পররাষ্ট্রসচিব পদে পরিবর্তন আনছে সরকার। বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে সরিয়ে নতুন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের এক স্থায়ী প্রতিনিধির কথা ভাবা হচ্ছে! প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর শেষে দেশের ফেরার পর নতুন পররাষ্ট্রসচিব নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
পররাষ্ট্রসচিব ছাড়াও নিউইয়র্ক, যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি মিশনে রাষ্ট্রদূত পদে পরিবর্তন আসছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং উপ-স্থায়ী প্রতিনিধিকে পরিবর্তন করা হচ্ছে। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এ রকম একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মীকে স্থায়ী প্রতিনিধি করা হতে পারে। আর উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রদূত পদমর্যাদায় রাজনৈতিক নিয়োগের পাশাপাশি এক পেশাদার কূটনীতিককে পদায়নের কথা শোনা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ‘দ্বিতীয় আঁতুড়ঘর’ হিসেবে পরিচিত লন্ডনে বর্তমান ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল মুহিতকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া, আর্জেন্টিনা, আয়াল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায় শিগগিরই নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠানো হচ্ছে, যাদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা প্রথমবার রাষ্ট্রদূত হয়েছেন।
মরিশাসে বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করছেন পেশাদার কূটনীতিক জকি আহাদ। ১৭তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের এ কর্মকর্তাকে পরবর্তী অ্যাসাইমেন্টে ডেনমার্কে পাঠাচ্ছে সরকার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো ঢাকা পোস্টেকে পররাষ্ট্র সচিবসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে রাষ্ট্রদূত পদে পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র জানায়, পররাষ্ট্রসচিব পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর শেষে দেশের ফেরার পর আসাদ আলম সিয়ামের উত্তরসূরি কে হবেন, তা চূড়ান্ত হবে এবং নতুন পররাষ্ট্রসচিবের জন্য সামারি বা সারসংক্ষেপ হবে।
নির্ভরযোগ্য একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীকে নতুন পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তারই স্থলাভিষিক্ত হয়ে রাজনৈতিক নিয়োগে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে পারেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান।
দেশের ২৮তম পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে ২০২৫ এর ২০ জুন দায়িত্ব নেন রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে আসা আসাদ আলম সিয়ামকে পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার পররাষ্ট্রসচিব পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও বর্তমান পররাষ্ট্রসচিবের পরবর্তী দায়িত্ব কী হতে পারে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটা নিশ্চিত যে, তাকে বিদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠাবে সরকার। এক্ষেত্রে ইউরোপের একটি দেশ হতে পারে তার গন্তব্য।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। অফিস আদেশ হলে আমরাও জানতে পারব, আপনারাও পারবেন। অনেক কথাই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু অফিস আদেশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।
সিঙ্গাপুর ও ইরান মিশনের রাষ্ট্রদূত পদগুলো এই মুহূর্তে খালি রয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পেশাদার কূটনীতিক ফেরদৌসী শাহরিয়ারকে সিঙ্গাপুরে হাইকমিশনার করা হয়। তিনি সেখানে কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সদর দপ্তর ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এই কূটনীতিক বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার এবং ওয়েলফেয়ার অনুবিভাগের প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন।
পরবর্তী সময়ে ১৩তম বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের এক কর্মকর্তার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়োগ প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরও পড়ুন
এদিকে, নেদারল্যান্ডস, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনার ফাইয়াজ মুরশিদ কাজী, আন্দালিব ইলিয়াস ও ডি এম সালাউদ্দিন শিগগিরই নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার কথা। এদের মধ্যে সালাহউদ্দিন মাহমুদ প্রথমবার রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। বাকি দুজন ব্যাংকক ও কলম্বোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন।

নাজমুলকে ফেরাতে ব্যর্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৮ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগ থেকে চারটি পৃথক আদেশে পর্তুগাল, পোল্যান্ড, মেক্সিকো ও মালদ্বীপে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যথাক্রমে এম মাহফুজুল হক, মো. ময়নুল ইসলাম, এম মুশফিকুল ফজল (আনসারী) ও মো. নাজমুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই চার রাষ্ট্রদূতের মধ্যে তিনজন সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে দেশে ফিরলেও মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম দেশে ফেরেননি। সরকারের সিদ্ধান্তের সাড়ে তিন মাস পার হলেও এখনো কর্মস্থল ত্যাগ করেননি তিনি। এটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনআই/এসএম
