রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট : সৌদির তাগাদা, ঢাকার ‘মার্চ’ পর্যন্ত সময় প্রার্থনা

জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক না হয়েও সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা পাচ্ছেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট। ১৯৭৭ সালের দিকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে তারা সৌদি আরবে প্রবেশ করেন। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম শ্রমবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সৌদি সরকারের চাপের মুখে অনেকটা বাধ্য হয়েই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিতে চুক্তি করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে বারবার তাগাদা দিচ্ছে রিয়াদ। এমন পরিস্থিতিতে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পাসপোর্ট হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের প্রতিদিন ৪০০টি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) সরবরাহের সক্ষমতা থাকলেও আবেদনকারীদের উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম। অনেককে মেসেজ বা কল দিয়েও কনস্যুলেটে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ৬৯ হাজার পাসপোর্টের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বিতরণ শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, দেশের নীতি-নির্ধারণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার নীতি-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। অনুপস্থিতির উচ্চ হার, দ্বিধাগ্রস্ত আবেদনকারী এবং কিছু ক্ষেত্রে ভুল তথ্য প্রক্রিয়াটিকে ধীর করছে। সরকারকে শুধু হস্তান্তর প্রক্রিয়াই শেষ করতে হবে না; নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেও মনোযোগ দিতে হবে। একইসঙ্গে পাসপোর্ট প্রদানের প্রক্রিয়া দেশের মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রিন্টের জন্য পাঠানো হয়েছে ২০ হাজার পাসপোর্ট
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত জেদ্দার ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. আব্দুল জব্বারের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকায় মোট ৬২ হাজার ২৪০ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে হাজির হয়েছেন ৩৮ হাজার ২৩৮ জন। তাদের মধ্যে ২৪ হাজার ৯ জন অনুপস্থিত ছিলেন, যা মোট আবেদনের ৩৭ শতাংশ। এছাড়া ২১ হাজার ৬৪৮ জনের এনরোলমেন্ট শেষ হয়েছে। পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়েছে মোট ১৭ হাজার ৩৭৪টি।
সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদান মূলত বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৭ সালে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠীকে পাসপোর্ট দিতে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছে। সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের বিশাল বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অটুট রাখতেই শর্তসাপেক্ষে এই পাসপোর্ট দিচ্ছে সরকার। তবে, চুক্তির আওতায় এই পাসপোর্টধারীরা কখনওই বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ পাবেন না
১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এনরোলমেন্ট পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট শেষ হয়েছে ২১ হাজার ৬৪৮ জনের। অনুমোদন দিয়ে প্রিন্টের জন্য পাঠানো হয়েছে ২০ হাজার ৯৯০টি পাসপোর্ট। প্রিন্টের জন্য ঢাকায় পেন্ডিং রয়েছে ১৪১টি, সৌদি কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৭৪টি। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে ১৮৪টি, স্ক্যান বা পেমেন্ট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ২৫০টি। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কারণে পেন্ডিং রয়েছে ১৩০টি। এছাড়া অ্যাপ্রুভাল স্টেজে আসেনি ৯৪টি পাসপোর্ট।
দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সৌদির শ্রমবাজারে অবস্থানরত ২৫ লাখ শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর চাপে পড়ে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বাধ্য হয়েই দিতে হচ্ছে সরকারকে। তবে, পাসপোর্ট পেলেও এসব রোহিঙ্গার জন্য শর্ত হচ্ছে— তারা কখনও বাংলাদেশে আসতে পারবেন না। শুধু সৌদিতে বৈধভাবে থাকার জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করবেন। এটা নিয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তিও রয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় বাস্তুচ্যুত এসব রোহিঙ্গার পাসপোর্ট হস্তান্তর কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে বারবার বাংলাদেশকে তাগাদা দিচ্ছে রিয়াদ।
মার্চ পর্যন্ত সময় চায় বাংলাদেশ
সৌদিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রদানের অগ্রগতি জানতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব ফয়সল আহমেদসহ এই উইংয়ের অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে জানান, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে সরকারের অবস্থান ও অগ্রগতি সম্পর্কে সৌদি সরকার বিস্তারিত জানতে চেয়েছে এবং দ্রুত এই প্রক্রিয়া শেষ করার আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও কিছু সময় চাওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ৬৯ হাজারের মধ্যে মাত্র ১৭,৩৭৪টি পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়েছে। এনরোলমেন্ট ও বিতরণে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকায় এবং সৌদি সরকারের ক্রমাগত তাগাদার মুখে কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে
সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন আরেকটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে ৬৯ হাজার পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষ করার কথা ছিল। তবে, এই সময়ের মধ্যে তা সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গারা প্রথমে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিসে আবেদন করেন। সৌদি সরকার যাচাই-বাছাই শেষে তালিকাগুলো বাংলাদেশ কনস্যুলেটে পাঠায়।
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ক্ষমতা অনুযায়ী, প্রতিদিন ৪০০ জনকে পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সৌদি যদি ২০০ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রেরণ করে, কনস্যুলেটে আসে মাত্র ১৫০ জন। বাকি ৫০ জন অনুপস্থিত থাকায় চাইলেও দ্রুত এই কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় এর আগেও সৌদি প্রতিনিধি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেন। সম্প্রতি আবারও তারা এসেছেন এবং বাংলাদেশ মার্চ পর্যন্ত সময় চেয়েছে।
সাত মাসে অনুপস্থিত ১০ হাজার ৭৯৯ জন
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তালিকা অনুযায়ী মোট অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১৭ হাজার ৫৪৩ জনের। এর মধ্যে কনস্যুলেটে উপস্থিত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪৪ জন। এই সময়ে মোট এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে ৪ হাজার ৯৭৭ জনের। অনুপস্থিত ছিলেন ১০ হাজার ৭৯৯ জন আবেদনকারী। পাশাপাশি নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় উপস্থিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬৭ জনের এনরোলমেন্ট সম্ভব হয়নি।
এনরোলমেন্ট ও অনুপস্থিতির হালচাল
ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১ হাজার ৪৬৩ জনের। এর মধ্যে কনস্যুলেটে উপস্থিত হন ৭১২ জন। ওই মাসে মোট ৬৩০ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ৭১৫ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় উপস্থিতদের মধ্যে ৮২ জনের এনরোলমেন্ট সম্ভব হয়নি।
আগস্ট মাসে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১ হাজার ৭৩৫ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ৬৬৪ জন। ওই মাসে মোট ৫৯৭ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ৭১ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত প্রতিপালন না করায় উপস্থিতদের মধ্য থেকে ৬৭ জনের এনরোলমেন্ট করা যায়নি।
সেপ্টেম্বর মাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১ হাজার ৯২৫ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ৬৮৩ জন। ওই মাসে মোট ৫৬৫ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ২৪২ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় উপস্থিতদের মধ্যে ১১৮ জনের এনরোলমেন্ট সম্ভব হয়নি। অক্টোবর মাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ২ হাজার ৯৪১ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ১ হাজার ১২ জন। ওই মাসে মোট ৮৬৮ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ৯২৯ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত প্রতিপালন না করায় উপস্থিতদের মধ্য থেকে ১৫৪ জনের এনরোলমেন্ট করা যায়নি।
পাসপোর্ট সংগ্রহের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের মধ্যে রহস্যজনক অনীহা দেখা যাচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৩৭ শতাংশ আবেদনকারী নির্ধারিত দিনে কনস্যুলেটে অনুপস্থিত থাকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসপোর্ট গ্রহণ করলে সৌদি সরকার মাসিক উচ্চহারে ফি বা 'লেভি' আরোপ করতে পারে— এমন আর্থিক আতঙ্কই তাদের নিরুৎসাহিত করছে। কল বা মেসেজ দিয়েও অনেককে ডাকা যাচ্ছে না, যা পুরো বিতরণ প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে
নভেম্বর মাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ২ হাজার ৯৩৯ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ১ হাজার ১৬৩ জন। ওই মাসে মোট ১ হাজার ১৮ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ৭৭৬ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় উপস্থিতদের মধ্যে ১৪৫ জনের এনরোলমেন্ট সম্ভব হয়নি। ডিসেম্বর মাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ৫ হাজার ৬৩২ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ২ হাজার ১২৯ জন। ওই মাসে মোট ১ হাজার ১৩০ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ৩ হাজার ৫০৩ জন। নির্ধারিত শর্ত প্রতিপালন না করায় উপস্থিতদের মধ্য থেকে ৯৯৯ জনের এনরোলমেন্ট করা যায়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ২ হাজার ৪১৫ জনের। এর মধ্যে উপস্থিত হন ৯১৫ জন। ওই সময়ে মোট ৪২৬ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়। অনুপস্থিত ছিলেন ১ হাজার ৫০০ জন। এছাড়া নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় উপস্থিতদের মধ্য থেকে ৪৮৯ জনের এনরোলমেন্ট সম্ভব হয়নি।
সবমিলিয়ে গত সাত মাসে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল ১৭ হাজার ৫৪৩ জনের। এর মধ্যে কনস্যুলেটে উপস্থিত হন ৬ হাজার ৭৪৪ জন। এই সময়ে মোট ৪ হাজার ৯৭৭ জনের এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। অনুপস্থিত ছিলেন ১০ হাজার ৭৯৯ জন। পাশাপাশি নির্ধারিত শর্ত প্রতিপালন না করায় উপস্থিতদের মধ্য থেকে ৪৮৯ জনের এনরোলমেন্ট করা যায়নি।
