রেলপথে কক্সবাজার যেতে চাইলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ট্রেনের টিকিট পাওয়া। টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় অধিকাংশ আসন। যাত্রার ১০ দিন আগেই অনলাইনে দেখা যায় ‘জিরো সিট’।
রেলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন রুট ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকায় বর্তমানে চলছে মাত্র দুটি ট্রেন। বছরের প্রায় প্রতিদিনই এই রুটে শতভাগ যাত্রী থাকলেও বাড়ানো হচ্ছে না ট্রেনের সংখ্যা।
ফলে প্রতিদিন হাজারও যাত্রী টিকিট না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন বিকল্প পথ বেছে নিতে। টিকিট না পেয়ে কেউ যাচ্ছেন বাসে, সামর্থবানরা বেছে নিচ্ছেন আকাশপথ। প্রশ্ন উঠছে, ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের অন্যতম বড় রেল প্রকল্পে যখন যাত্রীর চাহিদা তুঙ্গে, তখন সেই চাহিদা পূরণে নতুন ট্রেন চালু করতে পারছে না কেন বাংলাদেশ রেলওয়ে? যাত্রী ফিরিয়ে দিয়ে আর কতদিন সম্ভাব্য আয় ও সেবার সুযোগ হারাবে রাষ্ট্র?
রেলপথ তৈরির পর পাহাড়-সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে প্রথম ট্রেন ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ যাত্রা শুরু করে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। ওইদিন ১ হাজার ১০ জন যাত্রী ট্রেনে প্রথমবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার যান। এরপর থেকে আর কখনও ওই ট্রেনের কোনো আসন ফাঁকা যায়নি। যাত্রীদের এমন চাহিদার কথা বিবেচনা করে মাত্র ৪০ দিন পরই ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ নামে আরও একটি নতুন ট্রেন দেওয়া হয় ওই রুটে। তাতেও যাত্রী চাহিদা বিন্দুমাত্র কমেনি। বর্তমান ঢাকা থেকে দুটি আর শুধুমাত্র চট্টগ্রাম থেকে দুটি ট্রেন কক্সবাজার রুটে চলাচল করছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে, গত এপ্রিল মাসে শুধুমাত্র কক্সবাজার এক্সপ্রেস (৮১৩ ও ৮১৪) আয় করেছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আর মে মাসে আয় করেছে ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছাড়ে রাত ১১টায়। আর কক্সবাজার থেকে ছাড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায়।

অন্যদিকে গত এপ্রিল মাসে পর্যটক এক্সপ্রেস (৮১৫ ও ৮১৬) আয় করেছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর মে মাসে আয় করেছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছাড়ে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে। আর কক্সবাজার থেকে ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে।
সূত্রটি আরও জানায়, এই দুটি ট্রেনে টিকিটের চাহিদা এমন যে, গড়ে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩৬০ (৯৮.৬৩ শতাংশ) দিনই ১০০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ে ট্রেন দুটি। এই রুটটি বাংলাদেশ রেলওয়ের সবচেয়ে লাভজনক রুট।
যাত্রী চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রায় প্রতিদিনই কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬টি অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হয়। আর পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে ২ থেকে ৩টি কোচ অতিরিক্ত সংযোজন করা হয়। এসব অতিরিক্ত এসি কোচে ৩০ শতাংশ ও নন-এসি কোচে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই যাত্রীরা যাতায়াত করে থাকেন।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল আরও একটি সূত্র ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছে, লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে নতুন কোনো ট্রেন দিতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। ফলে নতুন একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই মোতাবেক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রাত ৯টা ২০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের রুট বর্ধিত করে কক্সবাজার পর্যন্ত নেওয়া হতে পারে। বিষয়টি চলমান আছে।
গত এপ্রিল মাসে ৪ সদস্যের পরিবার নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঘুরে এসেছেন আশরাফুল ইসলাম অনিক। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ১০ দিন আগেই সকালে বসেছিলাম ট্রেনের টিকিট কাটতে। কিন্তু টিকিট ছাড়ার ২ মিনিটের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। আমি চেষ্টা করেও টিকিট ধরতে পারিনি। পরিবার নিয়ে বাসের চেয়ে ট্রেন ভ্রমণ অনেকটা নিরাপদ। তাই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ৪টি টিকিট সংগ্রহ করলাম ১৫০০ টাকা বেশি দিয়ে। কিন্তু আসার পথে কোনোভাবেই আর টিকিট পেলাম না। পরে বাধ্য হয়ে বাসে আসতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরের জ্যাম ঠেলে বাসে ঢাকায় ফিরতে সময় লেগেছে ১২ ঘন্টা। এটা একটা ভোগান্তি। যদি ট্রেনে সিট পেতাম, তাহলে নিশ্চয়ই ট্রেনেই ফিরতাম। কিন্তু ট্রেনই তো মাত্র দুইটা, সিট পাবো আর কোথায়? রেলের উচিৎ কক্সবাজার রুটে আরও তিন-চারটা ট্রেন দেওয়া। কারণ, ট্রেন চালু হওয়ার পর থেকে কক্সবাজার পর্যটক নিয়মিত হয়েছে। আমিই আমার বন্ধুদের এখন বছরের বিভিন্ন সময় দেখি কক্সবাজারে যেতে।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের এখানে ট্রেন আসার পর থেকে সারা বছরই পর্যটক আসছে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হলে পর্যটক আরও আসবে। কারণ, ট্রেনে সবাই আরাম করে আসতে পারে। অনেকে আবার বাসেও চড়তে পারেন না। কিন্তু ঠিকই ট্রেন চড়তে পারেন।
