সময়টা তখন গ্রীষ্মকাল। প্রচণ্ড রোদে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির। ততদিনে গ্রামের অধিকাংশ ক্ষেতের ধান কাটা হয়ে গেছে। পশ্চিম দিকের বিল প্রায় শূন্য। ধানহীন বিস্তীর্ণ ক্ষেতের মাটি শুকিয়ে যেন রূপ নিয়েছে পাথরে। খালি পায়ে হাঁটতে গেলেও ব্যথা লাগে। সেই বিল থেকে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছে দরবেশ। না না, পীর-মুর্শিদ ধাঁচের কেউ না। তার নামই দরবেশ। এটা আসল নাম কিনা, জানা হয়নি কখনো। তবে পরিবার থেকে শুরু করে গ্রামের সকলে তাকে এ নামেই চেনে।
দ্রুত লয়ে হেঁটে বাড়িতে এলো দরবেশ। লুঙ্গির কাছা খুলল, অমনি ঝরঝরিয়ে পড়ল কই, টাকি আর শিং মাছ। তা প্রায় এক কেজি তো হবে! সকলে অবাক। এই আকালে মাছ পেল কোথায়! যে বিল শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, সেখান থেকেই নাকি মাছ ধরে এনেছে দরবেশ। কথা বিশ্বাস হয় না কারোর। কিন্তু জ্যান্ত মাছকে কিভাবে অবিশ্বাস করা যায়!
আরেক দিনের ঘটনা। দরবেশের বোনের শ্বশুরবাড়ি অন্য উপজেলায়, কৃষ্ণপুরে (ছদ্মনাম)। যেতে হয় বাসে অথবা ট্রেনে। বাসে ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তা। ট্রেনে আরেকটু কমই লাগে, কারণ মাঝে আর স্টেশন নেই। একদিন পরিবারের সঙ্গে কৃষ্ণপুর যাওয়ার কথা দরবেশের। কিন্তু তাকে রেখেই সবাই রওনা করে, ট্রেনে চড়ে। ট্রেন ছুটল দরবেশের, বাসে যাওয়ার মতো টাকাও তার কাছে নেই। অথচ তার পরিবার কৃষ্ণপুর গিয়ে দেখে বোনের সঙ্গে বসে হেসে হেসে গল্প করছে দরবেশ! কিভাবে সম্ভব? দরবেশ জবাব দিলো, হেঁটে হেঁটে এসেছে সে! কারোর বিশ্বাস হয় না। কিন্তু জলজ্যান্ত দরবেশকে কৃষ্ণপুরে বসে থাকতে দেখেও বিশ্বাস না করে কী উপায়!
এমন অনেক ঘটনা আমরা শুনেছি, দরবেশকেও দেখেছি। বয়স কত তার? ২৫-এর মতো হয়তো। আমরা তখন শৈশবের লাটিম-ঘুড়ির জীবনে। দরবেশের এমন অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলো অবাক করত গ্রামের সবাইকে। দরবেশের কি অলৌকিক কোনো ক্ষমতা ছিল? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খেত সবার মনে। তারপর একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল দরবেশ। কোথায় গেল, কার কাছে গেল, কেউ জানে না। কত খোঁজাখুঁজি হলো, দরবেশকে আর পাওয়া গেল না।
শনিবার রাতে ‘রইদ’ দেখার সময় বারবার আমার সেই দরবেশের কথাই মনে পড়ছিল। একবার মনে হচ্ছিল, সাদুর মধ্যে দরবেশের ছায়া, গতরে লম্বা, গায়ের রঙ কালো আর মাথা নিচু করে হাঁটা। পরে মনে হলো, না; দরবেশ যেন পাগলী—সাদুর বউ। দরবেশের মতো পাগলীরও কোনো নাম নেই। এলোমেলো চলে, অদ্ভুত আচরণ করে। আর এমন সব কাণ্ড ঘটায়, যেগুলো সাধারণ যুক্তিতে আঁটে না।

