দেশের উচ্চশিক্ষার বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন। গত ১৮ মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) অনুষ্ঠিত ১৮টি পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের অপরাধে দুই হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শৃঙ্খলা কমিটি। উচ্চশিক্ষায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের এই পরিসংখ্যানকে একটি ‘বড় নেতিবাচক নজির’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও শৃঙ্খলা কমিটির নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনার্স (স্নাতক) পর্যায়ে পাঁচটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী শাস্তির আওতায় এসেছেন। এর মধ্যে নকল এবং অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ‘অনার্স ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৩৩৭ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন। এছাড়া ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৩১৮ জন, ‘অনার্স ৪র্থ বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৩০৪ জন, ‘অনার্স ২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১৯০ জন এবং ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
এমনকি নতুন শুরু হওয়া ‘অনার্স ১ম বর্ষ-২০২৪’ পরীক্ষাতেও ইতোমধ্যে ৮৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছেন।
নথি বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, ডিগ্রি পাস কোর্সের অধীনে অনুষ্ঠিত ছয়টি পরীক্ষায় মোট ৫৩১ জন শিক্ষার্থী দণ্ডিত হয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘ডিগ্রি পাস ৩য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ১২৩ জন এবং একই বর্ষের ২০২২ সালের পরীক্ষায় ৮২ জন সাজা পেয়েছেন। এছাড়া ‘ডিগ্রি পাস ২য় বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯৩ জন, ‘২য় বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৮২ জন, ‘১ম বর্ষ-২০২৩’ পরীক্ষায় ৯০ জন এবং ‘১ম বর্ষ-২০২২’ পরীক্ষায় ৭৩ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে নকল ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায় রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী শাস্তির মুখে পড়েছেন। গত ১৮ মাসে অনুষ্ঠিত ১৮টি পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের অপরাধে দুই হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনার্স (স্নাতক) পর্যায়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন, যা অনার্সের মোট সাজার ৭৫ শতাংশেরও বেশি
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, উচ্চতর শিক্ষার স্তর মাস্টার্স এবং প্রিলিমিনারিতেও অসদুপায় অবলম্বনের চিত্রটি উদ্বেগজনক। শৃঙ্খলা কমিটির তথ্যানুযায়ী, ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় ১২৭ জন এবং ‘মাস্টার্স শেষ পর্ব-২০২১’ পরীক্ষায় ১২৪ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২২’ পরীক্ষায় ৮৩ জন এবং ‘প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স-২০২১’ সালের পরীক্ষায় ৫৭ জন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সাজা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অন্যদিকে, পেশাজীবী কোর্স হিসেবে পরিচিত এলএলবি (আইন) পরীক্ষাতেও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। জানা গেছে, ‘এলএলবি শেষ পর্ব-২০২২’ পরীক্ষায় একযোগে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছেন, যা একক পরীক্ষা হিসেবে অন্যতম সর্বোচ্চ। এছাড়া ‘এলএলবি ১ম পর্ব-২০২৩’ পরীক্ষায় ৫১ জন শিক্ষার্থীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৮ মাসে ১৮টি পরীক্ষায় সর্বমোট দুই হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীকে জালিয়াতির দায়ে এই রেকর্ড সাজা দিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
দণ্ডপ্রাপ্তদের ৪৬ শতাংশই অনার্সের (স্নাতক) শিক্ষার্থী
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ১৮ মাসের বহিষ্কারের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট সাজাপ্রাপ্ত দুই হাজার ৫৭১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বড় একটি অংশই অনার্স (স্নাতক) পর্যায়ের। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনার্সের মাত্র ছয়টি পরীক্ষায় (১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ বর্ষ মিলে) দণ্ড পেয়েছেন মোট এক হাজার ২৭২ জন। যা মোট বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট সাজার অর্ধেকই অনার্স স্তরের শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে জুটেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডিগ্রি পাস কোর্স। ছয়টি বর্ষের পরীক্ষায় মোট সাজা পেয়েছেন ৫৩১ জন, যা শতাংশের হিসেবে মোট বহিষ্কারের ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পেশাজীবী কোর্স হিসেবে পরিচিত এলএলবি-র মাত্র দুটি পরীক্ষায় বহিষ্কৃত হয়েছেন ২৮৫ জন, যা মোট সাজার ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ। এছাড়া মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি পর্যায়ের চারটি পরীক্ষায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন ৩৯৪ জন, যা মোট বহিষ্কারের ১৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি হচ্ছে চূড়ান্ত বর্ষগুলোতে। অনার্স ৩য় ও ৪র্থ বর্ষের তিনটি পরীক্ষায় (যথাক্রমে ৩০৪ জন, ৩১৭ জন, ৩৩৮ জন) মোট সাজা পেয়েছেন ৯৫৯ জন, যা অনার্সের মোট সাজার ৭৫ শতাংশেরও বেশি।
