৬ নবজাতক শিশুর আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় মগবাজার আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়টি নতুন করে সামনে আসছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মতে, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ অর্থে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক হাসপাতাল নয়। অলাভজনক দাতব্য সংস্থা হিসেবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের অধীনে আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালিত হয় বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক ধারায় হাসপাতালটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। যার বদান্যতায় কর থেকে অব্যাহতির সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আকিজ গ্রুপের বিরুদ্ধে। বর্তমানে একই সুবিধা নিচ্ছে আকিজ-বশির গ্রুপও।
১৯৮০ সালে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দীন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের যৌথ উদ্যোগে আদ-দ্বীনের কার্যক্রমের শুরু হয়। বর্তমানে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দীন।

তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা ‘আকিজ বশির গ্রুপ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেখ বশির উদ্দিনের ভাই। অব্যবস্থাপনা, অবহেলার কারণে জরিমানাও গুনতে হয়েছে আদ-দ্বীন হাসপাতালকে।
অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করা হলেও গত ৪-৫ বছরে এখানে চিকিৎসার খরচ কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে সিজারিয়ান ডেলিভারি ৮-৯ হাজার টাকায় হতো, এখন তা ৩৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বেসরকারি অন্যান্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতোই লাভকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেছেন অনেক রোগীর স্বজনরা।
এরপরেও এক সঙ্গে ৬ নবজাতক শিশুর মৃত্যু ও আরও ৫ নবজাতককে এনআইসিইউ-তে নেওয়ার ঘটনা অবহেলার চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন ভুক্তভোগী স্বজনরা।
খোঁজ নিয়ে মগবাজার আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সম্পর্কে জানা যায়, দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে কম খরচে চিকিৎসা নিতে আসেন নিম্নবিত্তরা। কিন্তু গত ৪ বা ৫ বছরে তাদের খরচ শুধু বাড়িয়েই গেছে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

উদাহরণ টেনে এক রোগীর স্বজন মেহেদি বলেন, ৪/৫ বছর আগেও এখানে সিজারিয়ান ডেলিভারি ছিল ৮/৯ হাজার টাকার মধ্যে। এখন সেটা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কখনো কখনো এখানে সিরিয়াল দিয়ে হাসপাতালে রেখে দেয়। সময় নিয়ে, বিল বাড়িয়ে তারপর জানানো হয়, নরমাল সম্ভব না, সিজার করতে হবে। এরপর যথারীতি ঔষধ, অপারেশন, সবমিলিয়ে বিলটা বেড়ে ৩৫ হাজার হয়ে যায়।
আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া ছয় শিশুর মধ্যে এক শিশুর চাচা বলেন, আমরা জানতাম আদ-দ্বীন অনেক বড় একটা মানবিক হসপাতাল। সেজন্য আমরা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছি। আমরা আজ রিলিজ নিয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। এখন সেবা নিতে এসে সেবার বদলে আমরা লাশ নিয়ে যাচ্ছি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বাচ্চাকে আইসিইউতে নেওয়া হলে ডাক্তাররা তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি না দিয়ে অবজারভেশনে রাখেন। কিছু সময় অবজারভেশন করে নিয়ে যাওয়ার পরে ওনারা ওষুধ লেখে। তখন কিন্তু বাচ্চা মারা গেছে। ওনারা আর বলে নাই। আমার ভাই বললো ভাই আপনি ওষুধটা নিয়ে আসেন। আবার বলেছে আপনি বি কাউন্টারে গিয়ে টাকাটা জমা দিয়ে আসেন। আমার ভাই ছোট, বোঝে নাই। পরে ও কয় ভাই আমি ওষুধটা নিই, তুমি কাউন্টারে টাকা দাও। আমি ওষুধ নিয়ে পাঁচতলায় এলে আমারে একটা ফাইল দিয়ে বলে এটা সই করেন। সব সাইন দিলাম, দেওয়ার পরে ওনারা আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। ভেতরে নিয়ে কয়েকজন ডাক্তার আমাকে বললো ওর তো হার্টবিট অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করতেছি, খুঁজে পাচ্ছি না। ওনারা বলছে না যে, মারা গেছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহেদ রায়হান জানিয়েছেন, ১-২ ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে ৬টি শিশু মারা গেল তা খতিয়ে দেখতে সিআইডি-এর টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা ওই রুমটি বন্ধ করে এসি ও ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্ট নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন।
আরেক শিশুর মামা বলেন, ভাবিনি এতো এতোটা অবহেলা, গাফিলতিতে চিকিৎসা সেবা হয় এখানে। অল্প খরচা, ভালো চিকিৎসা পাবো ভেবেই এখানে আসছিলাম। কাল ঈদ। আজ রাতেই বাড়ি ফেরার কথা আমাদের। কীভাবে যাবো এখন?
তিনি বলেন, এই হাসপাতালে না আসলে জানতামই না অবহেলার সর্বোচ্চটা। এখানকার ডাক্তার এবং নার্সরা কেউ কোনো পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন না! পুরুষের সঙ্গে কথা তো বলেই না হাসপাতালের ওয়ার্ডে বাপরেও ঢুকতে দেয় না। বাচ্চাদের দেখতে দেয় না বাবাকেও। এটা কোনো সিস্টেম হতে পারে না।
আজকে যদি রোগীর স্বজন, পরিবারকে দেখার সুযোগ থাকতো হয়তো এতো বড় ঘটনা না ঘটতেও পারতো।

