বিজ্ঞাপন

বাড়ছে কোকেনের ব্যবহার, নতুন আতঙ্ক সিন্থেটিক ড্রাগ

বাড়ছে কোকেনের ব্যবহার, নতুন আতঙ্ক সিন্থেটিক ড্রাগ

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেথামফেটামিন বা ইয়াবা। তবে উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথের ব্যবহার। প্রচলিত এসব মাদকের বাইরে এখন নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে এলএসডি, ডিএমটি, কুশ এবং বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক বা ডিজাইনার ড্রাগ।

আন্তর্জাতিক নারকোটিকস কন্ট্রোল বোর্ড (আইএনসিবি) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ এখন আর শুধু পাচারের ট্রানজিট রুট নয়; বরং আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর কাছে এটি একটি ক্রমবর্ধমান বাজার।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশে মাদকের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক উভয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কোকেনের বিস্তার বৃদ্ধির কথা। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি অপ্রচলিত বিভিন্ন মাদকের প্রবেশ ও ভোক্তা তৈরি হচ্ছে। ২০১৮-২০২৫ সাল পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১৩টি অপ্রচলিত মাদক। এগুলো হলো- খাত, আইস, এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টটাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হিরোইন, ব্ল্যাক কোকেন ও এমডিএমবি।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ডিএনসি’র প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ | ছবি– সংগৃহীত

সিন্থেটিক ড্রাগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট ২০২৫-এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

দুটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বৈশ্বিক মাদকবাজারের পরিবর্তনের ঢেউ বাংলাদেশেও লেগেছে। নতুন প্রজন্মের মাদক বিস্তারে বাংলাদেশকে এখন শুধু পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছে না, আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর ক্রমবর্ধমান ড্রাগ মার্কেটেও পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম কোকেন ও সিন্থেটিক ড্রাগ।

সিন্থেটিক ড্রাগ বা নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স (এনপিএস) হলো সাধারণত সিন্থেটিক বা রাসায়নিকভাবে তৈরি মাদক যা হেরোইন, কোকেন, গাঁজা বা একস্ট্যাসির মতো প্রচলিত অবৈধ মাদকের প্রভাব নকল করার জন্য তৈরি করা হয়। রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করে ল্যাবরেটরিতে এসব তৈরি করা হয়। এগুলোকে প্রায়ই ‘লিগ্যাল হাই’, ‘বাথ সল্ট’ বা ‘রিসার্চ কেমিক্যাল’ হিসেবে বাজারজাত করা হয়।

কোকেন পাচারে বাংলাদেশকে রুট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় কোকেনের অবৈধ উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে। উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো এশিয়া ও আফ্রিকার নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও।

দেশে গাঁজা ও ইয়াবার মতো প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি কোকেন এবং নতুন প্রজন্মের সিন্থেটিক মাদকের (যেমন: এলএসডি, ডিএমটি, কুশ ও ক্রিস্টাল মেথ) ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলো বাংলাদেশকে এখন আর শুধু পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে নয়, বরং মাদকের একটি বড় বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে এসব মাদক কেনাবেচা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পার্সেলের আড়ালে দেশে প্রবেশ করছে। এমনকি সম্প্রতি খোদ ঢাকাতেই এসব সিন্থেটিক মাদক তৈরির ল্যাবের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

আইএনসিবি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোকেন ও ক্রিস্টাল মেথামফেটামিনের ব্যবহার ক্রমশ যে বাড়ছে তার প্রমাণ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য। ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কোকেন পরীক্ষার নমুনা বেড়েছে। এটি দেশে কোকেন প্রবাহ ও ব্যবহারের বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএনসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদিত কোকেন প্রথমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যায়। পরে নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও মালাউইসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে আকাশপথে বাংলাদেশে আনা হয়। এরপর এর একটি অংশ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার করা হয়। পাচারকারীরা অনেক সময় পেটের ভেতর ক্যাপসুল আকারে মাদক বহন করে অথবা সাধারণ পার্সেল ও পণ্যের আড়ালে কোকেন পরিবহন করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দুটি প্রধান মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চল-গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওস) এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান) এর মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একই সঙ্গে মাদক পাচারের ট্রানজিট ও গন্তব্যস্থলে হিসেবে টার্গেট স্পট। স্থল, জল ও আকাশপথ- তিন পথেই মাদক দেশে প্রবেশ করছে।

আইএনসিবির মূল্যায়ন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়া এখন আর শুধু ট্রানজিট রুট নয়, বরং কোকেনের একটি ক্রমবর্ধমান গন্তব্য অঞ্চল হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে। বিশ্ববাজারে কোকেনের অতিরিক্ত সরবরাহ, পাচারের রুটের পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা ও অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে কোকেনের প্রবেশ ও ব্যবহার বাড়ছে।

