বিজ্ঞাপন

তাদের ‘দাদাগিরি’ মানসিকতার পরিবর্তন দরকার: শাহেদ আলী

তাদের ‘দাদাগিরি’ মানসিকতার পরিবর্তন দরকার: শাহেদ আলী

মঞ্চ থেকে টিভি নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা হালের ওটিটি—শাহেদ আলীর বিচরণ সবখানেই। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করছেন তিনি। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, কুড়িয়েছেন দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা। দীর্ঘ ক্যারিয়ার, চলমান ব্যস্ততা এবং ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয় নিয়ে এ অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন ইব্রাহীম জাহিদ

ঢাকা পোস্ট: কী করছেন আজকাল?

শাহেদ আলী: ঈদের পরে সেভাবে নতুন কিছু শুরু হয়নি। ঈদের আগের কিছু কাজ বাকি ছিল, ওগুলো করছি। আর সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোও প্রচার হচ্ছে।

ঢাকা পোস্ট: ফেসবুকে একটা শুটিংয়ের ভিডিও দেখলাম, ভিকি জাহেদের পরিচালনায় কিছু একটা করছেন। কী সেটা?

শাহেদ আলী: এটা আসলে অন্য একজন পোস্ট করেছে, আমি শুধু ট্যাগ অ্যাপ্রুভ করেছি। যা-ই হোক, ওটা নিয়ে ভিকি নিজেই সময়মতো জানাবে নিশ্চয়ই। যেহেতু অফিশিয়াল কোনো অ্যানাউন্সমেন্ট দেওয়া হয়নি, আমার কিছু বলা সমীচীন হবে না।

শাহেদ আলী

ঢাকা পোস্ট: ভিকি জাহেদের নির্মাণে 'চক্র' সিরিজের দুটি সিজনেই আপনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন। দর্শকদের অনেকেই আপনার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে সেভাবে আপনাকে নিয়ে চর্চা হয়নি। এর কারণ কী?

শাহেদ আলী: গণমাধ্যমে চর্চা করার দায়িত্ব তো আসলে আমার না। অথবা গণমাধ্যমে চর্চা করার জন্য যে বিষয়গুলো ফলো করা হয়, সেটাও আমার পক্ষে করা সম্ভব না। তো যারা গণমাধ্যমকর্মী বা গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারক, তারা কাকে নিয়ে চর্চা করবেন—সেটা তাদের নিজস্ব বিষয়। আমি কখনোই কোনো জায়গায় নিজেকে চর্চিত রাখার জন্য বাড়তি চেষ্টা করিনি। সুতরাং চর্চা কেন হলো না বা হয় না, সেটা নিয়ে বলার জন্য আমি উপযুক্ত ব্যক্তি নই। এটা একদমই আমার এখতিয়ারের বাইরে।

ঢাকা পোস্ট: দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে অভিনয়ে আছেন। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় দিলেন অভিনয়ে। বিপরীতে কী পেলেন? কোনো অপূর্ণতা অনুভব করেন?

শাহেদ আলী: কিছু পাওয়ার জন্য কখনো কাজ করিনি, তাই অপূর্ণতা অনুভব হয় না। কিছু কিছু কাজ মানুষ নিজের আনন্দের জন্যই করে এবং আমি অভিনয়টা করে সে আনন্দ পাই। এটা দিয়ে আমার জীবন-জীবিকা চলে, সংসার চলে। আর এই কাজ করার জন্য যে সময়, প্রচেষ্টা বা যে মনোযোগ ও ধ্যান আমি দিই, সেটা নিজের আনন্দ নিয়েই দিই। এটা আমার নিজস্ব ভালো লাগার জায়গা। এর বিনিময়ে কী পেলাম, কী পেলাম না, সে হিসাব মেলানোর যোগ্য মানুষ নই আমি। তাছাড়া এটা মেলানোর মতো কোনো বিষয়ও না। বিষয়টা যার যার নিজের মতো, একেকজনের ইকুয়েশন একেক রকম হয়। সবার ইকুয়েশন এক ধরনের হবে বা একজনের সাথে আরেকজনেরটা মিলবে, এমনটা ভাবার অবকাশ নেই।