১৯ অপরাধে ৬ ধরণের শাস্তির বিধান
দেশের সর্ববৃহৎ এই শিক্ষালয়ের অধীনে প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সারাদেশের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে একযোগে পরীক্ষায় বসেন। বিশাল এই শিক্ষার্থী বহরের পরীক্ষায় যথাযথ নিয়ম-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং পরীক্ষার পবিত্রতা রক্ষায় ১৯টি সুনির্দিষ্ট অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে ছয় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরীক্ষা সংক্রান্ত এই অপরাধগুলোকে বাংলা বর্ণমালার ‘ক’ থেকে ‘ধ’ পর্যন্ত মোট ১৯টি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
শিক্ষকরাও পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন ডিজিটাল জালিয়াতির পথ খুঁজছে এবং সনাতন পদ্ধতির চিরকুটের ব্যবহারও অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষকরা মনে করেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে সচেতন করার মাধ্যমে এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব
যেখানে সাধারণ কথা বলা কিংবা সামান্য অসদুপায় অবলম্বন থেকে শুরু করে শিক্ষক লাঞ্ছনা ও নাশকতার মতো গুরুতর বিষয়গুলোকে অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করে শাস্তির স্তরগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যার ফলে সামান্য অনিয়মে পরীক্ষা বাতিল থেকে শুরু করে গুরুতর জালিয়াতির দায়ে একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে পারেন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা কক্ষে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলা, ধূমপান, মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক সামগ্রী বহন এবং অননুমোদিত কাগজপত্র সঙ্গে রাখার মতো অপরাধের জন্য (ক থেকে ঘ) পরীক্ষার্থীর সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিল করা হবে। এছাড়া কোনো পরীক্ষার্থী অননুমোদিত কাগজ বা প্রশ্নপত্র দেখে উত্তরপত্রে লিখলে কিংবা মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নকল করলে (ঙ থেকে ঞ), ওই বছরের পরীক্ষা বাতিলসহ পরবর্তী এক বছর সব ধরনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারাবেন।
রোল নম্বর পরিবর্তন করা, নিজেদের মধ্যে উত্তরপত্র বিনিময় কিংবা মিথ্যা অজুহাতে বিশেষ সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা করলে (ট থেকে ঠ) সংশ্লিষ্ট বছরের পরীক্ষা বাতিলসহ পরবর্তী দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে। অন্যদিকে, মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কিংবা পরীক্ষা কক্ষ থেকে উত্তরপত্র বাইরে পাচার করে তা আবার লিখে এনে যুক্ত করার চেষ্টা করলে (ড থেকে ণ) ওই বছরের পরীক্ষাসহ পরবর্তী টানা তিন বছরের জন্য বহিষ্কারের বিধান রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে উত্তরপত্রের কভার পৃষ্ঠা পরিবর্তন, পরিদর্শকের (ইনভিজিলেটর) কাছে উত্তরপত্র জমা না দিয়ে হলত্যাগ, উত্তরপত্র ছিঁড়ে ফেলা কিংবা কর্তব্যরত শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও লাঞ্ছিত করার মতো অপরাধের (ত থেকে ধ) জন্য। এমন গুরুতর অপরাধে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীর ওই বছরের পরীক্ষা বাতিলসহ পরবর্তী টানা চার বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে।
এছাড়া পরীক্ষায় কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি, গোলযোগ, আসবাবপত্র ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতামূলক কাজে (ন) জড়িত থাকলে শৃঙ্খলা কমিটি অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে যেকোনো মেয়াদে সাজা বা স্থায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন— এমন বিধানও রাখা হয়েছে।
অসন্তোষ খোদ উপাচার্যের, ঝটিকা সফরে বহিষ্কার ১০ শিক্ষার্থী
পরীক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খোদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। গত ৩০ এপ্রিল ময়মনসিংহে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধনে যান তিনি। ওই সময় অনার্স চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা চলমান ছিল। অনুষ্ঠান শেষে আশপাশের বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে ঝটিকা সফরে যান তিনি। এ সময়ে কেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা পরীক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বন, বিশৃঙ্খলা দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কারও করেন।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে পরীক্ষা নেওয়া শুধুমাত্র প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।’

‘যতক্ষণ পর্যন্ত পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তা সকলের নৈতিক উন্নয়ন হবে না, ততদিন পর্যন্ত পরীক্ষা গ্রহণ প্ৰক্ৰিয়া মানসম্মত হওয়ার কোন সুযোগ নেই’ বলেও জানান তিনি।
পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বন নিয়ে শঙ্কিত শিক্ষকরাও