হাজার কোটি টাকার রেলপথে শতভাগ চাহিদা থাকা সত্বেও কেন আরও ট্রেন চালানো যাচ্ছে না— এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই রুটে আমাদের নতুন ট্রেন দেওয়ার পরিকল্পনা আছে ঠিকই। আমাদের কোচ-ইঞ্জিন থাকলে আমরা আরও আগেই ট্রেন দিতাম। এখন যেসব ট্রেন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলে, এর মধ্যে কোনো একটা ট্রেন কক্সবাজার পর্যন্ত এক্সট্রেনশন করা যায় কি না সেটা আমরা চিন্তাভাবনা করছি।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেসব জায়গায় যাত্রী চাহিদা বেশি আছে, সেগুলোতে নতুন করে আরও ট্রেন চালু করার ইচ্ছা আছে। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আমাদের লোকোমিটিভ ও ক্যারেজের স্বল্পতা আছে। সেই জায়গায় যখন আমরা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারবো এবং যখন আরও বেশি রকম ক্যারেজ আসবে তখনই আমরা এই লাইনগুলোতে আরও বেশি নতুন ট্রেন দিতে পারবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিটি কাজই শুরু করেছি এবং আমাদের পাইপলাইনেও আছে। আমরা আশাবাদী আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে একটা দৃশ্যমান সমাধানের মধ্যে আসতে পারব। আমরা সেভাবেই আগাচ্ছি।
আরও পড়ুন
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শুধু সংকটের কথা বললে হবে না, কেন এই সংকট তৈরি হয়েছে সেটিও দেখতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন রেললাইন নির্মাণ ও রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হলেও সেই অনুপাতে কোচ, ইঞ্জিন ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার ৬৪ জেলায় রেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি নিজস্ব কোচ ও লোকোমোটিভ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, পাহাড়তলী ও কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর হলে ভবিষ্যতেও একই সংকট চলমান থাকবে।
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, কক্সবাজার রুটে যাত্রী চাহিদা ও আয়— দুইই রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন চালানো গেলে রেলের আয় আরও বাড়বে। কিন্তু লোকোমোটিভ ও কোচ সংকটের কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত অবকাঠামোর পূর্ণ সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না।
ভবিষ্যতে কোনো রেল প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের সময় শুধু রেললাইন নির্মাণ নয়, একই সঙ্গে কতটি ট্রেন চলবে, কতগুলো কোচ ও লোকোমোটিভ প্রয়োজন হবে এবং স্টেশন পরিচালনার জন্য কত জনবল লাগবে— সেসব বিষয়ও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। অতীতে দেখা গেছে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু ট্রেন চালানোর সক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও প্রত্যাশিত সেবা ও আর্থিক রিটার্ন পাওয়া যায়নি। রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো পরিকল্পা ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রনগরী কক্সবাজারকে দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অবশ্য প্রকল্পে থাকলেও রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজ এখনও শুরুই হয়নি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রকল্পে রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণের কথা বলা হলেও ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় অংশ বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজ বাদ দেয়।
প্রকল্পটির মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ২০১০ সালের ৬ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করে। পরবর্তীতে হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশার ভিত্তিতে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়।

প্রকল্প সংশোধনের ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল একনেক প্রথম সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন করে, যেখানে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। পরে ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ৬ হাজার ৬৯৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা কমিয়ে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার অনুমোদন পায়। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ৬৯৬ কোটি ৪০ লাখ এবং প্রকল্প সহায়তা ৮ হাজার ৬৩৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) নেটওয়ার্কের অনুপস্থিত সংযোগ স্থাপনে অগ্রগতি অর্জন এবং দোহাজারী থেকে রেললাইন সম্প্রসারণ করে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সহজ, দ্রুত ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত মোট ১৩৯ দশমিক ৪৭৬ কিলোমিটার সিগন্যালিংসহ নতুন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ, যার মধ্যে মূল লাইন ১০৩ দশমিক ৫৭৭ কিলোমিটার এবং লুপ ও সাইডিং ৩৫ দশমিক ৮৯৯ কিলোমিটার। পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে ৩৮টি মেজর ব্রিজ, ২৫৬টি মাইনর ব্রিজ, কালভার্ট ও আন্ডারপাস। বন্য হাতির চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে বিশেষ আন্ডারপাস ও ওভারপাস। এছাড়া দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার— এই ৯টি নতুন রেলস্টেশন নির্মাণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ, অধিগ্রহণকৃত জমিতে বসবাসরত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং বনায়ন কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এমএইচএন/এনএফ
