ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। স্কুলের ঠিক পাশেই রকমারি দোকান। দোকানগুলোতে শিশুদের আকৃষ্ট করার মতো হরেক রঙের প্যাকেটজাত খাবারের ছড়াছড়ি। এসব খাবারের বেশিরভাগই শিশুদের জন্য তৈরি। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অভিভাবকরা হামেশাই বাচ্চাদের কেক, চকলেট, চিপস, জুস বা লজেন্স কিনে দিচ্ছেন।
এমনই একজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয়। গল্পের ছলে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, বাচ্চাকে প্যাকেটজাত যে খাবার কিনে দিচ্ছেন, তাতে কী ধরনের উপাদান আছে তা তিনি জানেন কি না। তিনি বললেন, ‘দেখেছি, কিন্তু কিছু বুঝিনি।’ প্যাকেটের পণ্যটি বাচ্চার জন্য উপযুক্ত কি না— এমন প্রশ্নে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘বাচ্চাদের খাবারে খারাপ কিছু থাকলে তার দায় কি আমার? রাষ্ট্র কেন এসব বিষয় নজরে নেবে না?’
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩২-এ সরাসরি খাদ্যদ্রব্যের মোড়কীকরণ এবং লেবেলিংয়ের বিষয়টি বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ আছে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি বা মান অনুসরণ না করে কোনো খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, বিতরণ বা বিক্রয় করা যাবে না
একই বিষয় নিয়ে কথা হয় গণমাধ্যমকর্মী মলয় বিকাশ দেবনাথের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘প্যাকেটের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে আমি সবসময় সতর্ক থাকি। ভালো করে দেখে কিনি, বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তো আরও বেশি সচেতন থাকি।’ প্যাকেজ লেবেলিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বাইরের দেশে এর ব্যবহার দেখেছি। আমাদের দেশে এটি খুব জরুরি, কিন্তু কে করবে?’
এ বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন বেসরকারি আইটি ফার্মে কর্মরত আশরাফ রহমান। তিনি বলেন, “আমি ডায়াবেটিসের রোগী। এক দিন আমার সুগার কমে গিয়েছিল, তাৎক্ষণিক একটা জুস কিনে খাই। প্রথমে স্বস্তি লাগলেও একটু পর খারাপ লাগা শুরু হয়। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। প্যাকেটের পেছনের ‘ইনগ্রেডিয়েন্টস’ পড়ে দেখলাম, যে পরিমাণ সুগার আমার প্রয়োজন ছিল, জুসে তারচেয়ে অনেক বেশি ছিল। এটা প্যাকেট দেখে বোঝার উপায় নেই। অথচ অফিসের কাজে কানাডায় গিয়ে প্যাকেটের গায়ে যথাযথ লেবেলিং দেখেছি, যা দেখে আমি খাব কি খাব না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে।’

দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা রয়েছে। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে হৃদরোগ, ক্যানসার ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি-লবণ, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স-ফ্যাটযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ক্যানসারসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে এবং ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে অসংক্রামক ব্যাধিতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ।
গবেষণা বলছে, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার বা এডিএইচডি-তে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। নির্দিষ্ট কিছু খাবারের ধরন এই ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে, যারা অনেক বেশি প্যাকেজ করা প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মিষ্টি (যেমন- প্রসেসড মাংস, ভাজা খাবার, পাফড ফুড), চিনিযুক্ত পানীয় এবং ক্যান্ডি গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে এডিএইচডি-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে
এ বিষয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে অসংক্রামক ব্যাধির কারণে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি, যার মধ্যে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস অন্যতম। এসব রোগের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা ওবিসিটির প্রকোপও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া। দেশের বাজারে প্রচলিত প্যাকেট করা প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যকর নয়। আমাদের গবেষণা বলছে, এসব খাবারে লবণ, চিনি এবং সম্পৃক্ত চর্বির মতো উপাদানের মাত্রা অনেক বেশি থাকে, যা অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।’
শিশু ও তরুণদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত খাবারের চটকদার বিজ্ঞাপন দেয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানে পুষ্টির তথ্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক দাবি এবং সম্পূরক পুষ্টি তথ্য অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত থাকে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিনি, চর্বি ও লবণের আধিক্য নির্দেশকারী ‘ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং’ (এফওপিএল) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বস্বীকৃত হাতিয়ার।

ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং কী?
ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) হলো একটি খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা, যেখানে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের প্যাকেট বা মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষা, চিহ্ন বা সতর্কবার্তার মাধ্যমে পণ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো— কোনো পণ্যে চিনি, লবণ (সোডিয়াম), স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স-ফ্যাটের মাত্রা বেশি কি না, তা ভোক্তাকে দ্রুত ও সহজে বুঝতে এবং তুলনা করতে সহায়তা করা।
সাধারণত প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি তথ্য প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষর ও জটিল সংখ্যায় দেওয়া থাকে, যা সবার পক্ষে পড়ে বোঝা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। এফওপিএল এই সীমাবদ্ধতা সহজে দূর করতে পারে। এটি ভোক্তার পছন্দ সীমিত করে না; বরং স্বচ্ছ তথ্য দিয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম করে।
অসংক্রামক রোগের সঙ্গে এফওপিএল-এর সম্পর্ক
অসংক্রামক রোগের সঙ্গে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং-এর সরাসরি ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন—
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ: হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো প্রধান অসংক্রামক রোগগুলোর মূলে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস। ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং ভোক্তাদের এই অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমিয়ে আনতে একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

ক্ষতিকারক উপাদান সহজে চেনা: এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের সামনে এমন স্পষ্ট লেবেল ব্যবহার করা, যা দেখে একজন ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারেন খাবারটিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স-ফ্যাট, চিনি বা লবণের মতো ক্ষতিকারক উপাদানের পরিমাণ অতিরিক্ত আছে কি না। এসব উপাদানের অতিরিক্ত গ্রহণই মূলত অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
রোগ প্রতিরোধের সূচক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘এনসিডি প্রোগ্রেস মনিটর’-এ একটি দেশ অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কতটা সফল, তা মূল্যায়নের জন্য ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং নীতি বাস্তবায়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়।
ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই লেবেলিংয়ের মাধ্যমে ভোক্তাদের সচেতন করা হয়। উচ্চমাত্রার চর্বি, চিনি বা লবণযুক্ত খাবারগুলো সহজে শনাক্ত করে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে উৎসাহিত করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য, যা দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের হার কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. ফারজানা আকতার ডরিন বলেন, “২০১৯ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘স্বাস্থ্যকর ডায়েট প্রচারের জন্য ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিংয়ের নির্দেশিকা এবং ফ্রেমওয়ার্ক ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশগুলোর মধ্যে উপযুক্ত ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা তৈরি, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নে সহায়তা করা। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএসটিআই-এর সঙ্গে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল ভোক্তাদের সচেতনভাবে খাবার কেনা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং প্রবর্তন করা।”
শিশুদের ওপর প্রভাব ও এডিএইচডি
গবেষণা বলছে, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার বা এডিএইচডি-তে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। নির্দিষ্ট কিছু খাবারের ধরন এই ঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষ করে, যারা অনেক বেশি প্যাকেজ করা প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মিষ্টি (যেমন- প্রসেসড মাংস, ভাজা খাবার, পাফড ফুড), চিনিযুক্ত পানীয় এবং ক্যান্ডি গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে এডিএইচডি-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে।
এমনই এক শিশুর অভিভাবক রাশেদ হাসান বলেন, ‘আমার বাচ্চা হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছিল। প্রথমে আমরা বুঝতে পারিনি। শুরুতে আমরা ওকে চিপস, চকলেট, জুস খেতে দিতাম। একসময় লক্ষ্য করলাম ও অনেক বেশি রেগে যায়। ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করে বললেন, ওর হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার আছে। ওকে কোনোভাবেই যেন বাইরের খাবার না দেই। ডাক্তারের নির্দেশ পাওয়ার পর এখন অনেক নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাওলী সরকার বলেন, ‘আমরা অভিভাবকদের সবসময় বলি প্যাকেটজাত, প্রক্রিয়াজাত এবং বোতলজাত খাবারগুলো শিশুদের না দিতে। শিশুরা এগুলো খেলে তাদের ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যায়, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয় এবং অণুপুষ্টির ঘাটতি হয়। এর ফলে শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ পদার্থের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দেখা দেয়। আরেকটা বড় বিষয় হলো, প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে শিশুদের আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়— অতিচঞ্চলতা ও মনোযোগে সমস্যা, খাবারে অনীহা, ঘুমের সমস্যা হয় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়। তাই শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর দিকে জোর দেওয়া জরুরি।’
