বিজ্ঞাপন

১৪ মাসের ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু পেল ভুল রক্তের প্লাটিলেট!

১৪ মাসের ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু পেল ভুল রক্তের প্লাটিলেট!

১৪ মাস বয়সী ফুটফুটে শিশু আয়মান। ব্লাড ক্যান্সারের অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ায় (এএলএল) আক্রান্ত হয়ে গত দেড় মাস ধরে হাসপাতালের শয্যায় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে সে। ক্যান্সারের কারণে আয়মানের শরীরে হিমোগ্লোবিন ও প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাচ্ছিল। ফলে তাকে বারবার প্লাটিলেট ও ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (এফএফপি) দিতে হয়েছে। তবে, চিকিৎসার প্রায় এক মাস পর পুনরায় রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যায়, এতদিন যে গ্রুপের রক্ত উপাদান তাকে দেওয়া হয়েছে, সেটি শিশুটির প্রকৃত রক্তের গ্রুপই নয়!

অর্থাৎ, ‘এ-পজিটিভ’ এক শিশুকে টানা ‘এ-নেগেটিভ’ গ্রুপের প্লাটিলেট ও প্লাজমা দেওয়ার পাশাপাশি, প্রতিবার নতুন নমুনা (স্যাম্পল) ছাড়া ভুয়া ক্রসম্যাচিং রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর মগবাজারের ‘ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার’ নামের একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

যেভাবে ভুল রক্তের গ্রুপে শুরু হয় চিকিৎসা

ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২ জুন শিশু আয়মানকে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা দ্রুত প্লাটিলেট সংগ্রহের তাগিদ দিলে হাসপাতাল থেকে দেওয়া চাহিদাপত্র নিয়ে শিশুটির বাবা মামুন হোসেন মগবাজারের ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টারে যান। শিশু হাসপাতালের দেওয়া নথিতে রক্তের গ্রুপ লেখা ছিল ‘এ-নেগেটিভ’। ব্লাড ব্যাংকের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, নমুনা পরীক্ষা ও ডোনারের সঙ্গে ক্রসম্যাচিং করে একই ফল পাওয়া গেছে।

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ১৪ মাসের শিশু আয়মানের প্রকৃত রক্তের গ্রুপ ‘এ-পজিটিভ’। তবে, চিকিৎসকদের ভুলেই হোক কিংবা গাফিলতিতে, দীর্ঘ এক মাস তাকে ‘এ-নেগেটিভ’ গ্রুপের ১৪ ব্যাগ প্লাটিলেট ও তিন ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া হয়। এতে প্লাটিলেট না বেড়ে শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে অন্য হাসপাতালে পুনর্নিরীক্ষায় সঠিক রক্তের গ্রুপ প্রকাশ পায়

এরপর ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই ছেলের জন্য মোট ১৪ ব্যাগ প্লাটিলেট ও তিন ব্যাগ ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (এফএফপি) সংগ্রহ করেন বাবা মামুন। এর মধ্যে দুই ব্যাগ শিশু হাসপাতালে এবং বাকি ১২ ব্যাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় শিশুটির শরীরে দেওয়া হয়।

dhakapost
ব্লাড ক্যান্সারের অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ায় (এএলএল) আক্রান্ত শিশু আয়মান / ঢাকা পোস্ট

টানা প্লাটিলেট দিলেও বাড়ছিল না মাত্রা, নতুন টেস্টে মেলে আসল গ্রুপ

ধারাবাহিকভাবে প্লাটিলেট দেওয়ার পরও আয়মানের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জান্নাত আরা বলেন, “আমাদের এখানে ৮ জুন ভর্তি হওয়ার পর একের পর এক প্লাটিলেট দেওয়া হয়। তবে, প্লাটিলেটের সংখ্যা না বাড়ায় গত ২৮ জুন স্বজনদের অন্য স্থান থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহের পরামর্শ দেই। পরে তারা এ-নেগেটিভ ডোনার ও বাচ্চার নমুনা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) গেলে দেখা যায়, শিশুটির রক্তের গ্রুপ ‘এ-পজিটিভ’। পরবর্তীতে পপুলার ও ঢাকা মেডিকেলেও পরীক্ষা করা হলে সেখানেও ‘এ-পজিটিভ’ আসে। এরপর এ-পজিটিভ প্লাটিলেট দেওয়ার পর থেকেই শিশুটির প্লাটিলেট বাড়তে শুরু করে।”

