বিজ্ঞাপন

হলি আর্টিজানে হামলার ১০ বছর

উগ্রবাদ আছে, ‘জঙ্গি নেই’: আত্মতুষ্টির আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?

উগ্রবাদ আছে, ‘জঙ্গি নেই’: আত্মতুষ্টির আড়ালে বাড়ছে কি ঝুঁকি?

ঢাকার কূটনৈতিকপাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁ একসময় দেশি-বিদেশি মানুষের কোলাহলে মুখরিত থাকত। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সন্ধ্যার পর দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও নারকীয় জঙ্গি হামলায় রেস্তোরাঁটি মুহূর্তেই এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়।

ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞ আর প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে শেষমেশ সেই জিম্মিদশার অবসান ঘটলেও, ততক্ষণে জঙ্গিদের হাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন। জঙ্গিদের গুলি ও বোমাবর্ষণে আহত হন পুলিশের আরও অনেক সদস্য।

পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো সদস্যদের পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে এবং নিহত হন হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি। এই ভয়াবহ হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেপথ্যের লোমহর্ষক সব তথ্য উন্মোচন করে। বিভিন্ন সময়ে এই হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের যোগসাজশের বিষয়টিও সামনে আসে।

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হলি আর্টিজানের মতো নিখুঁত হামলার ইতিহাস মাথায় রাখলে উগ্রবাদ ইস্যুতে রাজনৈতিক আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। সরকারগুলো নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় ‘জঙ্গি নেই’ বা ‘সহনশীল শব্দ’ ব্যবহার করে মূলত এই প্রবণতাকে আড়াল করতে চায়, যা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর লোকবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়। তাই একে রাজনীতির বিষয়বস্তু না বানিয়ে সমন্বিত জাতীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে মোকাবিলা করা জরুরি

আজ সেই ভয়াল গুলশান হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর। এই ঘটনার পর দেশের প্রথাগত চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে একটি নতুন সত্য উন্মোচিত হয়— দেখা যায়, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও জঙ্গি-উগ্রবাদে জড়াচ্ছেন। একই সঙ্গে এই হামলা স্পষ্ট করে দেয় যে, স্থান যতই নিরাপদ বা সুরক্ষিত হোক না কেন, নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ছাড়া ঝুঁকির আশঙ্কা থেকেই যায়।

dhakapost
ভয়াবহ সেই হত্যাযজ্ঞ আর প্রায় ১২ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস জিম্মি সংকটের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল পুরো জাতি। সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে শেষমেশ সেই জিম্মিদশার অবসান ঘটে / সংগৃহীত ছবি

বিগত সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও মামলার রায়

হলি আর্টিজান হামলার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের জঙ্গিবাদ-বিরোধী অবস্থান ও কার্যক্রম তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। ক্ষুণ্ন হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে সরকার তখন জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশজুড়ে এক হাজারের বেশি অভিযান পরিচালনা করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযানে হলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও শীর্ষস্থানীয় আট জঙ্গি নিহত হন।

তারা হলো— তামিম আহমেদ চৌধুরী (৩৩), নুরুল ইসলাম মারজান (২৩), সারোয়ার জাহান মানিক (৩৫), তানভীর কাদেরী (৪০), বাশারুজ্জামান চকলেট (৩২), মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম (৩৭), মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান (৩২) এবং রায়হানুল কবির রায়হান ওরফে তারেক (২০)।

ওই চাঞ্চল্যকর ঘটনার জেরে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। টানা এক বছর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। আদালত সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিগত সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হওয়া তিন শতাধিক উগ্রপন্থী বন্দি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ায় নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যাদের অধিকাংশকেই এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠন ‘টিটিপি’র সঙ্গে যোগাযোগ এবং জেএমবি সদস্যদের আটকের ঘটনা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য একটি ভিন্ন ও সতর্কবার্তা দিচ্ছে

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— হামলার মূল সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর সহযোগী আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ (আবু জাররা), অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী নব্য জেএমবি নেতা হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী, অন্যতম পরিকল্পনাকারী আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদ। ফাঁসির পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়। অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অপর আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেওয়া হয়।

dhakapost
জিম্মিদশার অবসান ঘটলেও জঙ্গিদের হাতে ১৭ জন বিদেশিসহ মোট ২২ জন প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন / সংগৃহীত ছবি

