বিজ্ঞাপন

ফায়ার সার্ভিস ডিজি

৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হবে

৭ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হবে

দেশে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যেকোনো সময় ৭ থেকে ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে রাজধানী ঢাকা। ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত এই নগরীর বহু এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেই হিমশিম খেতে পারে, এমনকি কোথাও কোথাও উদ্ধার অভিযান চালানোই প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

এই শঙ্কাকে সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে রাজধানীর অন্তত ৪০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছে বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল। শুধু ভূমিকম্পের প্রস্তুতিই নয়, সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন ফায়ার সার্ভিসের চলমান আধুনিকায়ন কার্যক্রম, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির সংযোজন, রেসকিউ হেলিকপ্টার যুক্ত করার পরিকল্পনা, জরুরি সেবা ‘১০২’ চালুর উদ্যোগ, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা পদক্ষেপ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার নানা দিক। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক মুছা মল্লিক।

ঢাকা পোস্ট : আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পর এক বছর ছয় মাস ১০ দিন পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে উল্লেখযোগ্য কী কী পরিবর্তন এসেছে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান লক্ষ্য ছিল ফায়ার সার্ভিসের ওপর জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করা এবং সেবাগুলোকে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর করা। পাশাপাশি নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত বিষয়ে অতীতে যে নেতিবাচক ধারণা বা ভাবমূর্তির সংকট ছিল, তা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটানো।

এই সময়ের মধ্যে আমরা ফায়ার লাইসেন্স ও ফায়ার সেফটি প্ল্যানসহ যাবতীয় সেবা অনলাইনে নিয়ে এসেছি। নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা নিয়োগের সময় গণমাধ্যমকর্মীরাও সরেজমিনে দেখেছেন।

dhakapost

অপারেশনাল কাজে শহীদ হওয়া ফায়ার ফাইটারদের পরিবারের জন্য আমরা একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছি। এছাড়া, চাকরিরত বা দায়িত্বরত অবস্থায় কোনো সদস্য মারা গেলে তার সন্তানদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য এইচএসসি পর্যন্ত কিছু শর্তসাপেক্ষে শিক্ষা অনুদান চালু করা হয়েছে।

এছাড়া, যেকোনো দুর্যোগ-দুর্ঘটনা, বিশেষ করে ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা বিশেষ উদ্ধারকারী দল (স্পেশাল রেসকিউ টিম) গঠন করেছি। বিভাগীয় এবং অধিদপ্তর পর্যায়ে এই বিশেষ টিমগুলো গঠন করে তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে মূল সক্ষমতার পাশাপাশি এসব স্পেশাল টিম দিয়ে যেকোনো দুর্যোগে দ্রুত রেসপন্স করা যায়।

একই সঙ্গে সম্প্রতি কেমিক্যাল সংক্রান্ত দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো ঢাকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি বিশেষ ‘কেমিক্যাল ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে, যার অবস্থান মিরপুর-১০ নম্বরে। কেমিক্যাল দুর্ঘটনা ঘটলে এই ইউনিটটি অতি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ করতে পারবে।

কল্যাণমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি মিরপুর-১০-এ প্রথমবারের মতো আমাদের ভূমিকম্প-সহনশীল সদর দপ্তর নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ফায়ার ফাইটারদের আবাসিক সমস্যা সমাধানে ঢাকায় প্রায় ৮৮টি পরিবারের জন্য উন্নত আবাসন সুবিধা নিশ্চিতের কাজ শুরু হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম প্রকল্পগুলো মিরপুর ও সদরঘাটে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

এর বাইরে সারা দেশে নতুন ১২টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুরানো স্টেশনের পুনর্নির্মাণকাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সার্বিকভাবে উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে আমরা বড় পরিবর্তন আনতে পেরেছি। 

