিবেশন।’
‘অনেক সময় কথায়, মিছিল-মিটিংয়ে যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন, গম্ভীরার রঙ্গ-রসের মাধ্যমে সেটিই সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।’
গম্ভীরা তখন পেশা নয়, ছিল ভালোবাসা
গম্ভীরাকে তখনও পেশা হিসেবে ভাবেননি মাহবুবুল আলম। জীবনের বাস্তবতায় নানা কাজ করেছেন। বিয়ের পর চাকরিতে যোগ দেন কলেজের লাইব্রেরিয়ান হিসেবে। কিন্তু চাকরির পাশাপাশি মঞ্চের টানটা আর ছাড়তে পারেননি। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গম্ভীরা নিয়ে ছুটেছেন। প্রায় পুরো বাংলাদেশেই অনুষ্ঠান করেছেন। শুধু কয়েকটি জেলা হয়তো বাদ পড়েছে। মঞ্চ বদলেছে, সময় বদলেছে, দর্শক বদলেছে কিন্তু গম্ভীরার সঙ্গে তার সম্পর্ক বদলায়নি।

চাকরি আর গম্ভীরা দুটোকে পাশাপাশি নিয়েই চলতে থাকে জীবন। দিনের বেলায় চাকরি, আর সুযোগ পেলেই মঞ্চের ডাক। তিনি বলেন, ‘কলেজে চাকরি করা অবস্থাতেই আমি দেশের প্রায় সব জেলাতেই গম্ভীরার প্রোগ্রাম করে বেরিয়েছি; কেবল দুই-তিনটি জেলা হয়তো বাকি আছে।’
শিবের গাজন থেকে ‘নানা-নাতি’
গম্ভীরার শিকড় বহু পুরোনো। একসময় এটি শিবের গাজনকে কেন্দ্র করে পরিবেশিত হতো। শিবের মন্দিরের সামনে লোকজন নাচ-গানের মাধ্যমে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরত। পরে সেই উপস্থাপনায় আসে পরিবর্তন। শিবের জায়গায় তৈরি হয় ‘নানা’ চরিত্র। আর সেই চরিত্রের সঙ্গে ‘নাতি’কে যুক্ত করে গম্ভীরাকে দেওয়া হয় আরও সার্বজনীন রূপ।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের সন্তান শেখ সুফিউদ্দিন, যিনি ‘সুফি মাস্টার’ নামে পরিচিত, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানান মাহবুবুল আলম। তার ভাবনাতেই নানা-নাতির চরিত্রের মাধ্যমে গম্ভীরাকে ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।
মাহবুবুল আলমের কাছে গম্ভীরার এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার কথায়, ‘অনেক সময় কথায়, মিছিল-মিটিংয়ে যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন, গম্ভীরার রঙ্গ-রসের মাধ্যমে সেটিই সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।’
হাসির আড়ালে মানুষের কথা
নানা-নাতির কথোপকথন হয়ে ওঠে গম্ভীরার অন্যতম শক্তি। হাসির ভেতর দিয়ে উঠে আসে সমাজের অসংগতি। রসিকতার মধ্যে বলা হয় মানুষের কথা। আর সেই কারণেই গম্ভীরা শুধু গান বা বিনোদন হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার মানুষের বক্তব্য জানানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম।
এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে তার দীর্ঘ পথচলায়। মাহবুবুল আলমের ভাষ্যে, ‘একসময় গ্রামের মানুষের কাছে ডায়রিয়ার চিকিৎসায় স্যালাইন খাওয়ার বিষয়টি খুব একটা পরিচিত ছিল না। ইউনিসেফ ও চিকিৎসকদের পরামর্শে চরাঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষার হার থাকা এলাকায় গম্ভীরা নিয়ে গেছেন তারা। গান, সংলাপ আর অভিনয়ের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন ডায়রিয়ায় শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, আর স্যালাইন সেই ঘাটতি পূরণে সাহায্য করে। মানুষ শুনেছে, হেসেছে, আবার প্রয়োজনীয় কথাটিও মনে রেখেছে।’
‘ক্লাসিক্যাল বা অন্যান্য নাচ গ্রামের সাধারণ মানুষ অতটা বুঝবে না। কিন্তু আমরা যে গম্ভীরা করি, তাতে মানুষ কথা জানতে পারছে, নাচ দেখতে পাচ্ছে এবং গানও শুনতে পাচ্ছে। এই বহুমুখী উপস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই, তাই গম্ভীরা কোনোদিন হারিয়ে যাবে না।’