সরকার পরিবর্তন ও জঙ্গিবাদ ইস্যুতে নতুন বাস্তবতা

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের চিত্রটি ভিন্ন রূপ নেয়। একদিকে যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে র‍্যাব ও সিটিটিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, অন্যদিকে ৫ আগস্টের পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কারাগার থেকে পালিয়ে যান তিন শতাধিক বন্দি, যারা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে উগ্রবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’-এর প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যায়। তবে, তৎকালীন পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ‘জঙ্গি’ বলে কিছু নেই। বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো স্থান হবে না। কিন্তু কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া উগ্রবাদে জড়িত সেই আসামিদের অধিকাংশকেই আর গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। উল্টো পুলিশের অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা, নিরাপত্তা জোরদার, মালয়েশিয়ায় উগ্রবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার, জেএমবি সদস্য আটক এবং আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠন ‘টিটিপি’র (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তারের তথ্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দেশে কোনো জঙ্গিবাদ নেই বলে দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হওয়া সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজপথে প্রকাশ্য সমাবেশ ও লিফলেট বিতরণ শুরু করেছে। যদিও পুলিশ সদর দপ্তর তাদের কার্যক্রমকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তবুও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংগঠনটির এই প্রকাশ্য তৎপরতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে কথাবার্তায় এক ধরনের অস্পষ্টতা ও শব্দগত রাখঢাক রয়েছে। বাংলাদেশে ‘জঙ্গি তৎপরতা’ ইস্যুতে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সেই বিভ্রান্তিকে আরও স্পষ্ট করে। তবে, দেশে যে উগ্রবাদের উপস্থিতি রয়েছে, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারির পর দেশের প্রধান বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করতে দেখা গেছে।

dhakapost
গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনায় নিহত পাঁচ জঙ্গি / সংগৃহীত ছবি

‘বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই’: উগ্রবাদ ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের আত্মতুষ্টি

২০২৫ সালের ৬ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই।

দেশের জঙ্গিবাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘মিডিয়ার সহযোগিতায় দেশে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। গত ১০ বছরে দেশে বড় কোনো জঙ্গি হামলার তথ্য আপনারা দিতে পারেননি, কারণ এমন ঘটনা ঘটেনি। এর কৃতিত্ব আপনাদেরও প্রাপ্য।’ বাংলাদেশকে ‘জঙ্গি তকমা’ দেওয়ার কোনো আন্তর্জাতিক চেষ্টা চলছে কি না, তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এমন কিছু নেই, যা এ ধরনের সন্দেহের পক্ষে যায়।’

এর আগে, গত বছরের ১ জুলাই তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর কাছে গণমাধ্যম জানতে চেয়েছিল, জঙ্গি দমনে পুলিশের বর্তমান উদ্যোগ কী? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘জঙ্গি নাই, এখন ঠেকাতে হবে ছিনতাই। জঙ্গি থাকলে না জঙ্গি নিয়ে ভাবব।’ তিনি আরও মন্তব্য করেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারছে, কিসের জঙ্গি? বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নাই। বাংলাদেশে পেটের দায়ে লোকে ছিনতাই করে।’

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হিযবুত তাহরীরের প্রকাশ্য সক্রিয়তা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র দুদিন পর, ৭ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রকাশ্য সমাবেশ করতে দেখা যায় হিযবুত তাহরীরের কর্মীদের। সাদা-কালো কাপড়ে ইসলামের কলেমা লেখা পতাকা এবং খিলাফতের দাবি সংবলিত ব্যানার ও লিফলেট নিয়ে শতাধিক সদস্য সেখানে অংশ নেন। একই দিনে সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনেও সভা করে। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের মিছিল-সমাবেশ করতে দেখা যায়।

dhakapost
উগ্রবাদী প্রবণতা আছে, আড়াল করার চেষ্টা বিপজ্জনক: ড. তৌহিদুল হক / ঢাকা পোস্ট

এমনকি গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে ভূমিকা রাখার দাবি করে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের জারিপত্র অনুযায়ী নিজেদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদনও জানায় সংগঠনটি। এ লক্ষ্যে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করে।

