খরচ, কর ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের ত্রিমুখী চাপে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারিরা এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়ের সূচক ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৯০-এ, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধি খামারিদের পুঁজিহীন করার পাশাপাশি ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের এই শিল্প এখন কার্যত টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। একসময় সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত ডিম ও ব্রয়লার মুরগি এখন উচ্চ কর ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপে সাধারণের নাগালের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
চলতি বাজেটে করের বোঝা খামারিদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এর সঙ্গে পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় খামারিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে
উৎপাদন ব্যয়ের চড়া সূচক
খাত-সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও খামারিদের তথ্যমতে, গত চার বছরে পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন ব্যয়ের সূচক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালে ব্যয়ের সূচক ১০০ থাকলেও ২০২৫ সালে তা ১৯০-এ পৌঁছেছে। মূলত ২০২২ সালে ১১৫, ২০২৩ সালে ১৪৫ এবং ২০২৪ সালে ১৭০— এভাবেই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে খরচের পাল্লা।
বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০.৫ থেকে ১১.৫ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭.৫ থেকে ৮.৫ টাকায়। একইভাবে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১৪৬ টাকা, যার পাইকারি মূল্য ১৪৫ থেকে ১৪৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে অধিকাংশ খামারিই এখন লোকসান গুনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পোল্ট্রি উৎপাদনের মোট ব্যয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই খরচ হয় খাদ্যের পেছনে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে পোল্ট্রি শিল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় উপাদান হলো খাদ্য। বাংলাদেশে পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি দেশীয় খামারিদের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে।

কর ও শুল্কের বোঝা: ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
এদিকে, চলতি বাজেটে করের বোঝা খামারিদের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এর সঙ্গে পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় খামারিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০.৫ থেকে ১১.৫ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭.৫ থেকে ৮.৫ টাকায়। একইভাবে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১৪৬ টাকা, যার পাইকারি মূল্য ১৪৫ থেকে ১৪৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে অধিকাংশ খামারিই এখন লোকসান গুনে উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
খামারিদের মতে, বর্তমান উচ্চ করের বোঝা আর আমদানিনির্ভর পশুখাদ্যের ওপর চড়া শুল্ক তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুখাদ্যের দাম দফায় দফায় বাড়ায় খামারিরা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের দীর্ঘদিনের ভারসাম্য এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। লাভের আশা তো দূরের কথা, মূলধন হারিয়ে দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি এখন ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ের চিত্র: নিঃস্ব হচ্ছেন উদ্যোক্তারা
দুই দশকের বেশি সময় ধরে খামার পরিচালনা করে আসছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার আলমগীর হোসেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, খাদ্যের দামের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তিনি আগে কখনও দেখেননি। বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব ও সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রতিদিন তাকে হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের চেয়েও অনেক কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে।
আলমগীর হোসেন বলেন, ‘একটি ডিম বা এক কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে যে খরচ হয়, বাজারে তার অর্ধেক দামও অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে ছোট ও মাঝারি খামারিরা নিঃস্ব হয়ে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন। আমি নিজেও এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে আছি। পরিস্থিতি দ্রুত না বদলালে আমাদের মতো পুরোনো খামারিদেরও পথে বসতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’
বিশেষজ্ঞ ও অ্যাসোসিয়েশনের দাবি
বিশ্লেষকদের মতে, পোল্ট্রি শিল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই খরচ হয় খাদ্যের পেছনে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলেন, খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই খাতকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। যেহেতু পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর, তাই আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর কমানো জরুরি।’ পাশাপাশি দেশীয়ভাবে বিকল্প খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই পোল্ট্রি খাতে কর ছাড় দেওয়া হয়, কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো উচ্চ কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা যদি ব্যবসা ছেড়ে দেন, তবে পুরো শিল্পটি গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যাবে। এতে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত, যার বড় একটি অংশই তরুণ উদ্যোক্তা। খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা সংকটে পড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা আরও অভিযোগ করেন, উৎপাদন থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজির কারণেও খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সংকট উত্তরণে খামারিরা সহজ শর্তে ঋণ, বিদ্যুৎ ভর্তুকি, কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেনের মতে, বর্তমান সংকট কাটাতে কর ও শুল্ক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি। তিনি প্রস্তাব করেন, পোল্ট্রি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশে, টার্নওভার কর ০.২ শতাংশে এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ১ শতাংশে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।
এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পোল্ট্রি ও পশুখাদ্য খাতে করের চাপ বেশি বলে উল্লেখ করেছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন ধরনের কর ছাড় ও প্রণোদনা থাকলেও বাংলাদেশে এখনও পশুখাদ্য আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর বহাল রয়েছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে বলেও মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব মো. সাফির রহমান সতর্ক করে বলেন, আসন্ন বাজেটে বিশেষ কোনো সুবিধা না থাকলে নতুন বিনিয়োগ যেমন কমবে, তেমনি বর্তমান উদ্যোক্তারাও নিরুৎসাহিত হয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে পারেন। ফলে ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, এখনই করের বোঝা কমিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা না দিলে পুষ্টির অন্যতম সহজলভ্য এই উৎস দুটি ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জন্য ‘বিলাসপণ্যে’ পরিণত হতে পারে।
আরএইচটি/এমএআর/
