বিজ্ঞাপন

ঢামেকে দালাল রাজত্ব

নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগী ‘সাপ্লাই’, নিঃস্ব হচ্ছে হাজারও পরিবার

নামসর্বস্ব ক্লিনিকে রোগী ‘সাপ্লাই’, নিঃস্ব হচ্ছে হাজারও পরিবার

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক সক্রিয় দালাল চক্র। হাসপাতালের অতিরিক্ত রোগীর চাপ, আইসিইউ ও এনআইসিইউ সংকট এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনকে পুঁজি করে চক্রগুলো রোগীদের নানা প্রলোভন ও আশ্বাস দিয়ে সরিয়ে নিচ্ছে ঢাকার অলিগলিতে থাকা বিভিন্ন নামসর্বস্ব বেসরকারি হাসপাতালে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ ও এনআইসিইউ সংকটকে পুঁজি করে ৮ থেকে ১০টি শক্তিশালী দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অসহায় রোগী ও স্বজনদের বিভ্রান্ত করে তারা ঢাকার বিভিন্ন নামসর্বস্ব বেসরকারি হাসপাতালে সরিয়ে নিচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয়ের পাহাড় ও জিম্মিদশার শিকার হয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজারও পরিবার, অথচ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না থাকায় জামিনে বের হয়ে অপরাধীরা আবারও একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে

এসব হাসপাতালে চিকিৎসার নামে বাড়ছে ব্যয়ের পাহাড়। অনেক ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পাওয়ার ভুক্তভোগী মানুষের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। দালালদের এই তৎপরতায় প্রতিনিয়ত আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও জিম্মি হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সময়ে এসব দালালের বিরুদ্ধে ক্ষণস্থায়ী অভিযান চালানো হলেও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় জামিনে বের হয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই তারা আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এমনকি পুরোনোরা গ্রেপ্তার হলে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন গ্রুপ। বর্তমানে এমন ৮ থেকে ১০টি সক্রিয় দালাল গ্রুপ রয়েছে, যারা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়মিত রোগী ‘সাপ্লাই’ দিয়ে যাচ্ছেন।

শ্যামলীর ক্লিনিকে শিশুর মৃত্যু ও জালিয়াতি

সম্প্রতি রাজধানীর শ্যামলীর একটি ক্লিনিকে অক্সিজেন গ্যাস লিকেজের ঘটনায় এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। খাতা-কলমে ২০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো সাধারণ বেড নেই। এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ মিলিয়ে ১০টি বেড নিয়ে চলছে পুরো বাণিজ্য। সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকেই শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে এসেছেন বলে জানা গেছে।

সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী পাচার করতে পারলেই যেভাবে মেলে ১৪-১৬ হাজার টাকা / ঢাকা পোস্ট

গত ২১ জুন ঢাকা মেডিকেলে সিজারের মাধ্যমে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন মুক্তা বেগম। জন্মের পরপরই শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকরা দ্রুত এনআইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডে কর্মরত কয়েকজন ভুয়ো পরামর্শদাতা জানান, ঢাকা মেডিকেলে কোনো এনআইসিইউ বেড খালি নেই। পরে তারা দালালি করে নিজেদের পরিচিত একটি হাসপাতালে রোগীকে পাঠান এবং প্রতিদিন আট হাজার টাকা খরচ হবে বলে আশ্বাস দেন।

পরে স্বজনদের ভুল বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শ্যামলীর ‘বেবি কেয়ার হাসপাতালে’। মুক্তা বেগমের ননদ আসমা খাতুন বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল প্রতিদিন আট হাজার টাকার মতো খরচ হবে। কিন্তু মাত্র তিন দিনেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা বিল করা হয়েছে। গত ২৩ জুন সন্ধ্যার দিকে বিকট শব্দ হয়ে চারদিকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকে এবং একটি শিশু মারা যায়। পরে আমাদের বাচ্চাসহ অন্য শিশুদের পাশের আরেকটি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর আমরা আমাদের বাচ্চাকে নিয়ে চলে যেতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বাধা দেয়।’

