এখনও সব ক্ষেত্রে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে গত দুই দশকে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হলেও সমান অধিকারের পথটি এখনো চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। বিসিএস ২৫তম ব্যাচের চৌকস কর্মকর্তা ফরিদা খানম মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখায় উপ-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ঢাকা পোস্টের মুখোমুখি হয়ে তিনি শুনিয়েছেন প্রশাসনে নারীদের লড়াই, বর্তমান অবস্থান এবং বৈষম্যহীন আগামীর প্রত্যাশার কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক মুছা মল্লিক।
নিচে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো—
ঢাকা পোস্ট : আমরা সবখানে নারীদের সমান অধিকারের কথা বলছি। প্রকৃতপক্ষে সব ক্ষেত্রে কি সমান অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে?
ফরিদা খানম : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে গত দুই দশকে যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তবে বাস্তবতা হলো, সব ক্ষেত্রে সমান অধিকার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সমাজের অনেক স্তরে প্রচলিত মানসিকতা ও কাঠামোগত বাধা এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকছেন। এমনকি কর্মক্ষেত্রেও অনেক সময় একজন নারীকে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তবে আশার কথা হলো, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, আইন এবং সামাজিক সচেতনতা এই ব্যবধান কমিয়ে আনছে। আমি বিশ্বাস করি, এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী প্রজন্ম একটি সমতাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে উঠবে।
ঢাকা পোস্ট : আপনি মাঠ প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নারীদের অবস্থান খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ফরিদা খানম : মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, সুযোগ পেলে নারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। উপজেলা ও জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার পরিচয় দিচ্ছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের কাজের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই; যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা কিংবা গভীর রাতেও মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক সময় প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী কর্মকর্তাদের জন্য এসব পরিস্থিতি সামলানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, আমাদের নারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত দৃঢ়তা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে এসব প্রতিবন্ধকতা জয় করছেন। এটি দেশের সামগ্রিক প্রশাসনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত।

ঢাকা পোস্ট : বর্তমানে নারীরা বড় বড় উদ্যোক্তা হচ্ছেন; চাকরি, শিক্ষা ও রাজনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখেন?
ফরিদা খানম : এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি পরিবর্তন। নারীরা এখন শুধু গতানুগতিক চাকরি বা গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ নেই; তারা ব্যবসা, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, কৃষি, এমনকি রপ্তানিমুখী শিল্পেও সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে তাদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে। একইসঙ্গে শিক্ষা ও রাজনীতিতে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। আমি মনে করি, নারীদের এই অগ্রযাত্রা টেকসই করতে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও সহায়ক এবং সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ঢাকা পোস্ট : সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে শুরুতে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
ফরিদা খানম : সত্য বলতে, সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর প্রথম দিকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। নতুন পরিবেশ, গুরুদায়িত্ব এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে সময়ের প্রয়োজন হয়। তবে আমি সবসময় চেষ্টা করেছি কাজের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা ও সততার পরিচয় দিতে। মানুষ যখন দেখে আপনি আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন তারা নিজ থেকেই আপনাকে সম্মান ও সহযোগিতা করতে শুরু করে। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে অনেক অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন, যা আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।

ঢাকা পোস্ট : কর্মজীবনে সহকর্মীদের কটূক্তি বা প্রতিহিংসার মতো কোনো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন কি না?
ফরিদা খানম : কর্মজীবনে অনেক নারী কর্মকর্তার মতো আমাকেও হয়তো কখনো কখনো কিছু মন্তব্য বা মানসিক চাপের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সেসব বিষয়কে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে বরং পেশাদারিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে। আমি বিশ্বাস করি, একজন কর্মকর্তা যখন সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার কাজই তার শ্রেষ্ঠ পরিচয় হয়ে ওঠে। আশার কথা হলো, বর্তমানে প্রশাসনে কর্মপরিবেশ আগের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক ও সহায়ক হয়েছে। নারী কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মস্থল নিশ্চিত করতে সরকারও বিভিন্ন কার্যকরী নীতিমালা গ্রহণ করেছে।
ঢাকা পোস্ট : কর্মস্থলে নারীদের অগ্রযাত্রা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আপনি ব্যক্তিগতভাবে কী ধরনের ভূমিকা রাখেন?
ফরিদা খানম : আমি যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করি না কেন, সেখানে নারী সহকর্মীদের জন্য একটি সহায়ক ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেই। কোনো নারী সহকর্মী যদি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, তবে আমি দ্রুত সেটি গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করি। আমি মনে করি, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা জরুরি। একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নারীরা আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন এবং দেশ গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ঢাকা পোস্ট : প্রশাসনে পুরুষের তুলনায় নারীদের সংখ্যা এখনো কম। বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ফরিদা খানম : প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও তা এখনো পুরুষের তুলনায় কম। এর পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা কাজ করে। বিশেষ করে পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্মজীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক নারীর জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া দূরবর্তী কর্মস্থলে বদলি বা মাঠ পর্যায়ের কঠিন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক নারী এই পেশায় আসতে দ্বিধা বোধ করেন। তবে আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে, শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে প্রশাসনে নারীদের উপস্থিতি আরও বাড়বে।

ঢাকা পোস্ট : আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শ্রমজীবী সাধারণ নারীদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
ফরিদা খানম : বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় আমাদের শ্রমজীবী নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা পোশাকশিল্প, কৃষি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা- প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। নারী দিবসে তাদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা রইল। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই- নিজেদের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখুন। মনে রাখবেন, শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসই আপনাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। একইসঙ্গে সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতি আমার আহ্বান- শ্রমজীবী নারীদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করুন। তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা একটি সত্যিকারের সমতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
ঢাকা পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷
ফরিদা খানম : আপনাকেও ধন্যবাদ৷ ঢাকা পোস্টের জন্য শুভকামনা৷
এমএম/এমএসএ