বিজ্ঞাপন

ডিপ্লোমা পরীক্ষায় গণরেফার্ড

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ‘ভুল মূল্যায়ন’, বোর্ড বলছে ‘ক্লাসবিমুখতা’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ‘ভুল মূল্যায়ন’, বোর্ড বলছে ‘ক্লাসবিমুখতা’

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন পর্বের সমাপনী পরীক্ষায় সারা দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর ফলে চরম বিপর্যয় হয়েছে। পাঁচটি সেমিস্টার মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ দশমিক ১ শতাংশে। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য বা ‘রেফার্ড’ হয়েছেন। বিশেষ করে জুনিয়র সেমিস্টারগুলোতে অস্বাভাবিক হারে ফেল করাকে ‘গণরেফার্ড’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অনেকেই ভালো পরীক্ষা দিয়েও অকৃতকার্য হয়েছেন, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে শিক্ষকরা বলছেন, নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি ও দুর্বল প্রস্তুতির কারণেই এমন ফল বিপর্যয় ঘটেছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় সারা দেশের ৪৯টি সরকারি ও প্রায় ২০০টি বেসরকারি পলিটেকনিক থেকে মোট দুই লাখ ১৮ হাজার ৬২২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৮৭ হাজার ৬৪৩ জন। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৯৩০ জনে। যদিও এর আগে সমাপনী সেমিস্টারগুলোতে ভালো ফলাফলের নজির ছিল, তবে এবার জুনিয়র সেমিস্টারগুলোর চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। 

পরিসংখ্যান বলছে, ১ম সেমিস্টারে পাসের হার মাত্র ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২য় সেমিস্টারে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, ৪র্থ সেমিস্টারে ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে ৪২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে, এর বিপরীতে ৮ম সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, যেখানে পাসের হার প্রায় ৯৯ দশমিক ১ শতাংশ।

খোদ রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের চিত্রও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে গড় পাসের হার মাত্র ৪৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ১১ হাজার ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন চার হাজার ৭৫২ জন।

২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় সারা দেশের ৪৯টি সরকারি ও প্রায় ২০০টি বেসরকারি পলিটেকনিক থেকে মোট দুই লাখ ১৮ হাজার ৬২২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৮৭ হাজার ৬৪৩ জন। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৯৩০ জনে

এদিকে, ফল বিপর্যয়ের পর থেকেই শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তুলছেন, খাতা মূল্যায়নে চরম অবহেলা ও ভুল করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিসহ বিভিন্ন আন্দোলনের মুখে ২৩ থেকে ৩০ জানুয়ারি তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে স্থগিত হওয়া যেসব পরীক্ষা পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই বিষয়গুলোতে ফেল করার হার সবচেয়ে বেশি।

dhakapost
 জুনিয়র সেমিস্টারগুলোতে অস্বাভাবিক হারে ফেল করাকে ‘গণরেফার্ড’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা / ছবি- সংগৃহীত

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, যারা ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন এবং যাদের পাসের বিষয়ে শতভাগ আত্মবিশ্বাস ছিল, তারাও একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। আবার অনেকেই বলছেন, পরীক্ষা শেষে শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেও তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, পাস করার মতোই লিখেছেন তারা। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। বিশেষ করে কিছু ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে একই ব্যাচের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় বিষয়টি তাদের কাছে আরও অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের আর্কিটেকচার বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিন হাসান বলেন, ‘আমাদের ব্যাচে ৯০ জনের বেশি পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু পাস করেছে মাত্র ১০ জন। আমরা নিজেরা জানি কে কেমন পরীক্ষা দিয়েছে। এত খারাপ হওয়ার কথা না। এমন ফল বিপর্যয়ের বিষয়টা বুঝতে পারছি না। আমাদের শিক্ষকরাও কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না।’

হাসিব বিল্লাহ নামের আরেক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এমন ঘটনা এক-দুইবার হলে ভুল বলা যেত। কিন্তু প্রায় প্রতি সেমিস্টারেই এমন হচ্ছে। এখন ভালো রেজাল্ট আসলে বরং অবাক লাগে। খারাপ রেজাল্টটাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।’

