প্রণোদনা লোপাটের কৌশল, নাকি কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়া?

জিলানী গ্লোবাল ট্রেড। ২০২০ সালের অক্টোবরে একটি ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে দাবি করে যে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের আলু রপ্তানি করেছে। শুধু তা-ই নয়, ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট আলু রপ্তানির অগ্রিম হিসেবে ৪১ হাজার ১৭৮.২২ মার্কিন ডলার দেশেও আসে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী শুল্কায়নও করে। স্বাভাবিক নিয়মে কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক হিসেবে বিল অব এক্সপোর্ট ও ইএক্সপির মাধ্যমে সরকারি নগদ সহায়তা বা প্রণোদনার জন্য আবেদন করে জিলানী গ্লোবাল।
২০২১ সালের মে মাসে সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া শেষে ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা গ্রাহক জিলানী ট্রেডের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। অনুরূপভাবে প্রতিষ্ঠানটির মোট ৮১টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে অগ্রিম ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৪৭.৮৯ মার্কিন ডলার প্রত্যাবাসন হয়, আর প্রণোদনা হিসেবে নগদ ছাড় হয় ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার ৫৮২ টাকা।
জিলানী গ্লোবাল ট্রেডসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আলু রপ্তানির নামে কোটি কোটি টাকার জালিয়াতি করেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২১১টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করা হলেও বাস্তবে কোনো পণ্য বন্দরে আসেনি বা জাহাজে ওঠেনি। অফ-ডক প্রতিষ্ঠান, শিপিং এজেন্ট এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের নথিপত্রে এই রপ্তানির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত কাগজেই আলু ছিল, বাস্তবে পণ্য রপ্তানি ছিল শূন্য
পুরো বিষয়টি বিবেচনা করলে মনে হবে— সবই তো ঠিক আছে, সমস্যা কোথায়? রপ্তানির বর্ণনা থাকলেও আলুর অস্তিত্ব নিয়েই আসলে প্রশ্ন! যে আলুর রপ্তানির কথা বলা হচ্ছে, সেই পণ্যের বাস্তব অস্তিত্বই মিলছে না। অথচ বৈদেশিক মুদ্রা ঠিকই দেশে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, আলুর উৎপাদন, ক্রয়, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং ও জাহাজিকরণ— কিছুই বাস্তবে হয়নি। অর্থাৎ পণ্য দুবাই যায়নি। তাহলে পণ্যের মূল্য-বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা কেন দেশে এলো? সেই জবাব খুঁজতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিভাগীয় তদন্তের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে ঢাকা পোস্ট।
দেখা যায়, জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ৮১টি বিল অব এক্সপোর্টের মধ্যে উত্তরা ব্যাংকে ৫২টি, অগ্রণী ব্যাংকে ২৮টি এবং সিটি ব্যাংকে ১টি বিল অব এক্সপোর্ট রয়েছে। মূল ঘটনা জানতে আলুর ডিপোতে প্রবেশ, রপ্তানি এবং রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা ছাড়— সব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
আলু কি ডিপোতে প্রবেশ করেছিল?
জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ৮১টি পণ্য চালানের নথিপত্র পর্যালোচনায় চারটি অফ-ডক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মেসার্স শফি মটরস লিমিটেড, মেসার্স ভারটেক্স অফ-ডক লজিসটিক সার্ভিসেস লিমিটেড, মেসার্স কে অ্যান্ড টি লজিসটিকস লিমিটেড ও ইনকন্ট্রেড লিমিটেড। বিল অব লেডিং অনুসারে ২০১৯ ও ২০২০ সালের বিভিন্ন সময়ে রপ্তানি পণ্য ডিপো হয়ে বিদেশে যাওয়ার কথা। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তারা কোনো রপ্তানি পণ্য পায়নি।
ডিপো কর্তৃপক্ষ বলছে, বিল অব এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট অফ-ডকে পণ্য গ্রহণের রেজিস্টারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংক থেকে সরবরাহকৃত বিল অব এক্সপোর্টের হার্ড কপিতে যে সিল ও রেজিস্টার নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ডিপোতে রক্ষিত নম্বরের কোনো মিল নেই।
অস্তিত্বহীন শিপিং এজেন্ট
জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ৮১টি পণ্য চালানের বিপরীতে শিপিং এজেন্ট হিসেবে ‘ওয়ান কার্গো লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফফা) ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন— উভয় সংগঠনই নিশ্চিত করেছে যে, এই নামে তাদের কোনো সদস্য নেই।
বাফফা’র অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি মো. আহসান উল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ওয়ান কার্গো লিমিটেড নামের কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নয়। ওই শিপিং এজেন্ট সম্পর্কিত কোনো তথ্যও আমাদের জানা নেই।’ অন্যদিকে, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সদস্য তালিকায় এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই।’
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকার ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এই উচ্চ হারের সুবিধা নিতেই জালিয়াত চক্র কৃষিপণ্যকে বেছে নিয়েছে। পণ্য রপ্তানি না করেই জিলানী গ্লোবাল ৫ কোটি ৫৭ লাখ এবং অন্তরা কর্পোরেশন সাড়ে ৭ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা হাতিয়ে নিয়েছে। কাস্টমস ও দুদকের হিসেবে এমন অন্তত ৫৭টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে
আলু কি জাহাজীকরণ হয়েছে?
