বিজ্ঞাপন

সবুজ শক্তির স্বপ্নে ফাটল: নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও উচ্চ শুল্কে আস্থার সংকট

সবুজ শক্তির স্বপ্নে ফাটল: নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও উচ্চ শুল্কে আস্থার সংকট

বাংলাদেশে সৌরপ্রযুক্তির যাত্রা শুরু প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে। শুরুতে গ্রামীণ এলাকায় সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হলেও, পরে এনজিও এবং সরকারি ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রিড বিদ্যুতের আওতার বাইরে থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষ সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছেন।

তবে হতাশার বিষয় হলো, বর্তমানে এসব সিস্টেমের ৪৭ শতাংশই অকার্যকর। এর প্রধান কারণ গ্রিড লাইনের সম্প্রসারণ হলেও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি করা উপকরণের অতিরিক্ত দামের ফলে গ্রাহকরা ক্রমেই সৌরবিদ্যুৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

শহর এলাকার চিত্রও একই রকম। সরকারি প্রচারণায় আগ্রহী হয়ে অনেকেই বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে সেগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
 
খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্ক-হার কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্রাংশ তৈরি উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্যানেল, ইনভার্টার, চার্জ কন্ট্রোলার, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক প্রসার সম্ভব। এতে লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গ্রাহকরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সরকারের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।

নিম্নমানের যন্ত্রাংশের বিস্তার ও প্রভাব

রাজধানীর রামপুরা হাজিপাড়ার বহুতল ভবন মদিনা পার্ক। নয় তলা এই ভবনে ২০১১ সালে সরকারি শর্ত মেনে দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু স্থাপনের মাত্র দুই বছরের মাথায় ইনভার্টারটি নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে আরও দুই দফায় ইনভার্টারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হলেও সিস্টেমটি পাঁচ বছরের বেশি সচল রাখা সম্ভব হয়নি।

অথচ সোলার হোম সিস্টেমে সোলার প্যানেল কমপক্ষে ২০ বছর, ইনভার্টার ৫ বছর এবং ব্যাটারি অন্তত ৩ বছর চলার কথা ছিল। বারবার যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের পরেও কাঙ্ক্ষিত সার্ভিস না পাওয়ায় মদিনা পার্কের সোলার প্যানেলগুলো এখন ভবনের ছাদে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছর নাগাদ দেশের সৌরবিদ্যুতের বাজারের আকার ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্ববাজারের কার্বন শুল্কের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের প্রসার জরুরি। শুধুমাত্র পোশাক খাতের কারখানার ছাদে সোলার স্থাপন করে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যার জন্য প্রয়োজন অনুকূল শুল্ক ও শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

মদিনা পার্কের কেয়ারটেকার আনোয়ার হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুরুর দিকে ভবনের কমন লাইট ও ফ্যানগুলো সৌরবিদ্যুতে চলত। ৪-৫ বছর পর বারবার যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে শুরু করলে মালিক সমিতি আর তা মেরামত করেনি। এখন বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে আমরা তেলচালিত জেনারেটরের ওপরই নির্ভর করি।

শুধু মদিনা পার্ক নয়, রাজধানীর অধিকাংশ ভবনের সোলার সিস্টেমেরই একই দশা। এসব ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো দ্রুত যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া।

ঢাকার বাইরেও সোলার সিস্টেমের চিত্র প্রায় একই রকম। বরিশাল বিভাগের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বাদলপাড়া গ্রামের বাজারে একসময় ২৫-৩০টি ছোট ছোট সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছিল। এমনকি ওই গ্রামের বাড়ি বাড়ি সোলার হোম সিস্টেম অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের দিকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ৩০-৫০ হাজার টাকায় সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করাকে মানুষ আশীর্বাদ হিসেবে দেখত।

dhakapost

তবে, ৫ থেকে ৬ বছর পর সোলার সিস্টেমের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকে। এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে দোকানদার ও গ্রামের বাসিন্দারা জাতীয় গ্রিডের লাইন পাওয়ার পাশাপাশি সোলার সিস্টেমের যথাযথ সার্ভিস না পাওয়াকে দায়ী করেছেন।

বাদলপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী নিজাম হাওলাদার একসময় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করতেন, কিন্তু এখন আর তা ব্যবহার করেন না। নিজ অভিজ্ঞতার কথা ঢাকা পোস্টকে এভাবে বলেন, ‘আমি এবং আমাদের বাজারের অনেকেই সোলার প্যানেল লাগিয়েছিলাম। শুরুতে আমার ৪০ হাজার টাকার প্যানেলটি বেশ ভালো সার্ভিস দিয়েছিল। কিন্তু ২-৩ বছর পর থেকেই ব্যাটারি ও ইনভার্টারে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। আমি প্রথম প্রথম ৩টি লাইট এবং একটি ছোট ফ্যান চালাতাম। এভাবেই প্রায় ৬ বছর ব্যবহার করেছি। এরপর এলাকায় গ্রিডের বিদ্যুৎ চলে আসায় সোলারের ব্যবহার কমে যায়। পরবর্তীতে বারবার যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত এটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছি।’

‘তবে আমার ধারণা, যন্ত্রপাতির মান ভালো হলে এবং ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে সোলার সিস্টেম থেকে দীর্ঘমেয়াদে ভালো সার্ভিস পাওয়া সম্ভব।’

এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যানুসারে, রাজধানীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১৩.৬৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। তবে, এর একটি বড় অংশই বর্তমানে অকেজো পড়ে আছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৫২ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলেও এর মধ্যে মাত্র ৯ মেগাওয়াট নেট মিটারিংয়ে সক্রিয়। অন্যদিকে, ডেসকো এলাকায় ৭৩.৬৭ মেগাওয়াট সোলার সিস্টেমের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র ১২.১৬ মেগাওয়াট।

এর অর্থ হলো, রাজধানীতে স্থাপিত সোলার সিস্টেমের প্রায় ৭০ শতাংশই বর্তমানে অকেজো। বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, এর প্রধান কারণ হলো— বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে গিয়ে স্থাপনের সময় নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও কন্ট্রোলার ব্যবহার করা এবং পরবর্তীতে সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।

ইডকলের হাত ধরে সোলারের বিস্তার ও মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ

১৯৯৭ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে সৌরপ্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে, বিশেষ করে ২০০৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে। জানা গেছে, শুধুমাত্র ইডকলের মাধ্যমেই প্রায় ৪২ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা ৬০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছায়, যার সুফল প্রাথমিকভাবে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। 

তবে, এই অগ্রযাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইডকলের নিজস্ব গবেষণাতেই উঠে এসেছে, নিম্নমানের এবং ত্রুটিপূর্ণ সোলার প্যানেল ও সরঞ্জাম এই স্থবিরতার অন্যতম কারণ। ২০১২-২০১৩ সালের এক সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর ৯৬.৩ শতাংশ চার্জ কন্ট্রোলারের নিম্নমান, ৭৪.১ শতাংশ আলোর সমস্যা এবং ৬৯.২ শতাংশ ব্যাটারির মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

গবেষণায় আরও চিহ্নিত করা হয়েছে যে, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ জনবলের অভাব নিম্নমানের উপাদানের ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে চার্জ কন্ট্রোলার, ব্যাটারি এবং লাইটের মতো যন্ত্রাংশ অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করেই উৎপাদিত বা সংযোজিত হয়। ফলে এগুলোর গুণগত মানে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায় এবং কোনো প্রকার মান যাচাই ছাড়াই নিম্নমানের পণ্য বাজারে প্রবেশ করে।

এই নিম্নমানের ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে, যা মাটি ও পানিতে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইডকলের মতে, যদিও গবেষণাটি পুরনো, বর্তমান বাস্তবতায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিল্প এলাকায় বড় প্রকল্প ছাড়া মানুষ এখন ছোট প্রকল্পে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এমনকি ইডকল এবং তাদের সহযোগী ৫৭টি সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানির বিরুদ্ধেও নিম্নমানের প্যানেল সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

dhakapost
১৯৯৭ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে সৌরপ্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে / ছবি- সংগৃহীত

