ঢিলেঢালা প্রশাসন, নতুন সরকারের অপেক্ষায় সরকারি কর্মকর্তারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা বা ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোযোগ এখন মূলত নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের দিকে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকায় এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকায় রুটিন কাজের বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমানে অনেকটা সীমিত।
গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটও হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনের প্রায় সব স্তরে নির্বাচনী প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারের নিয়মিত অন্যান্য কার্যক্রমে এক ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা এখন মূলত নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। বড় কোনো নতুন প্রকল্প বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখন আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এমনকি চলমান সংস্কার কার্যক্রমের গতিও আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, তথ্য ও সম্প্রচার এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে দেখা গেছে, দৈনন্দিন কাজকর্মে এখনো ঢিলেঢালা ভাব। বিভিন্ন ফাইলে সই না হয়ে পড়ে আছে। নিয়মিত সভা এবং সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারের নির্দেশনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোটের প্রচার-প্রচারণা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এতে তাদের নিয়মিত কাজের পরিধি ও ব্যস্ততা বাড়লেও মূল প্রশাসনিক কাজগুলো অবহেলিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ভোটের আমেজ আর ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতীক্ষায় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন স্থবির ও ঢিলেঢালা ভাব বিরাজ করছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে নির্বাচনী কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে রুটিন কাজও চলছে। এ ছাড়া, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সামনে নির্বাচন। দেশের মানুষের মতো সরকারি চাকরিজীবীরাও নতুন সরকারের অপেক্ষায় আছে। এজন্য কাজের গতি কমে গেছে। বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে এটা ঠিক হয়ে যাবে।
অপরদিকে মাঠ প্রশাসনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। আর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও)।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে এখন প্রায় সব দপ্তরের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে নির্বাচনী দায়িত্ব। নিয়মিত সভা, পরিদর্শন ও তদারকি কার্যক্রম কমে গেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সেবামূলক কার্যক্রমে দেরি হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করে একজন ইউএনও ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেহেতু নির্বাচনী দায়িত্ব রয়েছে এখন এটিই প্রথম অগ্রাধিকার। এজন্য বাকি কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতির হয়ে গেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো থেমে নেই। কিছুটা দেরি হলেও কাজগুলো চলছে। নির্বাচনের পরে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের সব কাজই চলছে। কোনো কাজই বন্ধ নেই। যখন যে কাজ তা যথাযথভাবে হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি কাজকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে কাজের ধরন অনুযায়ী অগ্রাধিকার ঠিক করা হয়; যখন যেটি বেশি জরুরি, তখন সেটিকে আগে বিবেচনা করা হয়। কারণ সব কাজের গুরুত্ব বা প্রকৃতি এক নয়। নির্বাচন হোক কিংবা অন্য যেকোনো প্রশাসনিক কাজ— সবই যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, সারা দেশ এখন নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে, এরপর একটি নিয়মিত সরকার আসবে। এখানে প্রশাসন বা চাকরিজীবীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।
তিনি আরও যোগ করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের রুটিন কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই মুহূর্তে প্রশাসনের মূল মনোযোগ বা ‘ফোকাস’ নির্বাচনের দিকে। নির্বাচনের ডামাডোলে অন্য কাজগুলো কিছুটা পেছনে পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও দাপ্তরিক নিয়মিত সব কাজই চলমান রয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আঁচ করতে পারছেন যে নির্বাচনের পর একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমান সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বা উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বহাল নাও থাকতে পারে— এমন ভাবনা থেকে অনেকেই কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। মূলত পরবর্তী সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতেই তারা এই সাবধানী পথ অবলম্বন করছেন।
তবে জনগণের স্বার্থের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন রুটিন কাজগুলো নিয়মিত চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক কার্যক্রম ঢিলেঢালা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে রুটিন কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা উচিত।
এসএইচআর/এমজে