বিশ্বব্যাপী এফওপিএল-এর প্রয়োগ
বিশ্বের ৯৫টি দেশে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের প্যাকেজে পুষ্টি ঘোষণার জন্য বাধ্যতামূলক নীতিমালা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপের ৪১টি, যুক্তরাষ্ট্রের ১৯টি, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৪টি, আফ্রিকার ৯টি, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ৭টি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৫টি দেশ অন্তর্ভুক্ত।
রিজলভ টু সেভ লাইভস-এর সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ৬,১৭৪ জনের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে ৩০৮৭ জনের বয়স ছিল ১৯-এর বেশি এবং ৩০৮৭ জন কিশোর-কিশোরীর বয়স ছিল ১০-১৯ বছর। বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের লেবেলের কার্যকারিতার ওপর এই গবেষণা বলছে, অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত পণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ কমানোর ক্ষেত্রে ওয়ার্নিং লেবেল বা সতর্কতামূলক লেবেল ক্রেতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে
এছাড়া ৭১টি দেশে ‘ফ্যাট-ফ্রি’-এর মতো পুষ্টি বিষয়ক দাবির ওপর নীতিমালা রয়েছে। ৪৪টি দেশে সম্পূরক তথ্য হিসেবে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) প্রবর্তন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি দেশে তা বাধ্যতামূলক। এই ১৬টি দেশ হলো— আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, ইসরায়েল, ইরান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর।
বাইরের দেশে এফওপিএল ভালোভাবে কাজ করলেও আমাদের দেশে এত দেরিতে কেন? এই বিষয়ে ভাইটাল স্ট্রাটেজিস’র কারিগরি পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি হয়েছে ধীরে, এই কারণে আমরা এটা সম্পর্কে জেনেছি পরে। দেরিতে হলেও ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে এফওপিএল এখন ফাইনাল ড্রাফটিং-এ আছে। খুব দ্রুতই এটা আইন হয়ে যাবে।’
ভোক্তাকে অবহিত করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ব্র্যাক জেপিজি এসপিএইচ-এর সহযোগী বিজ্ঞানী আবু আহমেদ শামীমের কাছে। তিনি বলেন, ‘উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তাকে অবহিত করতে হবে পণ্যে আসলে কী আছে? ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং ক্রেতাকে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ক্রেতা সেকেন্ডেই সিম্বলগুলো দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কোন খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, লবণ আছে।’

রিজলভ টু সেভ লাইভস-এর সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ৬,১৭৪ জনের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। তাদের মধ্যে ৩০৮৭ জনের বয়স ছিল ১৯-এর বেশি এবং ৩০৮৭ জন কিশোর-কিশোরীর বয়স ছিল ১০-১৯ বছর। বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের লেবেলের কার্যকারিতার ওপর এই গবেষণা বলছে, অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত পণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ কমানোর ক্ষেত্রে ওয়ার্নিং লেবেল বা সতর্কতামূলক লেবেল ক্রেতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের জন্য কেন জরুরি?
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর বাংলাদেশ প্রধান মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, ‘যেকোনো খাবারে কী উপাদান আছে, সেটা প্যাকেটের পেছনে তথ্যাকারে লিপিবদ্ধ করা থাকে। কিন্তু এখানে সবসময় সব তথ্য ঠিকমতো থাকে না, আবার যা থাকে তাও অস্পষ্ট। এত ক্ষুদ্র অক্ষরে থাকে যে ঠিকভাবে পড়া সম্ভব হয় না। কেউ যদি পড়তেও পারেন, সত্যিকার অর্থে এখানে কী বলছে তা পুরোপুরি বুঝে একজন ভোক্তা খাবারের প্যাকেটটি কিনবেন কি না, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই কঠিন।’
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩২-এ সরাসরি খাদ্যদ্রব্যের মোড়কীকরণ এবং লেবেলিংয়ের বিষয়টি বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ আছে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি বা মান অনুসরণ না করে কোনো খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, বিতরণ বা বিক্রয় করা যাবে না।
এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘একজন ভোক্তা কী কনজিউম করছেন, কতটুকু কনজিউম করছেন, এটা জানার অধিকার তার আছে। পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিষয়টি মানতে চায় না। তারা বিভিন্নভাবে ভোক্তার কাছে তথ্য গোপন করতে চায়। তাই আমরা ২০২৬ সালে এফওপিএল-এর ড্রাফটিং প্রবিধানটা আইন করার জন্য জোর দিচ্ছি, যাতে ভোক্তা জেনে বুঝে প্রক্রিয়াজাত খাবার খায়।’
প্রবিধানে কী আছে?