এই দর্শন থেকেই মানুষের সচেতনতা তৈরিতে বহুবার গম্ভীরাকে ব্যবহার করেছেন তিনি। তবে দীর্ঘ এই পথচলায় নিজের শিল্পটাকেও বারবার নতুন করে চিনতে হয়েছে তাকে। একসময় বাংলা একাডেমির সামনে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তার ভাবনার জগৎ বদলে দেয়। অনুষ্ঠান শেষে একজন শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন গম্ভীরা করেন, কিন্তু এর ইতিহাস সম্পর্কে তিনি কতটা জানেন? মাহবুবুল আলমের উত্তর ছিল সোজাসাপটা, দেখে দেখে শিখেছেন, ইতিহাস তেমন জানা নেই।
সেই কথাটিই তাকে ভাবিয়ে তোলে। উপলব্ধি করেন, যে শিল্পকে নিয়ে কথা বলেন, তার শিকড় সম্পর্কে না জানলে নিজের কথাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরে ভারতের মালদহের লেখক প্রদ্যুত ঘোষের ‘লোকসংগীত লোকসংস্কৃতি গম্ভীরা’ বইটি হাতে পান। বইটি পড়ার পর গম্ভীরার ইতিহাস নিয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় তার।
একেকজন সহশিল্পী, একেকটি অধ্যায়
একজন শিল্পীর দীর্ঘ পথচলায় যেমন সাফল্য থাকে, তেমনি থাকে হারানোর গল্পও। মাহবুবুল আলমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কুতুবুল আলম অসুস্থ হওয়ার পর রকিবউদ্দিনের সঙ্গে নানা চরিত্রে গম্ভীরা করতে শুরু করেন তিনি। পরে কাজের ধরন ও মানিয়ে নেওয়ার সমস্যায় নতুন সঙ্গী খুঁজতে হয়। তখন পাশে দাঁড়ান বীরেন ঘোষ। তার সঙ্গে তার পথচলা দীর্ঘ হয়। রেডিওতেও একসঙ্গে অনুষ্ঠান করেন তারা।
মাহবুবুল বলেন, ‘বীরেন ঘোষের সাথে রেডিওতে সম্ভবত ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রোগ্রাম করি।’ কিন্তু সেই সঙ্গীও একসময় চলে যান। বীরেন ঘোষের মৃত্যুর পর মাহবুবুল আলমের কাঁধেই দলের দায়িত্ব নেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়।
পরে ঘোষ মারা গেলে সবাই বললো যে মাহবুব যদি দলটা ধরতে পারে তবে গম্ভীরা এগিয়ে যাবে। তিনি দায়িত্ব নেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, গম্ভীরার শক্তি তার সরলতায়। তার কথায় ‘আমরা কম কথায়, রসের মাধ্যমে মূল সমঝতার কথাগুলো বলতাম। বর্তমানেও সেই ধারা বজায় রেখে কাজ চলছে।’
‘মানি মাহবুবের দল’ থেকে ‘চাঁপাই গম্ভীরা’
দীর্ঘদিন দলটির আলাদা কোনো নাম ছিল না। নানা-নাতির নাম কিংবা দলের প্রধান ব্যক্তির পরিচয়েই দলকে চেনা হতো। মাহবুবুল আলম বলেন, “আগে কিন্তু আলাদা নাম ছিল না। নানা-নাতির নাম দিয়ে বা প্রধান ব্যক্তির নামে ‘মানি মাহবুবের দল’ এভাবে চলতো। পরবর্তীতে আমার নাতি (ফাইজুর রহমান মানি) বললো যে, ‘এভাবে হবে না, আমরা ‘চাঁপাই গম্ভীরা’ নাম দিয়ে একটা দল করি।’ সেই থেকেই ‘চাঁপাই গম্ভীরা’ নামে আমরা দল পরিচালনা করছি।”

বয়স তাকে থামাতে পারেনি। বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে এখন তিনি ভাবেন, তার পরের প্রজন্ম কীভাবে এই শিল্পকে ধরে রাখবে? গম্ভীরা একদিন হারিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা করেন না তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে মানের পরিবর্তন আসতে পারে বলে তার ধারণা।
তার কথায় হতাশার চেয়ে বরং ভবিষ্যতের শিল্পীদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার মানসিকতাই বেশি, ‘আমার চেয়েও হয়তো আরও ভালো শিল্পী উঠে আসতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক ব্যাপার হওয়ায় এটি টিকে থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।’
মাথায় মাথাল, হাতে লাঠির কারণ
গম্ভীরা পরিবেশনে সবসময় দেখা যায়, নানা-নাতির মাথায় রয়েছে মাথাল। আবার নানার হাতেও সবসময় থাকে একটি লাঠি। কেন এই সাজপোশাক? সেটার পেছনেও আছে ব্যাখ্যা। মাথাল মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রামীণ কৃষকের এক অনন্য প্রতীক। এটিকে গম্ভীরায় যুক্ত করার পেছনে রয়েছে গভীর ইতিহাস ও রূপক অর্থ। মাহবুবুল আলম জানান, অতীতে যখন শিবের গাজন হতো, তখনকার পোশাকও এমন সাদামাটা ছিল। গরীব মানুষরা নিজেদের দুঃখ-কষ্ট ও অভাবের কথা জানাতে শিবের কাছে এভাবে বলত—‘আমরা গরীব মানুষ, কাপড়-চোপড় নাই, খাওয়া-পরার হিসাব নাই, আর তুমি শ্মশানে-মশানে নেশা করে পড়ে আছ! আমাদের জন্য কিছু একটা করো।’