বর্তমানে ডায়রিয়াসহ কয়েকটি ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতার কারণে শিশুটি দুর্বল থাকায় তার কেমোথেরাপি শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নমুনা ছাড়াই প্রতিবার বিল ও ভুয়া ক্রসম্যাচিং রিপোর্ট!

ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল— উভয় প্রতিষ্ঠানের রক্তের চাহিদাপত্রেই রক্তের গ্রুপ ‘এ-নেগেটিভ’ উল্লেখ ছিল। কিন্তু ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিসের ভূমিকা নিয়ে উঠে এসেছে গুরুতর প্রশ্ন।

মগবাজারের ‘ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস’ নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রথম দিনের পর আর কোনো রক্ত পরীক্ষা করেনি। শিশুটির পরিবারের কাছ থেকে শুধু মোবাইলে অর্ডার নিয়ে নিয়মিত প্লাটিলেট সরবরাহ করা হতো। অথচ প্রতিবারই স্যাম্পল ছাড়াই রক্ত পরীক্ষা, স্ক্রিনিং ও ক্রসম্যাচিংয়ের খরচ আদায় করে সম্পূর্ণ ভুয়া ও মনগড়া ‘কম্প্যাটিবল’ রিপোর্ট তুলে দেওয়া হতো স্বজনদের হাতে

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হোসেন জানান, রোগীর রক্তের নমুনা কেবল প্রথম দিনই তাদের কাছে আনা হয়েছিল। সেদিনই পরীক্ষা করে এ-নেগেটিভ ফল পাওয়া যায় এবং ডোনারের সঙ্গে ক্রসম্যাচিং সম্পন্ন করার পর ৩ জুন দিবাগত রাতে প্রথম প্লাটিলেট সরবরাহ করা হয়। এরপর স্বজনেরা শুধু ফোনে প্লাটিলেটের প্রয়োজনীয়তা জানাতেন, আর তারা ডোনার জোগাড় করে প্লাটিলেট প্রস্তুত করে দিতেন। কোনো নতুন রক্তের নমুনা আর নেওয়া হয়নি।

dhakapost
শিশু আয়মানের ব্লাগ গ্রুপ রিপোর্ট / ঢাকা পোস্ট

তবে, ঢাকা পোস্টের হাতে থাকা নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পরবর্তী প্রতিবার প্লাটিলেট ও ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্লাড গ্রুপিং, স্ক্রিনিং ও ক্রসম্যাচিং বাবদ নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিবারই ‘পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে’ উল্লেখ করে পৃথক ‘কম্প্যাটিবল’ (ক্রসম্যাচ পরীক্ষায় কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলে অর্থাৎ দাতার রক্ত রোগীর নিরাপদে গ্রহণ করতে পারে) রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

নতুন স্যাম্পল ছাড়া কীভাবে প্রতিবার ক্রসম্যাচিং ও গ্রুপিং সম্ভব— এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হোসেন বলেন, ‘যেসব ডোনার আগে প্লাটিলেট দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রথম নমুনার ভিত্তিতেই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।’ এটি বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না বা প্রতিবার পরীক্ষার জন্য অর্থ নিয়েও কেন নতুন পরীক্ষা করা হয়নি— এ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি। 