৮১টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে যেসব কন্টেইনার ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে শিপিং অন বোর্ড হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বন্দরের ট্রাফিক ডিপার্টমেন্ট বিভাগ থেকে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টকে জানান, বন্দরের ট্রাফিক পণ্য দেখতে পায় না। আমরা শুধু কন্টেইনার সংখ্যা যাচাই করতে পারি। জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ক্ষেত্রে হয়তো ভুয়া কন্টেইনার নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। ৮১টি রপ্তানি পণ্য চালানের কোনো পণ্যই রপ্তানি বা শিপট অন বোর্ড হয়নি।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদন্ত টিমও যেমনটি জানিয়েছে, সেখানে শিপট অন বোর্ডের তারিখের সঙ্গে বিল অব এক্সপোর্টের তারিখের অসামঞ্জস্য রয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের শিপিং এজেন্ট ভুয়া নম্বর ব্যবহার করেছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম টার্মিনালের ম্যানেজার সাইফুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা প্রধানত কন্টেইনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকি। শুধুমাত্র কন্টেইনার নম্বর দেখতে পারি। কন্টেইনারের ভেতরে কী পণ্য থাকে, সেটা আমরা দেখতে পারি না। দেখার দায়িত্ব কাস্টমস ও শিপিং এজেন্টের থাকে।’
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের দাবি ও কাস্টমসের বক্তব্য
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘জাহিন এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক দিলরুবা আফরোজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, ‘অজ্ঞাতনামা জালিয়াত চক্র পরস্পর যোগসাজশে বেআইনিভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ঢুকে জাহিন এন্টারপ্রাইজের পাসওয়ার্ড হ্যাক, চুরি কিংবা অন্য কোনোভাবে জাহিন এন্টারপ্রাইজের কাগজ তৈরি করে দীর্ঘদিনের অর্জিত সততা ও সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় বেআইনি কার্য সম্পাদন করেছে।’
অন্যদিকে কাস্টমসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, লাইসেন্সিং রুলস ২০১৬ (সংশোধিত ২০২০)-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক পণ্য চালান বা জাল-জালিয়াতির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।
রপ্তানিকারক জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের দাবি
রপ্তানির সত্যতা যাচাইয়ে জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের মতিঝিল, উত্তর কমলাপুরের কবি জসিম উদ্দিন রোডের ঠিকানায় সরেজমিনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে, মুঠোফোনে প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. অলিয়ন ঢাকা পোস্টের কাছে দাবি করেন, ‘রপ্তানি হয়েছে এমন সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দাখিল করেই প্রণোদনা নেওয়া হয়েছে। রপ্তানি হয়েছে বলেই অর্থ পেয়েছি।’
‘অফ-ডক প্রতিষ্ঠান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ রপ্তানি না হওয়ার কথা বলছে। এমনকি শিপিং এজেন্টের অস্তিত্বও পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে আপনি কীভাবে বলছেন, আপনার সবকিছু ঠিক আছে’— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার মতো করে বক্তব্য দিয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে মামলা করেছে। বিষয়টি আদালতে যাবে। আমার যা বক্তব্য সেখানেই দেব। এ বিষয়ে আমি আর বক্তব্য দিতে চাই না।’
বিল অব এক্সপোর্টে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের বক্তব্য
৮১টি বিল অব এক্সপোর্ট যাচাই-বাছাই করেন এমন ১২-১৪ জন কর্মকর্তার নাম পাওয়া যায়। যার মধ্যে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান, বাসুদেব পাল, পপি চাকমা, নওশের আলী, সৈয়দ সাহেদুল করিম, স্মরণিকা চাকমা ও এফ এম মশিউর রহমানের নাম আসে শুল্কায়নকারী হিসেবে। এছাড়া কায়িক পরীক্ষণকারী হিসেবে রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল হাই হাওলাদার, আবুল কাশেম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ, ইমরান হোসেন, রফিকুল ইসলাম, উম্মে সালমা ও মো. সাইফুল আলমের নাম পাওয়া যায়। তাদের প্রায় সবারই বক্তব্য, ‘পণ্য চালানগুলোর পরীক্ষণ রিপোর্টে স্বাক্ষরকারী তারা নন।’ একই বক্তব্য তারা কাস্টমসের তদন্ত টিমকেও দিয়েছেন।