কিছু পাওয়ার জন্য কখনো কাজ করিনি, তাই অপূর্ণতা অনুভব হয় না। কিছু কিছু কাজ মানুষ নিজের আনন্দের জন্যই করে এবং আমি অভিনয়টা করে সে আনন্দ পাই।
গল্পের চরিত্রে শাহেদ আলী

ঢাকা পোস্ট: ক্যারিয়ারে যে’কটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, প্রায় সবগুলোই গল্পনির্ভর ও মানসম্পন্ন। চলচ্চিত্রই কি শাহেদ আলীকে খুঁজে নেয়? নাকি তিনি নিজেই গল্প বেছে নেন?

শাহেদ আলী: ‘ক্যারিয়ার’ কথাটায় আমার আপত্তি আছে! আমাদের দেশে যে ধরনের অভিনয় আমরা করি, সেটাতে ক্যারিয়ারের কিছু হয় না। এটা খুবই অপেশাদারভাবে এক ধরনের পেশাজীবী প্রচেষ্টা, এটাকে ক্যারিয়ার নাম দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেকে এটাকে ইন্ডাস্ট্রি বলে, কিন্তু এখানে ইন্ডাস্ট্রির মতো ইনফ্রাস্ট্রাকচার নেই। ফলে ইন্ডাস্ট্রি, ক্যারিয়ার এগুলো খুবই ফ্যাশনেবল শব্দ। অভিনেতা হিসেবে যখন যে জায়গায় কাজ করি, সেখানেই নিজেকে উজাড় করে দিতে চাই। সেটার কোনো স্পেসিফিক জায়গা নেই। যখন মঞ্চে কাজ করি, নিজেকে মঞ্চের একদম নিবেদিত প্রাণ হিসেবে প্রকাশ করার চেষ্টা করি; যখন টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রে কাজ করি, তখনও ধ্যানী হয়ে, মনোযোগী থাকার চেষ্টা করি। এমন বড় বা প্রভাবশালী অভিনেতা আমি এখনও হইনি যে, শুধু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেই নিজেকে টিকিয়ে রাখব।

ঢাকা পোস্ট: আপনি থিয়েটারের মানুষ। ইদানিং থিয়েটারে কী করছেন?

শাহেদ আলী: দলে (প্রাচ্যনাট) এখনো নিয়মিত কাজ করি। আমার দলের শেষ দুটো প্রোডাকশন ‘অচলায়তন’ এবং ‘আগুনযাত্রা’ দুটোতেই অভিনয় করেছি। এছাড়া ১৬ জুন শিল্পকলা একাডেমিতে আমাদের শো আছে ‘ব্যতিক্রম এবং নিয়ম’-এর। তো, বিষয় হলো, থিয়েটারের সঙ্গে নিয়মিতই সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করি আমি।

ঢাকা পোস্ট: কয়েকটি যৌথ প্রযোজনার ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। অনেকদিন ধরে সেটা বন্ধ। এ নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন? ভারতের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?