দালালদের মাধ্যমে রোগী এনে এক বা দুটি কক্ষ ভাড়া করে গড়ে ওঠা এসব নামসর্বস্ব ক্লিনিকে শুধু আইসিইউ বা এনআইসিইউ বেড রেখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি শ্যামলীর একটি ক্লিনিকে গ্যাস লিকেজে শিশুর মৃত্যু এবং মোটা অঙ্কের বিলের কারণে লাশ আটকে রাখার মতো অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার চালানো বা স্থায়ী কোনো ডাক্তার না থাকার পরও দালালদের মাধ্যমে রোগীদের সেখানে নিয়ে জিম্মি করা হচ্ছে

গত বুধবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ভবনের সপ্তম তলায় পাশাপাশি দুটি হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে— একটি ‘বেবি কেয়ার’ এবং অন্যটি ‘হাই কেয়ার জেনারেল হাসপাতাল’। বেবি কেয়ারে কোনো সাধারণ বেড নেই, দুটি কক্ষে এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ মিলিয়ে ১০টি বেড রয়েছে। পাশে রয়েছে বড় বড় অক্সিজেন সিলিন্ডার। পুরো ভবনটিতে রয়েছে ছয়টি হাসপাতাল ও তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যা দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কোনো হাসপাতাল ভবন। এর আগে ২৩ মার্চ এই ভবনেরই চতুর্থ তলায় অবস্থিত ‘ডক্টরস কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি’ ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার পরিচালনার অপরাধে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে গিয়ে সিলগালা করে এসেছিলেন।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে সোমবার সক্রিয় দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করেছে র‍্যাব-২ / ঢাকা পোস্ট

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবি কেয়ার হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, এখানে নিজস্ব কোনো রোগী আসে না। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালদের মাধ্যমে রোগী আনা হয়। এখানে সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী চিকিৎসকও নেই। যেসব চিকিৎসকের এই হাসপাতালের শেয়ার রয়েছে, তারাই মূলত মাঝেমধ্যে এসে রোগী দেখে যান। তিনি আরও বলেন, ‘শুধু এই হাসপাতাল নয়, এই ভবনে থাকা অন্য হাসপাতালগুলোর অনেক রোগীকেই কোনো না কোনো দালাল এখানে নিয়ে এসেছে।’

এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ কথা বলতে রাজি হননি। রিসিপশন থেকে জানানো হয়, আপনাদের যা জানার তা মন্ত্রণালয় থেকে জেনে নেন, হাসপাতাল থেকে কেউ কোনো কথা বলবেন না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢামেক থেকে নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী পাচার করতে পারলে চক্রটি রোগীপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা কমিশন পায়। এই অর্থ ট্রলিম্যান, আয়া-ওয়ার্ডবয়, দালাল ও অ্যাম্বুলেন্স চালকদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ধাপে ভাগ হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের মতে, ধারণক্ষমতার চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি রোগীর চাপ এবং তীব্র শয্যা সংকটকে পুঁজি করেই এই বহুমাত্রিক দালাল চক্র ও অসাধু ব্যবসা গড়ে উঠেছে

ঢাকা মেডিকেলের সেবা নিয়ে বিভ্রান্তি ও জিম্মিদশা

গত কোরবানির ঈদের আগের দিন রাজধানীর নদ্দা এলাকায় বাস দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন বুলবুল আহমেদ। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরপরই বুলবুলের বাবা হাসমত আলীর কাছে ছুটে আসেন তিন ব্যক্তি। তারা তাকে বিভ্রান্ত করে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে পর্যাপ্ত সিট ও ডাক্তার নেই, এখানে থাকলে রোগী মারা যাবে।’ ঢাকা মেডিকেলে প্রথম আসা অসহায় হাসমত আলী তাদের কথায় রাজি হয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তিরাই অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে রোগীকে কাটাবনের ‘হোম কেয়ার হাসপাতালে’ নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে সটকে পড়েন।