প্রথম গ্রুপ ম্যাচিংয়ে আপনাদের এখানে ‘এ-নেগেটিভ’ এসেছে, কিন্তু বাংলাদেশ মেডিকেল, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ দিন পরে ব্লাড গ্রুপিং করালে সেখানে ‘এ-পজিটিভ’ কীভাবে আসে— এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হোসেন বলেন, “প্রথম যেদিন স্যাম্পল নিয়ে আমাদের এখানে আসে, সেদিন রাতে তাড়াহুড়ো করে আমরা গ্রুপিং করি। মূলত শিশু হাসপাতাল থেকে লিখে দেওয়া ব্লাড গ্রুপ ‘এ-নেগেটিভ’ দেখে আমরাও ‘এ-নেগেটিভ’ ধরে নিয়েছি। আমাদের ভুল হতে পারে, কিন্তু শিশু হাসপাতাল কীভাবে ব্লাড গ্রুপিং ভুল লিখে দিল? আপনি তাদের গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।”

dhakapost
ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার কর্তৃক ‘কম্প্যাটিবল’ রিপোর্ট / ঢাকা পোস্ট

৩ রুমের ব্লাড ব্যাংক, নেই নিবন্ধিত ল্যাব অবকাঠামো

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন মো. নাজমুল হোসেন। প্যাথলজিতে কোনো বিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং নিজেই প্লাটিলেট ও প্লাজমা সংগ্রহ করেন।

চিকিৎসা অবহেলা ও প্রতারণার অভিযোগে শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এক কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন ভুক্তভোগী বাবা। ঘটনার পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিশু হাসপাতাল। পাশাপাশি, দেশে ফিরেই লাইসেন্স বাতিলসহ দায়ী ব্লাড ব্যাংক ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বড় ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক

 দীর্ঘদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রক্ত সংগ্রহের কাজে যুক্ত থাকার পর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন তিনি। এটির অনুমোদন আছে কি না— জানতে চাইলে বলেন, ‘অবশ্যই আছে।’ 

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর একটি ভবনের পঞ্চম তলায় তিনটি ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বাইরে থেকে এটিকে ‘পূর্ণাঙ্গ ব্লাড ব্যাংক’ বলে বোঝার উপায় নেই। প্রয়োজনীয় ল্যাব অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনামূল্যে রক্ত সংগ্রহ করে রোগীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি ডোনারের যাতায়াত খরচও রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খান আনিসুর রহমান বলেন, “ল্যাব ফ্যাসিলিটি ভালো না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই সমস্যা হয়। অন-কল ভিত্তিতে ডাকলে আমি যাই, এছাড়া বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। সর্বশেষ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যখন বাচ্চার ব্লাড গ্রুপ ‘এ-পজিটিভ’ আসে, সম্ভবত ২ জুলাই; তখন আমাকে ফোন দেওয়া হয়। পরে আমি পুরোনো স্যাম্পল এবং নতুন করে ঢাকা মেডিকেল থেকে বাচ্চার শরীর থেকে নেওয়া রক্তের নমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করে আমিও ‘এ-পজিটিভ’ পাই।”

dhakapost
ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার / ঢাকা পোস্ট

দায় স্বীকার বনাম আইনি নোটিশ: শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, “আমাদের এখান থেকে প্রথম চাহিদাপত্রে ‘এ-নেগেটিভ’ লেখা হয়ে থাকলে সেটি আমরা স্বীকার করছি। তবে, যে ব্লাড ব্যাংক থেকে ব্লাড সংগ্রহ করা হয়েছে, সেখানে তো শিশুর রক্তের স্যাম্পল নিয়ে ব্লাড গ্রুপিং ও ডোনারের সঙ্গে ক্রসম্যাচিং করা হয়েছে। সেখানেও তো ব্লাড গ্রুপ ‘এ-নেগেটিভ’ এসেছে, সেটা তো আর আমাদের হাসপাতাল থেকে করা হয়নি। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ক্রসম্যাচিংয়ে তারা ‘কম্প্যাটিবল’ লিখে দিয়েছে। এটা লেখার অর্থ হলো ডোনারের রক্ত ও রোগীর রক্তের মধ্যে সবকিছু মিলেছে, অর্থাৎ ওই রক্ত দেওয়া যেতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “শিশুটির হিমোগ্লোবিন ৩.৭ থেকে বেড়ে ৯.৩ হয়েছে। ‘এ-নেগেটিভ’ দেওয়ার কারণে রিঅ্যাকশন হলে তো হিমোগ্লোবিন বাড়ত না।”

