বিজ্ঞাপন

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে কোচিংমুখী অভিভাবকরা, চাপে শিশুরা

স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে কোচিংমুখী অভিভাবকরা, চাপে শিশুরা

স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়ায় লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আবারও ভর্তি পরীক্ষা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি হবে নামমাত্র একটি ভর্তি পরীক্ষা, যার জন্য আলাদা প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে না। তবে সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এরইমধ্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।

সম্ভাব্য ভর্তি পরীক্ষাকে সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভর্তি কোচিং বাণিজ্য। ‘ভালো স্কুলে চান্স পেতেই হবে’—এই মানসিকতায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের এখন থেকেই কোচিংয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে ভর্তি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক নীতিমালা ও কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কোমলমতি শিশুদের কাঁধে চাপছে পরীক্ষার ‘নতুন বোঝা’। একইসঙ্গে বাড়ছে পরিবারের শিক্ষা ব্যয় এবং শিশুদের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, উত্তরা, মতিঝিল, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা কয়েকগুণ বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পন্সর করা বিজ্ঞাপন, রাস্তার মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন, লিফলেট বিতরণ এবং নামকরা স্কুলগুলোর আশপাশে প্রচারণার মাধ্যমে অভিভাবকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন কৌশলে। অনেক প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে নিয়মিত ক্লাসও শুরু করেছে। কোথাও চার মাসের বিশেষ কোর্স, কোথাও আবার ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত ধারাবাহিক প্রস্তুতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাজধানীর বাইরেও বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলোতে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

dhakapost

পরিচয় গোপন রেখে রাজধানীর একাধিক কোচিং সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্যই সবচেয়ে বেশি ব্যাচ চালু করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ভর্তি ফি তিন হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মাসিক বেতন দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চার মাসের বিশেষ কোর্সের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করেছে। সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন ক্লাসের পাশাপাশি নিয়মিত মডেল টেস্ট, মূল্যায়ন পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র অনুশীলনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামকরা বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সাফল্যের দাবিও করছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানীতে অন্তত শতাধিক কোচিং সেন্টার ভর্তি প্রস্তুতির নামে ব্যাচ পরিচালনা করছে। জিনিয়াস, কোর ক্যাডেট একাডেমি, রেসিডেনসিয়াল ভর্তি কোচিং, উইসডম, জেএএসি, প্রয়াস, মাস্টারউইন একাডেমি, এসএ একাডেমি, ইকরা একাডেমিক অ্যান্ড অ্যাডমিশন কেয়ার, রাজউক কোচিং সেন্টার, ব্রাইট কোচিং সেন্টার, লাইসিয়াম, ব্রেইন ব্রাইড একাডেমিসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান জোরেশোরে ভর্তি কোচিংয়ের প্রচারণা চালাচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনে স্কুল অ্যাডমিশন কোচিং, স্কুল অ্যাডমিশন ডেস্ক, ফখরুল স্যারসহ আরও কয়েকটি প্ল্যাটফর্মও ভর্তি প্রস্তুতির কোর্স পরিচালনা করছে। একইসঙ্গে অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত টিউটরদের কাছেও বাড়ছে অভিভাবকদের ভিড়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই এই বাজার সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছে। মূলত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার, উদয়ন, হলি ক্রস, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট জোসেফ ও সেন্ট গ্রেগরিজের মতো নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই এই ভর্তি কোচিং বাজার গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি এখন নেমে এসেছে চার-পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কাছেও। রাজধানীর মালিবাগ, মতিঝিল, সিদ্ধেশ্বরী ও মিরপুর এলাকার কয়েকটি কোচিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, চার থেকে পাঁচ বছরের শিশুরাও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট ছোট শিশুরা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছে, আর বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তাদের অভিভাবকেরা। দীর্ঘদিন ধরে ভর্তি কোচিং পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, ২০২১ সালে লটারি পদ্ধতি চালুর পর ভর্তি কোচিং কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই অভিভাবকদের আগ্রহ দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক কেন্দ্রেই সকাল, দুপুর ও বিকেলে (তিন শিফটে) ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।

অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাই কোচিং বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় পুঁজি

গত কয়েকদিনে অভিভাবক, কোচিং পরিচালনাকারী ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভর্তি কোচিং ব্যবসার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ। সন্তান ভর্তি পরীক্ষার জন্য আলাদা প্রস্তুতি না নিলে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে পারে— এমন আশঙ্কাই অনেক পরিবারকে কোচিংমুখী করছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে অনেক অভিভাবক ভর্তি কোচিংয়ের বিরোধিতা করলেও প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত তারাও সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন।

অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তি পরীক্ষাকে ‘নামমাত্র’ বলা হলেও বাস্তবে সেটি এরইমধ্যে কোচিংনির্ভর প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে শুরু করেছে। তাই অন্যরা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন নিজের সন্তানকে কোচিংয়ে না পাঠিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই।

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার অভিভাবক আনিসুর রহমান বলেন, ‘ছোট বাচ্চাকে কোচিং করাতে চাইনি। কিন্তু অন্যরা যখন করছে, তখন না করালে আমার সন্তান পিছিয়ে পড়বে কি না—এই ভয় থেকেই ভর্তি করিয়েছি।’

dhakapost

রাবেয়া বসরি নামের আরেক অভিভাবক বলেন, ‘সরকার বলছে কোচিং লাগবে না। কিন্তু বাস্তবে যদি অন্যরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়, তাহলে আমার সন্তান প্রতিযোগিতায় টিকবে কীভাবে?’