‘রইদ’-এ পাগলীকে বিয়ে করে ঘরে আনে সাদু। কিন্তু অন্য আট-দশটা দাম্পত্যের মতো তাদের গল্প এগোয় না। রান্না করতে গিয়ে তরকারিতে মুঠো ভরে লবণ দিয়ে দেয় পাগলী। সে খাবার উগড়ে দিয়ে আবার নিজেই গেলাসভর্তি জল ঢালে পাতে। স্বামীকেও দেয়। ওভাবেই খেতে বলে। স্ত্রীর এমন উদ্ভট আচরণে অতিষ্ট হয়ে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে অজানা এক জঙ্গলের দিকে রেখে আসে সাদু। পেছন থেকে পাগলের মতো ডাকে পাগলী। ফিরে তাকায় না সাদু। মন শক্ত রেখে চলে আসে। ওই দৃশ্য হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু সে কম্পন রীতিমতো উত্তেজনায় রূপ নেয় তখন, যখন সাদু একটি পাকা তাল কুড়িয়ে পায়। আর সে তাল হাতে নেয়া মাত্রই ভেসে আসে পাগলীর গলার স্বর। ফিরে আসে পাগলী। অচেনা অঞ্চল থেকে কোনো অলৌকিক শক্তিতে সে ফিরে আসে, অক্ষত।
আবার সেই সরল হাসিতে জমে ওঠে সাদু-পাগলীর সংসার। সাদুকে তালের পিঠা বানিয়ে খাওয়ায়। সাদু খায়, আর বলে, ‘এমন পিঠে বাপের জন্মে খাইনি’। এ কথা সে বারবার বলে। তাতে বোঝা যায়, এ কোনো সাধারণ তাল নয়।
পাগলীর এমন অবিশ্বাস্য কাণ্ড কয়েকবারই ঘটে। একবার তো এমনও ঘটল, কেউ এসে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিলো। পুরো ঘর দাউদাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। গরুটা মরে গেল। অথচ কী আজব কাণ্ড, ঘরের ভেতরে শেকলে বন্দী থাকা পাগলী বের হয়ে এলো জীবন্ত। সঙ্গে তার ছাগলটাও। এসব দৃশ্যে যুক্তির অংক মেলে না। কিন্তু ভাবনার অংক ঠিকই মেলে। জীবন ও পৃথিবী তো এমনই রহস্যময়। স্বাভাবিকের ভিড়ে অস্বাভাবিক কিছু ঘটে যাওয়াই তো এর বৈচিত্র্য।

‘রইদ’ আমাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে শৈশবে, অকৃত্রিম গ্রামের জীবনে। সাদু যেন আমারই চেনা কেউ, সরল যে মানুষটা দিনভর অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারে। তবু কোনো অভিযোগ নেই। হাঁটাচলা, চাহনি, অভিব্যক্তি কিংবা সংলাপ—প্রত্যেকটা বিষয়ে ফুল মার্কস পাবেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। এমন নিরেট পারফর্মেন্স বিরল। পাগলী চরিত্রে তুষি নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেটাও অবিশ্বাস্য। তার মুখের গালিও লেগেছে প্রাসঙ্গিক, উপভোগ্য। বাকিরাও প্রত্যেকের জায়গায় ঠিকঠাক, সাবলীল।
ছবিটির আবহ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে এর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তাল পড়ার শব্দ কিংবা পাগলীর ফিরে আসা অথবা ক্লাইম্যাক্সে যে শব্দসংগীতের খেলা, তাতে রাশীদ শরীফ শোয়েব ওভার দ্য বাউন্ডারি হাঁকিয়েছেন। চিত্রগ্রহণ তো নয়, ‘রইদ’ যেন কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা অগণিত চিত্রের চলমান রূপ। এমন ল্যান্ডস্কেপ বাংলার ছবিতে আর দেখা যায়নি।
‘রইদ’-এর প্রায় সবই ভালো লেগেছে। কেবল দুটো দিক কিঞ্চিৎ পীড়া দিয়েছে। এক—ছবিজুড়ে গ্রেইনি আবহ প্রকট; যেটা অ্যাস্থেটিক অনুভবের চেয়ে যেন নয়েজ বেশি অনুভব করিয়েছে। দুই—সাউন্ড ডিজাইন অনবদ্য। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্যে চারপাশের শব্দ এতো বেশি লাউড, চরিত্রের সঙ্গে কানেকশনটা ছুটে যাচ্ছিল।
অবশ্য ‘রইদ’ এমন মাপের, এমন অনুভবের ছবি হয়ে উঠেছে, খুব সহজেই উল্লেখিত দুটি নেতিবাচক দিক এড়িয়ে যাওয়া যায়। তবু বললাম, যা মনে হয়েছিল, বলা তো উচিৎ। ছবিটির গল্প বোঝা না বোঝা নিয়ে অনেক চর্চা দেখেছি। কেউ কেউ ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তবতার ব্যবহার নিয়েও সমালোচনা করেছেন। যদিও আমার কাছে সেটা দারুণ উপভোগ্য লেগেছে। শেষটা প্রশ্নের সুরে করি—রূপকথা কি শুধুই কথা? অলৌকিকতার ভেতরেও কি কিছুটা লৌকিকতা নেই?
ছবি : রইদ
রেটিং : ৯/১০
পরিচালনা : মেজবাউর রহমান সুমন
অভিনয়ে : মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ প্রমুখ।

কেআই