এই মহাজালিয়াতি সম্পন্ন হয়েছে কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে এবং অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের তথ্য ম্যানিপুলেট করে। অনেক ক্ষেত্রে শিপিং এজেন্টদের নামও ছিল ভুয়া। ব্যাংকগুলো কেবল নথিপত্র দেখে প্রণোদনা ছাড় করেছে, কিন্তু পণ্য জাহাজীকরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করেনি। কাস্টমস কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড ও আইডি ব্যবহার করে ভুয়া রিপোর্ট তৈরির ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে
সর্বাধিক ৩৩টি বিল অব এক্সপোর্টে কায়িক পরীক্ষণকারী কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমানের স্বাক্ষর ও সিলের মিল পাওয়া যায়। ৩১টি বিল অব এক্সপোর্টে কায়িক পরীক্ষণকারী ও শুল্কায়নকারী কর্মকর্তা হিসেবে রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই হাওলাদারের সিল ও স্বাক্ষর পাওয়া যায়। ২৮টি বিল অব এক্সপোর্টের শুল্কায়নকারী কর্মকর্তা হিসেবে রাজস্ব কর্মকর্তা নওশের আলীর স্বাক্ষর ও সিল পাওয়া যায়।
সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা পোস্ট। তাদের মন্তব্য, ‘চালানগুলোর পরীক্ষণ রিপোর্টের স্বাক্ষর তাদের নয়। তারিখ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। কে বা কারা সুকৌশলে স্বাক্ষর ও তারিখ জাল করে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করেছে, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।’
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায়
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংকের মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের ২৮টি পণ্য চালান রপ্তানির বিপরীতে প্রণোদনা ছাড় হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ ১৬ হাজার টাকার বেশি। চালানগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৮টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে মোট ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৪৫ মার্কিন ডলার প্রত্যাবাসন বা বিদেশ থেকে এসেছে। যার বিপরীতে রপ্তানি দেখিয়ে জিলানী গ্লোবাল ট্রেডকে প্রণোদনা হিসেবে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৬২ হাজার ৯৫০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ডিজিএম (জনসংযোগ) শাহনাজ চৌধুরী বলেন, ‘দুঃখিত, আপনার সঙ্গে এ বিষয় কথা বলতে চাই না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে পারব না।’
অন্যদিকে, জিলানী গ্লোবাল ট্রেড উত্তরা ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ৫২টি পণ্য চালান রপ্তানির বিপরীতে মোট ২০ লাখ ৪৯ হাজার ৯২৫ মার্কিন ডলার প্রত্যাবাসন বা বিদেশ থেকে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রণোদনা হিসেবে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ২০ হাজার ১২৩ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
ব্যাংকটির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিটি রপ্তানি বিলের বিপরীতে পণ্য রপ্তানি করে রপ্তানি মূল্য যথারীতি প্রত্যাবাসিত হয়েছে এবং তা আমেরিকার নিউইয়র্কে ওয়েলস ফার্গো ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে উত্তরা ব্যাংকের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। গ্রাহকের দাখিল করা রপ্তানি দলিল, কাস্টমস সার্টিফাইড বিল অব এক্সপোর্ট এবং অ্যাসাইকুডার মাধ্যমে বিল অব এক্সপোর্ট, পিআরসি ও অডিট ফার্মের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা ব্যাংকের তৎকালীন ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের ইনচার্জ নাজনীন নাহার শারমী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা। তবে, যতটুকু মনে পড়ে গ্রাহকের সব ডকুমেন্ট যেমন— চুক্তিপত্র, আমদানিকারকের ব্যবসার ধরন, ইএক্সপি, কমার্শিয়াল ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, কাস্টম সার্টিফাইড বিল অব এক্সপোর্ট এবং অ্যাসাইকুডার মাধ্যমে রিপোর্টকৃত বিল অব এক্সপোর্ট, ইএক্সপি নম্বর এবং প্রাপ্ত টিটির তথ্য ও মূল্যের মিল থাকায় পণ্য যথাযথভাবে রপ্তানি হয়েছে মর্মে প্রণোদনা ছাড় করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আলু গিয়েছিল কি না, তা দেখার দায়িত্ব কাস্টমস কর্তৃপক্ষের। কারণ, আমরা অ্যাসাইকুডা চেক করে সব ঠিক পেয়েছিলাম।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রণোদনা চুরি নয়, বরং পাচার করা কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে বৈধ করার একটি মাধ্যম। রপ্তানি না হলেও বিদেশ থেকে ‘রপ্তানি আয়’ হিসেবে কোটি কোটি ডলার ব্যাংকে এসেছে। সিপিডি’র মতে, হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে প্রবাসীদের টাকা ব্যবহার করে এই কাগুজে রপ্তানির খেলা চলছে, যার ফলে টাকা সাদাও হচ্ছে আবার প্রণোদনাও মিলছে