ইয়াবাসহ প্রায় সব মাদকই আসে মিয়ানমার-ভারত থেকে

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের প্রধান উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যের গোপন ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত মাদক নাফ নদী হয়ে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, উখিয়া ও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

অন্যদিকে আইএনসিবি বলছে, মিয়ানমার থেকে মেথামফেটামিন প্রথমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাচার হয়। পরে সেই মাদক ভারতের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে আসে। মিয়ানমার-ভারত-বাংলাদেশ করিডর এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সক্রিয় মাদক রুটে পরিণত হয়েছে।

দিনাজপুর সেক্টর সদর দপ্তরের প্রশিক্ষণ মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রায় ১১ কোটি টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য ধ্বংস করে বিজিবি | ছবি– সংগৃহীত

হেরোইন মূলত ভারত থেকে বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে বাংলাদেশের রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হয়ে হেরোইন পাচার করা হয়।

গাঁজা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং দিনাজপুর সীমান্ত এলাকাগুলো গাঁজা পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফেনসিডিল (কোডিন-ভিত্তিক সিরাপ) ভারত সীমান্ত সংলগ্ন জেলা যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর এবং কুড়িগ্রামের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এটি বাংলাদেশে আসে।

ট্যাপেন্টাডল ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, লালমনিরহাট এবং দিনাজপুর জেলা দিয়ে এটি পাচার হয়।

নতুন আতঙ্ক সিন্থেটিক ড্রাগ

প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি বাংলাদেশে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সেস (এনপিএস) সিন্থেটিক বা ডিজাইনার ড্রাগ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে– সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ক্যাতিনোনস, ট্রিপটামাইনস এবং ফেনইথিলামাইনস। এসব মাদক ব্যবহারকারীদের তীব্র বিষক্রিয়া, খিঁচুনি, সাইকোসিস এবং মারাত্মক মানসিক জটিলতায় ফেলতে পারে।

ডিএনসির প্রতিবেদনে এলএসডি এবং ডিএমটির মতো শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক মাদকের বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে। এলএসডি সাধারণত রঙিন ব্লট পেপার আকারে সরবরাহ করা হয়। ডিএমটি ব্যবহারকারীর বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষমতা পরিবর্তন করে দেয়। একই সঙ্গে এমডিএমএ বা এক্সটাসি, যা ‘মলি’ নামেও পরিচিত, দেশে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি মূলত একটি পার্টি ড্রাগ হিসেবে পরিচিত।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ‘এমডিএমবি ফোর এন পিআইএনএসিএ’ নামের একটি সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে শনাক্ত হয়। ২০১৮ সালে দেশে ৫ হাজার ১৫৬ কেজি ‘খাত’ জব্দ করা হয়েছিল।

রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকা থেকে ২৮ বোতল বিদেশি মদ ও ১০৬ ক্যান বিয়ারসহ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর | ছবি– সংগৃহীত

নতুন প্রজন্মের আরেকটি মাদক ‘কুশ’ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড ও অন্যান্য রাসায়নিকের মিশ্রণে তৈরি এই মাদকের একটি ল্যাবরেটরির সন্ধান ঢাকায় পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে দেশে এর স্থানীয় উৎপাদনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওপিওড ব্যথানাশক টাপেন্টাডল এখন মাদকসেবীদের নতুন পছন্দে পরিণত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়াবা বা অ্যামফেটামিন জাতীয় মাদকের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩৬৪টি টাপেন্টাডল ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে।

অনলাইন ডার্ক ওয়েব-কুরিয়ারে আসছে মাদক

রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন করে ল্যাবরেটরিতে এসব তৈরি ছাড়াও নতুন সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্টেন্স (LSD, MDMA, কুশ) বা সিন্থেটিক ড্রাগ' মূলত অনলাইন ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে অর্ডার দেওয়া হয়। এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও ক্রেতা সংগ্রহ করছে। পরে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার বা পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে সাধারণ পণ্যের আড়ালে দেশে প্রবেশ করে এই মাদক ও সব উপকরণ।

ডিএনসির ল্যাবরেটরি তথ্যানুযায়ী, ডিএনসি ল্যাবে ২০২৫ সালে বিভিন্ন সিন্থেটিক মাদকের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে সিন্থেটিক ড্রাগ ট্যাবলেট: ৩২টি, এমডিএমএ ১৩টি, কেটামিন ৮টি নমুনা এবং কুশ ১১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

