বিজ্ঞাপন

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার যাঁতাকলে নির্বাচন কর্মকর্তারা

পদোন্নতি ইস্যুতে ইসির প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

পদোন্নতি ইস্যুতে ইসির প্রস্তাব বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাসহ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিভিন্ন পদের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গ্রেড সমন্বয় ইস্যুতে ইসির পক্ষ থেকে পাঠানো প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বারবার প্রত্যাখ্যান করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারবার প্রায় একইরকম প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে ইসির অধীন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা চাকরি জীবনে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং তারা কর্মে স্পৃহা হারাচ্ছেন।

একই বৃত্তে কেটে গেছে ২১ বছর

২০০৫ সালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীনে 'উপজেলা নির্বাচন অফিসার' হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মো. ছামিউল আলম। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা নির্বাচন অফিসে প্রথম পোস্টিংয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তার কর্মজীবন। দুই দশক পেরিয়ে এখন ২০২৬ সালেও তার নামের পাশের পদবিটি ‘উপজেলা নির্বাচন অফিসার’ই রয়ে গেছে! তিনি এখন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসার। একই পদে কাজ করছেন ২১ বছর! এই দীর্ঘ সময়ে তার সাথে যোগদান করা অন্য দপ্তরের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে চলে গেছেন, অথচ ছামিউল আলমদের পদোন্নতির ফাইল এখনো বন্দি হয়ে আছে আমলাতন্ত্রের লাল ফিতায়।

ছামিউল আলম ঢাকা পোস্টকে জানান, দীর্ঘ ২১ বছর একই পদে কর্মরত থাকায় আমরা আজ পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমাদের সমসাময়িকরা যখন সমাজে মাথা উঁচু করে নিজেদের ক্যারিয়ারের সাফল্য উদযাপন করে, তখন আমরা প্রতিনিয়ত পরিবার ও সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। একজন কর্মকর্তার মেধা ও শ্রমকে এভাবে বছরের পর বছর একই বৃত্তে আটকে রাখা মানসিক নির্যাতনের শামিল। এটি মানুষের ভেতরে কাজের উদ্দীপনাকে মেরে ফেলে।

ছামিউল আলমের ভাষায়, এই দীর্ঘ সময়ে নিজের দক্ষতা বিস্তারের কোনো সুযোগ পাননি তিনি। নতুন কোনো অভিজ্ঞতা অর্জনের পথও রুদ্ধ হয়ে আছে। প্রতিদিন সকালে একই টেবিলে বসা আর একই ফাইলের স্তূপে নিজেকে সঁপে দেওয়া- এটি চরম মানসিক ক্লান্তি ও একঘেয়েমিতে রূপ নিয়েছে।

ব্যাচমেটদের অধস্তন হয়ে কাজ করা

একই রকম বঞ্চনার শিকার মোহাম্মদ এমদাদুল হক। যিনি বর্তমানে সিলেটের জৈন্তাপুরের উপজেলা নির্বাচন অফিসার। তিনিও ২০০৫ সালে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। যে ব্যাচমেটদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পথ চলা শুরু হয়েছিল তার, তাদের অনেকে আজ সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেছেন। কেউ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, কেউ পরিচালক, কেউ উপ-সচিব, কেউ উপ-পরিচালক, কেউবা সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার বা জেলা নির্বাচন অফিসার হয়েছেন।

এমদাদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আজ দেশের ৬৪টি জেলার নির্বাচন অফিসার সবাই আমার নিজের ব্যাচমেট। ফলে দেশের যেখানেই পদায়ন হোক না কেন, কোনো না কোনো ব্যাচমেটের অধীনে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে। যে মানুষগুলো একসময় সমকক্ষ ছিল, আজ তাদের নিচে অধস্তন হয়ে কাজ করার এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন। এই অসমতা সামাজিকভাবে প্রতিনিয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়। আত্মীয়-স্বজন আর চেনা মানুষদের কৌতুহলী চোখের সামনে লজ্জিত হতে হয়।

তিনি বলেন, এ ছাড়া পদোন্নতি না হওয়ায় আর্থিক যে ক্ষতি হয়েছে, তার খেসারত দিতে হচ্ছে আমার পুরো পরিবারকে। আর্থিক টানাপোড়েন সংসারকে এমনভাবে চেপে ধরেছে যে, চাইলেই সন্তানের মুখে হাসি ফোটানো যায় না, তাদের ছোট ছোট আবদারগুলো অপূর্ণ থেকে যায়।

dhakapost

একই ধরনের কাজ, গ্রেডে বৈষম্য

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা সংক্রান্ত আরেকটি জটিলতা হলো গ্রেড বা বেতন বৈষম্য। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৯টি জেলায় এখন ৫ম গ্রেডের সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার কর্মরত আছেন। বাকি ৪৫টি জেলায় কাজ করছেন ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন অফিসার। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও কর্মকর্তাদের গ্রেড-এর এই বৈষম্য থেরি হয়েছে।

