বছরের পর বছর ঝুলে আছে কারাবন্দিদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব

২০২৩ সালে গাজীপুরের তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বন্দি থাকা মোছা. কছিরন। গত বছরের এপ্রিলে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান ভোলা জেলা কারাগারে বন্দি থাকা আসামি শফিউল আলম শফি। বছরের শেষ প্রান্তিকে অক্টোবরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথে মারা যান ছইবুর রহমান নামে এক বন্দি।
বিজ্ঞাপন
এভাবে গুরুতর শারীরিক জটিলতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করা বন্দির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারা অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা গেছে, ৫ বছরে কারাগার থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা গেছেন ৪৯১ জন। এতে একদিকে যেমন সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে তেমনি ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছে কারা অধিদপ্তরও।
প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অসুস্থ বন্দিদের রিক্সা, ভ্যান কিংবা অন্য কোনো পরিবহনে করে হাসপাতালে প্রেরণ করতে হয়। এতে পথিমধ্যে বন্দিদের মৃত্যুর ন্যায় অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে। যা কারা প্রশাসন তথা সরকারের জন্য বিব্রতকর।
কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর জন্য কারা কর্তৃপক্ষ সবসময় রোগীর ‘গুরুতর অসুস্থতা’কে সামনে আনলেও বন্দিদের স্বজনরা প্রায়ই অভিযোগ করেন তাদের আসামিকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হয়নি।
বিজ্ঞাপন
‘সময়মতো হাসপাতালে না নেওয়া’ বা নিতে না পারার এই অভিযোগ যে সত্য এবং এক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের যে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা পরিষ্কার হয় সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লেখা একটি চিঠিতে। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়- ‘‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অসুস্থ বন্দিদের রিক্সা, ভ্যান কিংবা অন্য কোনো পরিবহনে করে হাসপাতালে প্রেরণ করতে হয়। এতে পথিমধ্যে বন্দিদের মৃত্যুর ন্যায় অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে। যা কারা প্রশাসন তথা সরকারের জন্য বিব্রতকর।’’
অর্থাৎ, কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর জন্য দায়ী কিছু কারণের মধ্যে একটি হলো কারাগারগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকা। অথচ প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে বারবার আবেদন করেও কারা কর্তৃপক্ষ তা পাচ্ছে না। বছরের পর বছর ফাইল ঘুরছে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এই মুহূর্তে সারা দেশের ৭৮টি কারাগারের জন্য অ্যম্বুলেন্স আছে মাত্র ২৩টি।
বিজ্ঞাপন
জানা গেছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কারা অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিকভাবে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য চিঠি পাঠায়। জবাবে তখন বাজেট কমানোর নির্দেশ আসে। বাজেট কেটে ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর প্রায় সাড়ে তিন বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি।
কারা অধিদপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে- সর্বশেষ উদ্যোগ হিসেবে ঢাকাসহ সারা দেশে কারাবন্দিদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কিনতে প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। কারা অধিদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই প্রস্তাবে সারা দেশের ৭৪টি কারাগারের জন্য পর্যায়ক্রমে অ্যাম্বুলেন্স ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনার কথা বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারা অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই। বছরের পর বছর আমাদের নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়েও আমাদের প্রতিনিধি অ্যাসাইন করে রাখি নিয়মিত। তবুও কেন জানি ফাইল নড়ে না। দিন যায় মাস যায় বছর যায়, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স আর কেনা হয় না। আমাদের বর্তমান আইজি-প্রিজন চেষ্টা করছেন আন্তরিকভাবে। এখনো কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি।
কারাগার থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (এএসকে) তথ্য বলছে, কারাগার থেকে হাসপাতালে যাওয়ার মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। আসকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১২ জন বন্দি হাসপাতালে বা পথে মৃত্যুবরণ করেছেন। অপরদিকে কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ১ হাজার ৫৭৭ জন মারা গেছেন। আর এই সময়কালে ৪৯১ জন মারা গেছেন পথে, হাসপাতালে যাওয়ার সময়।
কারা সূত্র বলছে, ২০২২ সালে সারা দেশে কারা হেফাজতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ২৮৬ জন বন্দি। ২০২৩ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৫৫ জনের, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৩ হাজার ৮০১ জন বন্দি। ২০২৪ সালে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ৮৬৪ জন বন্দি। ২০২৫ সালে ১৭২ জন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন, আর চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ হাজার ২০৮ জন বন্দি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে যা বলা হয়েছে