হাসমত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ঢাকার কিছুই চিনি না। ছেলের জীবনের কথা চিন্তা করে ওরা যেভাবে বুঝিয়েছে, সেভাবেই রাজি হয়েছি। কিন্তু এখানে আসার পরই বলা হয় আইসিইউ লাগবে, যার প্রতিদিনের খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। মাত্র পাঁচ দিনেই আইসিইউ বিল এসেছে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা! অনেক কষ্ট করে ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছি। গত দুই দিন ধরে বলছি, ছেলেকে আইসিইউ থেকে সাধারণ বেডে দিতে। কিন্তু তারা আইসিইউর পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত বেডে দিতে রাজি হচ্ছে না। আমার মতো অনেক রোগীকেই ঢাকা মেডিকেল থেকে এনে এখানে জিম্মি করা হয়েছে। প্রতিবাদ করলেই ভয়ভীতি দেখানো হয়।’

সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে র‌্যাবের দালালবিরোধী অভিযান / ঢাকা পোস্ট

ঢামেকের অন্দরে দালাল সিন্ডিকেট! রোগীপ্রতি যেভাবে ভাগ হয় টাকা

ওই ঘটনার পর অনুসন্ধানে নামে ঢাকা পোস্ট। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেটের তথ্য। বিশেষ করে হাসপাতালের ২১২ নম্বর গাইনি ওয়ার্ড এবং ২১১ নম্বর এনআইসিইউ ওয়ার্ড ঘিরে এই চক্রের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। কারণ হিসেবে ঢাকা মেডিকেলে চাহিদার তুলনায় অনেক কম সংখ্যক আইসিইউ ও এনআইসিইউ ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের অসহায়ত্ব এবং ঢাকা শহর সম্পর্কে অপরিচিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে তাদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন ক্লিনিকের হয়ে কাজ করেন এসব দালাল। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেডিকেল থেকে কোনো নির্দিষ্ট ক্লিনিকে রোগী পাঠাতে পারলে রোগীপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয় এই চক্রের পেছনে। এই অর্থ কয়েকটি ধাপে ভাগ হয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হাসপাতাল থেকে রোগী নেওয়া নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্সকে দেওয়া হয় প্রায় দুই হাজার টাকা, দালাল পায় দুই হাজার টাকা, সিনিয়র চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (যেমন- ওয়ার্ডবয়, আয়া) পায় প্রায় চার হাজার টাকা এবং ট্রলিতে করে রোগীকে হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা।

ট্রলির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত, কেউ দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মী এবং কেউ রোগীদের কাছে নিজেদের সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। মূলত রোগী ও স্বজনদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং নানা প্রলোভন দিয়ে এসব দালাল তাদের নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে প্রভাবিত করেন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রোগীদের আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে কাজ করে কয়েকটি সক্রিয় গ্রুপ। রাজধানীর রামপুরায় অবস্থিত মাল্টিকেয়ার হাসপাতালের হয়ে শাহাদাতের নেতৃত্বে রোগী ‘ট্রাফিকিং’-এর কাজ করেন জাহিদ ও আনিস। এছাড়া কাঁটাবনের হোমকেয়ার, চানখাঁরপুলের রয়েল কেয়ার অ্যান্ড সার্জিক্যাল এবং যাত্রাবাড়ীর প্যারামাউন্ট স্পেশালাইজড হাসপাতালে রোগী সরবরাহের কাজ করেন রাব্বি। শ্যামলীর সিটি কেয়ার, হাই কেয়ারে রনি এবং পান্থপথের ইউনি হেলথ কেয়ারে মনির ও বাধন রোগী সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন।

আইসিইউ বাণিজ্য, রোগী পাচার করে দিনে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নামসর্বস্ব ক্লিনিকগুলো / ঢাকা পোস্ট