সার্বিক বিষয়ে ইডকলের ডেপুটি সিইও এস এম মনিরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিম্নমানের উপাদান ব্যবহারের ফলে সোলার হোম সিস্টেমের কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষাগার স্থাপন, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবহারকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ খাতের গুণগত মান উন্নত হবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও দাবি করেন, ইডকলের আওতায় সরাসরি চালু করা সিস্টেমগুলোতে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়েছে, যা তাদের টেকনিক্যাল কমিটি তদারকি করে। তবে, ২০০৮-২০০৯ সালের দিকে চীন থেকে একদল আমদানিকারক নিম্নমানের পণ্য এনে নবাবপুর রোডের পাইকারি বাজারে সরবরাহ শুরু করে। তৃনমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষ কম দামের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে ২০ হাজার টাকার সিস্টেম ১২ হাজার টাকায় পাওয়া যেতে শুরু করে। এই সস্তার প্রবণতার কারণে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়েছে। ২০১৩-২০১৪ সালের দিকে এই নিম্নমানের পণ্যের বাজার ব্যাপক আকার ধারণ করে।

মনিরুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, শুরুতে যন্ত্রাংশের মান নিশ্চিত করার কারণেই সৌরবিদ্যুতের সব সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে, পরবর্তীতে সরকারিভাবে গ্রিড বা বিদ্যুৎ লাইনের সম্প্রসারণ এবং বাজারে নিম্নমানের ও নকল পণ্যের ছড়াছড়ির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সৌরশক্তির প্রতি আগ্রহ কমতে শুরু করে।
 
তার মতে, ২০ বছর আগের প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানের চাহিদা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগে গ্রামের জন্য এটি অপরিহার্য হলেও, এখন হোম সিস্টেমের ক্ষেত্রে এটি অনেকটা বিলাসবহুল পণ্যের মতো হয়ে গেছে, যেখানে মানুষ একে আইপিএসের বিকল্প হিসেবে ভাবছে।

তবে, শিল্পের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ এখনও লাভজনক। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘শিল্পে ব্যাটারি ছাড়াই সরাসরি বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, ফলে ব্যাটারির খরচ না থাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৬ টাকারও কম পড়ে। অন্যদিকে, হোম সিস্টেমে ব্যাটারির প্রয়োজন হয় বলে উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিটে ২০ টাকার বেশি পড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষকে অনাগ্রহী করে তোলে। তাই শুধু হোম সিস্টেম দিয়ে সৌরবিদ্যুতের প্রকৃত জনপ্রিয়তা পরিমাপ করা সম্ভব নয়।’

সৌরবিদ্যুতের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আকাশছোঁয়া শুল্ক ও কর। অধিকাংশ যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপিত আছে। অথচ এই খাত থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় ২০ কোটি টাকারও কম। এই উচ্চ করভারের কারণে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে

স্রেডার দুর্বল তদারকি এবং বিএসটিআই নির্ভরতা 

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের মান নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই খাতে নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (স্রেডা)। তবে, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ধরন এবং সীমাবদ্ধতা এই মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।

স্রেডা সরাসরি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে না, তাদের কাজ মূলত পলিসি নির্ধারণ এবং জনসচেতনতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশের মান যাচাই করার জন্য স্রেডার নিজস্ব কোনো ল্যাবরেটরি নেই। এছাড়া, বিশাল এই খাতের তদারকি করার জন্য তাদের লোকবলও অত্যন্ত নগণ্য— মাত্র ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে চলছে তাদের কার্যক্রম। নিজেদের ল্যাব না থাকায়, স্রেডাকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন’ (বিএসটিআই)-এর রিপোর্টের ওপর।