শিক্ষার্থীরা মূলত মৌলিক বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ম্যাথমেটিক্স-১, কেমিস্ট্রি এবং বেসিক ইলেকট্রিসিটি। একই সঙ্গে রেজাল্ট পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, ১ম সেমিস্টারের অনেক শিক্ষার্থী এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের থিওরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এছাড়া প্রকৌশল বিদ্যার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং এবং ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্ট-এর মতো প্রাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক বিষয়গুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে

ঢাকা পোস্টের হাতে আসা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বেশকিছু শিক্ষার্থীর ফলাফল বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর নামের পাশে বড় অক্ষরে লাল কালিতে ‘Yet to pass’ (এখনও উত্তীর্ণ হয়নি) লেখাটি শোভা পাচ্ছে। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এই অকৃতকার্য বিষয়ের সংখ্যা চারটি, পাঁচটি কিংবা ছয়টি পর্যন্ত। এমনকি ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থীর আগে-পরের সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ১১টি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার রেকর্ডও দেখা গেছে। 

এসব ফল বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা মূলত মৌলিক বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ম্যাথমেটিক্স-১, কেমিস্ট্রি এবং বেসিক ইলেকট্রিসিটি। একই সঙ্গে রেজাল্ট পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, ১ম সেমিস্টারের অনেক শিক্ষার্থী এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের থিওরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এছাড়া প্রকৌশল বিদ্যার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং এবং ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড কনসেপ্ট ডেভেলপমেন্ট-এর মতো প্রাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক বিষয়গুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড লাইফ স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ-এর মতো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার তথ্য মিলেছে।

dhakapost
খোদ রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের গড় পাসের হার মাত্র ৪৩ দশমিক ০৪ শতাংশ / ছবি- সংগৃহীত

এদিকে, এমন অস্বাভাবিক ও হতাশাজনক ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুনর্নিরীক্ষণ বা বোর্ড চ্যালেঞ্জের হিড়িক পড়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বিষয়প্রতি ৩০০ টাকা করে ফি প্রদান করতে হচ্ছে। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থীর ফলে জিপিএ অনুপস্থিত রয়েছে কিংবা কোনো ধরনের কারিগরি ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাদের জন্য আগামী ১৪ মে পর্যন্ত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সরাসরি আবেদন করার বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে, পুনর্নিরীক্ষণ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরোপুরি আস্থা তৈরি হয়নি। অনেকের অভিজ্ঞতা, বোর্ড চ্যালেঞ্জ করার পরও সব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থী বলেন, এখানে ৯১০ জন শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার ৭৮১টি বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা দিয়েছেন। চারটা সাবজেক্টে চ্যালেঞ্জ করলে হয়তো এক-দুটায় পরিবর্তন আসে। কিন্তু বাকিগুলোতে কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলাফলে এই অসঙ্গতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি ধারাবাহিক সমস্যা।

এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীরাও ইতোমধ্যে বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সকল খাতা বিশেষ বিবেচনায় পুনর্নিরীক্ষণ, পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়াকে সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিকল্প মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা এবং পুরো ফলাফল প্রক্রিয়া পুনরায় তদন্ত করে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা।

তবে, শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগের বিষয়টি মানতে নারাজ শিক্ষকরা। তারা বলছেন, থিওরি খাতাগুলো যেহেতু সরাসরি বোর্ডের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকদের কাছে যায়, তাই সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট পক্ষপাতমূলক আচরণ করার সুযোগ কম।

আবার অনেক শিক্ষক মনে করছেন, করোনাকালীন সংকটের পর থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মৌলিক বিষয়গুলোতে তাদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে এবারের ফলাফলে।

সুনামগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও চিফ ইনস্ট্রাক্টর মো. আজিজুল সিকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফল বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আমাদের এলাকায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। আবার নতুন কারিকুলাম বারবার পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় পূর্ণ সিলেবাস শেষ করাও কঠিন হয়ে যায়।

dhakapost
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, অনেক শিক্ষার্থী ভালো পরীক্ষা দিয়েও অকৃতকার্য হয়েছেন / ছবি- সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষায় উপস্থিতির ভিত্তিতেও মূল্যায়ন হয়। অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে, কুইজ দেয় না। এতে সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়ে। সব শিক্ষক একসঙ্গে খারাপভাবে খাতা দেখছেন— এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে কোথাও যদি ত্রুটি থাকে, সেটা তদন্ত করে দেখা উচিত।’

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রকৌশলী সুব্রত দাশও ফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের দুর্বল প্রস্তুতিকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষকই চান না একজন শিক্ষার্থী ফেল করুক। কারিগরি বিষয়ে প্রাসঙ্গিক উত্তর লিখলে সাধারণত নম্বর দেওয়া হয়। কিন্তু খাতা ফাঁকা থাকলে বা অপারেশন ভুল হলে নম্বর দেওয়ার সুযোগ থাকে না।

তবে বোর্ডের কর্মকর্তাদের দাবি ভিন্ন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ ঢাকা পোস্টকে জানান, পরীক্ষার মাঝে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, বারবার পরীক্ষা পেছানো এবং ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে শিক্ষা অপরিহার্য হলেও শিক্ষার্থীরা এখন ক্লাসমুখী নয়। গত দুই বছর ধরে এই প্রবণতা বেড়েছে। তবে, খাতা মূল্যায়নে কোনো শিক্ষকের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি।

dhakapost
শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখতাও ফল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ— বলছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ / ঢাকা পোস্ট

শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী নয় : কারিগরি শিক্ষা বোর্ড

ফল বিপর্যয় ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বোর্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারিগরি শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো নিয়মিত ক্লাস এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে উপস্থিত না হওয়ার একটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৪ সপ্তাহের একটি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা শুরুতে এবং মিডটার্মের পর দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকে। এমনকি ফরম ফিলাপের পরও অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে পাওয়া যায় না। এই শিখন ঘাটতি নিয়েই যখন তারা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়, তখন সঙ্গত কারণেই ফলাফল আশানুরূপ হয় না।

কর্মকর্তারা আরও বলছেন, সাধারণ শিক্ষার মতো কেবল গাইড বই পড়ে বা প্রাইভেট পড়ে কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী হওয়া সম্ভব নয়। এখানে ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিল, তাদের অকৃতকার্য হওয়ার হার প্রায় শূন্য। ফলে এবারের এই গণফেলকে কেবল খাতা মূল্যায়নের ত্রুটি হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা ও খাতা মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি একাধিক ধাপে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। বোর্ডের প্রশ্নপত্র অভিজ্ঞ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা তৈরি করেন। পরে বিভিন্ন কেন্দ্রে শিক্ষকরা পরীক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নও শিক্ষকদের মাধ্যমেই করা হয়। এরপর প্রধান পরীক্ষক ও নিরীক্ষকরা পুনরায় খাতা যাচাই করেন, মূল্যায়নে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য। সব ধাপ শেষে বোর্ড ফলাফল প্রকাশ করে।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর পরীক্ষার মাঝখানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরীক্ষা বর্জন এবং বিভিন্ন সময় পরীক্ষা পেছানোর কারণে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখতাও ফল বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ। শুধু কারিগরি শিক্ষা নয়, সামগ্রিকভাবেই শিক্ষার্থীরা এখন ক্লাসমুখী নয়। সাধারণ শিক্ষায় বাসায় পড়াশোনা বা প্রাইভেটের মাধ্যমে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করা গেলেও কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ জরুরি হওয়ায় ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে তা পূরণ করা সম্ভব হয় না। গত দুই বছর ধরেই এই প্রবণতা বেড়েছে। এ বছর প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ খাতার মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ হাজার পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে।

এরপরও খাতা দেখায় কোনো অনিয়ম বা অনৈতিক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আরএইচটি/এমএআর/