টালমাটাল পুঁজিবাজার : সংকট কাটাতে ‘অভিজ্ঞ’ নেতৃত্বের অপেক্ষায় অংশীজনরা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোতে পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও থমকে আছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ এবং বীমা খাতের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এলেও বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা। এই সিদ্ধান্তহীনতার নেতিবাচক প্রভাবে বাজার এখন খাদের কিনারে গিয়ে ঠেকেছে।
এদিকে, প্রায় প্রতিদিনই বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার গুঞ্জন উঠছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, তারা নতুন নতুন নাম শুনছেন। দিনশেষে কারও নিয়োগ চূড়ান্ত হচ্ছে না। অন্যদিকে, বর্তমান চেয়ারম্যানও ‘পদত্যাগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে’ বহাল তবিয়তে নিজ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ফলে ঘোলাটে পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার আরও বেশি তলানিতে নেমে যাচ্ছে। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার এক দিনেই প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২০৯ পয়েন্ট কমে ৫৩২৫ পয়েন্টে নেমেছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন আসবে, নাকি আসবে না— বিষয়টি সরকারের দ্রুত সময়ের মধ্যে স্পষ্ট করা উচিত। পাশাপাশি বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসে তার বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যদি তাকে দায়িত্বে বহাল রাখা হয় তাহলে তিনি বাজারে আস্থা ফেরাতে কী কী উদ্যোগ নেবেন— সেই ধারণাও দেওয়া দরকার। এভাবে সিদ্ধান্তহীনতা চলতে থাকলে পুঁজিবাজার আরও বেশি তলানিতে নেমে যাবে।
পুঁজিবাজারে চলমান ধস ঠেকাতে সাবেক আমলা বা তাত্ত্বিক শিক্ষকদের পরিবর্তে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার নেতৃত্ব নিয়োগের দাবি তুলেছেন অংশীজনরা। তারা মনে করেন, অনভিজ্ঞ কেউ দায়িত্বে এলে বাজার বুঝতে বুঝতেই কয়েক বছর পার হয়ে যায়। তাই স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে দ্রুত দক্ষ ও সৎ নেতৃত্ব বাছাই করা এখন সময়ের দাবি
যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ে ‘সার্চ কমিটি’র প্রস্তাব
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন বিনিয়োগকারী থেকে বাজার-অংশীজনরা। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো সংকটকালীন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে দীর্ঘদিন বাজার-সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি তুলছেন তারা। তাদের ভাষ্য, সাবেক আমলা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হলে মার্কেটের ইকোসিস্টেম বুঝে উঠতে তাদের কয়েক বছর লেগে যায়। এতে বাজারের উন্নয়নে তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেন না।
তারা বিএসইসি চেয়ারম্যান বাছাইয়ে ‘দক্ষ’ ও ‘সৎ’— এই দুটি গুণ বিচার করে একটি ‘সার্চ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মন্তব্য, “শুধু সৎ হলেই বাজারে পরিবর্তন আনা যায় না। অন্যদিকে, দক্ষ হয়েও ‘স্বার্থের সংঘাত’ প্রশ্নে আপস করলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই, অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসির প্রতিনিধি, স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি, বাজার-অংশীজন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বিএপিএলসি’র প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান বাছাই করতে ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করা উচিত।”
ব্রোকারেজ হাউজগুলো কী বলছে
পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় অংশীজন ব্রোকারেজ হাউজগুলো দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানের কবলে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া এবং ধারাবাহিক লোকসানের কারণে গত দেড় বছরে শতাধিক হাউজের শাখা ও মূল অফিস বন্ধ হয়েছে। বিএসইসির নতুন নেতৃত্ব বাজারে আস্থা ফিরিয়ে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে টিকে থাকার পথ দেখাবে— এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। তাই, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে সব পক্ষের মধ্যে অধিক আগ্রহ ব্রোকারেজ হাউজগুলোর।

ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, এবার এমন নেতৃত্ব বাছাই করা হোক যিনি অভিজ্ঞ এবং সংকটকালীন যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অংশীজনদের মতে, মানুষের বেঁচে থাকার মতো পুঁজিবাজারেরও কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানসম্মত আইপিও’র সঠিক মূল্য নির্ধারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড মার্কেটের গভীরতা বাড়ানো। বর্তমান সংকটকালে এই চাহিদাগুলো যারা অনুধাবন করতে পারবেন এবং মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনতে কার্যকর ইনসেন্টিভ দিতে পারবেন, তাদেরই নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো উচিত