অনুরূপভাবে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় বিল অব এক্সপোর্টে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ২০২০ সালের অক্টোবরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের আলু রপ্তানির তথ্য উল্লেখ করে ৪১ হাজার ১৭৮.২২ মার্কিন ডলার দেশে প্রত্যাবাসন দেখায়। এর বিপরীতে নগদ সহায়তা হিসেবে ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা প্রণোদনা ছাড়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
কাস্টমস ও দুদকের পদক্ষেপ
অনিয়মের পুরো বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২২ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ একটি মামলা দায়ের করে। যেখানে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বাদী হয়ে জিলানী গ্লোবালের মালিক অলিয়ন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জাহিন এন্টারপ্রাইজের মালিক দিলরুবা ও শিপিং এজেন্টকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনে সুপারিশ করে যে, জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের ৮১টি রপ্তানি পণ্য চালানের বিপরীতে পণ্য রপ্তানি না হওয়া সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করা এবং নগদ প্রণোদনা ছাড় হওয়ার বিষয়টি আরও তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাজিউর রহমান মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের তদন্তে প্রকৃত রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট পারস্পরিক যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে বেনামি শিপিং এজেন্ট দেখিয়ে রপ্তানির বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টার মাধ্যমে প্রণোদনার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলমান।’
অন্যদিকে, জালিয়াতির বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কী ব্যবস্থা নিয়েছে— জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারের পক্ষে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) শরীফ আল আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিষয়টি জানার পরপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখছে। এটি নিয়ে তদন্তও চলমান। যতটুকু জানি, একই বিষয়ে দুদকও কাজ করছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টের কাছে দাবি করেন, ‘যেহেতু স্বাক্ষর জাল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সেহেতু তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড কীভাবে অন্যের হাতে গেল— এর দায় তারা এড়াতে পারেন না। বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
অনিয়মের আরও উদাহরণ
জিলানী গ্লোবাল ট্রেডের মতো আরও দুটি অনিয়মের উদাহরণ পাওয়া গেছে ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে। একই কৃষিপণ্য আলু রপ্তানির আড়ালে ৯৬টি বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে ভুয়া রপ্তানি দেখায় অন্তরা কর্পোরেশন। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তাদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মেসার্স এ অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স প্যান বেঙ্গল এজেন্সি ও জিআর ট্রেডিং কর্পোরেশন বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে আলু রপ্তানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখিয়ে ২০ শতাংশ প্রণোদনা সুবিধা গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে সোনালী ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ৮৩টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৫২ হাজার ৭০০ টাকা, উত্তরা ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে ১১টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে ৮৯ লাখ ৬১ হাজার ১২২ টাকা এবং ব্যাংক এশিয়ার দিলকুশা শাখা থেকে ২টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৮২৯ টাকাসহ মোট ৭ কোটি ৫৪ লাখ ২৭ হাজার ৬৫১ টাকা নগদ আর্থিক প্রণোদনা গ্রহণ করেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, এখানেও আলু রপ্তানি হয়নি। উল্টো ৪৬ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭ মার্কিন ডলার রপ্তানির অগ্রিম বিল হিসেবে প্রত্যাবাসন হয়েছে। বিল অব এক্সপোর্টের পণ্য ডিপোতে আসেনি কিংবা সেখানকার রেজিস্টারে এন্ট্রিও হয়নি। কিন্তু অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে এন্ট্রি ও শুল্কায়ন হয়েছে। জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অন্তরা কর্পোরেশন, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাসহ ১৫ জনকে আসামি করে গত ৩০ অক্টোবর মামলা দায়ের করে দুদক।
