একটি ভুলের মাশুল মানুষ কতদিন ধরে গোনে? অথবা নামের সামান্য অংশ বাদ পড়ে যাওয়া কি একটি মানুষের জীবিকার স্বপ্নকে এভাবে ঝুলিয়ে দিতে পারে? এমন এক বুকভাঙা প্রশ্ন বুকে চেপে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের এনআইডি অনুবিভাগের দরজায় দরজায় ঘুরছেন নেত্রকোনার প্রান্তিক জনপদের বাসিন্দা মোশাররফ (ছদ্মনাম)। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) এক চরম উদাসীনতার মাশুল দিতে গিয়ে আজ তার নতুন চাকরির স্বপ্ন ভাঙার উপক্রম হয়েছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে ছুটে এসে দিনের পর দিন নির্বাচন কমিশনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মিলছে না কোনো সমাধান।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের শীর্ষ আমলাদের অনমনীয় মনোভাব, নতুন মহাপরিচালকের আকস্মিক কঠোর শর্ত এবং বাস্তবতাবিবর্জিত মৌখিক নির্দেশনার ত্রিমুখী জাঁতাকলে পড়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এনআইডির মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা এই জটিল পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে বলছেন, নবাগত হিসেবে পুরো প্রক্রিয়াটি তিনি ‘বোঝার চেষ্টা করছেন’। অন্যদিকে, ইসি সচিব আখতার আহমেদ সম্পূর্ণ নেতিবাচক ও আমলাতান্ত্রিক অবস্থান নিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে ‘আরও ধীরগতিতে (স্লো) চলবে’ এবং নাগরিকদের তাগিদ অনুযায়ী কোনো কাজ হবে না।
ইসি সচিবের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এবং এনআইডি মহাপরিচালকের নতুন কঠোর শর্তের জেরে পরিচয়পত্র সংশোধন প্রক্রিয়ায় চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ৪ বছরের বেশি বয়স সংশোধন না করাসহ বাস্তবতাবিবর্জিত নানা মৌখিক নির্দেশনায় হাজারও বাল্কনোট ফাইল বন্দি হয়ে পড়েছে; যার খেসারত দিচ্ছেন জরুরি চাকরিপ্রার্থী ও পাসপোর্ট নবায়নের অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী যুবসমাজ
শীর্ষ কর্তাদের এই অনড় মনোভাবের বিপরীতে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার অবশ্য জানিয়েছেন, বয়স সংশোধনে কোনো সময়সীমা নেই। তিনি দ্রুত সংশোধনী আবেদন নিষ্পত্তির আশ্বাস ও মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন। তবে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই তীব্র সমন্বয়হীনতা ও ফাইল আটকে রাখার খামখেয়ালিপনার কারণে ইসি ভবনে এখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও হাহাকার।
ঈদের মুখে নেত্রকোনার মোশাররফের মতো যুবকের নতুন চাকরির স্বপ্ন ভাঙতে বসেছে এবং ফরিদপুরের রাকিবুল হাসানের মতো শত শত প্রবাসীর কর্মস্থলে ফেরা তথা পুরো কর্মজীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মোশাররফের জাতীয় পরিচয়পত্রে তার পুরো নাম বাদ দিয়ে স্রেফ লেখা রয়েছে ‘ইব্রাহিম’। এই সামান্য ভুলের কারণে তার জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্রের সঙ্গে তৈরি হয়েছে পাহাড়সম অমিল। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করা মোশাররফ সম্প্রতি নিজের ভাগ্য বদলের জন্য নতুন আরেকটি চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এনআইডির এই নামের অসামঞ্জস্যতার কারণে সেই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াটি মাঝপথে আটকে গেছে। স্বপ্ন ছোঁয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এসে যেন নিয়তির এক নির্মম পরিহাসের শিকার হয়েছেন এই যুবক।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান কবে?
মোশাররফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কয়েক দিন পরেই ঈদ। যখন সবার ঘরে ফেরার আনন্দ, তখন চলতি মাসের ১ তারিখে (মে) নাম সংশোধনের আবেদন জমা দিয়েও আমি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আবেদনটি ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে পাঠানো হলেও গত তিন দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের বারান্দাই আমার ঠিকানা। আজ সকালেও দীর্ঘ তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে, সমস্ত ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে কোনোমতে মহাপরিচালকের (ডিজি) রুমের সামনে পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি। তবে, এখন শুধুই অপেক্ষার প্রহর গুনছি।’
মোশাররফের চোখে-মুখে এখন শুধু ক্লান্তি আর একরাশ হতাশা। ধরা গলায় তিনি আরও বললেন, ‘আজ যদি কাজটি না হয়, তবে ঈদের ছুটির পর আমাকে আবারও নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় আসতে হবে। কিন্তু বারবার এই দূরপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে থাকার মতো কিংবা যাতায়াত করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমার নেই। এনআইডি নামক একটি প্লাস্টিকের কার্ডের সামান্য ভুলের কারণে একজন যুবকের জীবিকা আর ভবিষ্যৎ এভাবে থমকে যাবে, এমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান কবে হবে?’
ফরিদপুর অঞ্চল থেকে আসা রাকিবুল হাসান নামের এক প্রবাসী সেবাগ্রহীতার চরম ভোগান্তি ও অসহায়ত্বের চিত্র কর্তৃপক্ষের এই অমানবিক সিদ্ধান্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি জানান, প্রবাস থেকে স্বল্প মেয়াদের ছুটিতে দেশে এসেছেন এবং আগামী ঈদের পরপরই কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু প্রবাসে ফেরার প্রধান শর্ত পাসপোর্ট নবায়ন করা, যা এনআইডির সঙ্গে তথ্যের অমিল থাকার কারণে সম্পূর্ণ আটকে গেছে। পাসপোর্ট অফিস থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর পর তিনি অনলাইনে এনআইডি সংশোধনের দ্রুত আবেদন করে ইসি ভবনে ছুটে আসেন। তবে, এখানে এসেও ভবনের ভেতরে ঢোকার জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভেতরে প্রবেশ করতে পারলেও সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা ডেস্ক থেকে ন্যূনতম কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। উল্টো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কাগজপত্র জমা দিয়ে আরও এক মাস পর খোঁজ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যেখানে আগামী এক মাসের মধ্যেই প্রবাসে ফিরে যাওয়া বাধ্যতামূলক, সেখানে এনআইডি অনুবিভাগের এমন ধীরগতি ও উদাসীনতা আমার পুরো কর্মজীবনকে এখন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিদেশ যাত্রাই যে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তা নয়, বরং কর্মসংস্থান হারানোসহ অপূরণীয় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
‘জনবিরোধী’ সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ
নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের নতুন কঠোর নির্দেশনার জেরে সেখানে চরম উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে নির্বাচন কমিশন ভবনের অভ্যর্থনা কক্ষের সামনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। উপস্থিত সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে কেউ এসেছিলেন নিজের সংশোধন আবেদনের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে, কেউ প্রবাসী হওয়ায় পাসপোর্ট নবায়নের জন্য জরুরি প্রয়োজনে এনআইডি সংশোধনের তাগিদ নিয়ে এসেছিলেন, আবার কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় এনআইডি জটিলতায় বেতন আটকে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়ে এখানে ছুটে আসেন।
এমন এক জনাকীর্ণ ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে এদিন সকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক অভ্যর্থনা কক্ষে এসে সাধারণ জনগণের ভেতরে প্রবেশে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দেন— যেন কোনো আবেদনকারীকে ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে সবার কাগজপত্র বাইরে থেকেই জমা রেখে ওপরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করলে ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা ভবনের সামনে অনড় অবস্থান নেন এবং ভেতরে ঢোকার দাবিতে হট্টগোল শুরু করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং জনগণের তীব্র প্রতিবাদের মুখে একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং পর্যায়ক্রমে সবাইকে এনআইডির ফ্লোরে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

