বিজ্ঞাপন

হাড় ভাঙলেও ব্যথা নেই, আগুনে পুড়লেও জ্বালা নেই

ব্যথা না পাওয়ার অভিশাপে আক্রান্ত তারা

ব্যথা না পাওয়ার অভিশাপে আক্রান্ত তারা

ছোট্ট ইফফাতের বয়স তখন সবে ৬ মাস। মা-বাবা আর বড় বোনের সব আনন্দ তাকে ঘিরে। এরই মধ্যে ইফফাতের ছোট্ট মুখে দু’একটি দাঁত উঠতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেল সদ্য ওঠা দাঁত দিয়ে নিজের জিহ্বাতে ঘষে ঘষে ক্ষত তৈরি করে ফেলছে ইফফাত।

শুরুতে বিষয়টা তেমন গুরুতর মনে না হলেও কিছুদিনের মধ্যে দেখা যায় বারবার জিহ্বা দাঁতে ঘষা দেওয়ায় এর সামনের অংশ ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। বয়স ৯ মাস হতে হতে জিহ্বার অনেকটাই খসে পড়ে যায়। এত কিছু হয়ে গেলেও এ নিয়ে ব্যথা-বেদনার কোনো চিহ্ন নেই ইফফাতের মুখে, নেই কোনো কান্নার আওয়াজও।

কেন ব্যথা পেয়েও কাঁদে না ইফফাত—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একের পর এক চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হয়েছে পরিবারটিকে। পরে তারা জানতে পারেন তাদের মেয়ে জন্মগতভাবে এক বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার নাম কনজেনিটাল ইনসেনসিটিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহাইড্রোসিস (CIPA)। এই রোগে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা ‘ব্যথা’ অনুপস্থিত থাকে।

এই রোগে আক্রান্তদের শরীরে কোনো ব্যথার অনুভূতি হয় না বা খুব কম অনুভব করেন। আর সে কারণেই একটি সাধারণ আঘাতও অজান্তেই ভয়াবহ ও স্থায়ী জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

ইফফাতের মা মাহমুদা সিদ্দিকা ঢাকা পোস্টকে বলেন, জিহ্বার সমস্যাটা বাড়তে থাকায় আমরা বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখাই এবং ওষুধ খাওয়াই। কিন্তু কোনো ফল পাচ্ছিলাম না। এরপর ঢাকার এক ডাক্তার ওর রোগ শনাক্ত করতে পারে। খুব বিরল রোগ হওয়ায় ডাক্তারেরও রোগ শনাক্ত করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ডাক্তার সময় নিয়ে আমার মেয়ের কিছু টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো ভারতে পাঠান। প্রায় দেড় মাস পর সেই টেস্টের রিপোর্ট ডাক্তারের হাতে আসে এবং তখন তিনি আমাদের নিশ্চিত করেন যে, আমার মেয়ে সিপা নামক এক বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত। এজন্য ও বারবার ওর ক্ষতস্থানে আঘাত করলেও ব্যথা অনুভব করতে পারে না। আমরা এর আগে কখনো এই রোগের নাম শুনিনি। 

ব্যথা অনুভব করতে না পারাই এই রোগের একমাত্র লক্ষণ নয়। এই রোগে আক্রান্তদের শরীরের ঘামও হয় না। ইফফাতের মা বলেন, গরমের সময় ওর শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ইফফাতের সর্বোচ্চ ১০৪.৯ ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠেছে। রোগ শনাক্তের আগে অনেক ডাক্তার দেখিয়ে ও ওষুধ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ওর শরীরকে ঠান্ডা পরিবেশে রাখা, বারবার গা মুছে দেওয়াই হলো কার্যকর উপায়।

