বিজ্ঞাপন

আগাম জামিন পেতে ৩ মাসের অপেক্ষা, ‘ইমিডিয়েট রিলিফ’ কি তবে অতীত?

আগাম জামিন পেতে ৩ মাসের অপেক্ষা, ‘ইমিডিয়েট রিলিফ’ কি তবে অতীত?

আগাম জামিন (Anticipatory Bail) হলো একটি বিশেষ আইনি প্রতিকার, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা থাকলে গ্রেপ্তারের আগেই উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সাময়িক আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার আওতায় উচ্চ আদালত এই সুরক্ষা দিয়ে থাকেন।

কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হলে এবং তিনি যদি আশঙ্কা করেন যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার বা অযথা হয়রানি করতে পারেন, তখন তিনি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আগাম জামিনের আবেদন করতে পারেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা শুধু ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষাই নয়, বরং তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতে আগাম জামিন শুনানিতে দীর্ঘ বিলম্ব দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুই-তিনটি বেঞ্চে আগাম জামিনের আবেদন শুনানি হওয়ায় একটি পিটিশন শুনানির জন্য অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে যে প্রতিকার তাৎক্ষণিক সুরক্ষা (ইমিডিয়েট রিলিফ) দেওয়ার জন্য প্রবর্তিত, সেটিই সময়মতো মিলছে না। এতে আগাম জামিনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে এবং বিচারপ্রার্থীরা কাঙ্ক্ষিত আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

dhakapost

আগাম জামিনের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রেপ্তার বা হয়রানি এড়াতে তাৎক্ষণিক বিচারিক সুরক্ষা লাভ করা। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ আদালতে মাত্র দুই-তিনটি মোশন বেঞ্চে শুনানি হওয়ায় একটি সাধারণ আবেদন ঝুলে থাকছে প্রায় দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত। ফলে যে জরুরি প্রতিকারটি দ্রুততম সময়ে নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রবর্তিত হয়েছিল, দীর্ঘ শুনানির গোলকধাঁধায় পড়ে আজ তা পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ছে

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম জামিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যই হলো তাৎক্ষণিক বিচারিক সুরক্ষা। শুনানি যদি মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়, তাহলে এই আইনি প্রতিকারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। তারা বলছেন, হাইকোর্টের সব ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে আগাম জামিন শুনানির ব্যবস্থা করা এবং দ্রুত শুনানি নিশ্চিত করা না গেলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে বিলম্বিত বিচার ন্যায়বিচারকে সংকুচিত করবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘কার্যত আমাদের হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিনের যে উদ্দেশ্য, সেই উদ্দেশ্য অনুযায়ী এখন শুনানি করা যাচ্ছে না। আগাম জামিন মানেই হলো মানুষ একটি তাৎক্ষণিক আইনি প্রটেকশন চায়। কিন্তু আমরা দেখছি, একটি আগাম জামিন শুনানির তালিকায় আসার জন্যই দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো, নির্দিষ্ট দুই-তিনটি কোর্ট ছাড়া বাকি বেঞ্চগুলো আগাম জামিন শুনতে চান না। আমি মনে করি, সব ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চেই আগাম জামিন শুনানির ব্যবস্থা থাকা দরকার।’

‘এই জামিন যেন দ্রুত শুনানি হয়, তার জন্য প্রধান বিচারপতি এবং বারের নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি’ উল্লেখ করে এই ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, “অন্যথায় অ্যান্টিসিপেটরি বেইলের (Anticipatory Bail) যে মূল ধারণা, সেটিই আর কার্যকর থাকবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী এই পিটিশন শুনানি হয়। একসময় আগাম জামিনের জন্য আলাদা ‘৪৯৭-ক’ ধারা ছিল, যা পরবর্তীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪৯৮ ধারার অধীনেই এই বিধান চালু রাখা হয়েছে। আদালত সাধারণত চার, ছয় বা ক্ষেত্রবিশেষে আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন। এই সীমিত সময়ের প্রটেকশনটুকুও যদি মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে না পায়, তবে দেশের আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ দিন দিন কমে যাবে।”

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্টের সব ক্রিমিনাল মোশন বেঞ্চে আগাম জামিন শুনানি না হওয়াই এই দীর্ঘসূত্রিতার প্রধান কারণ। তাৎক্ষণিক প্রটেকশন পাওয়ার আইনি অধিকার যদি মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়, তবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা এবং আস্থাবোধ হ্রাস পাবে। প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট বারের পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসন করা এখন সময়ের দাবি

কোন প্রেক্ষাপটে আগাম জামিন নেওয়া হয়?

সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে নির্দোষ মনে করেন এবং বুঝতে পারেন যে তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখনই তিনি আগাম জামিনের আবেদন করেন। এর মূল প্রেক্ষাপটগুলো হলো—

মিথ্যা ও বানোয়াট মামলার আশঙ্কা: রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে কারও বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হলে বা মামলা করার হুমকি দেওয়া হলে।

সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা: সমাজে কোনো প্রতিষ্ঠিত বা সম্মানিত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন বা হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হলে।

dhakapost

গ্রেপ্তার ও হয়রানি এড়ানো: পুলিশ যেন অযৌক্তিকভাবে বা সঠিক তদন্ত ছাড়াই হুট করে গ্রেপ্তার করে হাজতে পাঠাতে না পারে, সেই অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা পাওয়ার জন্য।

ব্যবসায়িক বা পারিবারিক শত্রুতা: জমিজমা নিয়ে বিরোধ বা ব্যবসায়িক প্রতিহিংসার কারণে প্রতিপক্ষ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা ঠুকে দিলে তা মোকাবিলায় মানুষ আগাম জামিন চায়।

বিলম্বিত বিচার আসলে বিচার না দেওয়ারই সমতুল্য, যা বিচার বিভাগে এক ধরনের নজিরবিহীন ডেডলক তৈরি করেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিচার বিভাগ নাগরিক অধিকারের বিষয়ে আরও সচেতন হবে— এমনটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক মামলা থেকে হয়রানি এড়াতে আগাম জামিনের মতো এক্সট্রাঅর্ডিনারি আইনি সুরক্ষাকে সহজ ও সব বেঞ্চের জন্য উন্মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি

উল্লেখ্য, আগাম জামিন কোনো চিরস্থায়ী সমাধান নয়। আদালত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই জামিন দিয়ে থাকেন। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে (ম্যাজিস্ট্রেট বা ট্রায়াল কোর্ট) গিয়ে অবশ্যই নিয়মিত জামিনের আবেদন করতে হয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘মানুষ অনেক কষ্ট করে হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য আসেন। বহু বছর আগে বিচারপতি গৌরগোপাল সাহা বলেছিলেন— আদালতের আগাম জামিনে ইন্টারফেয়ার করা উচিত এই কারণে যে, এর মাধ্যমে মানুষ আইনের প্রক্রিয়ার মধ্যে আসে। কারণ হাইকোর্ট নির্দিষ্ট মেয়াদের (ছয় বা আট সপ্তাহ) বেইল দেওয়ার পর আল্টিমেটলি তাকে নিচের কোর্টেই সারেন্ডার (আত্মসমর্পণ) করতে হয়। সেখানে সারেন্ডার না করলে সে স্থায়ীভাবে আইনি জটিলতায় পড়ে যায় এবং ভবিষ্যতে মামলা পরিচালনা করাও দুষ্কর হয়।’

অতীতের বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এই আগাম জামিনকে যে কয়েকজন ভদ্রলোক অত্যন্ত কঠিন করেছিলেন, তাদের মধ্যে সাবেক বিচারপতি এইচ. এম. শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং সাবেক বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক দুর্ভাগ্যবশত এখন কারাগারে আছেন। আরও একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, যাক উনি বাইরে আছেন। তখনকার বিচারালয় ও বিচার বিভাগ মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। আগাম জামিন নিয়ে বাড়াবাড়ি— এরকমই। এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হয়েছিল।’

dhakapost

‘আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, ৫ আগস্টের এত বড় জনজোয়ারের পর আমাদের বিচার বিভাগ মানুষের অধিকারের ব্যাপারে আরও বেশি সচেতন হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগাম জামিন নেহায়েতই একজন মানুষকে মানসিক শান্তি দেয় যে, সে একটু সময় পেল এবং নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেল। হয়রানিমূলক মামলা কেয়ারটেকার আমল, আওয়ামী লীগ আমলসহ সব সময়ই হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তাই আমি মনে করি, হাইকোর্ট বিভাগের প্রতিটি ফৌজদারি বেঞ্চের প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন আগাম জামিনের আবেদন শোনা উচিত। আমি প্রত্যাশা করব, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এবং জজ আদালতগুলো ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা মনে রাখবে।’

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান আগাম জামিনকে একটি ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি প্র্যাকটিস’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘যখন আশঙ্কা করা হয় যে কোনো আসামি অযথা হয়রানির শিকার হতে পারেন বা তিনি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবেন না, তখনই এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। হয়রানি থেকে বাঁচানোর জন্যই এই প্র্যাকটিস। আগে নিয়ম ছিল, কোনো মামলা দায়েরের এক বা দুই মাস পর আগাম জামিন চাইলে কোর্ট বলতো— হয়রানি থেকে বাঁচতে হলে তো ইমিডিয়েটলি আসা দরকার ছিল, এত পরে কেন? অর্থাৎ তাৎক্ষণিকতার একটা বাধ্যবাধকতা ছিল।’

বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনে তিনি বলেন, “এখন দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। মামলা ফাইল করার পর তিন বা চার মাসের মধ্যে শুনানির সুযোগই পাওয়া যাচ্ছে না। যে চিন্তা থেকে আগাম জামিনের প্র্যাকটিস করা হতো, এখন তার পুরোপুরি বিপরীত ঘটছে। বিচারপ্রার্থীদের এই দীর্ঘসূত্রিতা আসলে ‘বিচার না দেওয়ারই’ নামান্তর। এই মুহূর্তে পুরো বিচার বিভাগেই এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে, যা আগাম জামিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। অতীতে আগাম জামিনের ক্ষেত্রে এমন ডেডলক আমরা আর দেখিনি। আগে পিটিশন সাবমিট করার এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে শুনানি করা যেত, এখন যা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”

‘আমরা দাবি জানাব, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আগাম জামিনের ব্যবস্থাটিকে আরও উন্মুক্ত ও সহজ করা হোক’— যোগ করেন তিনি।

এমএইচডি/এমএআর/