মাদক চোরাচালানে সমুদ্রপথে ঝুঁকি, নতুন রুট পটুয়াখালীর উপকূল

দুটি প্রতিবেদনেই বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক মাদক পাচারের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আইএনসিবি বলছে, উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সামুদ্রিক মাদক পাচারের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলো বড় চালান পরিবহনের জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহারের চেষ্টা করছে।

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ ও কক্সবাজারের পাশাপাশি এখন বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকা এবং পটুয়াখালীর উপকূলকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। মাদক পাচার শনাক্ত ও প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিচ্ছে।

সীমান্তে মাদক চোরাচালোনের গুরুত্বপূর্ণ রুট

মাদক পাচারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো তিনটি প্রধান জোনে বিভক্ত। পশ্চিম সীমান্তে (ভারত হতে প্রবেশপথ) সাতক্ষীরা- কলারোয়া, দেবহাটা, ভোমরা, কাকডাঙ্গা, পলাশপুর। যশোর- বেনাপোল, পুটখালী, চৌগাছা, নারায়ণপুর, শার্শা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা। চুয়াডাঙ্গা- কার্পাসডাঙ্গা, দর্শনা, জীবননগর। মেহেরপুর- দরিয়াপুর, বুড়িপোতা। রাজশাহী- মণিগ্রাম, চারঘাট, সারদাহ, ইউসুফপুর, কাজল্লা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ী, বাঘা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-ভোলাহাট, শাহবাজপুর, বিনোদপুর, সোনামসজিদ ল্যান্ড পোর্ট, কানসাট এবং জয়পুরহাট-পাঁচবিবি (প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট)।

 

মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু আইন প্রয়োগের বিষয়ে হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার ও সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সমুন্নতি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে— মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান | ছবি– সংগৃহীত

উত্তর সীমান্তে (ভারত হতে প্রবেশপথ) দিনাজপুর-ঘোড়াঘাট, ফুলবাড়ী, বিরামপুর, হিলি, হাকিমপুর, বিরল, খানপুর। সিলেট-জকিগঞ্জ, চুনারুঘাট, মাধবপুর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া- কসবা, আখাউড়া, সিংগাইরবিল, বিজয়নগর। কুমিল্লা- জগন্নাথ দিঘী, চৌদ্দগ্রাম, গোলাপশা, কালিকা পুর, বুড়িচং, বিবিরবাজার। ফেনী- ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম। কুড়িগ্রাম- ফুলবাড়ী, রৌমারী, নাগেশ্বরী, বাঁশজানি। লালমনিরহাট- লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, পাটগ্রাম, বুড়িমারী। শেরপুর-ময়মনসিংহ: ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া। নেত্রকোনা- দুর্গাপুর, কলমাকান্দা।

দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত (মিয়ানমার হতে প্রবেশপথ) টেকনাফ ও কক্সবাজার- জালিয়াপাড়া, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, দক্ষিণপাড়া, ল্যদাপাড়া, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, উখিয়া, পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, তোমরু।

মামলা-আসামি দুটোই বেড়েছে মাদকে

২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মামলা হয়েছে। ২০২০ সালে মামলার সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০৪, আসামি ১৮ হাজার ৩২১। ২০২১ সালে মামলা ২০ হাজার ৫৯২, আসামি ২১ হাজার ৯৯২। ২০২২ সালে মামলা ২৫ হাজার ৬৫৪, আসামি ২৭ হাজার ৯৫৯। ২০২৩ সালে মামলা ২৭ হাজার ৯৯১, আসামি ২৯ হাজার ৭৭৩। ২০২৪ সালে মামলা ২১ হাজার ৯১৩, আসামি ২৩ হাজার ৩৮৬। ২০২৫ সালে মামলা ২৮ হাজার ৪০৯, আসামি ৩০ হাজার ১৬১।

‘জয়েন আস টু বিল্ড আ ড্রাগ ফ্রি অ্যাডিকশন বাংলাদেশ’– প্রসপেক্টাসের মাদক শনাক্তকরণের উল্লেখযোগ্য ঘটনা থেকে নেওয়া

এছাড়া, ২০২৬ সালে জানুয়ারি-এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে মাদক মামলার সংখ্যা ১০ হাজার ১৩৪, আসামি ১০ হাজার ৬৮৯।

বাংলাদেশে কেন বাড়ছে সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার?