শাহেদ আলী: যৌথ প্রযোজনার ব্যাপারটা একদমই সরকারের উচ্চপর্যায়ের যারা নীতিনির্ধারক, তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। সেটাকে যত সহজ করে দুই দেশের মধ্যে কাজ করার প্রচেষ্টা নেওয়া যায়, ততই বেটার। কারণ এমনিতে আমাদের তো বাংলাভাষী হিসেবে একটা হীনমন্যতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় পশ্চিমবঙ্গের কাছে। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রকর্মীরা আমাদের সঙ্গে ‘ছোট ভাই’সুলভ আচরণ করে। ‘তারা বড় দাদা, আমরা ছোট ভাই’—এমন একটা ব্যাপার তাদের মধ্যে থাকে। ঠিকভাবে যৌথ প্রযোজনা হলে সমানে-সমানে কাজটা করার সুযোগ ঘটে। ভারতীয় শিল্পী বা কলাকুশলী যারা আছেন, তারা বাংলাদেশে অবারিত কাজ করেন। কিন্তু যখনই বাংলাদেশের কারও পশ্চিমবঙ্গে কাজের প্রশ্ন ওঠে, তখন রাস্তাটা এমন সহজ থাকে না। ফলে দুই দেশের মধ্যে যে বৈষম্যমূলক অবস্থান আছে, সেটা নিয়ে একটু চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। আমরা তো বাংলাভাষী হিসেবে পুরো পৃথিবীতে লিড দিই। বাংলা ভাষার একটা অংশ পশ্চিমবঙ্গ, তারা সবসময় কেন একটা সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগবে? তাদের এ আচরণের কারণে সংগীত, সাহিত্য, নৃত্যসহ অন্যান্য অনেক জায়গায় এক ধরনের মানসিক দৈন্যের ভেতর দিয়ে যেতে হয় আমাদের। এর সুনির্দিষ্ট সমাধান প্রয়োজন, তাদের এই ‘দাদাগিরি মানসিকতা’র পরিবর্তন দরকার।

ওখানকার যারা চলচ্চিত্রকর্মী, তারা আমাদের সঙ্গে খুব ‘ছোট ভাই’সুলভ আচরণ করে। ‘তারা বড় দাদা, আমরা ছোট ভাই’—এমন একটা ব্যাপার তাদের মধ্যে থাকে।
শাহেদ আলী

ঢাকা পোস্ট : এর কিছুটা দায় দেশের ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের ওপরে নিশ্চয়ই পড়ে?  

শাহেদ আলী :  হ্যাঁ। আমাদের এখানে একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, বাইরের টেকনিশিয়ান বা আর্টিস্ট নিয়ে আসার। এডিটিং, কালার, গ্রাফিক্স, ভিজুয়াল ইফেক্টস বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিংবা ক্যামেরাম্যান ও ডিওপি—অনেক কিছুর জন্যই এক ধরনের পরমুখাপেক্ষিতা তৈরি হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য শোভন না, খুব আরামদায়কও না। বাইরে থেকে স্পেশালিস্টের নামে লোক এনে যে কাজ করা হয়, তাতে খুব আহামরি কিছু তো দেখতে পাই না। বিপরীতে দেশে যারা ওই কাজগুলো করেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাউন্ড ডিজাইনের জন্য আপনি ভারতে যাচ্ছেন, ফলে এখানে যে লোকটা সাউন্ড ডিজাইনের কাজ করে, সে তো বেকার হচ্ছে। অথচ বাইরে গিয়ে আপনি বেশি টাকা দিয়ে কাজটা করাচ্ছেন! গল্পের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। যে গল্পগুলো বানানো হচ্ছে, দেখে মনে হয় না, এটা দেশি সিনেমা। দেশের একটা সিনেমার শোতে নায়ক তামিল সংস্কৃতির কাপড় পরে চলে আসছেন! তাহলে আমাদের জাতিসত্তার কী রইল? আমাদের কোনো সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটি নেই? নিজস্ব কোনো ল্যাঙ্গুয়েজ নেই? সিনেমা দেখে দর্শকদের যদি মনে হয়—এটা তামিল সিনেমা, না তেলেগু, নাকি বোম্বের সিনেমা, বুঝতে পারছি না। তাহলে ডাবিং করে বিভিন্ন ল্যাঙ্গুয়েজে দিয়ে দিলেই তো মনে হবে সেই দেশেরই ছবি চলছে!

ঢাকা পোস্ট: অনেকে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে ভারত। আপনার কী মনে হয়?