প্রবিধানের তফসিল-১ অনুযায়ী, চিনি, লবণ ও চর্বির পরিমাণ নির্ধারিত সীমার বেশি হলে মোড়কের সম্মুখভাগে বিশেষ কিছু ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ছবিগুলো কালো রঙের অষ্টভুজাকৃতি বক্সের ভেতরে সাদা প্রতীকে বোঝানো হয়েছে, যাতে ভোক্তা সহজেই বুঝতে পারেন।
সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স-এর নীতি বিশ্লেষক কামরুন্নিসা মুন্না বলেন, ‘প্রবিধানমালায় আর্টিফিশিয়াল সুগারের কথা আসেনি। এটি যদি না আসে তাহলে স্যাকারিনের মতো আরও যে প্রোডাক্টগুলো আছে সেগুলো কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে অনায়াসে বের হয়ে যেতে পারবে। আবার প্রবিধানের সব জায়গায় লবণের কথা বলা হয়েছে। সেই জায়গায় যদি সোডিয়াম উল্লেখ না করে, তাহলে টেস্টিং সল্টের মতো ক্যামিকাল লবণগুলো পার পেয়ে যাবে। এই বিষয়গুলো প্রবিধানে স্পষ্ট করা দরকার।’

অসংক্রামক রোগের ক্ষতির পরিমাণ
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে চিনিযুক্ত পানীয় ব্যবহারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৬ সালে যেখানে ১৩.২ শতাংশ পরিবার এগুলো পান করত, ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৬.৭ শতাংশ হয়েছে।
গবেষণা আরও বলছে, ২০০৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগ যেমন— হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হাঁপানিতে আক্রান্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় অন্য পরিবারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এসব রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর এই বাড়তি ব্যয়ের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ খরচ হয় শুধু ওষুধ কেনার পেছনে। বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বেশি।
অসংক্রামক ব্যাধির অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ১৫ ও ১৮ (১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে নাগরিকের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়। জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব আনার জন্য সরকারের উচিত লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০১৭ এবং অধিকতর আইন প্রয়োগে ২০২৬ সালের সংশোধনী দ্রুত প্রণয়ন ও কার্যকর করা।’
গবেষণা আরও বলছে, ২০০৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, অসংক্রামক রোগ যেমন— হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হাঁপানিতে আক্রান্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় অন্য পরিবারগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এসব রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর এই বাড়তি ব্যয়ের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ খরচ হয় শুধু ওষুধ কেনার পেছনে। বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বেশি
সমাধান কী
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের ডায়েট রিস্ক ফ্যাক্টরসের প্রোগ্রাম অফিসার সামিনা ইসরাত বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং নীতিমালা চূড়ান্ত করতে অ্যাডভোকেসি এবং কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখবে। এই নীতিমালাটি নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে ‘খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া সংস্থাটি এফওপিএল-এর কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে কাজ করবে। এই ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সাহায্য করবে এবং বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনবে।”
জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, ‘ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ ও ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই আলোকে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং নিরাপদ খাদ্য মোড়কাবদ্ধ প্রবিধিমালা, ২০১৭ সংশোধন করে খাদ্যপণ্যের সঠিক তথ্য প্রদর্শন নিশ্চিতে বাধ্যতামূলক আইন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এফওপিএল চালু হলে ভোক্তা খাদ্যের ঝুঁকি সহজে বুঝতে পারবে এবং বিভ্রান্তিকর বিপণন কমবে।’

এফওপিএল-এর পূর্ণাঙ্গ আইন হতে কত দেরি— জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আমাদের দেশে যেকোনো বিষয় আইনগতভাবে যদি প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে তো একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলতে হবে। এটার জন্য প্রিলিমিনারি যে কাজ যেমন— বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জনসাধারণ, সিভিল সোসাইটি, এমনকি সাংবাদিক, ইন্ডাস্ট্রি পিপল সবার সঙ্গে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, মিটিং, ওয়ার্কশপ করে আসছি। এই মাসেই হয়তো-বা একটা ফাইনাল ড্রাফট রেডি করতে পারব।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে বসেছিলাম। কিছু পর্যালোচনা হয়েছে। খুব দ্রুত এটি আইনে পরিণত হবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং প্রবিধান থেকে আইনে চূড়ান্ত রূপ নেওয়ার পর সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে আইন কার্যকর করা। আইন কার্যকর করা না হলে অসংক্রামক রোগসহ অন্যান্য রোগ বাড়বে, এতে রোগীর খরচের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার খরচও বাড়বে। এটি আমরা ইচ্ছা করলেই এড়াতে পারি।’
বিডি/এমএআর/
