তদবির বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মুহাম্মদ তুহিন ফারাবী ও মো. মাহমুদুল হাসান।
বিজ্ঞাপন
তাদের বিরুদ্ধে ওঠা শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতির মাধ্যমে অনুসন্ধানের সমাপ্তি টেনেছে বিদায়ী কমিশন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন ও আদেশ সূত্রে জানা যায়, ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনৈতিক বাণিজ্যের প্রাথমিক অভিযোগ আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেয় কমিশন। প্রায় এক বছরের অনুসন্ধান শেষে বিগত ‘মোহাম্মদ মোমেন কমিশন’ থেকে অভিযোগটি নথিজাত (পরিসমাপ্তি) করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
তুহিন ফারাবীর পরিসমাপ্তির আদেশে যা বলছে
সাবেক ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মুহাম্মদ তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, তদবির বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানাবিধ দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকী ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেখানে তুহিন ফারাবীর সম্পদের সঠিক তথ্য নিরূপণের জন্য দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(১) ধারায় সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও ডা. মাহমুদুল হাসানকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার ও শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দীর্ঘ এক বছর অনুসন্ধান শেষে সত্যতা না পাওয়ায় বিদায়ী ‘মোহাম্মদ মোমেন কমিশন’ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের অব্যাহতি প্রদান করে
বিজ্ঞাপন
কমিশনের সেই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর নিজের সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন তুহিন ফারাবী। এরপর তার দাখিলকৃত তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলামকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা মিনহাজ। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এর ভিত্তিতে তিনি অভিযোগটি নথিভুক্ত বা পরিসমাপ্তির সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে কমিশনের অনুমোদনক্রমে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি অভিযোগটি থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
দুদকের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তুহিন ফারাবী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কয়েকজন সাংবাদিকের মনগড়া ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণেই দুদক আমাদের হয়রানি করতে বাধ্য হয়েছিল। এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
মাহমুদুল হাসানের অব্যাহতি আদেশে যা বলা হয়েছে
মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর দাখিল করেন সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকী। এরপর মাহমুদুল হাসানের সম্পদের সঠিক তথ্য যাচাইয়ের লক্ষ্যে ‘দুদক আইন ২০০৪’-এর ২৬(১) ধারা অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১০ নভেম্বর তিনি তার সম্পদের হিসাব দাখিল করেন।
দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাই ও বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য ওই বছরের ২১ ডিসেম্বর সহকারী পরিচালক ইমরান খান অপুকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে তিনি চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অনুসন্ধান কর্মকর্তার এই সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমোদনক্রমে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিসমাপ্ত বা নথিভুক্ত করে তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে যুব অধিকার পরিষদ ও আইনজীবীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধানে তুহিন ও মাহমুদুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। অব্যাহতি পাওয়ার পর তুহিন ফারাবী এই অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মনগড়া বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ডা. মাহমুদুল হাসান সব অভিযোগ অস্বীকার করে জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে তার সামাজিক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন
দুদকের অনুসন্ধান চলাকালে সংস্থাটির জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন মাহমুদুল হাসান। ওই সময় তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, ‘তদবির ও অনৈতিক লেনদেনের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য। কোটি কোটি টাকা পাচারের কাল্পনিক অভিযোগে আমি সত্যিই মর্মাহত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মূলত জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছি। ইতোমধ্যে ৪৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আমি সরকারি পদে থাকি বা না থাকি, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাব।’
অভিযোগের সূত্রপাত ও অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপট
সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের দাবিতে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল ‘মার্চ টু দুদক’ কর্মসূচি পালন করে যুব অধিকার পরিষদ। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গিয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেন। প্রায় একই সময়ে হাইকোর্টের দুই আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাদিম মাহমুদ ও অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামও পৃথক অভিযোগ দাখিল করেন। এসব অভিযোগে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) তুহিন ফারাবী ও ডা. মাহমুদুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ওই বছরের ৪ মে কমিশন অনুসন্ধানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৫ মে তাদের তলব করে চিঠি দেওয়া হয় এবং ২১ মে তুহিন ফারাবী ও ডা. মাহমুদুল হাসানকে দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
উল্লেখ্য, তুহিন ফারাবীকে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বরত ডা. মাহমুদুল হাসান একই বছরের মে মাসে পদত্যাগ করেন।
আরএম/এমএআর/