এ বিষয়ে স্রেডার চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে, প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে এই সংকটজনক পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, যন্ত্রাংশের মান খারাপ হলে মাত্র এক-দুই বছরের মধ্যেই সৌরপ্যানেলের উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, সাধারণ নিয়মে প্রথম বছর পূর্ণ ক্ষমতার পর দ্বিতীয় বছরে তা ৮০-৯০ শতাংশ থাকার কথা। এভাবেই ধীরে ধীরে ক্ষমতা কমার কথা ছিল। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে দেখা যায়, উৎপাদন ক্ষমতা হঠাৎ করে ৮০ শতাংশ থেকে এক লাফে ৪০-৫০ শতাংশে নেমে আসে।

dhakapost

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, পণ্যের দাম এখানে একটি বড় কারণ। উচ্চমানের পণ্যের জন্য কিছুটা বেশি দাম দিতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা যখন কম দামে পণ্য খোঁজেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের হাতে নিম্নমানের পণ্য চলে আসে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ভোক্তা অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও ভালো পণ্য পায়নি। এই ঊর্ধ্ববতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, অতীতে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি কিছু প্রকল্পে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের নজির রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘কাবিখা’ প্রকল্পের আওতায় গ্রামের স্কুল-কলেজের ছাদ এবং স্ট্রিট লাইটে স্থাপন করা সোলার সিস্টেমগুলোর অনেকগুলোই নিম্নমানের যন্ত্রাংশের কারণে এখন আর সচল নেই।

তিনি স্পষ্টভাবেই বলেন, বাজার মনিটরিংয়ের প্রকৃত দায়িত্ব আসলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর। কারণ, স্রেডার তীব্র লোকবল সংকট রয়েছে এবং নিজস্ব কোনো গবেষণা ল্যাবরেটরি নেই। এই অসহায়ত্বের কারণেই তারা পুরোপুরি বিএসটিআই-এর রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেন।

যদিও বিএসটিআই কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সৌরপ্যানেলের যন্ত্রাংশ বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশনের আওতায় এসেছে ২০২২ সাল নাগাদ এবং এর জন্য বিশেষায়িত টেস্টিং ল্যাব চালু হয়েছে ২০২৫ সালে। এর আগে দীর্ঘ সময় এসব যন্ত্রাংশের মান যাচাইয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবে, বর্তমানে বিএসটিআই ছাড়পত্র দিলেও সারা দেশের বাজারে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ প্রবেশ ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সোলার প্যানেলসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামগুলো এখনও দেশের ‘আমদানি নীতি’-তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

এই সীমাবদ্ধতার বিষয়ে বিএসটিআই’র পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম (সিএম) ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সোলার মডিউল ও ইনভার্টার আমদানি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় আমদানিকারকরা অনায়াসেই এগুলো দেশে নিয়ে আসছেন এবং সরাসরি বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে কেবল নেট মিটারিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্রেডার অনুমোদনের প্রয়োজনে আমাদের কাছ থেকে যন্ত্রাংশের ছাড়পত্র নিতে হয়। এর বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ যদি এসব সরঞ্জাম আমদানি করে ব্যবহার শুরু করেন, তবে বিএসটিআই-এর পক্ষে তা তদারকি করা সম্ভব নয়।’

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী আগামী অর্থবছর থেকে এসব পণ্য আমদানি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হলে পুরো বাজার বিএসটিআইয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তখন যেকোনো বন্দর দিয়ে সোলার সরঞ্জাম প্রবেশের আগেই বিএসটিআই-এর ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। আমাদের বর্তমান লোকবল এবং ল্যাবরেটরির যে সক্ষমতা রয়েছে, তাতে আমরা সম্পূর্ণ বাজার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব বলে আশা করছি।’

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, বিএসটিআই আন্তর্জাতিক আইএসও (ISO) স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে সোলার সিস্টেমের ছাড়পত্র প্রদান করে। তারা মূলত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি— এই তিনটি সরঞ্জামের মান নিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে প্যানেল ও ইনভার্টার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হলেও ব্যাটারি দেশে উৎপাদিত হয়, যার লাইসেন্স দেয় বিএসটিআই।

ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হলেই কেবল ছাড়পত্র দেওয়া হয় এবং বিএসটিআই সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই স্রেডা তা অনুমোদন দেয়। বিএসটিআই-এর মানসম্মত প্রমাণপত্র ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই স্রেডায় তালিকাভুক্ত (এনলিস্টেড) হতে পারে না। প্যানেল বা মডিউলের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য বিএসটিআই-এর নিজস্ব টেস্টিং সুবিধা রয়েছে। তবে, ইনভার্টারের ক্ষেত্রে ২০ কিলোওয়াট পর্যন্ত টেস্টিং সুবিধা থাকলেও এর বেশি ক্ষমতার ইনভার্টারের জন্য আমদানিকারকের আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব রিপোর্ট যাচাই-বাছাই করে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। 

dhakapost
স্রেডার নিজস্ব ল্যাব ও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সৌরপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে / ঢাকা পোস্ট

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সৌরপ্যানেলের প্রকৃত কোনো উৎপাদক বা ম্যানুফ্যাকচারার নেই এবং প্রায় সব সরঞ্জামই শতভাগ আমদানিনির্ভর। বিএসটিআই মান নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে মাত্র ৪-৫ বছর আগে। এর আগে মান দেখার মতো কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় সেই সময়েই বাজারে মানহীন পণ্যের সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটেছে।

বাজারে মিলছে দামি পণ্য, মান নিয়ে সন্দেহ

সৌরবিদ্যুতের বাজার মনিটরিং নিয়ে ভোক্তা ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর সংশয় রয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের পণ্যই মজুত আছে। অর্থাৎ, ক্রেতা যেমন দাম দেবেন, দোকানদার ঠিক তেমন মানের পণ্যই সরবরাহ করবেন। বাজারে উচ্চমান ও নিম্নমান— উভয় ধরনের যন্ত্রাংশই সহজলভ্য. তবে জালিয়াতির চিত্রও ভয়াবহ; অনেক ক্ষেত্রে কম ওয়াটের প্যানেলে বেশি ওয়াটের স্টিকার লাগিয়ে হরহামেশাই বিক্রি করা হচ্ছে।

পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের কাপ্তান বাজার দেশের অন্যতম বৃহৎ সোলার মার্কেট, যেখানে শতাধিক দোকান রয়েছে। এই বাজারের ব্যবসায়ী আসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাজারে ভালো-মন্দ সব ধরনের মালই পাওয়া যায়। যে যেমন টাকা দেবেন, পণ্য তেমন পাবেন। দেখতে এক রকম মনে হলেও ভেতরের মানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকে, যা কারিগরি জ্ঞান ছাড়া সাধারণ ক্রেতার পক্ষে বোঝা অসম্ভব।’ 

তিনি আরও জানান, বর্তমানে ফ্ল্যাট বাড়িতে গ্রিড বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়ার শর্ত পূরণের জন্য অনেকেই কেবল নামমাত্র নিম্নমানের সোলার সিস্টেম কিনছেন।

বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সময়ে বাজারে ৪২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন সোলার হোম সিস্টেম প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে। সাশ্রয়ী প্যাকেজ ৪২-৪৫ হাজার টাকায়। এই প্যাকেজের মাধ্যমে ৩টি সিলিং ফ্যান, ৫টি এলইডি লাইট, টিভি ও ওয়াই-ফাই রাউটার চালানো সম্ভব। মধ্যম মানের প্যাকেজ ৫০-৬৫ হাজার টাকায়। এই বাজেটে আরও অতিরিক্ত ফ্যান ও লাইট ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যায়। উচ্চমূল্যের প্যাকেজ ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মধ্যে। সবচেয়ে বড় এই প্যাকেজে ১০টি ফ্যান, ১৫টি লাইট, ফ্রিজ, ১.৫ টনের এসি এবং পানির মোটর চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া, আছে ক্ষুদ্র প্যাকেজ। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাড়ে ৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে ৩০ থেকে ২৫০ ওয়াটের ছোট সেটও মিলছে। এটি মূলত ফ্যান, লাইট বা ছোট ডিভাইস চালানোর জন্য উপযোগী।

সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, খোলা বাজারে সোলার যন্ত্রাংশের মান নিয়ন্ত্রণই এখন এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উচ্চ শুল্ক ও কর-হার বড় বাধা

সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিকাশে উচ্চ শুল্ক ও কর-হার বর্তমানে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ সত্ত্বেও এই খাতের বিভিন্ন উপকরণ আমদানি থেকে বছরে মাত্র ২০ কোটি টাকারও কম রাজস্ব আসে, যা মোট রাজস্ব আয়ের অত্যন্ত সামান্য অংশ। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই খাত থেকে বছরে রাজস্ব আয় হয়েছে মাত্র সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। অথচ এই সামান্য রাজস্ব আহরণের বিপরীতে আরোপিত উচ্চ করভার দেশের সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

dhakapost
রাজধানীর বহুতল ভবনে স্থাপিত সোলার সিস্টেমের ৭০ শতাংশই অচল, যা জাতীয় গ্রিডে সবুজ জ্বালানি যুক্ত করার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে / ছবি- সংগৃহীত

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের অধিকাংশ যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপিত আছে। এই উচ্চ ব্যয়ের কারণে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এইচএস কোড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোলার পিভি মডিউল, ফটোভোলটাইক সেল এবং সোলার ইনভার্টারের মতো মূল যন্ত্রাংশে যথাক্রমে প্রায় ২৬.৯০ শতাংশ, ২৫.৭৫ শতাংশ এবং ২৮.৭৩ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়। এছাড়া, ডিসি কেবল ও মাউন্টিং স্ট্রাকচারের (অ্যালুমিনিয়াম) ওপর ৫৮.৪০ শতাংশ এবং ব্যাটারি প্যাক (রেডিমেড) ও ব্যাটারি সেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ওপরও সমান হারে অর্থাৎ ৫৮.৪০ শতাংশ করভার রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি কর দিতে হয় পিভি ডিজি কন্ট্রোলার বা হাইব্রিড কন্ট্রোলারের ক্ষেত্রে, যার হার প্রায় ৮৯.০৮ শতাংশ। এমনকি সোলার প্ল্যান্টে ব্যবহৃত মনিটরিং ইউনিট বা সেফটি অ্যালুমিনিয়ামের মতো আনুষঙ্গিক উপকরণের ওপরও ৩১ থেকে ৩৭ শতাংশের বেশি কর বিদ্যমান। 

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা হলে দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন দ্রুত বাড়বে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমদানিনির্ভরতা কমবে। এটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

আশার কথা হলো, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার সৌরবিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নের জন্য যা যা করার প্রয়োজন এনবিআর তা করবে। আগামী বাজেটে এই শুল্ক-কর কমানোর বিষয়েও আশ্বাস পাওয়া গেছে।

মান নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক বিষয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের পরামর্শ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সৌরবিদ্যুৎ খাতের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি শুল্কছাড় ও প্রণোদনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাজারে যেন কোনোভাবেই নিম্নমানের যন্ত্রাংশ প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি। সোলার খাতের ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে বেশকিছু দুর্বলতা রয়েছে। ভালো মানের সোলার সিস্টেম পেতে গ্রাহককে যেমন সঠিক দাম দিতে হবে, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকেও আলাদা এইচএস কোড (HS Code) নির্ধারণ করে যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক-কর ছাড়সহ বিশেষ রাজস্ব প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।’

পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সার্কভুক্ত এই দেশটি তাদের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করছে, অথচ ২০০৭-০৮ সালেও এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। পাকিস্তান কোন নীতি অনুসরণ করে এই অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।’ 

এছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে সিমেন্ট, লোহা, ইস্পাত ও সারসহ ৬টি খাতে কার্বন নিঃসরণের জন্য শুল্ক বা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং ২০৩০ সালের পর তৈরি পোশাক খাতেও এমন শুল্ক বসতে পারে। বর্তমানে যে হারে কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে রপ্তানি পণ্যের ওপর প্রায় ৪ শতাংশ অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক বসার ঝুঁকি রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের প্রসার অত্যন্ত জরুরি।’

মোস্তাফিজুর রহমান একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে জানান, শুধুমাত্র দেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের কলকারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা নিয়ে সরকারের গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। 

dhakapost
সৌর সরঞ্জামের ওপর ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক এই পরিবেশবান্ধব খাতের প্রসারে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে / ছবি- সংগৃহীত