এ বিষয়ে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর সংগঠন ডিবিএ’র জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মনিরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘পুঁজিবাজার এখন যে পরিস্থিতিতে আছে, তাতে বাজার-সংশ্লিষ্ট সার্বিক জ্ঞান রয়েছে— এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার বিকল্প নেই। সেটি বাংলাদেশের বাজার থেকেও কেউ হতে পারেন, আবার বিশ্বের বড় মার্কেটে কাজ করা অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তিও হতে পারেন। আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে বিশ্বের বড় কোনো মার্কেটে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেটি যদি না হয় তাহলে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কাজ করেছেন এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে।’
শীর্ষস্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউজের সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, শেয়ারবাজার বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর জায়গা। এই বাজার সম্পর্কে যাদের ভালো জ্ঞান আছে এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া যথাযথ হবে। বিশ্বজুড়ে বেসরকারি খাত থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান নির্বাচনের প্র্যাক্টিস আছে। বাংলাদেশেও পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু হতে পারে। সংকটকালে এতে ভালো ফল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
উদাহরণ টেনে মালয়েশিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের কথা বলেন। সেখানে সিইও, ডেপুটি সিইও ব্রোকারেজ হাউজ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং ভালো ফলও এসেছে।
অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চান মার্চেন্ট ব্যাংকাররাও
পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। বাজারের স্বার্থে এই মুহূর্তে তারাও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব চান। এ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ইফতেখার আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই বাজারে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বে আসেন, সেটি নিশ্চয়ই বাজারের জন্য ভালো সিদ্ধান্ত হবে। বাজারের স্বার্থে তিনি যদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনতে পারে। এছাড়া তিনি যদি ফান্ডামেন্টাল (মৌলিক) কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন, তাহলে বাজারের নেতিবাচক প্রভাবও বন্ধ হবে।’
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসইএক্স সূচক ৪৫০ পয়েন্টের বেশি কমেছে এবং প্রায় ৮৭ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। লেনদেন খরায় শতাধিক ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দফায় দফায় আন্দোলনে নেমেছেন। এই পরিস্থিতিতে সাইফুল ইসলাম ও তানভীর গনির মতো বাজার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সাবেক আমলা ও শিক্ষকের নাম নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জোরালো আলোচনায় রয়েছে
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও সুমিত পোদ্দার বলেন, ‘বাজারের প্রকৃত উন্নয়নে যিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তাকেই এই পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত। শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান পরিবর্তন করলেই যে রাতারাতি বাজারের চিত্র বদলে যাবে, বিষয়টি তেমন নয়। বাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে দায়িত্ব দিলে তিনি খুব সহজেই বাজারের গতিপ্রকৃতি বা ‘পালস’ বুঝতে পারবেন। তবে বাজারের বাইরে থেকেও দক্ষ কেউ আসতে পারেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত নেতৃত্বের সক্ষমতার ওপর। যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তিনি সংকটকালীন সময়ে কতটা দূরদর্শী নেতৃত্ব দিতে পারবেন, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।’
এই মার্চেন্ট ব্যাংকার আরও বলেন, ‘দেশের মানুষের যেমন বেঁচে থাকার জন্য অন্ন-বস্ত্রের মতো কিছু মৌলিক চাহিদা থাকে, পুঁজিবাজারেরও তেমনি নিজস্ব কিছু মৌলিক চাহিদা রয়েছে। বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই চাহিদাগুলো পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। পুঁজিবাজারের প্রধান মৌলিক চাহিদাগুলো হলো— মানসম্মত নতুন পণ্য আনা এবং সেগুলোতে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা, আইপিও’র ক্ষেত্রে শেয়ারের প্রকৃত মূল্য বা যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা, যেসব কোম্পানি মৌলভিত্তি সম্পন্ন, তাদের বাজারে আনতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া, মিউচুয়াল ফান্ড এবং বন্ড মার্কেটের পরিধি ও গভীরতা বাড়িয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো। বাজারের এই সংকটকালীন যিনি এই গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাগুলো অনুধাবন করে তা পূরণে সক্ষম হবেন, তাকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে বসানো উচিত।

সম্পদ ব্যবস্থাপকরা কেমন নেতৃত্ব চান
পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলো সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান, যাদের ব্যবসা পুরোপুরি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এই খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হলে প্রার্থীর কেবল উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ব্যক্তিগত সততা থাকলেই চলবে না, বরং সৎ ও শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি তার দীর্ঘ বছরের বাস্তব বাজার অভিজ্ঞতা থাকাটা অপরিহার্য। তাদের মতে, বাজারের গভীরতা ও জটিলতা বোঝেন এমন অভিজ্ঞ নেতৃত্বই পারে বর্তমান সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
