সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগের ধারাবাহিকতায় এবার দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদেও বিএনপি নেতাদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার। দলীয় নেতাদের এই ঢালাও নিয়োগের প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন তুলছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এসব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও কাজের মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মতো অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি দায়িত্ব পালন করে। এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়কে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে পেশাগত দক্ষতার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
আট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাতটিতেই বিএনপি নেতা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক গ্রেড-২ মর্যাদার এই পদগুলোতে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে সাতজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
দেশের আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাতটিতেই সরাসরি বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদের পর এই গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এমন ঢালাও রাজনৈতিক নিয়োগের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো অত্যন্ত জটিল আভিযানিক কাজগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হয়েছেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান করা হয়েছে রাজশাহী মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদকে।
ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হয়েছেন মোতাহার হোসেন তালুকদার, যিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন।

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হয়েছেন রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মো. সামসুজ্জামান সামু। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব। অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের স্কুলজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই দেশের সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতেও একইভাবে বিএনপি নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।
কেন প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা?
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে সাধারণত সরকারের ‘বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ হলো মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ভবন নির্মাণ অনুমোদন, আবাসন উন্নয়ন এবং নগর সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা নির্ধারণ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা নয় এবং এখানে আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চেয়ে পেশাগত জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্ব থাকা আবশ্যক। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে যোগ্যতার অবমূল্যায়ন করে পুরোনো ফ্যাসিবাদের মডেলের পুনরাবৃত্তি এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় টেকসই নগর উন্নয়ন ও জনস্বার্থ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের কাজ অত্যন্ত জটিল এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে শুধু সাধারণ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দক্ষতা নয়; বরং নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং আইন সম্পর্কে গভীর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান থাকা জরুরি। কারণ, একটি শহরের ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়ন এসব সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি এমন কারও হাতে যায় যিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, তবে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে শহরের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
এছাড়া, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এসব পদে বসলে কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় প্রভাব ও পরিচিতদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চেয়েও পরিস্থিতিকে বেশি ভঙ্গুর করে তোলে।

‘এটি রাজনৈতিক পদ নয়, বিশেষায়িত পদ’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্বের জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অপরিহার্য।
তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো একটি বিশেষায়িত জায়গা। এখানে যারা দায়িত্বে থাকবেন, তাদের পরিকল্পনা, প্রকৌশল ও স্থাপত্যের মতো বিষয়গুলো ধারণ করতে হয়। বিশ্বজুড়েই এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত পেশাজীবীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।’
‘বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। এখন সংস্কারের প্রত্যাশার সময়েও যদি একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা কঠিন।’
ড. আদিল মুহাম্মদ খানের ভাষ্য, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যে পরিবর্তিত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা করছি, তার সঙ্গে সবকিছুর মধ্যে দলীয় লোক নিয়ে আসার এই সংস্কৃতি মেলে না। এই সরকারের নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি ছিল যে— তারা ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করবে। জাতীয় সরকার মানেই হলো দলীয় লোক না এনে সবাইকে নিয়ে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করা। এখন সবাইকে যদি একইভাবে দলীয়করণ করা হয়, তবে তা সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদের মডেলেরই পুনরাবৃত্তি।’

‘এই পুরোনো মডেলের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ বার্তা দিয়েছে। এখন যদি ওপর মহল থেকে দেয়ালের এই লিখন ও মানুষের আওয়াজ না শোনা হয়, তবে তা দলের জন্য এবং রাষ্ট্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। এ ধরনের কারিগরি জ্ঞানহীন লোক যখন দায়িত্বে আসে, তখন তারা অধিকাংশ বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত নিতে থাকে এবং পরিকল্পনাগুলোও দলীয়ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়। সরকারের উচিত ছিল, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোতে অন্তত পেশাদার ও যোগ্য জনবল নিয়োগ দেওয়া; তারা দলীয় না হলেই সবচেয়ে ভালো হতো।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জায়গা না যে কাউকে নিয়ে এসে কাজ শেখানো হবে। তারা চেয়ারে বসে কাজ শিখতে শিখতেই বছর পার করে দেবেন, যার ফলে বড় বড় সিদ্ধান্তে ভুল হবে। রাজনৈতিক লোক হলে পরিস্থিতি আমলাদের চেয়েও জটিল হয়, কারণ ওপর থেকে ভুল সিদ্ধান্ত বা টপ-ডাউন পলিসি আসলে নিচের পেশাদার কর্মকর্তারাও আর স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।’
এসএইচআর/এমএআর/