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, নতুন মাদকের বিস্তার কেবল সরবরাহভিত্তিক নয় এর পেছনে চাহিদা ও কাঠামোগত একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘদিন একই ধরনের মাদক ব্যবহারের ফলে অনেক ব্যবহারের মধ্যে সহনশীলতা তৈরি হয়। তখন তারা অধিক শক্তিশালী মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

তিনি বলেন, সিন্থেটিক মাদক উৎপাদন ও পরিবহন তুলনামূলক সহজ কাজ এবং অধিক লাভজনক অল্প পরিমাণ মাদক দিয়েই বৃহৎ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা পাচারকারীদের জন্য এই ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ডার্কওয়েব, এনক্রিপটেড ম্যাসেঞ্জিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক বিক্রি ও সরবরাহ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ও ডাক ব্যবস্থার অপব্যবহার নতুন মাদক বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সিন্থেটিক মাদক মোকাবিলাকে চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। গোয়েন্দা সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার(এআই) সহযোগিতায় বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ডার্ক ওয়েব ও সাইবারভিত্তিক মাদকপাচার মোকাবিলার জন্য বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠন প্রয়োজন। রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে নতুন মাদক দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিমানবন্দর সমুদ্র বন্দর ও আন্তর্জাতিক কোরিয়ার হবে উন্নত স্ক্যানিং ও ঝুঁকি বিশ্লেষণপ্রযুক্তি স্থাপন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং তথ্যবিনিময় ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে।

স্থলপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান জোরদার হওয়ায় মাদক কারবারিরা এখন সমুদ্রপথকে পাচারের নিরাপদ ও বিকল্প রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র এলাকা এবং পটুয়াখালীর উপকূল দিয়ে মাদকের চালান দেশে প্রবেশের উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো এবং বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠনের ওপর জোর দিচ্ছে। এছাড়া মাদকের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের মানি লন্ডারিং রোধে ডিএনসির একটি সেল কাজ শুরু করেছে, যা এরই মধ্যে একাধিক মামলার তদন্ত করে সম্পদ ক্রোক করার মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় আয়োজিত "টেক অ্যাগেইনস্ট ট্রাফাকিং-টু" সম্মেলনে ডিএনসি মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। সেখানে অনলাইনভিত্তিক মাদক বিপণন এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে পাচার রোধে ৯টি সুপারিশ পেশ করা হয়। এরমধ্যে ৬টি প্রস্তাব আইএনসিবি গ্রহণ করেছে। এটি সাইবার-নারকোটিক্স এবং মাদক বিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি বড় সাফল্য ও স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মাদক নিয়ন্ত্রণকে শুধু আইন প্রয়োগের বিষয়ে হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার ও সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সমুন্নতি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

মেহেদী হাসান বলেন, গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগী বাংলাদেশের মাদক বিরোধী লড়াইকে আরো কার্যকর ও টেকসই করতে পারে।

স্থলপথে চাপ বাড়লে সমুদ্রপথে কারবার

কোকেন পাচারে বাংলাদেশকে রুট করার চেষ্টার ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা যখন স্থলভাগে অপারেশনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেই তখন তারা (কারবারি) ট্রলারে করে সীমান্তবর্তী সমুদ্র বা ডিপসিতে চলে যায়। ওখানে ছোট ছোট মাছ ধরার যে নৌযানগুলো আছে সেগুলোতে কারবার করে। নতুন করে হয়তো পটুয়াখালীর দিকে আসতে পারে। সম্ভাবনা একটা আছে। সেখানে কোস্টগার্ড এবং নৌপুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী আছে। তারা বিভিন্ন সময় সেখানে মাদক জব্দ করছে।

সিন্থেটিক মাদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে। আমরা অনলাইনেও বিভিন্ন ধরনের অপারেশনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করি। অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাপ ব্যবহার করে সিন্থেটিক ও পার্টি ড্রাগ (যেমন: কেটামিন, এমডিবি, মলি) কেনা-বেচা হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত সামর্থ্যে সাইবার স্পেসে অভিযান চালানো হলেও, নতুন আইন কার্যকর হলে উন্নত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল পাওয়া যাবে, যা অনলাইন অপারেশনকে আরও সহজ করবে।

মাদকের অর্থ পাচাররোধে অনানুষ্ঠানিক সেল গঠন

মাদকসংক্রান্ত মানি লন্ডারিং মামলা ও আইনি অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, মাদকের অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংরোধে বর্তমানে একটি অনানুষ্ঠানিক সেল কাজ করছে। যা নতুন আইনে আইনি ভিত্তি পাবে। ইতোমধ্যে তারা দেশব্যাপী ২৪টি মামলা অনুসন্ধান করছে। ৮টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করেছে।

বিশেষ করে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় বেশ কিছু মামলায় সম্পদ ক্রোক করার মতো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

জেইউ/বিআরইউ/এনএফ