কৃষিপণ্য রপ্তানির নামে একই ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেয় ‘দো এম্পেক্স লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠান। এটিও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের ঘটনা। বিষয়টি জানার পর তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় গত ২৬ নভেম্বর ১১ কাস্টমস কর্মকর্তা, অডিট ফার্ম ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রপ্তানি পণ্য না হওয়া সত্ত্বেও আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রপ্তানির মূল্য-বাবদ ‘দো এম্পেক্স লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৮ কোটি টাকা প্রত্যাবাসন হয়েছে, যার বিপরীতে প্রণোদনা হিসেবে প্রায় ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪১টি বিল অব এক্সপোর্ট দাখিল করে সরকারের প্রণোদনা গ্রহণ করে। যার মধ্যে আবার ৭টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে শাকসবজি, ফলমূল ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের চালান দুবাই ও অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর প্রকৃত সত্যতা মেলে। তবে, একই প্রতিষ্ঠানের ৩৪টি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে কোনো পণ্যই বিদেশে রপ্তানি হয়নি বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অথচ পণ্য রপ্তানির বিপরীতে অগ্রিম হিসেবে পুরো অর্থ ২২ লাখ ১৮ হাজার ১৭.৪৪ ডলার অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে প্রত্যাবাসন হয়েছে। রপ্তানি দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা নিয়েছে।
যদিও দো এম্পেক্স লিমিটেডের মালিক জিয়া হায়দার মিঠু দাবি করেন, ‘রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব ডকুমেন্ট থাকা দরকার, তার সবই তাদের রয়েছে। কাগজপত্রে কোনো গ্যাপ নাই। রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারি ৬-৭টি প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত। অডিট রিপোর্টও পক্ষে। তারপরও জোর করে যদি বলা হয় ঠিক নাই, তাহলে কী আর করণীয়!’ এখানে রাজনৈতিক কোনো ইস্যু রয়েছে— মন্তব্য তার।
কেন লক্ষ্যবস্তু কৃষিপণ্য?
বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনা, কাগজে-কলমে কৃষিপণ্য রপ্তানি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা রপ্তানি প্রণোদনা হিসেবে আত্মসাৎ, কিন্তু কেন? কারণ হিসেবে ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ‘প্রণোদনার হার’। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে অনেক কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সরকার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা প্রায় ২০ কোটি টাকা। এই উচ্চ হারই প্রণোদনা জালিয়াতির অন্যতম প্রলোভন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কৃষিপণ্যের মান ও ওজন যাচাই করা কঠিন। যেখানে শিল্পপণ্য বা তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে স্পেসিফিকেশন ব্র্যান্ড ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড থাকে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যেমন- আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, চাল, ডাল, শাকসবজি ইত্যাদির মান নির্ধারণ তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট কিংবা প্যাকেট খুলে যাচাই করাও প্রায় অসম্ভব। কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদরও সহজে যাচাই করা যায় না। ফলে কাস্টমস পর্যায়ে চালান যাচাই অনেকটা কাগজনির্ভর হয়ে পড়ে। এছাড়া কৃষিপণ্য নষ্টযোগ্য ও পচনশীল বিধায় দ্রুত ছাড় দেওয়ার একটি বিষয় থাকে। তাই জালিয়াত চক্র এই দুর্বলতাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কাগুজে রপ্তানি দেখানো তুলনামূলক সহজ। যদিও কৃষিপণ্যে প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তবে কন্টেইনার নম্বর, শিপিং লাইন ও ব্যাংকের তথ্য অটোমেশনে যুক্তকরণসহ কঠোর নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
তিন ঘটনায় প্রণোদনার ১৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা হাওয়া
উপরের তিনটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রপ্তানির বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪২.৩৩ মার্কিন ডলার বিদেশ থেকে অগ্রিম রপ্তানি বিল হিসেবে এসেছে, যেখানে কোনো পণ্যই রপ্তানি হয়নি। ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত গড় বিনিময় হার হিসেবে টাকার অংকে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ কোটি ৪৭ লাখ ৮২ হাজার ১৩ টাকা। একই সময়ে টাকার অংকে সরকারের প্রণোদনা হিসেবে ছাড় হয়েছে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ ১৪ হাজার ২৩৩ টাকা।