সম্প্রতি এম্বুলেন্সের সংকট ও নানা সমস্যার বিষয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পঞ্চম ধাপে প্রস্তাব পাঠায় কারা অধিদপ্তর। সেই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য একটি পত্র প্রেরণ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে- দেশের ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৯টি জেলা কারাগারসহ মোট ৭৪টি কারাগারের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জনের বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৭৮ হাজার বন্দি আটক আছে। কখনো কখনো এ সংখ্যা ৯০ হাজারে উন্নীত হয়। কারাগারে আটক বন্দিদের মধ্যে থেকে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অসুস্থ বন্দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতালে কিংবা এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে জরুরিভিত্তিতে প্রেরণ করতে হয়। ৭৪টি কারাগারের মধ্যে বর্তমানে শুধুমাত্র ২০টি কারাগারে টিওএন্ডইভুক্ত ১৫টি এবং প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত হিসেবে প্রাপ্ত ৮টিসহ মোট ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অসুস্থ বন্দিদের রিক্সা, ভ্যান কিংবা অন্য কোনো পরিবহনে করে হাসপাতালে প্রেরণ করতে হয়। এতে পথিমধ্যে বন্দিদের মৃত্যুর ন্যায় অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটে, যা কারা প্রশাসন তথা সরকারের জন্য বিব্রতকর। তাই অসুস্থ কারা বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কারাগারের জন্য এক বা একাধিক অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করা অত্যন্ত জরুরি।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ১ হাজার ৫৭৭ জন মারা গেছেন। আর এই সময়কালে ৪৯১ জন মারা গেছেন পথে, হাসপাতালে যাওয়ার সময়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে- প্রকল্প গ্রহণ ব্যতীত রাজস্ব বাজেট থেকে একসাথে অনেকগুলো অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে। কারাগারসমূহের অসুস্থ বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স জরুরিভিত্তিতে ক্রয়ের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, কারাগারসমূহের অসুস্থ বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংস্থানের জন্য ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রেরিত প্রস্তাবিত ‘‘অ্যাম্বুলেন্স, নিরাপত্তা সংক্রান্ত গাড়ী ও অন্যান্য যানবাহন সংগ্রহের মাধ্যমে কারা অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি” প্রকল্পের অনুমোদন গ্রহণের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমতি বা সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য নির্দেশক্রমে পুনরায় অনুরোধ করা হলো।
‘এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় অর্থ মন্ত্রণালয়’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কারা অধিদপ্তরের অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের প্রস্তাব অন্তত পাঁচবার ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারপরও নতুন করে প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। অর্থাৎ, অ্যাম্বুলেন্স কেনার বিষয়ে মন্ত্রণালয় এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
ফলে, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের প্রস্তাব কার্যত পূর্বের অবস্থায় রয়েছে। এটি শুধু কারা অধিদপ্তরের কার্যক্রমকে সীমিত করছে না, বরং দেশের কারাগারে বন্দিদের জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। বন্দিদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত এই সিদ্ধান্তহীনতা প্রশাসনিক জটিলতা ও মানবিক প্রশ্নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
কী বলছেন কারা মহাপরিদর্শক
জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ বিষয়ে আমরা নতুন করে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলে এটাকে ফেরত পাঠিয়েছিল। আমরা পুনরায় এটাকে উপস্থাপন করেছি। এটা এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। এটা আসলে লম্বা প্রক্রিয়া। আমাদের কাজে ব্যাঘাত হচ্ছে বলেই আমরা বারবার চেষ্টা করছি। কারাগারে যে অসুস্থ রোগী রয়েছে, তাদের সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকেই এই প্রস্তাব প্রেরণ করা হচ্ছে। এর আগে আমি দুইবার পাঠিয়েছিলাম। দুইবারই ফেরত এসেছে। এখন তৃতীয় বারের মতো পাঠিয়েছি। এর আগেও দুইবার পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু সেগুলোও ফেরত এসেছে। সব মিলিয়ে ৪ থেকে ৫ বার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
নতুন করে অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব প্রকল্প আকারে দিতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখানে কোন মডেলের অ্যাম্বুলেন্স কেনার কথা বলেছেন এবং এগুলোর দাম কেমন হতে পারে—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা অ্যাডভান্সড কোনো কিছু চাইনি। খুবই প্রয়োজনীয় বেসিক অ্যাম্বুলেন্স কেনার কথা বলা হয়েছে। সম্ভবত গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের ক্ষেত্রে নতুন অর্থবছরে ৭৪ লাখ টাকার মধ্যে কেনা যাবে—এমন একটি পরিপত্র আছে। আমরা এই নীতিমালার মধ্যেই থাকব।
তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। এতে আমাদের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। কারা অধিদপ্তর এবং সরকার অনেক সময় এই পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রত হচ্ছে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠে বিনা চিকিৎসায় বন্দি মারা গেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলেই তো আমরা চিকিৎসা দিতে পারব। কিন্তু তার আগে যদি পথিমধ্যে জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে কিছুই করার থাকে না। অ্যাম্বুলেন্স থাকলে সুবিধা হয়। কারণ, পথে চিকিৎসা চালু রাখার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে যে সুবিধা থাকে, সাধারণ গাড়িতে সেই সুবিধা থাকে না।
চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব
বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারে বন্দি থাকা মানুষদের পূর্ণাঙ্গ ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবাধিানিক দায়িত্ব। কারাগারে প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্স না থাকা একটি গুরুতর অভিযোগ। রাষ্ট্রকে অবশ্যই এ ব্যপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেখক, গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, কারাগারের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স নেই- এটি ভয়ঙ্কর বিষয়। কারাগারে থাকা বন্দিরাও রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তাদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। যদি পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকে বা অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়—মানবাধিকারের প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় দেখা যায় বন্দিদের গুরুতর অসুস্থতার পরও সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে এবং পরে ‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর’ অভিযোগ ওঠে। তাই কারা প্রশাসনের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি চিকিৎসা পরিবহন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
তিনি আরও বলেন, কারাগারগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা কমাতে শুধু ভেতরের চিকিৎসাসেবাই নয়, দ্রুত উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সের ঘাটতি থাকলে তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
সারা দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে বর্তমানে শুধুমাত্র ২০টি কারাগারে টিওএন্ডইভুক্ত ১৫টি এবং প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত হিসেবে প্রাপ্ত ৮টিসহ মোট ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মাসুদ আহমেদ সাইদ বলেন, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব। কারাগারে থাকা বন্দিরা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান না; তাই তাদের চিকিৎসা সেবা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে অসুস্থ বন্দিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো জরুরি ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকলে তা প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি আইনি প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, কারাগারে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকা বা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। কারণ, গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় যদি বিলম্ব হয় এবং পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তাহলে তা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলতে পারে। অনেক সময় এসব ঘটনায় পর তদন্ত বা আইনি জটিলতাও তৈরি হয়।
আরও পড়ুন
ব্যারিস্টার সাইদ আরও বলেন, কারা প্রশাসন যে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা বলছে তা যদি বাস্তব হয়, তাহলে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা ব্যক্তির জীবন রক্ষা করা শুধু মানবিক দায় নয়, এটি আইনের দৃষ্টিতেও রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, কারাগার শুধু একটি বন্দিশালা নয়; এটি একই সঙ্গে একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন প্রশাসনিক স্থাপনা। এখানে বন্দিদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও স্থানান্তরের প্রতিটি ব্যবস্থাই সুসংগঠিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যদি জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের মতো মৌলিক ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তাহলে সেটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, অসুস্থ বন্দিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য যদি নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স না থাকে এবং বিকল্প হিসেবে রিকশা, ভ্যান বা সাধারণ গাড়ি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা সেবার মান কমে যায়, অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়। কারণ বন্দি পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রটোকল বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মু. জসীম উদ্দিন খান বলেন, আমি এই উইংয়ে মাত্র চারদিন দায়িত্ব নিয়েছি। আমার সামনে বিষয়টি আসেনি, এলে আশা করি দ্রুত সমাধান হবে ইনশাআল্লাহ।
এমএম/এনএফ