এসএমএস ও কলেও নেই ‘সাড়া’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত এনরোলমেন্টের আগের দিন আবেদনকারীদের টেলিফোন ও এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়। এছাড়া আগে যারা অনুপস্থিত ছিলেন, তাদেরও বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে ফোন করে ডাকা হয়। তবে, এসব উদ্যোগের পরও বড় একটি অংশ কনস্যুলেটে হাজির হননি। কেন এত সংখ্যক আবেদনকারী হাজির হননি, সে বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জেদ্দার একটি সূত্রে জানা গেছে, পাসপোর্ট ছাড়া অবস্থান করা এসব রোহিঙ্গা মনে করছেন যে, তারা পাসপোর্ট নিলে এবং এই প্রক্রিয়া শেষ হলে সৌদি সরকার তাদের আয়ের ওপর বা অবস্থানের জন্য উচ্চ হারে ফি গ্রহণ করতে পারে। এই ভয়ে অনেকেই পাসপোর্ট নিচ্ছেন না।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, সব রোহিঙ্গার পাসপোর্ট হস্তান্তর শেষে প্রতি মাসে ৬০০ রিয়াল করে ফি নিতে পারে সৌদি সরকার। এ কারণে অনেক শরণার্থী পাসপোর্ট নিতে সংশয় প্রকাশ করছেন।
উপস্থিতির হার কম— স্বীকার সরকারের
সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন এবং বাংলাদেশের বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর পূর্ণোদ্যমে কাজ করছে। প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কয়েকটি বিশেষ টিমও পাঠানো হয়েছে।
তবে তিনি স্বীকার করেন, মিশনে আসা আবেদনের তুলনায় পাসপোর্ট এনরোলমেন্টে উপস্থিতির হার এখনও অনেক কম। বিষয়টি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই ধরনের বৃহৎ পাসপোর্ট বিতরণ প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিতির উচ্চ হার স্বাভাবিক, কিন্তু বিষয়টি উদ্বেগজনক। ঢাকা পোস্টের তথ্যানুসারে, সাত মাসে প্রায় ১৭ হাজার ৫৪৩ জনের অ্যাপয়েন্টমেন্টের মধ্যে ১০ হাজার ৭৯৯ জন অনুপস্থিত ছিলেন। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেকে মনে করছেন, পাসপোর্ট নিলে সৌদি সরকার তাদের আয়ের ওপর বা অবস্থানের জন্য উচ্চ ফি আরোপ করতে পারে; কেউ আবার কাজ হারার আশঙ্কায় উপস্থিত হতে চাচ্ছেন না। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীরা ভুল তথ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটিকে জটিল করছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারকে শুধু হস্তান্তর (পাসপোর্ট) শেষ করা নয়, বরং প্রক্রিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা, তথ্য যাচাই এবং আবেদনকারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিদিন ৪০০ জনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সংখ্যক আবেদনকারীর হাজির না হওয়া, তথ্য ও আনুষঙ্গিক বিষয় যাচাই না করা— পুরো প্রক্রিয়াটিকে ধীর করে দিচ্ছে। এটির সঙ্গে শুধু প্রশাসনিক নয়, অপরাধ ও সাইবার ঝুঁকির বিষয়টিও রয়েছে। প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ হলে দালাল বা অবৈধ সুবিধাভোগীদের সুযোগ তৈরি হয়, যা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদা রওনক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট প্রদানের বিষয়টি আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা, মানবিকতা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির নিরাপত্তা— এগুলোও নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বিতরণ কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং দেশের নীতি-নির্ধারণেরও প্রতিফলন। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে অবস্থানরত সংখ্যাগুরু এই জনগোষ্ঠীকে বৈধতা দেওয়া বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি কৌশলগত সুবিধা দেয়। তবে, রাজনৈতিক দিক থেকে এটি সতর্কতার দাবি রাখে। পাসপোর্ট প্রদানের শর্ত এবং সৌদি সরকারের চাপে দ্রুত হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দেশীয় নীতিমালা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। অনুপস্থিতির উচ্চ হার এবং দ্বিধাগ্রস্ত আবেদনকারীরা প্রক্রিয়াকে ধীর করছে, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট বিতরণ কেবল অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশ-সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার নীতি-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বৈধভাবে অবস্থানরত এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি কৌশলগত সহযোগিতা স্থাপন করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখে। তবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকে এটি সতর্কতারও দাবি রাখে যে, পাসপোর্ট প্রদানের শর্ত এবং সৌদি সরকারের চাপে দ্রুত হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেন বাংলাদেশের নীতি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সমন্বয় রেখে হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
এছাড়া অনুপস্থিতির উচ্চ হার ও দ্বিধাগ্রস্ত আবেদনকারীরা প্রক্রিয়াটিকে ধীর করছে, যা কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে— মনে করেন এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ খালিদ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ মানবিক বিবেচনায় ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে তার দেশে আশ্রয় দেন। শুরু থেকেই তাদের বাংলাদেশে থাকা বাস্তুচ্যুত নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে সৌদি সরকার। ওই রোহিঙ্গারা পরবর্তী সময়ে নানা কৌশলে সৌদির বাংলাদেশ মিশন থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়ে গেছেন। সেই পাসপোর্ট দিয়ে তারা বাংলাদেশও ভ্রমণ করেছেন। সৌদি সরকার বাংলাদেশকে এমন বহু তথ্যপ্রমাণও দিয়েছে। ওই রোহিঙ্গারা কীভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়েছেন, সে বিষয়ে এখনও কোনো তদন্ত হয়নি।
এমএম/