অভিযোগ রয়েছে, কম বিনিয়োগে কীভাবে বেশি মুনাফা করা যায়, সেই প্রবণতা থেকেই হাসপাতালটি এখন পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা অবকাঠামোগত নির্দেশনা উপেক্ষা করা হয়। কম জায়গায় বেশি রোগী, কম নার্স-চিকিৎসকে লাভেই লাভ। এরমধ্যে দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি বেসরকারি অর্থ সহায়তা তো আছেই।
গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এনআইসিইউ রাখা এক নবজাতকের বাবা বলেন, আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এটা। দাতব্য বলে প্রচার হয়। বলে কম খরচা। ভাবছিলাম ১০ হাজারে হয়ে যাবে। ৩০ হাজার খরচা ছাড়িয়ে গেছে। এখন বাচ্চার জীবনও সংকটাপন্ন। অথচ শুরু থেকেই মিথ্যাচার করা হয়েছে। সবকিছু গোপন করা হয়েছে। জানাজানির পর আকিজ গ্রুপের নামে, সাবেক উপদেষ্টা বশিরের নামে প্রভাব খাটানোর নোংরামিটাও দেখলাম।
৬ নবজাতকের মৃত্যুতে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা ছিল বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
বুধবার (২৮ মে) দুপুরে মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমরা রুমটি পরিদর্শন করে দেখেছি ওখানে কর্তব্যরত সেবিকা ছিলেন, সেবিকাদের একটি টিম ছিল।আমরা জানতে পেরেছি যে ওই রুমে যখন কোনো বাচ্চা অসুস্থ হয়, ওনারা হাসপাতালের যে প্রচলিত সিস্টেম, বাচ্চাদেরকে পাঁচতলায় এনআইসিইউতে চিকিৎসার জন্য পাঠান। এই জায়গাটিতে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে, একটি দুর্বলতা আছে এবং কর্তৃপক্ষ এটি আমাদেরকে জানিয়েছে। সেবার দিক থেকে কোনো ত্রুটি আছে, অবশ্যই খতিয়ে দেখবো, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।
প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমরা জানতে পেরেছি প্রথম রাত ২টার সময় বাচ্চার কোনো একজন অভিভাবক বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে বলে এসি অফ করতে বলা হয়। এসিটা এক ঘণ্টা অফ ছিল, তা হলে সময় হলো ৩টা। রাত ৪টার সময় প্রথম বাচ্চাটা অসুস্থ হয়। একটা বাচ্চা কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়। তখন নার্স ওই বাচ্চাটাকে এনআইসিইউতে নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা পর বাচ্চাটা আবার ইমপ্রুভ করে। করার পর তাকে আবার এই ভিক্টিম এরিয়াতে নিয়ে আসে। এখানে আনার পর তখন হয়তো ধরেন সাড়ে ৬টা বা পৌনে ৭টার সময় নার্স খেয়াল করেন একজন বাচ্চা মারা গেছে। তাকে সঙ্গে সঙ্গে এনআইসিইউতে নেয়। সাবসিয়েন্টলি বাচ্চাগুলো খারাপ হতে থাকে। পরে সব বাচ্চাকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয় এবং দুঃখজনকভাবে তাদের মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহেদ রায়হান বলেন, এটা খুব সাধারণ একটা কমনসেন্স কাজ করবে যে, এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার মধ্যে ৬টা বাচ্চা হঠাৎ করে কেন মারা গেল? সুতরাং এটা তদন্ত করতে হবে। ইতোমধ্যে সিআইডির টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা এসি এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্টস এর ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট তারা ওই রুমটা বন্ধ করে তদন্ত কাজ শুরু করেছেন। এই তদন্ত রিপোর্টটা আমাদের কাছে ডেফিনেটলি আসবে। সেই অনুযায়ী আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারব।

তিনি আরও বলেন, বাচ্চাদের মৃত্যুর কারণগুলো খতিয়ে দেখার জন্য যে সময়টা, সে সময়টা কিন্তু আমরা এখনো পাইনি। আমরা কিন্তু এটা নিয়ে অলরেডি কাজ করছি। আমরা অ্যাকটিভ তদন্তে আছি। তদন্ত শেষ হলে তখন আমরা আপনাদেরকে জানাতে পারবো যে বাচ্চার মৃত্যুর সত্যিকারের কারণগুলো কী।
জেইউ/বিআরইউ