স্থানীয় উৎপাদনের সম্ভাবনা : আগামীর বাজার ও নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগের প্রবণতা প্রতি বছরই বাড়ছে। সবুজ জ্বালানি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের তথ্যমতে, দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে জাতীয় গ্রিডে নতুন করে প্রায় ৭০০-৯০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সৌরবিদ্যুৎ খাতের বাজারের আকার ছিল প্রায় ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ হাজার থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা প্রায় ৮–১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ১০–১৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এই লক্ষ্যমাত্রা ও সক্ষমতা অর্জনের জন্য আনুমানিক ১৩.৬ লাখ সৌরপ্যানেলের প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে এই খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। দেশে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার নামে আমদানিতে শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তার মতে, ‘যেখানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর নিম্ন বা শূন্য শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশেও আমদানি পর্যায়ে শূন্য শুল্ক নির্ধারণ করা জরুরি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই খাতটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উচ্চ শুল্ক ও করের চাপে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। শুল্ক কমানোর পাশাপাশি যদি দেশীয় উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যায়, তবে প্রথাগত বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আরও অনেক নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে।’

বিএসআরইএ কোম্পানি সচিব এ এস এম মনির সৌরবিদ্যুতের জনপ্রিয় না হওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক-করকে দায়ী করেছেন। ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই খাতের অসম প্রতিযোগিতার চিত্র তুলে ধরেন। বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৯৫ শতাংশ উপকরণই আমদানিনির্ভর, যা পুরোপুরি শুল্ক-কর মুক্ত। গ্রিডের এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি খরচ হয় ১২-১৩ টাকা, অথচ পিডিবি তা ৫-৬ টাকায় কিনে বাকি টাকা সরকার থেকে ভর্তুকি হিসেবে পাচ্ছে। অন্যদিকে, সৌরশক্তি ব্যবহার করে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৬৮-৭০ শতাংশ শুল্ক-কর গুনতে হচ্ছে, যদিও এর উৎপাদন খরচ সর্বোচ্চ মাত্র ৬-৭ টাকা।’

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের যাত্রা আশাব্যঞ্জক হলেও বর্তমানে প্রায় ৪৭ শতাংশ সোলার হোম সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজধানীর আবাসিক ভবনগুলোতে স্থাপিত সোলার সিস্টেমের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন অকেজো। মূলত নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি ব্যবহার এবং তদারকির অভাবে সাধারণ গ্রাহকরা এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি থেকে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পিডিবি সোলার বিদ্যুৎ নিতে চায় না কারণ তারা সরকার থেকে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ পায়।’ তার মতে, ‘সোলার খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিদ্যুৎ খাতে একটি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা জরুরি। একদিকে রাজস্ব খরচ করে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব সবুজ এনার্জিতে উচ্চ শুল্ক-কর বসিয়ে রাখা হয়েছে— এমন বৈষম্যমূলক নীতি থাকলে এই খাতকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।’

dhakapost

বিগত চার বছরের আমদানির হালচাল

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত চার অর্থবছরে দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে মডিউল আকারের ফটোভোলটাইক সেল। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২১ হাজার মেট্রিক টন ফোটোভোল্টাইক সেল আমদানি হয়েছিল, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও এর মোট মূল্য ছিল ১ হাজার ২৬৩ কোটি টাকারও বেশি। আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে; মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসেই ২০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি সোলার মডিউল দেশে এসেছে।

মডিউলের পাশাপাশি সোলার ইনভার্টার এবং ফটোসেনসিটিভ সেমিকন্ডাক্টর ডিভাইস আমদানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। তবে, ব্যাটারির বিষয়টি এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে, কারণ ব্যাটারি সোলার সিস্টেম ছাড়াও অন্যান্য অনেক খাতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া, সোলার ব্যাটারির জন্য এখনও পৃথক কোনো এইচএস কোড নেই এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ব্যাটারি থেকেই মেটানো হয়।

আরএম/এমএআর/