ঢাকা পোস্ট : আপনারা নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণের একটি পরিকল্পনা করেছেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কতজন মানুষের জন্য একটি স্টেশন থাকা প্রয়োজন? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কি সেই মানদণ্ড বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য একটি করে ফায়ার স্টেশন থাকা উচিত। তবে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় হুবহু এই মানদণ্ড বজায় রাখা বেশ কঠিন। তাই আমরা কোনো এলাকার ঝুঁকি, স্পর্শকাতরতা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার উপস্থিতি এবং দুর্যোগপ্রবণতার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন স্টেশন স্থাপন করছি।

রাজধানী ঢাকার কথাই ধরা যাক; এখানে যেমন চরম ঘনবসতি রয়েছে, তেমনি রয়েছে তীব্র যানজট। যানজটের কারণে মাত্র ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় ফায়ার সার্ভিসের এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। ফলে কেবল জনসংখ্যা নয়, এলাকার ঘনত্ব, গুরুত্ব ও সড়ক পরিস্থিতির সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই আমাদের স্টেশনের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হয়।

dhakapost

বর্তমানে সারা দেশে আমাদের ৫৩৮টি ফায়ার স্টেশন চালু রয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষের জন্য গড়ে একটি করে স্টেশন পড়ে। তবে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ঝুঁকি বিবেচনা করলে দেশে অন্তত ১৭০০টি ফায়ার স্টেশন থাকা প্রয়োজন।

এই ঘাটতি পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে স্টেশনের সংখ্যা ৯৯৭টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে নতুন ১২টি স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের কাজ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা এই পরিকল্পনাটি ইতোমধ্যে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি।

ঢাকা পোস্ট : তীব্র যানজটসহ নানা বাস্তবতায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। রেসপন্স টাইম বা জরুরি সাড়া দেওয়ার সময় কমিয়ে আনতে আপনাদের বিশেষ কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : রেসপন্স টাইম কমিয়ে আনতে আমরা বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। প্রথমত, সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি কল করে দ্রুত তথ্য দিতে পারে, সে জন্য ‘১০২ নম্বর’ চালু করা হয়েছে। পুলিশের মতো আমরাও যেন যেকোনো দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক খবর পেতে পারি, সে ব্যবস্থা এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ এলাকায় বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা শুধু একটি ইউনিট না পাঠিয়ে একই সঙ্গে দুই থেকে তিনটি ইউনিট পাঠাই। এতে রাস্তায় একটি ইউনিট যানজটে আটকে গেলেও বিকল্প রুট থেকে অন্য ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে রেসপন্স করতে পারে।

এছাড়া, রেসপন্স টাইম কমানোর জন্য, বিশেষ করে সম্ভাব্য ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে অনেক এলাকায় গাড়ি নিয়ে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে, তাই দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলো রাজধানীর ৪১টি ভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মজুত রাখা হয়েছে।

dhakapost

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরি করছি। শত চেষ্টার পরও যানজটের কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। আমাদের দল পৌঁছানোর আগে স্থানীয় ভলান্টিয়াররা যাতে প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু করতে পারেন, সে জন্য আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর জোর দিচ্ছি। গত বছর ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৪০০ জন ভলান্টিয়ার তৈরি করা হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের এক লাখ কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরির পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে আমরাও কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

ভলান্টিয়ারদের সক্রিয় করতে পারলে আমাদের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং তাদের মাধ্যমেই রেসপন্স টাইম আরও কমিয়ে আনা যাবে।

ঢাকা পোস্ট : জরুরি মুহূর্তে সহায়তা পেতে ভলান্টিয়ারদের কোনো ডেটাবেজ আছে কি? মাঠে তাদের কীভাবে কাজে লাগানো হয়?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : বর্তমানে আমরা সব ভলান্টিয়ারের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ (এনআইডি) একটি সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ তৈরি করছি। প্রতিটি ফায়ার স্টেশনের সঙ্গে ভলান্টিয়ারদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকে এবং তাদের যুক্ত করে আলাদা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পরিচালনা করা হয়।

জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে বা বড় কোনো দুর্ঘটনার খবর পেলে আমরা গ্রুপের মাধ্যমে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে বার্তা দিই। এরপর তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়, আবার অনেক সময় তথ্য পেয়ে তারা সপ্রণোদিত হয়েই কাজে নেমে পড়ে।
 
দুর্ঘটনাস্থলে ফায়ার ফাইটারদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশেষ ভেস্ট পরা ভলান্টিয়ারদের কাজ করতে দেখা যায়। এদের মূলত আমরা তিন দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করি। এই প্রশিক্ষণে শেখানো হয়— ফায়ার সার্ভিসের টিমের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে, উদ্ধারকাজের সময় প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী, কীভাবে ঝুঁকি এড়িয়ে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও সহজ ও দ্রুত করা যায়। ফলে বড় কোনো দুর্যোগে ফায়ার ফাইটারদের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সহায়তা প্রদান করতে পারেন তারা।

ঢাকা পোস্ট : সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার আওতায় ফায়ার সার্ভিস কয়েকটি চমৎকার উদ্যোগের প্রস্তাব দিয়েছে। যেমন— রেসকিউ হেলিকপ্টার, ড্রোন বা সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। এর মধ্যে কোনটিকে আপনি সবচেয়ে কার্যকর মনে করছেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : প্রথমত, ড্রোন বা হেলিকপ্টার যুক্ত করার মতো বিষয়গুলো কেবল ১৮০ দিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; এগুলো স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত। তবে, ১৮০ দিনের প্রাথমিক পরিকল্পনার মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি সেবা শতভাগ অনলাইনে নিয়ে আসা ও ডিজিটালাইজেশন-এর ওপর।

ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার সেফটি প্ল্যান ও এনওসি পুরোপুরি অনলাইনে পাওয়ার সুবিধা চালু হওয়ায় মাঠপর্যায়ে অনিয়ম বা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া, দেশে কতটি প্রতিষ্ঠানের বৈধ ফায়ার লাইসেন্স বা সেফটি পারমিট রয়েছে, তার তথ্য একটি সেন্ট্রাল ডেটাবেজে আনা হচ্ছে। ফলে যেকোনো নাগরিক বা সংস্থা মুহূর্তে হালনাগাদ তথ্য দেখতে পারবে।

পাশাপাশি কেনাকাটায় শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের যাবতীয় কেনাকাটা ই-জিপির আওতায় আনা হয়েছে, যা ১৮০ দিনের মধ্যে অন্যতম বড় সাফল্য।

dhakapost

১৮০ দিনের মধ্যে আমরা আরও কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। যেমন— যেসব উপজেলায় এখনও ফায়ার স্টেশন নেই অথবা মাতারবাড়ী ও চকরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যেখানে নতুন স্টেশন প্রয়োজন, সেগুলোর প্রকল্প দলিল তৈরি করে অনুমোদনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়াদের চিহ্নিত করতে বিশেষ ইমেজিং ইকুইপমেন্ট ও সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার ঝুঁকিপূর্ণ অগ্নিকাণ্ডে ব্যবহার করা হবে ‘রোবটিক ফায়ার ফাইটিং ভেহিক্যাল’। আর সুন্দরবন, পাহাড়ি দুর্গম এলাকা কিংবা বহুতল ভবনে দ্রুত আগুন নেভাতে বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে নিজস্ব ড্রোন ও রেসকিউ হেলিকপ্টার।

ঢাকা পোস্ট : আপনাদের জমা দেওয়া পরিকল্পনায় একটি পৃথক ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এই ইউনিটটি আসলে কীভাবে কাজ করবে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : মূলত ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আমরা ইতোমধ্যে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিটের প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছি। বর্তমানে দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে স্পেশাল রেসকিউ টিম (এসআরটি) গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সদর অধিদপ্তরের অধীনে পূর্বাচলে ৫০ সদস্যের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তবে, একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠনের জন্য অনেকগুলো কারিগরি উপাদান ও বিশেষায়িত সরঞ্জামের সমন্বয় প্রয়োজন, তাই এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে। আপাতত আমরা অ্যাডহক (অস্থায়ী) ভিত্তিতে ছোট পরিসরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এবং ধাপে ধাপে এটিকে আরও বড় ও শক্তিশালী ইউনিটে রূপান্তর করা হবে।