শাহেদ আলী: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তো আমাদেরকে মানসিকভাবে পঙ্গু করার মধ্য দিয়েই চলছে। আমাদের এখানে তাদের (ভারতের) কিছু কিছু এজেন্ট আছে, যারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে বসে বসে। এরা দেশের আরও অনেক ক্ষতি করছে। আসলে সব বিষয় নিয়ে তো এখন সবাই কথা বলে, এটা আমাদের একটা জাতিগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের এই বিষয়ে বলা উচিৎ বা যাদের কাজ করা উচিত, তারা বলছে না, করছেও না।

ঢাকা পোস্ট: আপনার স্ত্রী দীপা খন্দকারও দেশের নামি অভিনেত্রী। পরস্পরের অভিনয় ও কাজ নিয়ে বাসায় আপনাদের আলোচনা হয়?

শাহেদ আলী: হ্যাঁ, আলোচনা তো হয়ই। অনেক সময় অনেক ধরনের আলোচনা হয়—ভালো, খারাপ এগুলো নিয়ে কথা হয়। এটা তো একটা প্রসেস, পার্ট অব দ্য লাইফ। আলাদা করে বলার মতো কিছু না।

সন্তানদের সঙ্গে শাহেদ আলী ও দীপা খন্দকার দম্পতি

ঢাকা পোস্ট: কখনো মনে হয়েছে, অভিনয়টা ছেড়ে দেবেন?

শাহেদ আলী: হ্যাঁ, অনেক সময় মনে হয়। যখন কাজকর্ম পাই না, বাসায় বসে থাকি, সংসার চালানোর জন্য ন্যূনতম জোগানের অভাব বোধ করি—তখন এমন মনে হয়। প্রয়োজনীয় রসদ যখন জোগাড় করতে পারি না, তখন তো মনে হয়, অভিনয় ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করলেই ভালো হতো। কিন্তু এত দিন পার করা পর তো আসলে অন্য কিছু করার সুযোগ নেই। তাছাড়া এটা সিরিয়াসলি ভাবারও সুযোগ নেই। মানে এখন যে জায়গায় আছি, যেভাবে যতগুলো সময় পার করে এসেছি জীবনে, সেখান থেকে নতুন করে কিছু শুরু করা কঠিন। অভিনয়টা এখন বেশিরভাগের জন্যই খুব অনিশ্চিত পেশা। যদিও এক ধরনের ভাব-ভঙ্গি ধরে থাকে সবাই, আমরা অনেক ভালো আছি! কিন্তু বেশিরভাগের জন্যই এটা খুবই ইনকনসিস্টেন্ট একটা প্রফেশন। এটা নিয়ে খুব বড়াই করার কিছু নাই। অভিনেতাকে স্ট্রাগলের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। এ কারণে আমি প্রথমেই বলেছি, আমাদের এখানে ক্যারিয়ার, ইন্ডাস্ট্রি শব্দগুলো খুব হাস্যকর।

প্রয়োজনীয় রসদ যখন জোগাড় করতে পারি না, তখন তো মনে হয়, অভিনয় ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করলেই ভালো হতো। কিন্তু এত দিন পার করা পর তো আসলে অন্য কিছু করার সুযোগ নেই।

ঢাকা পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের যারা অভিনয়শিল্পী হতে চায়, তাদের কী উপদেশ দেবেন?

শাহেদ আলী: উপদেশ দেওয়ার কিছু নাই। যার যেটা ইচ্ছে হবে, সে সেটা করবে; যদি সে ওই জায়গার জন্য উপযুক্ত হয়। তার যদি যোগ্যতা থাকে, মার্কেট ভ্যালু তৈরি হয়, সে কাজ করবে। আলাদা করে এখন তো শেখার কিছু নেই। যে কেউ এখন অভিনেতা হতে পারে! এমন অনেকেই অভিনয় করছেন, যারা জীবনে কখনো এর চর্চাই করেননি। সে একটা ব্যাংকের কর্মকর্তা বা গৃহিণী অথবা ব্যবসায়ী; আশেপাশের লোক তাকে বলেছে, ‘তুই অভিনেতা হয়ে যা, ভালো করবি’। এরপর সে অভিনয়ে চলে এসেছে! সুতরাং যাদের ইচ্ছা হবে, তারাও করবে।

এমআইকে/কেআই