রোগটির ভয়াবহতা আরও ভালোভাবে বোঝা যায় ইফফাতের ১৮ মাস বয়সের আরও একটি ঘটনা থেকে। খেলতে খেলতে ডান পায়ে আঘাত পায় ইফফাত। এমন বয়সে সামান্য আঘাত পেলেই সাধারণত শিশুরা কান্নায় বাড়ি মাথায় তোলে। কিন্তু ইফফাত কাঁদেনি। ব্যথার কথাও বলেনি। আগের মতোই হাঁটছিল, খেলছিল। কয়েক দিন পর হঠাৎ তার ডান পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। তখন তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানালেন, ইফফাতের গোড়ালির হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি লিগামেন্টও। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা হাড়ের ওপর চাপ পড়তে থাকায় সেখানে রক্ত সঞ্চালনও ব্যাহত হয়েছে। ফলে হাড়ের একটি অংশ স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করেছে। 

কয়েকজন অর্থোপেডিক্স জানান, ইফফাতের পায়ের অবস্থা বেশ জটিল। তার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। তবে বয়স কম হওয়ায় এখনই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা উচিত হবে না। আপাতত তাকে অ্যাঙ্কল ফুট অর্থোসিস (এএফও) নামের বিশেষ ধরনের সাপোর্ট ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, যাতে গোড়ালির ওপর চাপ কম পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশের আরও অবনতি না হয়। ব্যাথা অনুভূতি না থাকায় এত বড় ক্ষত নিয়েও ইফফাতের আচরণে নেই কোনো অস্বস্তি বা যন্ত্রণার ছাপ। সে স্বাভাবিকভাবেই হেসে-খেলে বেড়ায়। 

তবে ব্যথা অনুভব করতে না পারাই এই রোগের একমাত্র লক্ষণ নয়। এই রোগে আক্রান্তদের শরীরের ঘামও হয় না। ইফফাতের মা বলেন, গরমের সময় ওর শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ইফফাতের সর্বোচ্চ ১০৪.৯ ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠেছে। রোগ শনাক্তের আগে অনেক ডাক্তার দেখিয়ে ও ওষুধ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ওর শরীরকে ঠান্ডা পরিবেশে রাখা, বারবার গা মুছে দেওয়াই হলো কার্যকর উপায়। 

ইফফাতের রোগ শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সামছুন নাহার সুমি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সিপা (CIPA) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল একটি রোগ। 

ডা. সামছুন নাহার সুমি জানান, ২০২৪ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি জেনেটিকস সেন্টারের মাধ্যমে তিনি তখন ৯ মাসের ইফফাতের রক্তের নমুনা ভারতের বেঙ্গালুরুরের মেডজিনোম ল্যাবে পাঠান। হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিংয়ের (জিনের প্রোটিন তৈরির অংশের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ) পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুটির NTRK1 জিনে একটি পরিবর্তনের সন্ধান মেলে। এই জিনের ত্রুটি সিপা রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। 

ইফফাতের বিষয়ে ঢাকা পোস্টকে ডা. সামছুন নাহার সুমি বলেন, শিশুটি যখন আমার কাছে আসে, তখন তার অবস্থা বেশ জটিল ছিল। এর আগে একাধিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও কেউ রোগটি শনাক্ত করতে পারেননি। বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আমি দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটির উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করি। বিভিন্ন লক্ষণ বিশ্লেষণ করে সিপার সন্দেহ হয়। পরে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং (ডাব্লিউইএস) পরীক্ষার জন্য ভারতে পাঠাই। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর নিশ্চিত হই, শিশুটি সিপাতে আক্রান্ত। বর্তমানে সে আমার নিয়মিত ফলোআপে রয়েছে এবং আগের তুলনায় তার অবস্থা কিছুটা উন্নত।

ভারতে পাঠানো নমুনার 'হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং' রিপোর্ট, যা শিশুটির এই বিরল ব্যাধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসক জীবনে সিপার লক্ষণযুক্ত দুই শিশুর দেখা পেয়েছেন তিনি। তাদের মধ্যে একজন ইফফাত। অন্য শিশুর ক্ষেত্রেও লক্ষণগুলো সিপার সঙ্গে মিল থাকলেও পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সিপা শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় জিনগত পরীক্ষা সহজলভ্য নয়। তাই রোগীদের ডাব্লিউইএস পরীক্ষা বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে থেকে করিয়ে আনা হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল। 

