বিজ্ঞাপন

‘মাস্তুল’ আন্তর্জাতিক মানের ছবি : ফজলুর রহমান বাবু

‘মাস্তুল’ আন্তর্জাতিক মানের ছবি : ফজলুর রহমান বাবু

পর্দায় তার অভিনয় যেমন দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে, তেমনই তার কণ্ঠে মাটির সুর সহজেই ছুঁয়ে যায় শ্রোতাদের হৃদয়। তিনি ফজলুর রহমান বাবু—দেশের খ্যাতিমান অভিনেতা। ১৭ জুলাই মুক্তি পাবে তার অভিনীত নতুন ছবি ‘মাস্তুল’; এতে গানও গেয়েছেন শিল্পী। তার কণ্ঠে কালজয়ী লোকগান ‘আমায় ভাসাইলি রে’ শ্রোতাদের সাড়াও পাচ্ছে বেশ। এসব প্রসঙ্গের সূত্র ধরে তার সঙ্গে মুঠোফোন আড্ডায় মেতেছেন ইব্রাহীম জাহিদ। 

ঢাকা পোস্ট : ‘মাস্তুল’-এর জন্য গাইলেন। আবার এ ছবির প্রধান অভিনেতাও আপনি। এক ছবিতে দুই ভূমিকা, কেমন ছিল অভিজ্ঞতা?

ফজলুর রহমান বাবু : এটা আসলে ছবির মূল অংশের গান না। এটা মূলত সিনেমার প্রমোশনের জন্য তারা একটা ভিডিও তৈরি করেছে, গানটি সেখানেই ব্যবহার করা হয়েছে। এই ছবির গল্পটা কিছু ভাসমান মানুষকে নিয়ে। ভাসমান বলতে কিন্তু ঘরহীন মানুষ না; যারা মূলত নদীতে জাহাজে কাজ করে; যেমন সুকানি, নাভিক, বাবুর্চি—তাদের জীবনের গল্প। জাহাজের এই মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা অত্যন্ত চমৎকার একটি মানবিক গল্প এটি, আর এই কারণেই নদী কেন্দ্রিক গানটি বেছে নেওয়া হয়েছে।

আর দুই ভূমিকার কথা যদি বলেন, এর আগেও আমি একই ছবিতে অভিনয় করার পাশাপাশি প্লেব্যাক করেছি। মূলত আমি অভিনয়ই করি, তার পাশাপাশি প্লেব্যাকও করা হয়েছে এমন অনেক ছবি আছে। নিজের অভিনীত ছবিতে প্লেব্যাক করতে আসলে ভালোই লাগে। আমি মূল পেশায় সংগীতশিল্পী না হলেও যখন প্লেব্যাক করি এবং সাধারণ মানুষ সেটা পছন্দ করে, সেটা আমার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্য এবং অনেক বড় প্রাপ্তি।

ঢাকা পোস্ট: ‘মাস্তুল’ আপনার কাছে কবে, কীভাবে এলো? ছবিটাতে যুক্ত হওয়ার ঘটনাটা শুনতে চাচ্ছি...

ফজলুর রহমান বাবু: ছবিটার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের দিকে। প্রথমে ছবির পরিচালক আমার সাথে যোগাযোগ করেন। যোগাযোগ করার পর আমি গল্পটার সিনোপসিস বা সংক্ষেপটা একটু শুনি। শোনার পরেই গল্পটার প্রতি আমার এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয় যে ছবিটা করা যায়। এরপর যখন আমি পুরো স্ক্রিপ্ট হাতে পাই, তখন দেখলাম যে কাজটা আসলেই দারুণ।

ফজলুর রহমান বাবু

আসলে যারা এই ধরনের চলচ্চিত্র বানায়, অর্থাৎ যারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম বা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, তারা তো প্রচলিত ফরম্যাটের বাণিজ্যিক ছবি বানায় না। তারা মূলত অন্য ধরনের জীবনঘনিষ্ঠ গল্প পর্দায় বলতে চায়। এই রকম ভিন্নধর্মী কাজের প্রতি আমার এমনিতেই সবসময় আলাদা একটা আগ্রহ থাকে। গতানুগতিক বা চেনা ফরমেটের ছবি তো আমি ওইভাবে আসলে করতে চাই না। সেই জায়গা থেকেই আগ্রহের সৃষ্টি এবং ধীরে ধীরে এই ছবির সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

তবে ছবিটা করতে গিয়ে আমাদের বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম বড় বাধা ছিল করোনা মহামারি। করোনার কারণে আমরা দীর্ঘ সময় শুটিং করতে পারিনি, অনেক সময় প্রপার শট নেওয়া সম্ভব হয়নি। এরকম অনেক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তারপরও আমি বলব, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের ছবি হয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তির আগেই এটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে। 

ঢাকা পোস্ট: মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তো পুরস্কারও জিতল… 

ফজলুর রহমান বাবু: হ্যাঁ, ফেস্টিভ্যালের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশগ্রহণ করেছে ‘মাস্তুল’ এবং সেখানে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে। চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি বোর্ডের সদস্য এবং বোদ্ধা দর্শক—উভয় মহলের কাছেই ছবিটি ভীষণভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

ঢাকা পোস্ট: ‘আমায় ভাসাইলি রে’ গানটি করার প্রসঙ্গ এসেছিল কীভাবে?