‘হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ’: পুলিশ সদর দপ্তর

হিযবুত তাহরীরের এই প্রকাশ্য তৎপরতার মুখে গত ২০২৫ সালের ৭ মার্চ এক জরুরি বার্তায় পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, হিযবুত তাহরীর একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন এবং আইন অনুযায়ী এর সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯’ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ যেকোনো সংগঠনের কার্যক্রম দণ্ডনীয় অপরাধের শামিল। এর আওতায় হিযবুত তাহরীরের সভা, সমাবেশ, মিছিল, পোস্টার বা লিফলেট বিতরণ এবং প্রচারের যেকোনো চেষ্টা আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা

নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে হিযবুত তাহরীরের প্রচার-প্রচারণা ও লিফলেট বিতরণ থেমে নেই। সংগঠনটি দাবি করছে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে তাদের কর্মীরাও মাঠে ছিল।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, ৫ আগস্টের পর উগ্রবাদে জড়িত যাদের ধরা হয়েছে, তারা অত্যন্ত প্রাথমিক (ইনিশিয়াল) পর্যায়ের। আমরা অভ্যন্তরীণ নজরদারি করছি এবং সর্বদা সজাগ আছি। গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো প্রতিনিয়ত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে হিযবুত তাহরীর সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে, তবে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমরা তাদের কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটর করছি।

dhakapost
বিশ্বব্যাপী এখন উগ্র বা জঙ্গিবাদের আগের মতো অ্যালার্মিং অবস্থা নেই: ব্রি. জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত

পাকিস্তানে ২০০৮ সালে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশে চার তরুণের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। সুনির্দিষ্ট সংশ্লিষ্টতা পেয়েই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে, তারা বড় ধরনের কোনো হামলা করার মতো অবস্থায় ছিল না, কেবল যোগাযোগ স্তরে ছিল।’ 

তিনি আরও যোগ করেন, “উগ্রবাদের এখন নানান ধরন (প্যাটার্ন) দেখা যাচ্ছে। গণমাধ্যমে হামলা, মাজার কিংবা লালনের আখড়ায় হামলা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘মব জাস্টিস’ বা মব ভায়োলেন্সও কিন্তু উগ্রবাদেরই অংশ। আমরা এগুলো নিয়ে কাজ করছি এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। উগ্রবাদকে একদম প্রাথমিক স্তরেই (ফার্স্ট লেয়ার) নির্মূল করা সবচেয়ে শ্রেয় এবং সরকারের পক্ষ থেকেও সেই স্পষ্ট বার্তা রয়েছে।”

আদালত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গির খোঁজ মেলেনি পৌনে চার বছরেও

২০২২ সালের ২০ নভেম্বর ভরদুপুরে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ থেকে প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের সহযোগীরা। দীর্ঘ পৌনে চার বছর পার হয়ে গেলেও এখনও পলাতক সেই দুই জঙ্গির কোনো হদিস বা শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সিটিটিসির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হলি আর্টিজানের মতো সুপরিকল্পিত ও নিখুঁত হামলাকে সবসময় স্মরণে রাখা উচিত। জঙ্গি বা উগ্রবাদ ইস্যুতে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ঝুঁকি বিবেচনায় প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে; কারণ ‘ব্যক্তি মরলেও মতাদর্শ কখনও মরে না’।

উগ্রবাদী প্রবণতা আছে, আড়াল করার চেষ্টা বিপজ্জনক: ড. তৌহিদুল হক

উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদ নিয়ে এই রাজনৈতিক শব্দচয়ন ও আত্মতুষ্টির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা যে শব্দই ব্যবহার করি না কেন— জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ কিংবা উগ্র মতবাদ ধারণকারী গোষ্ঠী; দেশে তাদের এই প্রবণতা ও অস্তিত্ব আছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে এই বিষয়গুলো সরাসরি স্বীকার করতে চায় না।’

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান বিএনপি সরকারও ‘সহনশীল শব্দ’ ব্যবহার করে উগ্রবাদের প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যেতে বা আড়ালে রাখতে চাচ্ছে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগায় উগ্রবাদী ও অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলো, যারা জোরজবরদস্তিমূলকভাবে নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়। দেশে বিভিন্ন উগ্রবাদী হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা দেশের বাইরে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই এর প্রমাণ মেলে।”

ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ‘হলি আর্টিজান হামলার সময়ও আমরা বলেছিলাম, এই অগণতান্ত্রিক শক্তির অপচেষ্টাকে রাজনীতির বিষয়বস্তু না বানিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির প্রশ্নে জাতীয়ভাবে সমাধান করতে হবে। কিন্তু বিগত সরকার এটিকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, আর বর্তমান সরকারও শব্দগত মারপ্যাঁচে একে আড়াল করার চেষ্টা করছে। এই আড়ালের সুযোগে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা, লোকবল ও অনুসারী বাড়ানোর প্রক্রিয়া ভেতরে ভেতরে আরও মজবুত হচ্ছে।’

dhakapost
ওই ভয়াবহ হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নেপথ্যের লোমহর্ষক অনেক তথ্য উন্মোচন করে / সংগৃহীত ছবি

নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই উগ্রবাদকে মোকাবিলা করতে হবে।’

আগের মতো অ্যালার্মিং অবস্থা নেই: ব্রি. জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী এখন উগ্র বা জঙ্গিবাদের সেই আগের মতো শঙ্কা নেই। ১০-১৫ বছর আগে উগ্রবাদের যে আন্তর্জাতিক উৎস ও জোয়ার ছিল, তা এখন অবলুপ্ত। ফলে বড় কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব এখন আর ওইভাবে পাওয়া যায় না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি মনে করি, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অবস্থা আগের মতো আশঙ্কাজনক নয়।’

তিনি আরও বলেন, “এখন যদি আমাদের দেশে কেউ জঙ্গিবাদের জুজু দেখায়, তবে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (পলিটিক্যালি মোটিভেটেড) হতে পারে। আমার মনে হয় না যে, দেশে আবার হলি আর্টিজানের মতো নতুন কোনো বড় হামলা হওয়ার মতো ‘অ্যালার্মিং’ পরিস্থিতি আছে বা তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে। কারণ, এই অঞ্চলে এখন উগ্রবাদের ভূ-রাজনৈতিক উর্বরতা নেই।”

ভারতের গণমাধ্যমে ‘বাংলাদেশে হামাসের তৎপরতা রয়েছে’ সংক্রান্ত খবরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত বা ইসরায়েল থেকে এমন তথ্য আসতেই পারে যে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির উপাদান আছে। তবে, শঙ্কার বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে না দিয়ে, নিরাপত্তার স্বার্থে সব ধরনের তথ্যই আমাদের গোয়েন্দা বিবেচনায় রাখা উচিত।’

dhakapost
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উগ্রবাদ ইস্যুতে রাজনৈতিক আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই / সংগৃহীত ছবি

সাইবার মনিটরিং ও আইনি তৎপরতায় এটিইউ ও র‍্যাব

পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের দেশ ও বর্তমান সরকার কোনো ধরনের উগ্রবাদকে সমর্থন করে না। দেশের মানুষ স্বভাবগতভাবেই শান্তিপ্রিয়। তবে, অনলাইনের এই যুগে মানুষ ঘরে বসেই নানা মতবাদে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। ইন্টারনেট বা ইউটিউব দেখে কথিত ধর্মীয় চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে একা একা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া (লোন উলফ) ঠেকাতে আমাদের সাইবার অ্যাক্টিভিটিজ ও সাইবার পেট্রোলিং জোরদার করা হয়েছে। সরকারের অবস্থান উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।’

উগ্রবাদ নিয়ে তৈরি হওয়া এই আত্মতুষ্টির মধ্যে ঝুঁকি কমানোর প্রস্তুতি নিয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘শুধু উগ্রবাদ নয়, যেকোনো ধরনের অপরাধ দমন ও অপরাধীদের নিষ্ক্রিয় করতে র‍্যাব সর্বদা সচেষ্ট ও প্রস্তুত। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের সাইবার টিম ২৪ ঘণ্টাই সাইবার জগৎ মনিটর করছে, যাতে উগ্রবাদের কোনো উপাদান ডালপালা মেলতে না পারে।’

‘জিহাদ’ পবিত্র বিধান, একে সন্ত্রাস বা উগ্রবাদের সমার্থক বানানোর সুযোগ নেই: শায়খ আহমাদুল্লাহ