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে নকলের প্রবণতা এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা যেমন নতুন নতুন ডিজিটাল জালিয়াতির পথ খুঁজছে, তেমনি সনাতন পদ্ধতির চিরকুটের ব্যবহারও থেমে নেই। সম্প্রতি বিভিন্ন কলেজের কক্ষ পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে নকলের এই বিচিত্র ও উদ্বেগজনক বিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
নাম ও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, বর্তমানে পরীক্ষার হলে নকলের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো শুধু বেঞ্চে লেখা বা ছোট কাগজের চিরকুটেই শিক্ষার্থীরা সীমাবদ্ধ নেই বরং এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার। অনেক শিক্ষার্থী অতি ক্ষুদ্রাকৃতির ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও অ্যাকাউন্টিংয়ের মতো জটিল বিষয়গুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এমন সূক্ষ্মভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে যা সাধারণ নজরদারিতে শিক্ষকদের কাছেও বোধগম্য হচ্ছে না।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, যারা স্নাতক (অনার্স) চূড়ান্ত বর্ষের শিক্ষার্থী, তারাও বহিষ্কারের চরম ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক হারে নকল করছেন।
দেশের উত্তরবঙ্গের একটি কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক নাম-পরিচয় গোপন রেখে বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সারা বছর ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে গাইড বই পড়ে তারা পাসের চেষ্টা করে। কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতি থাকায় যখন সাধারণ জ্ঞানেও কুলিয়ে উঠতে পারে না, তখন তারা বাধ্য হয়ে নকলের আশ্রয় নেয়।
তিনি আরও জানান, চাকরির বাজারে সনদের গুরুত্ব বাড়লেও বাস্তব যোগ্যতার অভাবে শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে, যা তাদের যেকোনো উপায়ে সনদ অর্জনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আবার কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশপথে চেকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীরা অনায়াসেই নিষিদ্ধ সামগ্রী নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করছে। অনেক কেন্দ্রে দায়িত্বরত পরিদর্শকদের ঢিলেঢালা মনোভাবও শিক্ষার্থীদের এই অনৈতিক কাজে উৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপের কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
ময়মনসিংহের একটি কলেজের অধ্যাপক বলেন, অনার্স ৩য় বা ৪র্থ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী যখন বহিষ্কৃত হয়, তখন তার জীবন থেকে মূল্যবান ১-২ বছর হারিয়ে যায়। এই ভয়াবহ ক্ষতির ঝুঁকি জেনেও তারা কেন এই আত্মঘাতী পথ বেছে নিচ্ছে, তা নিয়ে গভীর গবেষণার প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা বহিষ্কার করে এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিকভাবে সচেতন করার মাধ্যমেই এই অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব। নকলমুক্ত পরীক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও প্রশাসন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় ‘জিরো টলারেন্স’, শিক্ষকরাও আসছেন জবাবদিহিতায়
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলছেন উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি জানিয়েছেন, পরীক্ষায় নকল রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি খাতা মূল্যায়নে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতিও সহ্য করা হবে না। পুনর্মূল্যায়নে কোনো শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
ঢাকা পোস্টেকে তিনি বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এখনও পরীক্ষা যথাযথ নিয়ম মেনে নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। অন্যান্য সময়ের চেয়ে তদারকি বানানো হয়েছে। ২০২৫ সালে আমরা প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা নিয়েছি, যেখানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ। যেখানে আগে ফল প্রকাশে ৫-৬ মাস লাগত, সেখানে আমরা সর্বোচ্চ ৪৫ দিনে ফলাফল প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি।
উপাচার্য আরও জানান, ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ শতাংশ সেশনজট কমানো সম্ভব হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ৭০ শতাংশ এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট বলতে আর কিছুই থাকবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে উপাচার্য বলেন, পুনর্মূল্যায়নের আবেদনের পর দেখা যায় প্রায় ৮-৯ হাজার শিক্ষার্থী পাস করে। এর অর্থ হলো, কিছু শিক্ষক খাতা দেখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী নন। আমরা এখন অত্যন্ত কঠোর হচ্ছি। যদি পুনর্মূল্যায়নে কোনো শিক্ষার্থী পাস করে, তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। খাতা দেখার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে আমরা শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করছি এবং প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছি।
এছাড়াপরীক্ষায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সেশনজটমুক্ত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বদ্ধপরিকর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরএইচটি/এমএআর/