বিশেষ করে, সম্প্রতি ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ৬ষ্ঠ গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নতুন পদ সৃজিত হওয়ায় নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা এবং তার অধস্তন কর্মকর্তা একই গ্রেডের হয়ে পড়েছেন।

২০০৫-এর পর নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি হয়নি

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ গ্রেডেশন তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীনে কারিগরি (টেকনিক্যাল) পদের ১৭ জনসহ সর্বমোট ৭৩৮ জন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এর মধ্যে সচিবালয়, আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিস মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন ৭২১ জন কর্মকর্তা।

জানা গেছে, গ্রেডেশন তালিকার ৩০১ নম্বর ক্রমিক পর্যন্ত কর্মকর্তারা ২০০০, ২০০৪ ও ২০০৫ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর মধ্যে ২০০০ ও ২০০৪ সালের সব কর্মকর্তার পদোন্নতি সম্পন্ন হলেও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে ২০০৫ সালের ব্যাচকে নিয়ে। এই ব্যাচে নিয়োগপ্রাপ্ত ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে একই পদে চাকরি করছেন। আইনি লড়াই শেষে এই ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা সম্প্রতি উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে যোগদান করেছেন। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও গ্রেডেশন তালিকায় সিরিয়াল অনুযায়ী নাম থাকা সত্ত্বেও চাকরি ফিরে পাওয়া এই কর্মকর্তাদের পুনরায় উপজেলা/থানা বা সহকারী সচিব হিসেবেই যোগদান করতে হয়েছে। বিধি অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে থাকা ২০০৫ ব্যাচের এই ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার পদোন্নতি নিশ্চিত করার পরই পরবর্তীতে নিয়োগ পাওয়া ৪২০ জন কর্মকর্তার পদোন্নতির সুযোগ আসবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০০৫ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যারা উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে নির্বাচন কমিশনে যোগদান করেছেন, তাদের মধ্য থেকে একজন কর্মকর্তাও এখন পর্যন্ত পদোন্নতি পাননি। এই ৪২০ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি বা গ্রেড উন্নয়ন কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে কেউ কিছু জানেন না।

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয়বারের মতো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেও মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দেয় যে পদসমূহের গ্রেড উন্নীতকরণ সমীচীন হবে না। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট নির্বাচন কমিশন পূর্ণ কমিশনের অনুমোদন নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তৃতীয়বারের মতো পুনরায় চিঠি পাঠায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা জানান, আমাদের দাবির পেছনে বড় কোনো আর্থিক সংশ্লেষ বা বাড়তি বেতনের চাহিদা নেই। কারণ, আমরা অনেকেই টাইমস্কেল বা উচ্চতর গ্রেডের কল্যাণে ইতিমধ্যেই ওপরের গ্রেডের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাচ্ছি। আমাদের মূল দাবিটি সামাজিক মর্যাদার। এটি বিবেচনা করে হলেও কমিশনের দ্রুত পদোন্নতির জট খোলা উচিত। নির্বাচন কমিশন দ্রুত এই প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে ২০০৫ ব্যাচের বিষয়টির সুষ্ঠু মীমাংসা করবে এবং পরবর্তী ব্যাচগুলোর পদোন্নতির পথ সুগম করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে কাজের উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনবে বলেই আমরা প্রত্যাশা করি।

dhakapost

চারবার জনপ্রশাসনে কড়া নেড়েছে তিন কমিশন

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের গ্রেড জটিলতার শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ২৫ জুন, যখন কমিশন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ৪র্থ গ্রেডে উন্নীত করার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ৪৫টি জেলা নির্বাচন অফিসারের পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি পত্র পাঠান। সেই চিঠিতে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) মহাপরিচালকের পদটি ৩য় গ্রেড থেকে ২য় গ্রেডে উন্নীত করা আবশ্যক, যেহেতু অন্যান্য দপ্তরের মহাপরিচালকরা সাধারণত ২য় গ্রেডেই কর্মরত থাকেন। তবে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক চিঠির মাধ্যমে এই দাবি নাকচ করে দেয়। তাদের যুক্তি ছিল যে, বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী ৫ম গ্রেডভুক্ত 'সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার' পদের ফিডার পদ হলো ৬ষ্ঠ গ্রেডভুক্ত 'জেলা নির্বাচন অফিসার', তাই পদোন্নতির এই স্তর টপকে পদগুলো উন্নীত করা সম্ভব নয়।