তবে, ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পেলেও শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী নাগরিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। নতুন কর্তৃপক্ষের জারি করা কঠোর ও জটিল নির্দেশনার বেড়াজালে আটকে পড়ে এনআইডির ফ্লোরে গিয়েও কোনো সাধারণ মানুষের কাজ সম্পন্ন হয়নি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং হট্টগোলের পর শত শত মানুষকে চরম হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে ইসি ভবন থেকে ফিরে যেতে হয়েছে।
এনআইডি সংশোধন নিয়ে কমিশনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পেয়েছে। ইসি সচিব যেখানে আবেদন নিষ্পত্তি আরও ধীরগতির করার পক্ষে এবং নাগরিকদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন, সেখানে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বয়স সংশোধনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকার কথা জানিয়ে ঝুলে থাকা আবেদনগুলো দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়েছেন
ফাইলবন্দি হাজারও আবেদন, ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা
এনআইডি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, দাপ্তরিক জটিলতা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনমনীয় ও পরস্পরবিরোধী নির্দেশনার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন কার্যক্রমে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব এবং এনআইডি অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাস্তবতাবিবর্জিত মৌখিক নির্দেশনার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। প্রতিদিন কোনো লিখিত আদেশ ছাড়াই নতুন নতুন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ফলে সেবা প্রদান ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বিশেষ করে এনআইডি মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে পরিচালক (অপারেশন্স)-এর মাধ্যমে আসা দুটি নতুন সিদ্ধান্তের কারণে গত সপ্তাহের বুধ ও বৃহস্পতিবার এবং চলতি সপ্তাহের পাঁচ দিনসহ মোট সাত দিনে জমা হওয়া সমস্ত বাল্কনোটের ফাইল ফেরত পাঠানো হয়েছে। একেকটি বাল্কনোটের ফাইলে ৩০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত সংশোধন আবেদন থাকে, যা এখন পুরোপুরি ফাইলবন্দি ও অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন নিষ্পত্তির খোঁজ নিতে আসা ভুক্তভোগী এবং নতুন আবেদনকারীদের কোনো যৌক্তিক জবাব দেওয়া যাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের পক্ষে ক্ষুব্ধ জনতাকে সামাল দেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে পরিচালক (অপারেশন্স) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডেকে ডিজির নতুন কিছু অবাস্তব নির্দেশনা জানান। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিগত সাত দিনে প্রস্তুত হওয়া ফাইলগুলো বাতিল করে চারটি আলাদা ক্যাটাগরিতে ভাগ করে চার রঙের ফাইলে নতুন করে উপস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ৪ বছরের বেশি বয়সের কোনো সংশোধন তিনি করবেন না এবং ভুলবশত উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা কমিয়ে প্রকৃত যোগ্যতা চাওয়ার আবেদনকে ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান, বর্তমান ডিজি শুরুতে নাগরিক সেবার বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আন্তরিক থাকলেও ইসি সচিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর থেকেই তিনি কঠোর ও জনবিরোধী অবস্থান নিতে শুরু করেন। মূলত নির্বাচন কমিশন সচিব এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিরক্ত এবং তার ব্যক্তিগত মত হলো— এনআইডিতে বয়স সংশোধন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ ভুল সাধারণ মানুষের নিজস্ব কারণে হয়েছে। এমনকি মাঠপর্যায়ে উপজেলা বা জেলা নির্বাচন অফিসাররা সরেজমিনে তদন্ত করে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিলেও সচিব একক ক্ষমতাবলে তা নাকচ করে দিচ্ছেন। সচিবের এই চরম নেতিবাচক মনোভাবের কারণেই মহাপরিচালক তার পূর্বের অবস্থান থেকে পিছু হটেছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে এনআইডি মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা পোস্ট। তিনি বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি এবং এনআইডির কার্যক্রম বোঝার চেষ্টা করছি। আপনি সচিব স্যারের সঙ্গে কথা বলেন।’