মিরপুরের বাসিন্দা নাঈমা মিতু বলেন, ‘আমি নিজেই সন্তানকে পড়াই। তারপরও পরীক্ষার ধরন কেমন হবে, কী ধরনের প্রশ্ন আসবে এসব বুঝতে কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছি। এ জন্য সংসারের অন্য খাতের ব্যয়ও কমাতে হচ্ছে।’

শারমিন আক্তার নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘ছোট শিশুদের কোচিং করানোর পক্ষে আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু আশপাশের সবাই যখন ভর্তি কোচিংয়ে দিচ্ছে, তখন নিজের সন্তানকে না দিলে সে পিছিয়ে পড়বে এমন আশঙ্কা থেকেই বাধ্য হয়েছি।’

উত্তরার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম-কানুন এখনো স্পষ্ট হয়নি। এই অনিশ্চয়তার সুযোগই নিচ্ছে কোচিং সেন্টারগুলো। তারা এমনভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে, যেন কোচিং না করলে ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগই নেই। সরকার দ্রুত একটি স্পষ্ট নীতিমালা প্রকাশ করলে অভিভাবকদের এই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যেত।’

স্কুলে ভর্তিতে ‘নামমাত্র’ পরীক্ষা হবে, কোচিংয়ের প্রয়োজন নেই : শিক্ষামন্ত্রী

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সরকারি সিদ্ধান্তের পর অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই সন্তানদের সম্ভাব্য ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এখন থেকেই কোচিং সেন্টারে ভর্তি করাচ্ছেন। তবে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

সম্প্রতি সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এটি হবে একটি নামমাত্র পরীক্ষা। এ পরীক্ষার জন্য কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।’

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া এবং নামমাত্র পরীক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এমন একটি ব্যবস্থা করা হবে, যাতে অভিভাবকদের সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠানোর প্রয়োজন না হয়।’

dhakapost

সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি পরীক্ষা নেই, বিষয়টি মাধ্যমিকের : ববি হাজ্জাজ

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেই। তাই এ বিষয়ে আমার মন্তব্যের সুযোগ নেই। যেসব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শাখা রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ও মাধ্যমিক কর্তৃপক্ষ দেখভাল করে।’

বারবার বদলাচ্ছে নিয়ম, স্থিতিশীল হচ্ছে না স্কুল ভর্তি ব্যবস্থা

গত দেড় দশকে দেশের স্কুল ভর্তি ব্যবস্থায় একাধিকবার বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সরকারি ও স্বনামধন্য বেসরকারি স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লিখিত ও মৌখিক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। আসনের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হতো। এমনকি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্যও চার-পাঁচ বছরের শিশুদের পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো। এর ফলে ভর্তি কোচিং, ব্যক্তিগত টিউশন এবং প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা অনিয়ম নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে।

শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমানো এবং কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১২ শিক্ষাবর্ষে একই ব্যবস্থা বেসরকারি স্কুলেও কার্যকর হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে শূন্য আসনের বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষা বহাল ছিল। পরে করোনা মহামারির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি সব স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই পদ্ধতি অব্যাহত রাখা হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা–সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি ছিল, লটারির মাধ্যমে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে গত ১৬ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে আর লটারির মাধ্যমে ভর্তি হবে না; বরং মেধাভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে। তবে সেই পরীক্ষার ধরন, মানবণ্টন ও নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

শিশুদের শিক্ষাজীবন ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে শুরু হওয়া উচিত নয় : অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরুতেই অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ তৈরি করে।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থায় যেতে হবে, যাতে শিশুরা বাড়ির কাছের বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই পড়ার সুযোগ পায়। ছোট শিশুদের শিক্ষাজীবনের শুরুটা হওয়া উচিত আনন্দময় ও সহযোগিতামূলক পরিবেশে, প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নয়।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানে আসনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হওয়ায় সাময়িকভাবে কোনো না কোনো বাছাই পদ্ধতির প্রয়োজন হচ্ছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ধীরে ধীরে ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থায় যাওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও শিশুবান্ধব সমাধান।

ভর্তি তথ্য প্রকাশের বিষয়ে মেলেনি মাউশির বক্তব্য

স্কুলে ভর্তির বিস্তারিত নীতিমালা, পরীক্ষার ধরন ও সময়সূচি কবে প্রকাশ করা হবে—এ বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) মো. সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোনকলের জবাব দেননি। পরে তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা ও ভয়েস মেসেজ পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

dhakapost

আগেভাগে সিদ্ধান্ত ঘোষণাতেই চাঙ্গা হয়েছে ভর্তি কোচিং : অভিভাবক ঐক্য ফোরাম সভাপতি 

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত অনেক আগেই ঘোষণা দেওয়ায় দেশজুড়ে ভর্তি কোচিং বাণিজ্য আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো ভর্তি কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। এতে অভিভাবকদের ওপর নতুন করে আর্থিক ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। প্রথম শ্রেণি একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরু। এ পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না।’

তিনি বলেন, সরকার যদি শেষ পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষাই নিতে চাইত, তাহলে ভর্তি কার্যক্রম শুরুর ঠিক আগে সিদ্ধান্ত জানালেও চলত। অনেক আগে ঘোষণা দেওয়ায় কোচিং সেন্টারগুলো কয়েক মাস সময় পেয়েছে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের।

জিয়াউল কবির দুলুর দাবি, অতীতেও ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ফল পরিবর্তন, নম্বরে কারসাজি এবং ঘুষের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তির মতো অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যার কয়েকটি তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। তাই ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শুধু কোচিং বাণিজ্যই নয়, অনিয়মের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এমন অবস্থায় তার দাবি, কোচিং বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক অনিয়ম রোধে কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহি এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভর্তি কোচিংকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হবে, আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন অভিভাবক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

আরএইচটি/জেডএস