বিজ্ঞাপন

বিমানকে বিশ্বমানে, পর্যটনকে বিশ্বদরবারে নিতে কাজ করছি

বিমানকে বিশ্বমানে, পর্যটনকে বিশ্বদরবারে নিতে কাজ করছি

দেশের এভিয়েশন ও পর্যটন খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ, নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু, হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া কমানো এবং আন্তর্জাতিক মানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ, জাতীয় ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং পর্যটন খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এসব উদ্যোগ, সরকারের অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা পোস্ট-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের চিফ রিপোর্টার মো. আদনান রহমান

ঢাকা পোস্ট: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এমিরেটসেরও আগে প্রতিষ্ঠিত। অথচ এমিরেটস বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইন্স হলেও বিমান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এখনও পিছিয়ে। আপনার মতে, এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ কী এবং এই অবস্থান থেকে বিমানকে বিশ্বমানের এয়ারলাইন্সে পরিণত করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

আমরা ১৪টি বোয়িং কেনার পাশাপাশি আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার পরিকল্পনা নিয়েছি। বর্তমানে থাকা উড়োজাহাজগুলোর সঙ্গে এগুলো যুক্ত হলে বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হবে। আমাদের অনেক আন্তর্জাতিক রুটে ফ্রিকোয়েন্সি থাকলেও পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকায় সেগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বহর বাড়লে সেই সুযোগ তৈরি হবে

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: অতীতে (ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে) পরিচালনা পর্ষদ যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেভাবে করেনি। জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স হিসেবে বিমানের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে, যেখানে এভিয়েশন ও ব্যবসা সংক্রান্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি বহর (ফ্লিট) সম্প্রসারণ, নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহ, লিজে বিমান আনা, ক্যাডেট পাইলট নিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরির কাজ চলছে।

আমরা ১৪টি বোয়িং কেনার পাশাপাশি আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার পরিকল্পনা নিয়েছি। বর্তমানে থাকা উড়োজাহাজগুলোর সঙ্গে এগুলো যুক্ত হলে বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হবে। আমাদের অনেক আন্তর্জাতিক রুটে ফ্রিকোয়েন্সি থাকলেও পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ না থাকায় সেগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বহর বাড়লে সেই সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিরাপত্তা ও সেবার মান পূরণে আমরা কাজ করছি।

dhakapost

আমাদের লক্ষ্য— আন্তর্জাতিক মান অর্জন করে ভবিষ্যতে নিউইয়র্কসহ গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পুনরায় ফ্লাইট চালু করা। পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছর নাগাদ মানুষ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাবেন।

আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি মাস বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট নিয়ে ডিসেম্বরে যাত্রীসেবা শুরু হবে এবং আগামী বছরের মার্চের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে

ঢাকা পোস্ট: বিমানের বহর সম্প্রসারণে নতুন উড়োজাহাজ কেনা ও লিজে আনার পরিকল্পনা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার বর্তমান অগ্রগতি কী? যাত্রীরা কবে নাগাদ এর সুফল পাবেন?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: আমরা বিমান কেনা ও লিজের পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে চাই। এজন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪০টি আবেদন থেকে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হবে।

আমাদের আশা, চলতি বছরের শেষ নাগাদ লিজে আনা প্রথম উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হবে। প্রাথমিকভাবে অন্তত চারটি ওয়াইড-বডি এবং কিছু ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। রুট চাহিদার ওপর নির্ভর করে এ বছর সর্বোচ্চ ১০টি উড়োজাহাজ লিজে আনার বিষয়টি বিবেচনাধীন।

অন্যদিকে, এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। তবে, নতুন উড়োজাহাজের ডেলিভারি পেতে কয়েক বছর (২০৩১ সাল) সময় লাগবে। তাই মধ্যবর্তী সময়ে লিজে উড়োজাহাজ এনেই ফ্লাইট পরিচালনা কার্যক্রম শক্তিশালী করা হবে।

ঢাকা পোস্ট: দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, বিমানের নেতৃত্বে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের চেয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য বেশি ছিল। ভবিষ্যতে কি এখানে বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে?