ইফফাতের ঘটনা বাংলাদেশে সিপা রোগের প্রথম নজির নয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশি দুই চিকিৎসকের জার্নাল অফ কারেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভান্স মেডিকেল রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি কেস রিপোর্টে দেশের প্রথম প্রকাশিত সিপা রোগীর তথ্য তুলে ধরা হয়। সেই রোগীর সঙ্গেও ইফফাতের উপসর্গের বেশ কিছু মিল রয়েছে। পুরোনো ওই রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ ও নার্ভ কনডাকশন স্টাডির ভিত্তিতে রোগটি শনাক্ত করা হয়েছিল।

কেস রিপোর্টে চার বছর বয়সী এক ছেলে শিশুর কথা বলা হয়। জন্ম থেকেই সে ব্যথা অনুভব করত না। নিজের ঠোঁট ও জিহ্বা কামড়ে ক্ষত তৈরি করত, ধীরে ধীরে হাত-পায়ের কয়েকটি আঙুলও ক্ষয়ে যায়। গরমের মধ্যেও তার ঘাম হতো না এবং বারবার অকারণে জ্বর আসত। পরীক্ষায় দেখা যায়, স্পর্শ অনুভব করতে পারলেও ব্যথা ও তাপমাত্রা অনুভবের ক্ষমতা ছিল না। এক্স-রেতে হাড়ের গুরুতর ক্ষতিও ধরা পড়ে।

সেই গবেষণায় বলা হয়েছে, হেরেডিটারি সেন্সরি অ্যান্ড অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (HSAN) এর পাঁচ ধরনের মধ্যে টাইপ-IV-ই সিপা নামে পরিচিত। এটি একটি অটোসোমাল রিসেসিভ জিনগত রোগ। অর্থাৎ বাবা ও মা—উভয়ের কাছ থেকেই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে এলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। NTRK1 (এনটিআরকে ওয়ান) জিনে মিউটেশনের কারণে এই রোগটি হয়। 

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, হেরেডিটারি সেন্সরি অ্যান্ড অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলো এক ধরনের বিরল বংশগত স্নায়ুরোগের গ্রুপ, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যথা অনুভব করতে পারেন না এবং শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। এর ফলে ঘাম হওয়া, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্রোমোজোম-১-এর 1q21-22 অঞ্চলে অবস্থিত NTRK1 জিনে ৩৭টিরও বেশি ধরনের মিউটেশন শনাক্ত করা হয়েছে। এই জিনটি নার্ভ গ্রোথ ফ্যাক্টর (এনজিএফ)-এর হাই অ্যাফিনিটি রিসেপ্টর রিসেপ্টর তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এনজিএফ ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুর স্বাভাবিক বিকাশ ও কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে NTRK1 জিনে ত্রুটি হলে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুগুলো ঠিকভাবে বিকশিত হয় না। এর ফলেই আক্রান্ত ব্যক্তি ব্যথা অনুভব করেন না এবং ঘামসহ স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয়। 

গবেষণার তথ্য মতে, সিপা রোগীদের মধ্যে হাড় ভাঙা, হাড়ে সংক্রমণ (অস্টিওমাইলাইটিস), জয়েন্টের বিকৃতি এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে বারবার আঘাত পাওয়ার ঘটনা খুবই সাধারণ। সিপা রোগীদের মৃত্যুর প্রায় ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে হাইপারপাইরেক্সিয়া (অত্যধিক জ্বর) ও সেপসিস একসঙ্গে দায়ী থাকে। 

রোগটি নিয়ে কথা হয় এই জার্নালের লেখক ডা. মো. আবদুল্লাহ ইউসুফের সঙ্গে। তিনি বর্তমানে আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। ডা. মো. আবদুল্লাহ ইউসুফ বলেন, কেসটা আমি এবং আমার টিমের কয়েকজন দেখেছিলাম। রোগটি শনাক্ত করার জন্য কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি আমাদের দেশে তখন ছিল না। এ ধরনের রোগ এতটাই বিরল যে শুরুতে অন্য রোগের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলার ঝুঁকি থাকে। রোগটি প্রথমে ডায়াবেটিস বা কুষ্ঠরোগ বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেসব সম্ভাবনা বাদ পড়ে। পরে শিশুটির উপসর্গ ও নার্ভ কনডাকশন স্টাডির ভিত্তিতে সিপা নিশ্চিত করা হয়। এরপর আমি এ রোগের আর কোনো রোগী পাইনি।

