বিজ্ঞাপন

পাখির চোখে সীমান্ত পাহারার ছক, কঠোর নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার

পাখির চোখে সীমান্ত পাহারার ছক, কঠোর নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আগের নীতি পেছনে ফেলে এবার সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-তে ১ হাজার ৫৮৮ জন নতুন জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিজিবির আভিযানিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে প্রায় ১২টি মিডিয়াম-রেঞ্জ ড্রোন এবং ৫৮টি শর্ট-রেঞ্জ (টিআই) ড্রোন সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবিতে ৩০টিরও বেশি হ্যান্ডহেল্ড অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

সমর কৌশলবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই আধুনিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সীমান্তে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও শক্তি বৃদ্ধি করবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে সরকারের এই কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।

দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে বিজিবিতে ১,৫৮৮ জন নতুন জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে আকাশপথে কঠোর নজরদারির জন্য ১২টি মিডিয়াম-রেঞ্জ ড্রোন, ৫৮টি শর্ট-রেঞ্জ ড্রোন এবং ৩০টির বেশি হ্যান্ডহেল্ড অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম যুক্ত করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান সম্পূর্ণ বন্ধ করাই সরকারের মূল লক্ষ্য

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, দ্রুত বাজেট প্রাপ্তিসাপেক্ষে এসব মিডিয়াম-রেঞ্জ ড্রোন, শর্ট-রেঞ্জ (টিআই) ড্রোন এবং হ্যান্ডহেল্ড অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম শতভাগ ক্রয় ও সংগ্রহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, চলতি বছরে সীমান্তে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় মাসিক ভিত্তিতে মাদক পাচার ১৫ শতাংশ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ২৫ শতাংশ হ্রাস এবং অবৈধ চোরাচালান পণ্য আটকের হার ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

dhakapost

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ, সীমান্তকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং বিজিবির আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে বিশেষ প্রযুক্তি

এদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান দমনে ১৫০টি নাইট ভিশন ক্যামেরা ও থার্মাল ডিভাইস সংযোজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি বছরে মিয়ানমার রুট দিয়ে আসা মাদকের মোট চালান ৮০ শতাংশ হ্রাস করতে চায় সরকার। 

ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে ৫৫০টি নাইট ভিশন ক্যামেরা, থার্মাল ডিভাইস এবং ডগ স্কোয়াড যুক্ত করা হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য মিয়ানমার রুটের মাদক চালান ৮০% হ্রাস করা। এছাড়া, সীমান্ত অপরাধের স্থায়ী সমাধানে ১,০০০ পরিবারকে মৎস্য ও পোলট্রি খামার এবং ১৫০ জন তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

অন্যদিকে, ভারত সীমান্তে ৪০০টি আধুনিক নাইট ভিশন ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবি’র বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) ও চেকপোস্টগুলোতে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদক সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্তকরণের জন্য ৩০২ জন বিশেষ জনবল এবং ১২৫টি প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড (কুকুর) সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

dhakapost

সীমান্ত এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জোর

কেবল সামরিক নজরদারিই নয়, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নেও বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। জানা গেছে, সীমান্ত এলাকার ১ হাজার পরিবারের জন্য পোলট্রি ও মৎস্য খামার স্থাপনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া বন্ধ থাকা বর্ডার হাটগুলো পুনরায় চালু এবং সীমান্ত নজরদারি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ওই ১ হাজার পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে উপার্জনক্ষম করা এবং ১৫০ জন স্থানীয় তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

dhakapost

যা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল একটি সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপাদান। আধুনিক ড্রোন, থার্মাল ডিভাইস ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে একটি সর্বাধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় নিয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু নজরদারিই বাড়বে না, সীমান্তে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সরকার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, ‘সীমান্ত অপরাধ দমনে শুধু শক্তিশালী নজরদারি বা অস্ত্র যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নও সমান জরুরি। সরকার যে সীমান্ত এলাকার পরিবারগুলোকে কর্মসংস্থান, পোলট্রি ও মৎস্য খামার এবং তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের আওতার আনার উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে অপরাধপ্রবণতা কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়ন— এই দুইয়ের টেকসই সমন্বয়ই একটি শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি।’

dhakapost

র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘মাদকপাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। সীমান্তে ড্রোন, নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম সংযোজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বিশেষ করে দুর্গম, পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অপরাধী চক্রের গতিবিধি আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষায় কার্যকর অবদান রাখবে।’

এমএম/এমএআর