দুদকের মামলায় আনীত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রপ্তানির নামে নগদ প্রণোদনা হাতিয়ে নেওয়ার নজির আগেও দেখেছি। দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধ মামলা দায়ের হয়েছে। আগামীতেও যাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, কাস্টমস ও দুদকের কাছে এমন আরও ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে রপ্তানি দেখিয়ে একই কৌশলে প্রায় ১৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রণোদনা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো এখন তদন্তাধীন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
রপ্তানির নামে প্রণোদনা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যদি ‘ব্যবসায় বিনিয়োগ’ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, তাহলে এটি বড় মুনাফা বা লাভজনক ব্যবসা বলা যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বৈধ অর্থ বিনিয়োগ করে কেন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা করতে আসবেন ব্যবসায়ীরা? প্রশ্ন যেখানে, জবাবও সেখানে। অর্থাৎ এখানে উপার্জিত অর্থ ‘অবৈধ’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি— মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এখানে দুটি বিষয় হতে পারে। একটি হচ্ছে— চক্রটি দুর্নীতির টাকা বা কালো টাকা বাইরে পাঠিয়ে বৈধ করার প্রক্রিয়া হিসেবে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। টাকা সাদা হলো, আবার প্রণোদনাও এলো। আরেকটি হতে পারে— হুন্ডি বা হাওলার মাধ্যমে প্রবাসীদের টাকা দিয়ে ব্যবসা করা। যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আগামীতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে সেজন্য কী করা যেতে পারে, সেই উপায়ও বের করা দরকার। কারণ, এটা যে কোনো সময়ই হতে পারে।’
বিষয়টি ‘কাগুজে রপ্তানির খেলা’ উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘এখানে রপ্তানির বিপরীতে টাকা সাদা করা হয়েছে। এটা যেন আর না হতে পারে সেজন্য কাস্টমস সিস্টেম উন্নত করা যেতে পারে। যেহেতু কৃষি খাতে প্রণোদনা বেশি, সে কারণে এই খাতেই অনিয়ম বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ঘটনাগুলোর পরিপূর্ণ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এমন ঘটনা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে সেজন্য এই প্রক্রিয়ায় দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
এমন ঘটনায় তিন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়— উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘একটি হচ্ছে— কালা টাকা সাদা করা অর্থাৎ বৈধ করার প্রক্রিয়া। আর একটি ট্রেড-বেইজড মানিলন্ডারিং। অর্থাৎ চালানপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে মানিলন্ডারিং। তৃতীয়ত, প্রতারণার মাধ্যমে প্রণোদনা সুবিধা নেওয়া। তিনটিই অপরাধ। বাণিজ্যভিত্তিক মানিলন্ডারিং অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এখনও এটি চলমান। এ বিষয়ে আমাদেরও গবেষণা রয়েছে।’
ট্রেড-বেইজড মানিলন্ডারিং বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম— উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘যারা অর্থপাচার করেন, তারা অনেক স্মার্ট। ক্রমাগত তারা আরও বেশি স্মার্ট হচ্ছেন।’
‘যেহেতু এখানে প্রণোদনা পাওয়ার বিষয়টি জড়িত, সেহেতু এখানে সেটি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য জালিয়াত চক্র কাজ করছে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রপ্তানি না করেও মানিলন্ডারিং অপরাধ করছে, আবার প্রণোদনার টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে। এদেরকে জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যারা এটা করছে শুধু তারাই নয়, এখানে অনেক সহায়তাকারীও রয়েছে। তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শুধুমাত্র দুদক বা কাস্টমসের মামলাই যথেষ্ট নয়। মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধে যে দণ্ড রয়েছে, তার সঙ্গে তিনগুণ অর্থদণ্ডও দিতে হবে। এটি প্রয়োগ করতে পারলে এ-সংক্রান্ত অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব।’
দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার বাইরে থাকা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সদিচ্ছার অভাবই এই ধরনের অপরাধ বারবার সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ বলেও মনে করেন তিনি।
আরএম/এমএআর