এ বিষয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিইও শহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেকোনো খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব অপরিহার্য। বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এখানে বহুমাত্রিক প্রতিভা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ব্যক্তি প্রয়োজন। অনভিজ্ঞ কেউ দায়িত্বে আসলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। একজন অভিজ্ঞ নেতা জানেন বাজারের কোন দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিপরীতে, অনভিজ্ঞ ব্যক্তি অন্যের পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অনেক সময় ভালো-মন্দ বিচার ছাড়াই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা বাজারের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, “বিএসইসির নেতৃত্ব বাছাইয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কাজের অভিজ্ঞতা থাকাটা জরুরি। এই যোগ্য ব্যক্তি বাজার-সংশ্লিষ্ট হতে পারেন, কর্পোরেট সেক্টর থেকেও আসতে পারেন, আবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও হতে পারেন। এক্ষেত্রে যেটি মুখ্য সেটি হলো— পুঁজিবাজার নিয়ে তার দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না। আর বাজার-সংশ্লিষ্ট কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে অবশ্যই তাকে স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে আসতে হবে, যাতে ‘স্বার্থের সংঘাত’ প্রশ্নটি না আসে।”
তবে, শীর্ষস্থানীয় আরেকটি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির সিইও নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘স্বার্থের সংঘাত’ প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজ করা যায়। কিন্তু দক্ষতায় ঘাটতি থাকলে সেটি ম্যানেজ করা যায় না। একজন অদক্ষ ব্যক্তির চেয়ে ‘দক্ষ’ কিন্তু সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতে জড়ানো ব্যক্তির মধ্যে আমি ‘দ্বিতীয়’ ব্যক্তিকে বেছে নেব। তবে দক্ষ ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া গেলে অবশ্যই তাকে বাছাই করতে হবে।
যে কারণে নেতৃত্ব পরিবর্তনের আলোচনা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএসইসি’র নেতৃত্বে আসা তিনজন চেয়ারম্যান এবং সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যানের সময়ে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের সময়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে এমন বিতর্কিত অভিযোগ না উঠলেও তিনি দায়িত্ব পালনে অদক্ষ এবং বাজারে অস্থিরতা বন্ধে ব্যর্থ হয়েছেন। তার সময়ে পুঁজিবাজার বিভিন্নভাবে পিছিয়ে গেছে।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার দিনে (১৯ আগস্ট ২০২৪) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই’র সার্বিক মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৫৭৭৫ পয়েন্টে ছিল। এটি গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪৫০ পয়েন্ট কমে ৫৩২৫ পয়েন্টে নেমেছে। এই সময়ের মধ্যে বাজারে লেনদেন কমে ৩০০ কোটির ঘরে নেমে যায়, ফলে পুরো শেয়ারবাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়েন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শেয়ারবাজার ছাড়েন ৮৭ হাজার বিনিয়োগকারী। লেনদেন খরায় লোকসানের চাপে শতাধিক ব্রোকারেজ হাউজের শাখা ও মূল অফিসও বন্ধ হয়ে যায়। দুই স্টক এক্সচেঞ্জে বড় অঙ্কের পরিচালন লোকসান হয়। আস্থা হারানো বাজারে টানা পতনে বিক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা মাকসুদের পদত্যাগ চেয়ে বিএসইসি অবরোধসহ দফায় দফায় রাস্তায় নামেন। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে তিনি পদে বহাল আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নতুন নেতৃত্বে আলোচনায় যারা
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের শীর্ষ পদে (চেয়ারম্যান) নিয়োগ পেতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের নাম সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি, বহির্বিশ্বের পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বাজার-অংশীজনসহ অনেকের নাম। আবার ‘আগ্রহী’ না হলেও এমন ব্যক্তির নামও আলোচনায় আসছে।
আলোচনায় রয়েছেন পুঁজিবাজারে দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞ ডিএসই’র সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলামের নাম। এশিয়ার বৃহত্তম হেজ ফান্ড (সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান) টাইবোর্ন ক্যাপিটালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি তানভীর গনির নামও রয়েছে এই তালিকায়।
এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আল-আমিন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজের নামও আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া বিএসইসি’র সাবেক কমিশনার এটিএম তারিকুজ্জামানও। সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব ফরিদ ইসলামের নামও সম্প্রতি এই আলোচনায় যোগ হয়েছে।
এমএমএমএইচ/এমএআর/