ফজলুর রহমান বাবু: এই ভাবনাটা সম্পূর্ণ পরিচালকের মাথা থেকে এসেছে। যেহেতু ওরা ছবির প্রচারণার জন্য একটা প্রমোশনাল ভিডিও বানাবে, তাই তারা চিন্তা করছিল যে সেখানে কী ধরনের গান ব্যবহার করা যায়। যেহেতু এই সিনেমাটির গল্প নদীর জীবন এবং নদীর সাথে যাদের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে তাদের নিয়ে, তাই এই গানটি চরিত্রের ও গল্পের সাথে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের বিখ্যাত পল্লীকবি জসীম উদদীনের লেখা একটি গান। সবকিছু মিলিয়ে তাদের মনে হয়েছে, গানটি আমাকে দিয়ে গাওয়ালে ভালো হবে। তবে প্রচলিত যেভাবে গানটি গাওয়া হয়, আমি কিন্তু ঠিক সেভাবে গাইনি। লক্ষ্য করলে বুঝবেন, আমি আমার মতো করে, এই ছবির গল্প এবং চরিত্রের প্রয়োজনে যেভাবে দরকার, ঠিক সেভাবেই গেয়েছি। আমার যে চরিত্র, সেই চরিত্রের জায়গা থেকেই গানটি পরিবেশন করার চেষ্টা করেছি।

সুর ও অভিনয়ে ফজলুর রহমান বাবু, প্রকাশ পেল ‘মাস্তুল’-এর গান
গানে ফজলুর রহমান বাবু

ঢাকা পোস্ট: পল্লীকবি জসীম উদদীনের গান এটি, লোকজ সুরের। এই ধরনের গান আপনার কণ্ঠে শ্রোতারা বরাবরই পছন্দ করেন। আপনারও কি ব্যক্তিগতভাবে ফোক বা লোকগান বেশি প্রিয়?

ফজলুর রহমান বাবু: এটা তো আসলে মাটির গান; আর মাটির গান আমি সবসময়ই ভীষণ পছন্দ করি। এর আগেও আমি লোকগান বা ফোক ধারার গান করেছি। আমাদের যে লোকগান, লোকসংস্কৃতি—এগুলোর প্রতি আগাগোড়াই আমার একটা নাড়ির টান আছে। আমি এগুলো মনে-প্রাণে পছন্দ করি এবং সত্যি বলতে, মাটির সুর আর মাটির গান সরাসরি আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে।

ঢাকা পোস্ট: ‘মাস্তুল’-এর প্রেক্ষাপট কেমন? একটু আভাস যদি দেওয়া যায়...

ফজলুর রহমান বাবু: প্রেক্ষাপট তো আমি আগেই কিছুটা বললাম যে, এটি নদীতে ভাসমান মানুষদের গল্প। যারা মূলত নদীতে জাহাজে কাজ করে জীবন অতিবাহিত করে, তাদের ভেতরের যাপন এবং একটি সুন্দর মানবিক গল্প ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে।

ঢাকা পোস্ট: ছবিতে আপনার যে চরিত্র, সেটা কেমন? তার জীবন-যাপন আপনাকে কোনো আলাদা ভাবনা দিয়েছে কি?

ফজলুর রহমান বাবু: এখানে আমার চরিত্রটি হচ্ছে ওই জাহাজের একজন বাবুর্চির। সে একজন বয়স্ক লোক, যে জাহাজে রান্নাবান্না করে সবাইকে খাওয়ায়। আসলে একটা জাহাজ কিন্তু নিজেই একটা পরিবার। সেখানে অনেকগুলো মানুষ একসাথে কাজ করে, থাকে। সেই পরিবারে একজন বাবুর্চি থাকে, যে বাজারঘাট করে, রান্নাবান্না করে সবাইকে পরম মমতায় খাওয়ায়—আমি ঠিক এই রকমই একটি চরিত্রে অভিনয় করেছি।

‘মাস্তুল’ সিনেমার দৃশ্য

আর ভাবনার কথা যদি বলেন, যে কোনো চরিত্র রূপায়ন করতে গেলেই তো সেই চরিত্রটা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হয়। গল্পের প্রতিটি চরিত্র নিয়েই আমরা ভাবি, পুরো গল্পটা নিয়ে ভাবি। ঠিক একইভাবে আমি যে চরিত্রে অভিনয় করছি, সে মানুষটা কোত্থেকে আসলো, তার ভেতরের ভাবনাগুলো কেমন, সেগুলো নিয়ে বিস্তর ভাবতে হয়েছে। স্ক্রিপ্ট বা টেক্সটের মধ্যে তো অনেক কিছু লেখাই থাকে, কিন্তু একজন অভিনেতার কাজ হলো তার ভেতর থেকে ‘সাবটেক্সট’ বের করা। কেন এই মানুষটা এখানে আছে, কী কারণে সে এই জাহাজের জীবনে আটকে আছে, তার কোনো পরিবার আছে কি নেই, সে মানুষ হিসেবে কতটা মানবিক—চরিত্রের এই গভীরের দিকগুলো আবিষ্কার করার জন্য অনেক পড়াশোনা ও ভাবনার প্রয়োজন পড়ে। আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি।

ঢাকা পোস্ট: নতুন আর কী করছেন? সিনেমা, নাটক কিংবা ওটিটিতে...

ফজলুর রহমান বাবু: আমি মাঝখানে বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলাম। প্রায় চার মাস আগে আমার হার্টের একটা ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছে। সে কারণে এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারিনি। অপারেশনের পর নতুন কোনো কাজ করা হয়নি। তবে শরীর এখন অনেকটাই সুস্থ, খুব শিগগিরই আবার নতুন কাজের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব। আর ‘মাস্তুল’ ছবির কাজ তো অনেক আগে করা; ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২২-২৩ সালের দিকে এর কাজ শেষ হয়েছিল।

এমআইকে/কেআই