পোশাকের এই বিশেষত্ব নিয়ে ‘নানা’ বলেন, ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গম্ভীরায় কিন্তু নানার মাথায় মাথাল দেওয়ার প্রচলন ছিল না, এখনো নেই। কেবল বাংলাদেশে আমরা এটি যুক্ত করেছি। পাকিস্তান আমলে আমাদের সুফি মাস্টার প্রথম নানার চরিত্রে এই মাথাল সংযোজন করেন। সেখানে নানা হলেন একজন মুরুব্বি বা বয়স্ক মানুষ আর নাতি হলো চ্যাংড়া এক তরুণ। এই যে নানার মাথাল, গেঞ্জি আর পায়ের নূপুরের ব্যাখ্যার বিষয়টি এটা অন্য কেউ লেখেনি, আমি নিজেই লিখেছি এবং সবাই তা সাদরে গ্রহণ করেছে। নানার চরিত্রটা হলো অনেকটাই প্রশাসনের অভিভাবকীয় ভূমিকার মতো। নানা যেখানেই যান, তিনি যেন সবার প্রধান। আর মাথাল দিয়ে তিনি সব জনগণকে ছায়ার মতো আগলে রাখেন; সবাই যেন সেই মাথালের নিচেই আশ্রয় পেয়ে থাকে। নানার শরীরে কেবল একটি সাধারণ গেঞ্জি থাকা মানে হলো, তিনি এ দেশের সাধারণ ও গরীব খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নানার পায়ে একটি নূপুর থাকে। তিনি যখন হাঁটেন বা নাচেন, সেই নূপুরের আওয়াজ যেন বাজারে বা সমাজে বসবাসকারী সর্বস্তরের মানুষকে সবসময় সচেতন ও সতর্ক করে তোলে।’
যেভাবে নানা-নাতি ‘ইত্যাদি’তে
বিটিভির তুমুল জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও গান করেছেন এই নানা-নাতি। ২০১৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্বে তারা গম্ভীরা পরিবেশন করেছিলেন? মাহবুবুল জবাব দিলেন, ‘হানিফ সংকেত সাহেব আগে থেকেই আমাদের গম্ভীরা দেখে চিনতেন ও ভালোবাসতেন। তিনি জানতেন যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দলগুলোর মধ্যে আমরাই সবচেয়ে ভালো কাজ করি।

তাই তিনি নিজে থেকেই ঢাকায় বসে আমাদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। এরপর তারা ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসেন। এসে আমাদেরকে সার্কিট হাউসে ডেকে পাঠান। খবর পেয়ে আমরা সার্কিট হাউসে গিয়ে তাদের সাথে দেখা করি এবং গম্ভীরা পরিবেশনার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলি। পরবর্তীতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের হর্টিকালচার সেন্টারের ভেতরের আম্রকাননে সেই পর্বের শুটিং হয়েছিল।’
মানুষের গানই তো লোকসংগীত
মাহবুবুল আলমের কাছে লোকসংস্কৃতির অর্থ খুব সরল—এটি মানুষের নিজের গল্প। ‘মানুষের গানই তো লোকসংগীত বা লোকসংস্কৃতি।’ এই ‘মানুষের গান’কে মানুষের কাছেই পৌঁছে দেওয়াই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ। তিনি বলেন, ‘ক্লাসিক্যাল বা অন্যান্য নাচ গ্রামের সাধারণ মানুষ অতটা বুঝবে না। কিন্তু আমরা যে গম্ভীরা করি, তাতে মানুষ কথা জানতে পারছে, নাচ দেখতে পাচ্ছে এবং গানও শুনতে পাচ্ছে। এই বহুমুখী উপস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই, তাই গম্ভীরা কোনোদিন হারিয়ে যাবে না।’
এই বহুমুখী উপস্থাপনাই গম্ভীরাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে বলে মনে করেন তিনি। ১৯৬২ সালে যে ছেলেটি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হয়ে ১৫ মিনিটের জন্য ‘নাতি’ সেজে মঞ্চে উঠেছিল, সে জানত না সামনে তার জন্য অপেক্ষা করছে ছয় দশকেরও বেশি দীর্ঘ এক যাত্রা।
সেই যাত্রায় চাকরি এসেছে, সংসার এসেছে, সহশিল্পী এসেছে-গেছে, দল বদলেছে, দলের নাম বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি মঞ্চের প্রতি তার টান। তবে বয়সের ভার ও অসুস্থতার কাছে শেষ পর্যন্ত থামতে হয়েছে তাকে। ‘নানা’ চরিত্রে গম্ভীরার মঞ্চ মাতানো মাহবুবুল আলম বিদায় নিয়েছেন মঞ্চ থেকে; রেখে গেছেন দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি আর লোকসংস্কৃতির আঙিনায় নিজের স্বতন্ত্র ছাপ। এখন তার সময় কাটে সাহিত্য আড্ডা ও লেখালেখি চর্চায়। সামনে বই প্রকাশ্যেরও পরিকল্পনা রয়েছে তার।
এমআইকে/কেআই