আবেদন নিষ্পত্তি আরও স্লো হবে : ইসি সচিব
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনে নাগরিকদের চরম ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রবাসীদের পাসপোর্ট জটিলতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়রা সচিব আখতার আহমেদ চরম আমলাতান্ত্রিক ও নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান না দিয়ে উল্টো নাগরিকদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এনআইডি সংশোধনের কাজ ভবিষ্যতে আরও ধীরগতিতে (স্লো) চলবে।
এনআইডি সংশোধন প্রক্রিয়ায় চরম ধীরগতি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ কোনো ইতিবাচক আশ্বাস দিতে পারেননি। উল্টো সেবার গতি আরও কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘নিষ্পত্তি আরও স্লো (ধীরগতি) হবে। কারণ, আমি পরীক্ষা না করে দেব কী করে? কারও তাগিদের কারণে তো আমার নিষ্পত্তি নির্ভর করছে না।’
জরুরি চাকরির ইন্টারভিউ কিংবা পাসপোর্টের কারণে সংকটে পড়া নাগরিকদের দুর্ভোগকে উপেক্ষা করে সচিব বলেন, ‘কারও জরুরি বা আগামীকালই দরকার— এমন তাগিদ দিয়ে এনআইডি সংশোধন করা যাবে না।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘উনার প্রয়োজন আগামীকাল। এখন উনি আমাকে এসে বলেন যে, তার আগামীকালই দরকার। আজ তাকে এটা করে দিতে হবে। এটা কি স্বাধীনতার পর্যায়ে পড়ে?’
মাসের পর মাস আবেদন ঝুলিয়ে রাখার পরও তিনি নিয়মের অজুহাতে বলেন, ‘পরীক্ষা করতে গেলে সময় দিতেই হবে।’

অতীতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ত্রুটি বা প্রচারণার অভাবে এনআইডিতে ভুল আসার বিষয়টি সামনে আনলে সচিব তা পুরোপুরি নাকচ করে দেন। নাগরিকদের ঘাড়েই সব দোষ চাপিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯২০ সালই হোক আর ২০২০ সালই হোক, কিছু আসে যায় না।’ প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও এনআইডির তথ্যের অমিল এবং হয়রানির বিষয়ে কোনো বিশেষ ছাড় বা উদ্যোগের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কারও তো কোনো ঝামেলায় পড়ার কথা না। সবারই তো একটা এনআইডি আছে। যাদের যে এনআইডি আছে সেই অনুযায়ী চললেই তো হয়।’
এনআইডি আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হতে হবে : নির্বাচন কমিশনার
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত নাগরিকদের ভোগান্তি ও ঝুলে থাকা আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সুশৃঙ্খলভাবে এগুলোর সমাধান করা হবে।’
নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা পার হলে এনআইডি সংশোধন করা হবে না— এমন গুঞ্জন নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বয়স পরিবর্তনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে, আবেদনকারীকে অবশ্যই সঠিক ও উপযুক্ত প্রমাণ দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ থাকলে সেটির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও পারিবারিক নথিপত্র ও বয়সের সামঞ্জস্যতা যাচাই করে সঠিক প্রমাণসাপেক্ষে সংশোধন করা হবে।’

সেবা বিকেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে এই নির্বাচন কমিশনার আরও জানান, সাধারণ মানুষ যাতে নিজ এলাকাতেই নির্বিঘ্নে সেবা পায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা হবে। অতীতে কিছু কর্মকর্তার অনিয়মের কারণে কমিশনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনে চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর সিদ্ধান্তও আসবে।’
মৌখিক নির্দেশে ডিজি অফিস থেকে ফাইল ফেরত যাওয়া বা প্রক্রিয়াগত কড়াকড়ির বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘অফিশিয়াল সিস্টেমকে আরও সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করার কাজ চলছে, ফলে দ্রুতই নাগরিক ভোগান্তি কমে আসবে।’
এসআর/বিআরইউ/এমএআর/