বিশ্বের অনেক মানুষই জানেন না যে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত। তাই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কক্সবাজারসহ দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং সেগুলোকে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: আমরা ইতোমধ্যে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ডেপুটি এমডি পদে পরিবর্তন এনেছি। আমাদের বিশ্বাস, একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) নেতৃত্বে বিমান আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে।

আমরা প্রতিষ্ঠানটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চাই। সে কারণেই পরিচালনা পর্ষদে এভিয়েশনের পাশাপাশি ব্যবসা ও করপোরেট ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে। এভিয়েশন দক্ষতা ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে বিমান একটি পেশাদার ও টেকসই প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দীর্ঘদিন চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি কত দূর?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: তৃতীয় টার্মিনাল চালু করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা শুধু টার্মিনাল চালুর দিকেই নজর দিইনি, বরং আগের অসম রাজস্ব বণ্টন চুক্তিটি পর্যালোচনা করেছি। 

 

আগের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব শেয়ার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ, যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। তাই জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে একাধিক দফায় সফল পুনঃআলোচনা (রি-নেগোসিয়েশন) করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমনকি জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

আলোচনার ফলে আমাদের রাজস্ব অংশ প্রথমে ২২ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ২৭ শতাংশে উন্নীত করতে জাপান সরকার সম্মত হয়েছে। নতুন চুক্তি শিগগিরই সই হবে। ফলে প্রকল্পের ঋণ সময়মতো পরিশোধ করা সহজ হবে এবং দেশের আর্থিক স্বার্থ আরও সুরক্ষিত হবে।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের জাপানি অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি মাস বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত চুক্তি সই হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট নিয়ে ডিসেম্বরে যাত্রীসেবা শুরু হবে এবং আগামী বছরের মার্চের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, ইনশাআল্লাহ।

ঢাকা পোস্ট: তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় বিমানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী? বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতাকে কীভাবে দেখছেন?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: আমরা প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচকভাবে দেখি, কারণ এতে সেবার মান উন্নত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সফলভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে আমরা যুক্ত করতে চাই। এতে আমাদের জনবল আধুনিক প্রশিক্ষণ পাবে এবং নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা যুক্ত হবে। একই সঙ্গে সেবার খরচও যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর এবং সুইজারল্যান্ডের ‘সুইসপোর্ট’-সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করে আবেদন করেছে। আমরা সব প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করছি। যেহেতু এটি রাজস্ব ভাগাভাগির (রেভেনিউ শেয়ারিং) ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও এর অংশীদার থাকবে; তাই যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে।

ঢাকা পোস্ট: শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি, লাগেজ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র নেওয়া কিংবা লাগেজ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: এসব অনিয়মের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা অস্বীকার করা যায় না। তবে, আমাদের কঠোর নজরদারির ফলে গত দুই মাসে লাগেজ চুরি বা কেটে মালামাল নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানেই প্রশাসনিক দুর্বলতা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আমরা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যেখানে দুর্বলতা বা অনিয়ম পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো বিমানবন্দরের সার্বিক পরিচালনা আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও যাত্রীবান্ধব করা। পাশাপাশি বিমানের প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকেও আরও কার্যকর করা হচ্ছে, যাতে দেশি-বিদেশি সব যাত্রী আন্তর্জাতিক মানের সেবা পান।

আমাদের লক্ষ্য হলো পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে পরিণত করা; যাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়

ঢাকা পোস্ট:  প্রতি বছরই হজের মৌসুমে বিমান ভাড়া নিয়ে সমালোচনা হয়, কারণ মোট ব্যয়ের বড় একটি অংশই বিমান ভাড়া। হজযাত্রীদের খরচ কমাতে সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বেসরকারি এয়ারলাইন্স যুক্ত করে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম হজ মৌসুমেই আমরা বিমানের ভাড়া কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি। আগের মৌসুমে বিমানের ভাড়া ছিল প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। আমরা সেটি কমিয়ে ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকায় এনেছি।