এই অসম্মতির পরও নির্বাচন কমিশন হাল ছাড়েনি। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয়বারের মতো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেও মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দেয় যে পদসমূহের গ্রেড উন্নীতকরণ সমীচীন হবে না। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট নির্বাচন কমিশন পূর্ণ কমিশনের অনুমোদন নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তৃতীয়বারের মতো পুনরায় চিঠি পাঠায়। কমিশন থেকে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পরও ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আবারও তাদের আগের অবস্থানেই অনড় থাকে। তারা তৃতীয়বারের মতো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানায় যে, এই পর্যায়ে পদসমূহের বেতন গ্রেড উন্নীতকরণ যুক্তিযুক্ত বা সমীচীন হবে না। যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা এই প্রক্রিয়াটি আবারও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে যায়।

সর্বশেষ চতুর্থবারের মতো নির্বাচন কমিশনের বর্তমান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে ৪৫টি জেলা অফিসারের পদ পঞ্চম গ্রেড ও ২০ জন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে পঞ্চম গ্রেডে উন্নীতকরণের দাবি জানিয়ে চিঠি দেন। 

ইসি সচিব চিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানান, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা পদসমূহের গ্রেড ও বেতনস্কেল উন্নীতকরণ করা হলে এই মুহূর্তে সরকারের কোনো আর্থিক ব্যয় প্রয়োজন হবে না। আলোচ্য পদসমূহের পদমর্যাদা ও বেতনস্কেল উন্নীতকরণ সংক্রান্ত তথ্যাদি ও তথ্যভিত্তিক প্রামানিক যৌক্তিকতা সংযুক্ত করা হলো। এছাড়া এ বিষয়ে মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব এ, এম, এম, নাসির উদ্দিন মহোদয়ের সদয় সম্মতি রয়েছে বলেও জানান ইসি সচিব।

এই প্রস্তাবের জবাব গত ১২ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ (সওব্য-১৩) এর উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানিয়া সুলতানার স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ৪৫টি পদ এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ২০টি পদ ৬ষ্ঠ গ্রেড হতে ৫ম গ্রেডে উন্নীতকরণের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অসম্মতি জ্ঞাপন করেছে।

আগের তিনটি প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইটিআই মহাপরিচালকের পদ ৩য় থেকে ২য় গ্রেডে, কমিশনারের একান্ত সচিবদের পদ ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম গ্রেডে এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের পদ ৪র্থ থেকে ৩য় গ্রেডে উন্নীত করার কথা বলা হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় প্রস্তাবটি এসেছে তৃণমূল পর্যায়ের জন্য, যেখানে ৫২২ জন উপজেলা নির্বাচন অফিসারের মধ্যে ২৩০ জনকে সিনিয়র উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে ৬ষ্ঠ গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়।

ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই পদোন্নতিগুলো কার্যকর করলে সরকারের তাৎক্ষণিক কোনো আর্থিক ব্যয়ের বোঝা বাড়বে না, কারণ অনেক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে উচ্চতর বেতন স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড পেয়ে প্রস্তাবিত বেতন সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছেন। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ, এম, এম, নাসির উদ্দিন এই প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন এবং এটি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে বলেও জানিয়েছেন।

জনপ্রশাসন কর্মকর্তারা যা জানালেন

পদমর্যাদা ও গ্রেড উন্নীতকরণের এই দীর্ঘসূত্রিতা ও অস্বীকৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের শাখা-১৩ এর সহকারী সচিব মো. শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে এর আগেও একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের আরও অনেক দপ্তর রয়েছে। একটির পদমর্যাদা বৃদ্ধি করলে অন্যান্য দপ্তর থেকেও একই ধরনের দাবি আসার সম্ভাবনা থাকে। মূলত সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনা করেই আগে এ বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়েছিল।

তিনি আরও জানান, পদমর্যাদা বা গ্রেড উন্নীতকরণের এই সিদ্ধান্তগুলো কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিভিন্ন বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। যেখানে বিধি অনুবিভাগ নিয়োগ বিধি ও আপগ্রেডেশন সংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই করে থাকে।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ইতিপূর্বে এ নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ মন্ত্রণালয় মূলত নীতিগত নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে চিঠিতে বিস্তারিত কারণ উল্লেখ থাকায় দপ্তরে সশরীরে যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৭ শাখার সহকারী সচিব মো. মোস্তফা কামাল বলেন, এটি মূলত সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সংক্রান্ত কোনো নতুন প্রস্তাব বা কার্যক্রম তার দফতরে আসেনি। ইতিপূর্বে এই দাবি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো পর্যালোচনা হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নীতিগত হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