ঢাকা মেডিকেলের ২১১ ও ২১২ নম্বর রুম এবং জরুরি বিভাগ থেকেও রোগী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয়। ২১১ নম্বর রুমের দায়িত্বে রয়েছেন মতিয়ার, শাওন, রাজীব, আব্দুর রব ও রুবেল। অন্যদিকে, ২১২ নম্বর রুমের দায়িত্বে রয়েছেন কাশেম, কালাম, সিয়াম ও শিপন। জরুরি বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার কাজে সর্দার স্বপন ও মনছুরের নেতৃত্বে কাজ করেন ডেইলি বেসিসে (দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে) কর্মরত শহীদ, দুলাল, সালাউদ্দিন, বিল্লাল ও বাপ্পী। এদিকে, রোগীকে ওয়ার্ড থেকে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কাজ করেন ট্রলিম্যানরা। দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগী অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরে তারা সরাসরি সহযোগিতা করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— নেওয়াজ, মিঠু, বাধন, ইব্রাহিম, রফিক, সেন্টু, মালেক, রহমান, সজীব, আওলাদ, আকাশ, নবীন, ইয়াসীন, রুবেল, জুয়েল, সোহেল, আজিজ, রানা, সাগর, তমাল, সেফালী, মাহাদী, রবিন, তুষার, আনোয়ার, হাসেম, রিয়াজ, সিয়াম, সোহাগ ও মিঠুন।

তাদের মধ্যে অনেকেই নিজেকে হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে রোগী ও স্বজনদের আস্থা অর্জন করেন। পরে চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কথা বলে তাদের নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যেসব হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে যাওয়া হয়, সেসব হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভবনের এক কিংবা দুই ফ্লোর ভাড়া করে এমনকি কোথাও কোথাও একটি বা দুইটি কক্ষ ভাড়া করে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব হাসপাতালে জেনারেল বেড ছাড়া শুধু এআইসিইউ, পিআইসিইউ ও আইসিইউ-এর বেড রাখা হয়, যাতে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে এসে তাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

এদিকে, গত ১ জুন সকালে ঘুরতে এসে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হন ২২ বছর বয়সী মারুফ। তার বাড়ি কক্সবাজারের রামুতে। দুর্ঘটনার পর তার সঙ্গে থাকা পাঁচ বন্ধু তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। পরে চিকিৎসকরা মারুফকে সিটি স্ক্যান করানোর পরামর্শ দেন এবং তার আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান। মারুফের সঙ্গে থাকা বন্ধু বিকাশ বলেন, ‘আমরা ঢাকার কিছুই চিনি না। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে গেলে চিকিৎসকরা সিটি স্ক্যান করতে বলেন। একই সঙ্গে আইসিইউ লাগতে পারে বলেও জানান। তখন তিন ব্যক্তি নিজেদের ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের কর্মী পরিচয় দিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন।’

নামসর্বস্ব ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাশ আটকে রেখে স্বজনদের হেনস্তা করারও অভিযোগ আছে / ঢাকা পোস্ট

তারা জানান, রোগীর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। ঢাকা মেডিকেলে বর্তমানে আইসিইউ খালি নেই। তাদের পরিচিত একটি হাসপাতালে আইসিইউ খালি আছে এবং সেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হবে। রোগীর জীবন বাঁচানোর কথা চিন্তা করে আমরা তাদের কথায় রাজি হই।’ বিকাশের ভাষ্য, ‘ওই তিন ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তাদের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান এবং ভর্তি করিয়ে দেন। ভর্তির সময় পুরো টাকা পরিশোধ করতে না পারায় হাসপাতালের লোকজন তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন’ বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘আমাদের একমাত্র চিন্তা ছিল রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ভর্তি করার পরপরই তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। বিকেলের দিকে আমরা পপুলারে নিয়ে গিয়ে সিটি স্ক্যান করাই। পরে রিপোর্ট দেখে তারা জানায়, মাথায় রক্ত জমাট বেঁধেছে এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হবে। অপারেশনের খরচ তিন লাখ টাকা বলা হয়। আমরা ঢাকার কিছুই না জানায় বাধ্য হয়ে রাজি হই। পরে রাত ৮টার দিকে মারুফের অস্ত্রোপচার হয়। তবে, পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়।’ মারুফের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় চার লাখ টাকার বিল দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় প্রায় আট ঘণ্টা লাশ আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত হলে দুই লাখ টাকা পরিশোধের পর পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