যেহেতু অধিকাংশ হজযাত্রীই মধ্যবিত্ত এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় কিংবা সম্পদ বিক্রি করে হজে যান, তাই তাদের আর্থিক চাপ কমানো আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। সেই লক্ষ্যে বিমানের মুনাফা কিছুটা কমিয়ে টিকিটের মূল্য আরও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরব দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন ফি ও চার্জ কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। আমাদের লক্ষ্য, হজের বিমান ভাড়া ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার নিচে নিয়ে আসা। এটি সম্ভব হলে একজন হজযাত্রীর প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হবে। আর সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও কিছু চার্জ কমানো গেলে হজ প্যাকেজের মোট ব্যয় আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা কমতে পারে।

শুধু বিমান ভাড়া নয়, হজযাত্রীদের সার্বিক সেবার মান উন্নয়নেও আমরা কাজ করছি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে হাজি ক্যাম্পে সকালের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে, হজযাত্রীদের সেবা থেকে কোনো মুনাফা করা যাবে না। আমাদের লক্ষ্য, হজযাত্রীরা যেন কম খরচে আরও উন্নত ও মানবিক সেবা পান।

ঢাকা পোস্ট: ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো ধারাবাহিকভাবে বহর সম্প্রসারণ করছে। একই সঙ্গে নতুন কয়েকটি এয়ারলাইন্সও বাজারে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের বিকাশ ও প্রতিযোগিতা নিয়ে সরকারের নীতি কী?

dhakapost

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: আমরা বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখি। বাংলাদেশে যত বেশি উড়োজাহাজ আসবে এবং পরিচালিত হবে, ততই দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাত সম্প্রসারিত হবে এবং এ খাত থেকে আয়ও বাড়বে। তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় আড়াই কোটি যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হবে, যেখানে বর্তমানে সক্ষমতা ১ কোটি ২০ লাখের মতো।

দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো যদি তাদের বহর বাড়াতে চায় কিংবা নতুন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায়, সরকার সেটিকে স্বাগত জানায়। আমরা বিশ্বাস করি, সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়লে সেবার মানও উন্নত হবে। তখন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকেও আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। শেষ পর্যন্ত এর সুফল ভোগ করবেন যাত্রীরাই।

একই সঙ্গে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোরও বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বাড়ছে। তবে, আমাদের অবকাঠামোগত সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি রানওয়ে থাকায় প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি উড়োজাহাজ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও এই সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি দূর হবে না।

আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত যাত্রীচাহিদা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এরপর ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যা ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের যাতায়াতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

নতুন বেসরকারি এয়ারলাইন্স পরিচালনার জন্যও কয়েকটি আবেদন পেয়েছি। সেগুলো দেশের প্রয়োজন, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং বিদ্যমান নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট: কোভিড-১৯ মহামারির পর বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে সরকারের পরিকল্পনা কী?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: বাংলাদেশে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত রয়েছে, যা আমাদের অন্যতম বড় পর্যটন সম্পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা এখনও এই অনন্য সম্পদকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি। বিশ্বের অনেক মানুষই জানেন না যে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশে অবস্থিত। তাই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কক্সবাজারসহ দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং সেগুলোকে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা বিভিন্ন পর্যটন স্থাপনা ও প্রকল্পকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যুক্ত হলে পর্যটন খাতের অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা, সেবার মান এবং বৈশ্বিক প্রচার সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১১৪টি পর্যটন স্পট রয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে এসব গন্তব্যের অবকাঠামো উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। একই সঙ্গে এসব স্থানে আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিদেশি পর্যটকরা একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে পারেন।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট: দেশের পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতীয় ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ কত দূর?

এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত: হ্যাঁ, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা একটি সমন্বিত ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ করছি। বর্তমানে এর প্রণয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আমরা আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই এটি চূড়ান্ত হবে।

এই মাস্টারপ্ল্যান শুধু একটি নীতিগত দলিল হবে না; বরং আগামী দিনের পর্যটন উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা এবং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার পর আমরা ধাপে ধাপে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করব। আমাদের লক্ষ্য হলো পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে পরিণত করা; যাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এই খাতের অবদান আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

এআর/এমএআর