ভোটের মাঠে রক্তের ছাপ, বাড়ছে সংঘর্ষ বাড়ছে গণআতঙ্ক

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর সেই উত্তেজনা এখন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। জনসভা, গণসংযোগ কিংবা সাধারণ নির্বাচনী কর্মসূচি— সবখানেই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
রক্তাক্ত নির্বাচনী মাঠ
গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের শ্রীবরদীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। একই দিন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া, গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডসহ অন্তত ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। শেরপুর, গাজীপুর এবং ময়মনসিংহে নির্বাচনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনাগুলো জনমনে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও বিদ্রোহীদের সমর্থকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটছে
সর্বশেষ গতকাল রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে গাজীপুর-২ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আলী নাছের খানকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এনসিপি নেতারা। একই ঘটনায় এনসিপির গাজীপুর জেলা সদস্যসচিব আল আমিন আহত হয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব ঘটনা সাম্প্রতিক সহিংসতার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানান, তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশে আরও তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে ২৫টি জেলা এবং তিনটি মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যানে সহিংসতার চিত্র
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর থেকে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে চারটি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে ৫৫টি, প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ছয়টি, ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ১১টি, প্রচারে বাধা প্রদান ১৭টি, নির্বাচনী অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ আটটি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ একটি, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন ছয়টি, অবরোধ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন ১০টি এবং অন্যান্য ঘটনা হয়েছে ২৪টি। সর্বমোট ১৪৪টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, ২৫টি জেলা এবং তিনটি মহানগরে সহিংসতার বিস্তার ঘটেছে। এর মধ্যে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলা সবচেয়ে বেশি সংঘাতপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রচারণায় বাধা, নির্বাচনী অফিসে অগ্নিসংযোগ এবং প্রার্থীদের ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা পরিবেশকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এমনকি ডাকযোগে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে প্রাণনাশের হুমকির মতো ঘটনাও ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে
সহিংসতায় বলি হওয়া চারজনের মধ্যে রয়েছেন— রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার এবং ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক মো. নজরুল ইসলাম । এসব ঘটনা নির্বাচনী সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে।
হটস্পট যখন কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, সহিংসতার বড় অংশই ঘটছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে। বিশেষ করে কুমিল্লা জেলা সবচেয়ে বেশি সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠেছে। চৌদ্দগ্রাম, হোমনা ও কুমিল্লা সদরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর বহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো স্থানে দলীয় অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে হামলা, আবার কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীর বহরে হামলা এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
কুমিল্লার পরেই লক্ষ্মীপুরে চার দফা সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচনী প্রচারণা ও লিফলেট বিতরণকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া, নারীকর্মীদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া, প্রচারণা ঠেকানো কিংবা মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় স্থানীয়ভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ অন্তত ১৫টি জেলায় উত্তেজনা এখন চরমে। এমনকি নেত্রকোনায় ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার এবং কক্সবাজারে প্রার্থীর বাসায় কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হত্যার হুমকির মতো ঘটনাও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ‘টার্গেট কিলিং’ এবং বড় ধরনের নাশকতার ঝুঁকি তত বাড়বে। বিশেষ করে আগে লুট হওয়া অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়ায় খুনের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে দেড় সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। ফলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা নজরদারি। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। সমান তালে সারা দেশে চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান ও টহল। সহিংসতায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে নিয়মিত।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা
অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, সংঘাতের ঝুঁকিও তত বাড়বে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং মাঠপর্যায়ের উত্তেজনা বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করছে। লুট হওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় এই আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক এ প্রসঙ্গে ঢাকা পোস্টকে বলেন, “নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, সহিংসতার মাত্রা তত বাড়বে। বিশেষ করে ‘টার্গেট কিলিং’ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের কেন্দ্র করে সংঘাতের আশঙ্কা বেশি। এছাড়া, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া একটি বড় ঝুঁকি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখনই আরও সতর্ক হতে হবে।”
‘অন্যান্য নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনের সহিংসতার চিত্রটা একটু আলাদা’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখনও উদ্ধার না হওয়ায় খুনের ঘটনা বাড়তে পারে। পাশাপাশি সরকারি বা আধা-সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটতে পারে। যারা মনে করবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বিপক্ষে কাজ করছেন, তারা এ ধরনের কাজে জড়িয়ে যেতে পারেন। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’
তবে, পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি বলে মনে করছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরল হুদা। তার মতে, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব ঘটনা একেবারে অভাবনীয় নয়। গোয়েন্দা তথ্য ও আগাম খবর সংগ্রহের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।’
বড় কোনো বিপর্যয়ের ইঙ্গিত পেলে করণীয় কী— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও বেশি অ্যালার্ট রাখতে হবে এবং আগাম খবর প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এটা খুবই জরুরি। এটা নিশ্চিত করতে পারলে আগে থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটা অসম্ভব নয়, আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। এখনও এটা সম্ভব।’
নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী যৌথ অভিযান চালাচ্ছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গত ১১ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ১৫০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১৫৩টি অস্ত্র ও ১৮৩৪টি গোলাবারুদ।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনী মাঠে কাউকেই আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া হবে না। যারাই বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে, তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।
এমএসি/এমএআর