শিশুটির বর্তমান অবস্থা জানতে কেস রিপোর্টটির আরও একজন লেখক ডা. মো. মুরাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকা পোস্ট। তিনি জানান, ২০১২ সালের দিকে শিশুটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তার বাবা-মায়ের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। ওই রোগীর তথ্য নিয়েই পরবর্তীতে ২০২২ সালে জার্নাল অফ কারেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভান্স মেডিকেল রিসার্চ-এ কেস রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। তবে এরপর সিপা-তে আক্রান্ত আর কোনো রোগী তার কাছে আসেনি। একই সঙ্গে ওই শিশুটির সঙ্গেও আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। 

চিকিৎসা নেই, আঘাত ঠেকানোই ভরসা

চিকিৎসকদের মতে, এখন পর্যন্ত সিপার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই মূল লক্ষ্য হলো, রোগীকে আঘাত থেকে রক্ষা করা, অতিরিক্ত জ্বর নিয়ন্ত্রণ, হাড় ও জয়েন্টের জটিলতা প্রতিরোধ এবং পরিবারের সদস্যদের রোগ সম্পর্কে সচেতন করা। অর্থোপেডিক, শিশু, দন্ত ও চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকের সমন্বিত তত্ত্বাবধান এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং এ রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকার জেনেটিক কাউন্সেলিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (জিসিআরসি) চেয়ারম্যান ও ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যথা মানুষের শরীরের একটি প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা। কিন্তু সিপা রোগীরা সেই সতর্কবার্তা পান না। ফলে তারা নিজের অজান্তেই জিহ্বা, আঙুল বা শরীরের অন্য অংশে আঘাত করতে পারেন। এমনকি হাড় ভেঙে গেলেও অনেক সময় বুঝতে পারেন না। অন্যদিকে ঘাম না হওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হয়। এতে অতিরিক্ত জ্বর দেখা দিতে পারে, যা কখনো কখনো প্রাণঘাতী হতে পারে। 

পরবর্তী সন্তানের ঝুঁকি কত? 

অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমান বলেন, সিপা একটি অটোসোমাল রিসেসিভ বংশগত রোগ। অর্থাৎ বাবা ও মা—উভয়েই যদি ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হন, তাহলে প্রতিটি গর্ভধারণে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ এবং জিনের বাহক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। আর সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ থাকে। তিনি বলেন, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে একই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ জিন বহনের সম্ভাবনা বেশি থাকায় এ ধরনের বিরল রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। 

সিপা রোগীর কেন প্রয়োজন জেনেটিক কাউন্সেলিং?

অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমানের মতে, বাবা-মা দুইজনেই বাহক কিনা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। গর্ভকালীন জিনগত রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে গর্ভাবস্থায় শিশুটি সিপা নিয়ে জন্মাবে কি না তা জানা সম্ভব। একই সঙ্গে আইভিএফ -এর সঙ্গে পিজিটি (ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের আগে জিনগত পরীক্ষা) ব্যবহার করে সুস্থ ভ্রূণ নির্বাচন করাও সম্ভব। এছাড়া কীভাবে এই বিশেষ শিশুর যত্ন নিতে হবে (পড়াশোনা, আঘাত থেকে রক্ষা করা, ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা) সে বিষয়ে মানসিক ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।

তার মতে, পরিবারের অন্য সন্তানদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়ন করা উচিত, যাতে আক্রান্ত বা বাহক সদস্য থাকলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। রোগ শনাক্তে বড় বাধা অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমান বলেন, বাংলাদেশে বিরল জিনগত রোগ শনাক্তে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। 

সচেতনতার অভাবে অনেক চিকিৎসকই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করতে পারেন না। যদিও দেশে এখন আধুনিক জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি (এনজিএস) বা জিনোম বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবু এসব পরীক্ষা এখনো সীমিত এবং ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, অনেক পরিবার রোগটির নিরাময় নেই জেনে জেনেটিক পরীক্ষা বা কাউন্সেলিং করাতে আগ্রহী হন না। ফলে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা ও বিস্তার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখেও রোগ চিনতে অনেক সময় লেগে যায়। 