নিহতের ভাই জবেদ বলেন, ‘মারা যাওয়ার পর আমাদের কাছে বড় অঙ্কের একটি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এত অল্প সময়ে এত টাকা পরিশোধ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বিল নিয়ে প্রশ্ন করায় তারা আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং বলেন, টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত লাশ দেওয়া হবে না। আমরা কেন পুলিশ ও সাংবাদিকদের খবর দিয়েছি, সেজন্য আমাকে একটা কক্ষে নিয়ে হাসপাতালের এক পরিচালক খুবই খারাপ আচরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো ইচ্ছা করে এই হাসপাতালে আসিনি। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা হবে না— এ কথা বলে তারাই আমার ভাইকে এখানে নিয়ে আসেন।’

কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বক্তব্য

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০টি সিজার হয়। সিজারের পর নবজাতকদের এনআইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমদের যে পরিমাণ এআইসিইউ আছে তাতে কোনোভাবেই রোগী সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, আমাদের নিউরোসায়েন্সে ৩০০ রোগীকে ভর্তি রাখতে পরি, কিন্তু রোগী থাকে ৪০০ থেকে ৫০০ জন। নিউরোসায়েন্সের দুটি ওটিতে সার্বক্ষণিক অপারেশন চলতে থাকে। কিন্তু অপারেশনের পর অনেক রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমি হয়তো প্রতিদিন সিট খালি হওয়া সাপেক্ষে দুইজনকে আইসিইউ দিতে পারি। তখন বাকি রোগী যাদের আইসিইউ প্রয়োজন তাদের তো সেই সাপোর্ট দিতে পারি না। তখন হয়তো ডাক্তারেরা নিউরোসায়েন্সে খোঁজ নিতে বলেন, সেখানে আইসিইউ আছে কি না। ঠিক তখনই দালালদের খপ্পরে পড়েন রোগীর স্বজনেরা।

সরকারি হাসপাতালের শয্যা ও আইসিইউ সংকটকে পুঁজি করে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে চলে নির্মম দালালি / ঢাকা পোস্ট

দালালদের বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘দালালদের প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক তদারকির নির্দেশনা দেওয়া আছে। দালাল ধরার দায়িত্ব তো আর ডাক্তারদের না। এটার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদেরই মধ্যে হয়তো কেউ কেউ এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার এখানে আনসারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকদের নিযুক্ত করেছে। কিন্তু তারা তো আমার কাছে রিপোর্ট দিতে বাধ্য নয়। মূলত আমাদের এখানে রোগীদের ওভারলোড এবং আইসিইউ সংকটকে কাজে লাগিয়ে দালাল চক্র গড়ে ওঠে। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পুলিশে দেওয়া হলেও তারা আবার জামিনে বের হয়ে একই কাজে যুক্ত হয়।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের কাছে এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ প্রদান করে না। যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করতো তাহলে আমাদের পক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হতো। তারপরও আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পরে একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি এবং কয়েকজনকে আটক করে শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছি। প্রয়োজনে আবারও আমরা অভিযানে নামব। এক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই একই ধরনের সংকট রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। অনেক রোগীকে বারান্দা ও হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করতে হয়। ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালে যেখানে ১২০০ থেকে ১৫০০ রোগী থাকেন, আবার ১৫০০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা প্রায় চার হাজারে পৌঁছে যায়। এটা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের চাহিদা অনেক বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় সেবার সক্ষমতা ও অবকাঠামো অপ্রতুল। এই সুযোগটি কাজে লাগায় দালাল চক্র। একই সঙ্গে বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ীও এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়।’

‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষদের অনেকেই সচেতনতা, শিক্ষা, সামাজিক, শারীরিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সহজেই বিভ্রান্ত হন। আর এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে শহরের চতুর দালালরা রোগী ও স্বজনদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলেন।’

সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটির সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও সরবরাহ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে রোগীর চাপও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। তাই স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।’

এমএল/এমএআর/