সিনেমার রূপালি পর্দা যখন শুধুই বিনোদন নয়, বরং ইতিহাস হয়ে চোখের সামনে ধরা দেয় তখন দর্শক আসনে বসে থাকা প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে এক পরম পাওয়া। হলিউডের মাস্টারমাইন্ড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান মানেই রূপালি পর্দায় নতুন কোনো ইতিহাস। চলতি সপ্তাহেই বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তার নতুন মহাকাব্যিক সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’। গ্রিক কবি হোমারের বিখ্যাত মহাকাব্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সিনেমাটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করা প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। নোলান থেকে শুরু করে ম্যাট ডেমন, অ্যান হ্যাথাওয়ের মতো তারকারা শুরু থেকেই বলে আসছেন—‘দ্য ওডিসি’র আসল স্বাদ পেতে হলে এটি দেখতে হবে প্রকৃত ‘আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার’ প্রিন্টে।
আর এই এক সিনেমা ঘিরেই বিশ্বজুড়ে সিনেমা দর্শকদের মাঝে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব এক উন্মাদনা। টিকিট পেতে মরিয়া দর্শক এক শহর থেকে অন্য শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। উন্মাদনা আকাশচুম্বী হলেও বাধ সেধেছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা। পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ২৫টি প্রেক্ষাগৃহে এই সিনেমাটি ‘প্রকৃত আইম্যাক্স ৭০ মিমি’ ফিল্মে দেখানোর প্রযুক্তি রয়েছে। বিশ্বজুড়ে এই সংখ্যাটি মাত্র ৪১। কিন্তু কেন এই প্রযুক্তির এত সংকট?
সম্প্রতি ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইম্যাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিচার্ড গেলফন্ড এই সংকটের পেছনের অবিশ্বাস্য গল্প শুনিয়েছেন। এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে তার সেই সাক্ষাৎকারটি ইতোমধ্যেই প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ দেখেছেন।
প্রেক্ষাগৃহের টিকিট বিক্রির পরিস্থিতি নিয়ে গেলফন্ড বলেন, ‘আমাদের কিছু কিছু থিয়েটারে আগামী পাঁচ সপ্তাহের সব টিকিট ইতোমধ্যেই অগ্রিম বিক্রি হয়ে গেছে। বাজারে এই ফরম্যাটের চাহিদা এখন তুঙ্গে। কিন্তু সমস্যা হলো, গত প্রায় ৫০ বছর ধরে নতুন কোনো আইম্যাক্স ফিল্ম প্রজেক্টর তৈরিই করা হয়নি। তাই আমরা পুরোনো প্রজেক্টরগুলোকেই মেরামত করছি, নতুন করে তৈরি করছি এবং আমাদের কৌশল হলো এটা দিয়ে কতদূর যাওয়া যায় তা দেখা। তবে চাহিদার কথা বিবেচনা করলে, আমি অবশ্যই আরও বেশি প্রজেক্টর দেখতে চাই।’
আইম্যাক্স সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই বিশেষায়িত ফিল্ম প্রজেক্টরগুলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি এখন পৃথিবীতে আর অস্তিত্বশীলই নেই। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যখন এর ডিজাইন ফাইল তৈরি হয়েছিল, তখন সেগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে আইম্যাক্সের কাছে এখন নতুন প্রজেক্টর তৈরির কোনো সম্পূর্ণ নকশা নেই। অনেকটা অ্যাপোলো যুগের মহাকাশযান তৈরির হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তির মতোই, বর্তমান প্রজন্মের খুব কম প্রকৌশলীই এই জটিল সিস্টেমটি পুরোপুরি বোঝেন।
ডিজিটাল বিপ্লব ও সেলুলয়েডের প্রত্যাবর্তন
২০০০ সালের শেষভাগে হলিউডে যখন ফিল্ম থেকে ডিজিটাল প্রজেকশনে রূপান্তর শুরু হয়, তখন থেকেই মূলত এই প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের বিলুপ্তি ঘটে। ডিজিটাল প্রজেক্টর সস্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হওয়ায় নির্মাতারা ফিল্ম প্রজেক্টর এবং এর খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি বন্ধ করে দেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রিস্টোফার নোলান এবং ডেনিস ভিলনেভের মতো জাদুকরী পরিচালকদের হাত ধরে এই ফরম্যাটের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটছে।
গেলফন্ডের মতে, ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় সব প্রেক্ষাগৃহে ফিল্ম প্রজেক্টর ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন নতুন প্রজেক্টর তৈরি করছি, কিন্তু এই বিশেষ ফিল্ম ব্যবহার করে প্রজেক্টর বানানো মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের ২ হাজার থিয়েটারের সবগুলো কি ফিল্ম প্রজেক্টরে রূপান্তর করা সম্ভব? না, কারণ পৃথিবীতে এখন এত প্রজেক্টর অবশিষ্ট নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমরা এই সংখ্যাটি আরও বাড়াতে পারব। ‘
২০২৩ সালে নোলানের ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমার ব্যাপক সাফল্যের পর আইম্যাক্স কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল যে ‘দ্য ওডিসি’র জন্য তাদের প্রজেক্টরের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এজন্য গত এক বছর ধরে পরিত্যক্ত, ভাঙা প্রজেক্টর খুঁজে বের করে, সেগুলোর যন্ত্রাংশ জোড়াতালি দিয়ে নতুন প্রজেক্টর সচল করার এক মহাযজ্ঞ চালায় প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে একদম নতুন করে ৬০ জন প্রজেক্ষনিস্টকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই কঠোর পরিশ্রমের ফলেই ‘ওপেনহাইমার’-এর সময় সচল থাকা ৩০টি প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়িয়ে এবার ‘দ্য ওডিসি’র জন্য বিশ্বব্যাপী ৪১টি করা সম্ভব হয়েছে।
‘শট উইথ আইম্যাক্স’ বনাম ‘ফিল্মড ফর আইম্যাক্স’
সাধারণ দর্শকদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? আইম্যাক্সের পোস্ট প্রোডাকশন প্রধান ব্রুস মার্কো জানান, ‘ফিল্মড ফর আইম্যাক্স’ হলো সেইসব সিনেমা যা আইম্যাক্স অনুমোদিত ডিজিটাল ক্যামেরায় শুট করা হয় এবং আইম্যাক্স স্ক্রিনের (১.৯০:১ অ্যাসপেক্ট রেশিও) জন্য অপ্টিমাইজ করা হয়।
অন্যদিকে, ‘শট উইথ আইম্যাক্স’ হলো সম্পূর্ণ খাঁটি সেলুলয়েড বা ফিজিক্যাল ফিল্মে আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণ করা সিনেমা। এটি সরাসরি আইম্যাক্সের ঐতিহ্যবাহী ১.৪৩:১ এর বিশাল পর্দায় দেয়াল থেকে দেয়াল, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত জাদুকরী ও নিমজ্জিত ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা দেয়—যা দর্শককে হলের ভেতরে না রেখে সরাসরি সিনেমার গল্পের ভেতরে নিয়ে যায়।
আপাতত আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নোলানের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জেদ এবং দর্শকদের এই অভাবনীয় উন্মাদনার ওপর। ‘ডুন: পার্ট থ্রি’ কিংবা নোলানের পরবর্তী সিনেমার হাত ধরে এই সেলুলয়েড বিপ্লব সিনেমা হলগুলোকে আরও কতদিন চাঙ্গা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এমআইকে