ডা. মুশফিকা রহমানের মতে, বাংলাদেশে সিপাসহ বিরল জিনগত রোগের জন্য একটি জাতীয় রোগী নিবন্ধন (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি) গড়ে তোলা জরুরি। এতে দেশে কতজন রোগী আছেন, কোন অঞ্চলে রোগটি বেশি দেখা যায় এবং কী ধরনের জিনগত পরিবর্তন বেশি হচ্ছে এসব তথ্য জানা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গবেষণা, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং সরকারি নীতিনির্ধারণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে করে সরকার স্বাস্থ্য বাজেটে এসব রোগীদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে এবং প্রযুক্তি সহজলভ্য করার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া স্থানীয় গবেষকদের মধ্যে বিরল জিন মিউটেশনের প্যাটার্ন নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে।

আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হলে ঝুঁকি বাড়ে 

যাদের আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হয় তাদের সন্তনের এই রোগের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজলও। তিনি বলেন, ভ্রূণের জিনগত ত্রুটি শনাক্তকরণ নিয়ে আমি কাজ করে থাকি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমন দম্পতি আমার কাছে রেফার্ড করা হয় যাদের বারবার গর্ভপাত হয়েছে, জন্মগত ত্রুটিযুক্ত সন্তান জন্মেছে বা জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই অজ্ঞাত কারণে একাধিক সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। 

ডা. রেজাউল করিম আরও বলেন, বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোতে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিয়ের হার তুলনামূলক বেশি। ফলে কিছু বিরল জিনগত রোগের ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনে সিপা আক্রান্ত মাত্র তিনজন রোগী পেয়েছেন তিনি। তাদের একজনের ঘটনা আজও তাকে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, শিশুটি বাবার লাইটার দিয়ে নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল। নিজের জিহ্বা ও হাতের আঙুলের মাথাও দাঁত দিয়ে কেটে ফেলেছিল। 

তিনি জানান, ওই পরিবারের বড় সন্তানও একই রোগে আক্রান্ত ছিল। পরিবারের সদস্যরা তখন বিষয়টি বুঝতে পারেননি। এক সময় ছাদ থেকে লাফিয়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে শিশুটি মারা যায়। ব্যথা অনুভব না করায় পড়ে গিয়েও সে কাঁদেনি। পরে দ্বিতীয় সন্তানের একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তারা। 

তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দম্পতির ক্ষেত্রে গর্ভধারণের প্রায় ১১ সপ্তাহ পর ভ্রূণের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা যায়। এর মাধ্যমে গর্ভের সন্তান সিপাসহ নির্দিষ্ট জিনগত রোগে আক্রান্ত কি না, তা আগেভাগেই নির্ণয় করা সম্ভব। 

শুধু বাংলাদেশে নয় সিপা বিশ্বেও অন্যতম বিরল জিনগত রোগ। প্রায় ১০ লাখ শিশুর মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে বলে জানা যায়। তবে জাপান এবং ইসরায়েলের বেদুইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। ২০০৯ সালের দিকে জাপানে সিপা রোগীর সংখ্যা আনুমানিক ১৩০ থেকে ২১০ জনের মধ্যে ছিল। ইসরায়েলের বেদুইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগটির তুলনামূলক বেশি বিস্তার এবং এর জিনগত বৈশিষ্ট্যের তথ্য উঠে এসেছে। 

বর্তমানে সিপার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই আক্রান্তদের ক্ষেত্রে আঘাত প্রতিরোধ, জটিলতা কমানো, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বহুবিভাগীয় চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা ব্যথা অনুভব করতে পারে না, তাদের প্রতিটি দিনই অদৃশ্য বিপদের সঙ্গে বসবাস। তাই সিপার মতো বিরল রোগে সবচেয়ে বড় ওষুধ এখনো সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত চিকিৎসা।

এনএফ/আরকে