এখনও হাল ছাড়েনি ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন
 
এদিকে বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন ঢাকা পোস্টকে জানান, কাজের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে বেশ কিছু পদ সৃজন ও আপগ্রেডেশনের প্রস্তাব দিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও ন্যূনতম প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে বিষয়টির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে উল্লেখ করে মনির হোসেন বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। আমাদের কমিশনের সিনিয়র সচিব স্যার ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে কথা বলেছেন। আমরা আশাবাদী যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখে দ্রুত সমাধান করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও সরকারের নীতিগত অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, পদ সৃজন ও আপগ্রেডেশনের এখতিয়ার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। ফাইলটি কোন ফোরামে তোলা হবে বা সরকারের কার সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন, তা পদ্ধতিগতভাবে তারাই নির্ধারণ করবেন। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কটি আইন সংশোধন ও অধ্যাদেশে রূপান্তর করেছে, তার মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন অন্যতম। এই আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘সার্ভিস’ থাকবে। অর্থাৎ ইসি এখন ক্যাডার বা নন-ক্যাডার বিভাজনের বাইরে একটি স্বতন্ত্র সার্ভিস হিসেবে গণ্য হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, একটি পূর্ণাঙ্গ সার্ভিস বাস্তবায়ন করতে গেলে পদ আপগ্রেডেশন, পদ সৃষ্টি এবং কাজের সমন্বয় করা অপরিহার্য। যেহেতু সরকার নিজেই সার্ভিস বাস্তবায়নে আইন পাস করেছে, সেহেতু ইসি পুনর্গঠনে সরকারের একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কীভাবে বিষয়টিকে ত্বরান্বিত করবে, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তফা জামানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হককেও একাধিকবার ফোন দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

পুনরায় প্রস্তাব পাঠানোর ঘোষণা ইসি সচিবের

গত ১২ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে অসম্মতির বিষয়টি ইসিকে জানানো হয়।জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা পোস্টকে জানান, পদগুলো উন্নীত করার বিষয়টি যৌক্তিক বলেই কমিশন থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল এবং ইসি তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

অসম্মতির পর কমিশনের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিনিয়র সচিব বলেন, আমার জায়গা থেকে আমি এই প্রস্তাব আবার পাঠাব। পদ উন্নীতকরণের বিষয়টিকে আমরা যৌক্তিক মনে করছি বলেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি নতুন কোনো প্রস্তাব নয়, পূর্বের অনুমোদিত প্রস্তাবের ধারাবাহিকতা। তাই প্রয়োজন হলে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পুনরায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবার চিঠি পাঠানো হবে।

বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর বক্তব্য জানতে তার সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি পরিচয় পাওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক অসংগতি ও বৈষম্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা কেউ চ্যালেঞ্জ করুক সেটি তারা চায় না

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই সংকটটি মূলত আমাদের আমলাতন্ত্রের ‘কলোনিয়াল মাইন্ডসেট’ এবং তাদের একক আধিপত্য বা ডমিনেন্স বজায় রাখার মানসিকতারই ফল। আমলাতন্ত্র কোনো অবস্থাতেই তাদের ক্ষমতা বা আধিপত্যকে কেউ চ্যালেঞ্জ করুক কিংবা সেটির ওপর আঙুল তুলুক তা মেনে নিতে চায় না।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে যদি বাস্তবিক অর্থেই একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে এর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজের চাপ, অর্পিত দায়িত্ব এবং তাদের ভেতরের যৌক্তিক ক্ষোভ-বঞ্চনার দিকে নজর দিতে হবে। কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই ঢালাওভাবে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে অসম্মতি জানিয়ে দেওয়া মোটেও সমীচীন নয়।

মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. সাব্বীর আহমেদ সতর্ক করে বলেন, যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি এভাবে দীর্ঘদিন সংক্ষুব্ধ থাকেন, তবে মাঠপর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পরিচালনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। তাই সবকিছু কেবল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হাতে ছেড়ে না দিয়ে এটিকে রাজনৈতিকভাবে এবং জনস্বার্থে বিবেচনা করার সময় এসেছে।

সদ্য পাস হওয়া নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদে আইন পাস হওয়ার পর এখন তা বাস্তবায়নে যাওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এটি বাস্তবায়নে বিদ্যমান আমলাতন্ত্র অর্থনৈতিক চাপ বা নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে বাধা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে এই আইনের সঠিক বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দিকনির্দেশনা ও গাইডলাইন প্রদান করতে পারে, যাতে প্রশাসন ও রাজনীতির যৌথ প্রচেষ্টায় একটি সঠিক সমাধান আসে।

এসআর/জেএস