বিজ্ঞাপন

ইতিহাস গড়া দুদকের ১১৬ দিন : নতুন কমিশনে আলোচনায় যারা

ইতিহাস গড়া দুদকের ১১৬ দিন : নতুন কমিশনে আলোচনায় যারা

স্বাধীনভাবে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ থেকে জন্ম হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের। ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান থেকে মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় এর মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন পুরো মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনকে মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেও বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনা প্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও সর্বশেষ গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন মেয়াদ পূরণ না করেই বিদায় নিয়েছে।

আবদুল মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ১১৬ দিন অতিক্রান্ত হলেও এখনো দুদক কমিশন গঠন হয়নি। অর্থাৎ চার মাস ধরে অভিভাবকশূন্য দুদক। দুদকের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। কমিশনহীন দুদকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা, চার্জশিট, আসামি গ্রেপ্তার, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ফ্রিজ, সংশ্লিষ্টদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি চূড়ান্ত করাসহ সকল সিদ্ধান্ত থমকে আছে। কারণ কমিশন শূন্যতা মানে প্রতিষ্ঠান হিসাবে অচল দুদক।

তবে আশার কথা হলো গত ২২ জুন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি কিংবা কমিশন গঠনে কারও নামের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে যায়নি বলেই জানা গেছে। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকজন সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের বেশ কিছু নাম আলোচিত হচ্ছে। 

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করে দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, কমিশন নেই প্রায় ৪ মাস পেরিয়ে গেছে। কমিশন না থাকলে দুদকে কোনো কাজ হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সকল সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন। দুদকের ইতিহাসে কখনও এতো দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ও কমিশনার অনুপস্থিত থাকেনি। যত দ্রুত সম্ভব কমিশন গঠন জরুরি। সার্চ কমিটি গঠন হতেই চার মাস লাগলো। এ বিষয়ে সরকার আন্তরিক হবেন বলেই আমরা আশা করছি।

অন্যদিকে নতুন কমিশন গঠনের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন গঠনের লক্ষ্যে যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে, তা নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্ন রয়েছে। আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটিতে কার্যরত ক্যাবিনেট সচিবের থাকার কথা নয়; বরং সেখানে সদ্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের থাকার কথা ছিল। এই আইনি ব্যত্যয় বা নিয়মের বিচ্যুতির পেছনে কী কারণ ছিল, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। দুদকের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।

তিনি বলেন, যদিও ক্ষমতাসীনদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরাই সাধারণত নিয়োগ পেয়ে থাকেন, তবুও এমন ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া উচিত, যারা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার সৎ সাহস রাখেন। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত, দক্ষ এবং অতীতে যেকোনো ধরনের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে কাজ করার ট্র্যাক রেকর্ড থাকতে হবে। বিশেষ করে দুদকের শীর্ষ পদ তিনটির জন্য এমন যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।

দুদকের আইন সংস্কার ও কার্যকর দুদক প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ বা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। মুখে বা কাগজে-কলমে দুদককে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার কাজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ। দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে যদি নতুন আইন বা সংস্কার করা হয়, তবেই একটি কার্যকর দুদক প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেবে। দুদককে সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনি সংস্কারের যথাযথ প্রতিফলন অত্যন্ত জরুরি।

কমিশন গঠনে আলোচনায় যারা
নতুন কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে গত ৩ মাস ধরেই সাবেক কয়েকজন আমলা ও বিচারকের নাম আলোচিত হচ্ছে। যদিও নামের সুপারিশ করবে সার্চ কমিটি। কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুটি করে নাম সুপারিশ করবে; যেখান থেকে রাষ্ট্রপতি তিনজনকে নিয়োগ দেবেন।

দুদক, জনপ্রশাসন ও জুডিশিয়াল সার্ভিস সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসাবে গত কিছুদিন ধরেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনের নাম। এ ছাড়া সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান ও সাবেক জেলা জজ রুহুল ‍কুদ্দুসের নামও আলোচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব আবদুস সবুর, সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের নামও আলোচিত হচ্ছে সচিবালয় এলাকায়।

এর মধ্যে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের একজন সাবেক বিচারক; যিনি ঢাকা মহানগর আদালতে সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক হিসেবে তিনি দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা বিদেশে অর্থপাচার সংক্রান্ত একটি দুর্নীতি মামলায় ২০১৩ সালে রায় ঘোষণা করেছিলেন মোতাহার হোসেন। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে তিনি তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছিল দুদক। পরে তা নিষ্পত্তি করা হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে মোতাহার হোসেন জানিয়েছিলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত কথিত দুর্নীতি মামলার রায় দিতে পিস্তল দেখিয়ে তাকে ভয় দেখানো হয়। 

আলোচনায় আরও এসেছে সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেনের নামও।

সেনাবাহিনীর প্রধান ও ব্রিগেডিয়ার পদ মর্যাদার সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে আলোচনার টেবিলে। এ ছাড়া দুদকের সাবেক মহাপরিচাক (ডিজি) প্রশাসন ক্যাডারের মুনীর চৌধুরীর নামও এসেছে কোথাও কোথাও।

যদিও দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যাদের নাম শোনা যায়, তাদের কমিশনে আনা হয় না। বরাবরের মতো প্রশাসন ক্যাডারও তাদের প্রভাব ধরে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।

কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ও চেয়ারম্যান নিয়োগে গত ২২ জুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। ওই দিনই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭ অনুযায়ী কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ন্যূনতম দুইজন করে প্রার্থীর নামের তালিকা প্রস্তুত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। পরে রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেবেন।

এর আগে ১৫ জুন জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুদক গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘হয়তো আপনারা মনে করেন সরকার আন্তরিক নয়। কিন্তু সরকার আন্তরিক ছিল। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করা হবে। সার্চ কমিটির মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের চলমান প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গড়ে তোলা হবে।’

আইনের যে প্রক্রিয়ায় গঠিত হয় দুদক কমিশন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গঠন, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ, তাদের মেয়াদ এবং অপসারণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশন আইন- ২০০৪-এ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। দুদকের আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী স্বতন্ত্র কমিশন গঠিত হবে, যার নাম হবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’।

আইনের ধারা ৫(২)-এ বলা হয়েছে, কমিশন একজন চেয়ারম্যান এবং দু’জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। অর্থাৎ ২০০৪ সালের মূল আইনে কমিশনের সদস্য সংখ্যা ছিল মোট তিনজন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধন ও অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনারের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হলেও মূল আইনে চেয়ারম্যানসহ তিন সদস্যের কমিশনের কথা বলা আছে।

চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আইনের ধারা ৬(১) অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। তবে রাষ্ট্রপতি সরাসরি কাউকে নিয়োগ দেন না।

ধারা ৬(২) অনুযায়ী বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ প্রদান করবেন। কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি স্বাধীন বাছাই কমিটির ভূমিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর ধারা ৬(৩) অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করবে।

যোগ্যতার বিষয়ে আইনের ধারা-৭ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সততা, সুনাম ও পেশাগত দক্ষতার অধিকারী হতে হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন, পুলিশ, রাজস্ব, হিসাব নিরীক্ষা বা সমজাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়ার কথা  উল্লেখ আছে। তবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি এ পদে নিয়োগের যোগ্য হবেন না। কমিশনের মেয়াদ হবে যোগদানের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের জন্য।

আইনের ধারা-১১ অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অপসারণের বিধান রাখা হয়েছে। আইনে তাদের এমন ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, যাতে সরকার ইচ্ছামতো বা প্রশাসনিক আদেশে তাদের অপসারণ করতে না পারে। অপসারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যা অনেকাংশে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সাংবিধানিক সুরক্ষার অনুরূপ।

দুদকের ইতিহাস
এক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। চার বছরের মেয়াদ পূরণের আগেই ২০০৭ সালে ‘এক-এগারোর’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পদত্যাগ করে তাকে চলে যেতে হয়।

২০০৭ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয় কমিশন। তৎকালীন সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব হতে দেখা গেছে কমিশনকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীসহ শীর্ষ অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এই কমিশন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল হাসান মশহুদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন।  

এরপর ২০০৯ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান সাবেক সচিব গোলাম রহমান। তৎকালীন সময়ে চার বছরের মেয়াদ শেষে তিনি ২০১৩ সালের ২৩ জুন দায়িত্ব শেষ করেন। তার সময়ে আলোচিত হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কাজ হয়েছিল। অনেকটাই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সংস্থাটির চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের আলোচিত বক্তব্য ছিল  দুদককে নখ-দন্তহীন বাঘের সঙ্গে তুলনা করা।

গোলাম রহমানের পর দুদক কমিশনার মো. বদিউজ্জামানকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে ও পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২৬ জুন তাকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার স্থলে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদকে।

২০১৬ সালের ১৩ মার্চ পর্যন্ত দুদক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন বদিউজ্জামান। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ছিলেন। বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালকও ছিলেন তিনি।

এরপর ২০১৬ সালের মার্চে নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সচিব ইকবাল মাহমুদ। ২০১৬ সালের ১০ মার্চ যোগ দিয়ে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ওই কমিশনের দুর্নীতির আসামিদের গ্রেপ্তারের বড় অভিযান করা হয়েছিল।

ইকবাল মাহমুদের মেয়াদ শেষে ২০২১ সালের মার্চে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে যোগ দেন সাবেক জেলা জজ মো. জহুরুল হক। আর ইকবাল মাহমুদের কমিশনের সঙ্গে নিয়োগ পাওয়া কমিশনার মোজাম্মেল হক খানের মেয়াদ পূর্ণ হলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সে পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন সাবেক সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন। 

মেয়াদ ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করে মোমেন কমিশন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র তিন মাসে আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় শতাধিক মন্ত্রী, এমপি ও আমলার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে আস্থায় আসার চেষ্টা ছিল ওই কমিশনের। অথচ তার আমলে প্রায় দুই শতাধিক আওয়ামী মন্ত্রী, এমপিকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ৩০ অক্টোবর তারা পদত্যাগ করেন।

সর্বশেষ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচ বছরের মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। তার সঙ্গেই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ১১ ডিসেম্বর এবং হাফিজ আহসান ফরিদ ১৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এই কমিশন নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। শেষ পর্যন্ত বছরে পেরিয়ে ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করে পুরো কমিশন। যদিও গত ৩ মার্চ জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণ দেখানো হয়েছিল।

আরএম/এনএফ