“শিশুটি অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। এ রোগের সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা আমাদের এখানেই হয়ে থাকে। বাচ্চাটির চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আমরা ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়ার  সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু স্বজনেরা ডিসচার্জ নিয়ে চলে যান। গতকাল তারা এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।”

ভুক্তভোগী বাবার আকুতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর হুঁশিয়ারি

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, লিউকেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অ্যান্টিজেনের প্রকাশ কমে যাওয়া রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা বিরল হলেও ঘটে। তাদের মতে, ‘এ-নেগেটিভ’ ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা দেওয়ায় রোগীর জন্য ক্ষতিকর হয়নি, বরং উপকার হয়েছে। এছাড়া, ‘এ-পজিটিভ’ রোগীকে ‘এ-নেগেটিভ’ প্লাটিলেট দেওয়ায় বড় ধরনের জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে রক্ত সংরক্ষণ, পরিবহন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না— বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা মামুন হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘খুব বিশ্বাস করে এই ব্লাড ব্যাংক থেকে আমার ছেলের জন্য ব্লাড নিয়েছি। শুধুমাত্র প্রথম দিন আমার সামনে ডোনারের কাছ থেকে ব্লাড নিয়েছে। এরপর তারা বলেছে, আপনার বারবার আসার দরকার নেই। শুধু ফোনে জানিয়ে দিলেই প্লাটিলেট ম্যানেজ করে আমাকে জানাবে। আমি গিয়ে টাকা পেমেন্ট করে প্লাটিলেট নিয়ে আসব।’

“প্লাটিলেটের টাকা জোগাড় করতেই দিন-রাত একাকার করে ফেলছি, তাদের প্রতি বিশ্বাস রেখে। কিন্তু দিনশেষে আমার বিশ্বাসের এই প্রতিদান পেলাম! যখন পিজিতে ৩০ তারিখ (জুন) টেস্ট করানোর পর ‘এ-পজিটিভ’ আসল, তখন তাকে জানানোর পর আমার ফোন আর রিসিভ করে না। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই, যেন আমার মতো আর কোনো বাবা তাদের হাতে এভাবে প্রতারিত না হয়।” 

dhakapost
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যাফরেসিস অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার / ঢাকা পোস্ট 

‘এই অপরাধের জন্য যদি আইনের মুখোমুখি হতে হয়, সেজন্য প্রস্তুত আছেন’ বলে জানান ব্লাড ব্যাংকটির পরিচালক নাজমুল হাসান। তিনি উল্টো যুক্তি দিয়ে বলেন, “আমি না হয় ভুল করেছি, কিন্তু ঢাকা মেডিকেল ও শিশু হাসপাতাল কীভাবে আমার কাছে ‘এ-নেগেটিভ’ রক্তের চাহিদাপত্র দেয়। আমার অপরাধ আছে মানি, কিন্তু তারা কী করেছে— সেটার উত্তর কি ওই হাসপাতালের আছে?”

এদিকে, এমন গুরুতর অবহেলা ও অনিয়মের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দুঃখজনক। আমি বর্তমানে দেশের বাইরে আছি, এ সপ্তাহেই ফিরে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। কোন প্রক্রিয়ায় তারা লাইসেন্স পেল, তা খতিয়ে দেখা হবে। আর শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল তাদের জনবল সংকটের কারণে হয়তো এতটা খেয়াল করতে পারেনি; তারপরও যদি কারও কোনো অবহেলা থাকে, তাহলে এর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এমএল/এমএআর