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, জনপ্রিয় ইসলামি চিন্তাবিদ ও দাঈ শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ইসলামে ‘জিহাদ’ একটি অত্যন্ত পবিত্র, গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিধান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, একদিকে ইসলামের এই মহান বিধান ‘জিহাদ’ শব্দটাকেই জঙ্গিবাদের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করার একটি ঢালাও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা তৈরি হয়েছিল; অন্যদিকে কিছু মানুষের আবেগকে পুঁজি করে জিহাদের নামে নানাবিধ বিশৃঙ্খল ও উগ্র কর্মকাণ্ডও লক্ষ্য করা গেছে। এই দুই চরমপন্থার কারণে ইসলামের জিহাদের মূল ও প্রকৃত রূপটি সাধারণ মানুষের কাছে বারবার ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এবং ইসলামের সঠিক বার্তা প্রতিষ্ঠা করতে আলেম সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েকটি জরুরি দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন—

১. জিহাদকে ঢালাওভাবে জঙ্গিবাদ বলার প্রবণতা পরিহার করতে হবে

‘জিহাদ’ মহান আল্লাহর নির্দেশিত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিধান। বেশ কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দমনের উদ্দেশ্যে এই শব্দটির মারাত্মক অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে এবং জিহাদকে সন্ত্রাসের সমার্থক শব্দে পরিণত করার চেষ্টা চলছে; এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে আলেম সমাজকে সাধারণ মানুষের সামনে জিহাদের সঠিক রূপ, উদ্দেশ্য ও ব্যখ্যা তুলে ধরতে হবে। তবেই জিহাদের নাম ব্যবহার করে তৈরি করা সব বিভ্রান্তির পথ সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

dhakapost
‘জিহাদ’ পবিত্র বিধান, একে সন্ত্রাস বা উগ্রবাদের সমার্থক বানানোর সুযোগ নেই: শায়খ আহমাদুল্লাহ / ঢাকা পোস্ট

২. জিহাদের নামে সমাজে বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই

ইসলাম শান্তির ধর্ম এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম মূল নীতি। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে— “ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) হত্যার চেয়েও মারাত্মক।” (সূরা বাকারা: ২১৭)। জিহাদ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা গোপন সংগঠনের খেয়ালখুশি মতো কিংবা নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে ঘোষণা করার বিষয় নয়; এটি সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও বৈধ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হওয়ার বিষয়। সুতরাং, জিহাদের পবিত্র নাম ব্যবহার করে নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করা বা জানমালের ক্ষতি করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। যারা এগুলো করছে, তারা মূলত জিহাদের নামে সমাজে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে; যা অনেক ক্ষেত্রে জিহাদকে কলঙ্কিত করতে পশ্চিমাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।

৩. মাদ্রাসা বনাম সাধারণ শিক্ষা: উগ্রবাদকে এই চশমা দিয়ে দেখা যাবে না

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বৈষম্যমূলক ও বাঁকা দৃষ্টি দেওয়ার প্রবণতা এ দেশে বহু পুরনো। অকারণে দীর্ঘ সময় ধরে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ওপর জঙ্গিবাদের তকমা লেপে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে যখন হলি আর্টিজানের মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটল, তখন সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে উগ্রবাদের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে বৈষম্যহীন। মাদ্রাসা হোক বা সাধারণ শিক্ষা— যারাই ভুল ও উগ্রপন্থী পথে পা বাড়াবে, তাদের সবাইকে সমানভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কোনো প্রকার ‘ব্লেম-গেম’ বা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না করে তাদের সঠিক কাউন্সেলিং ও আদর্শিক সংশোধনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে জিহাদকে সন্ত্রাস ও বিভ্রান্তির সাথে গুলিয়ে ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. ইসলামের সংবেদনশীল বিষয়ের ব্যাখ্যা আলেমদের কাছ থেকেই নিতে হবে

আলেমগণ হলেন নবী কারীম (সা.)-এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। সুতরাং, মূলধারার আলেম সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং ইন্টারনেট বা কোনো গোপন ও অজানা চক্রের চরমপন্থী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে মুসলিম তরুণদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। ইসলামে মনগড়া ব্যাখ্যার কোনো স্থান নেই। জিহাদসহ ইসলামের যেকোনো সংবেদনশীল বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যা, নির্দেশনা ও ফতোয়া কেবল যোগ্য, গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং মূলধারার আলেমদের কাছ থেকেই গ্রহণ করতে হবে। আলেম সমাজের দায়িত্ব হলো জিহাদের সুমহান বিধানকে মানুষের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা এবং বিচ্ছিন্ন ও ভ্রান্ত মতবাদের অসারতা তরুণদের সামনে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা, যাতে তারা ফেসবুক-ইউটিউবের উগ্রবাদী প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়।

জেইউ/এমএআর/