ঢাকা পোস্ট : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি ঘটলে রাজধানী ঢাকা চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। এই বিপর্যয় মোকাবিলায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঢাকায় বা চট্টগ্রামে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা অনেক বেশি হবে। রাস্তার গ্যাসলাইন থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অনেক এলাকায় ভবনের নিচে মানুষ চাপা পড়লেও ফায়ার সার্ভিস বা অন্য সংস্থার গাড়ি পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়বে।

dhakapost

এই সংকট মোকাবিলায় আমরা বেশকিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছি। যেমন— ঢাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য সারা দেশ থেকে ১০০টি বিশেষ ফায়ার স্টেশন চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে, যেগুলোর ইউনিট দ্রুত ঢাকায় চলে আসবে।  দ্বিতীয়ত, দ্রুত উদ্ধারের সুবিধার্থে আমরা জরুরি ইকুইপমেন্টগুলো ঢাকার ৪১টি পয়েন্টসহ চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মজুত রেখেছি।

এছাড়া, সেনা ও বিমানবাহিনীর সহযোগিতায় ছোট ছোট ইকুইপমেন্টসহ ফায়ার ফাইটারদের হেলিকপ্টারে করে দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত নামানোর সমন্বিত প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, ঢাকায় মেগা প্রজেক্টে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বড় বড় ক্রেন, ডোজার ও ভারী যন্ত্রপাতির হিসাব এবং ফোকাল পয়েন্ট চূড়ান্ত করতে আমরা বৈঠকে বসছি। এতে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও সিটি কর্পোরেশনের ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুত ধ্বংসস্তূপ বা রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা সহজ হবে।

ইতোমধ্যে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে একটি মহড়াও সম্পন্ন করেছি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত ধরে নিয়ে আশপাশের স্টেশনগুলোর রেসপন্স টাইম যাচাই করা হয়েছে। তবে, এটি একক কোনো সংস্থার কাজ নয়; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়সহ সব স্টেকহোল্ডারকে সঙ্গে নিয়েই এই সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ঢাকা পোস্ট : ফায়ার ফাইটার নিয়োগে সম্প্রতি সিসিটিভি, ড্রোন ও ভিডিও রেকর্ডিং ব্যবহার করছেন। এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। ভবিষ্যতেও কি এই স্বচ্ছতা বজায় থাকবে, নাকি আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : একদমই না, আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফায়ার সার্ভিসকে শতভাগ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতেই আমরা প্রতিটি ইভেন্টের রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। 

শারীরিক ও লিখিত— উভয় পরীক্ষার ভেন্যুতেই সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিবন্ধিত গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য ভেন্যু উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যা আপনি নিজেও সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেছেন।

dhakapost

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনার আলোকেই আমরা সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রযুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলো। আমাদের লক্ষ্য— এটিকে ফায়ার সার্ভিসের স্থায়ী ‘সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে’ রূপ দেওয়া। ফলে নিয়োগ বাণিজ্য বা প্রতারণার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হবে এবং ফায়ার সার্ভিস একটি সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত হবে।

ঢাকা পোস্ট : শিল্পকারখানা, বহুতল ভবন ও বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের তদারকি চালাচ্ছেন? ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো কি নতুন করে চিহ্নিত করা গেছে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : পরিদর্শন ও তদারকির জন্য আমাদের ‘ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর’ পদ রয়েছে, যাদের সংখ্যা ২৬৮ জন। কেবল ঢাকা বিভাগেই লাখখানেক ভবন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাই এই স্বল্পসংখ্যক ইন্সপেক্টর দিয়ে পুরো দেশ কাভার করা কঠিন।

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে আমরা সম্প্রতি একটি বিশেষ ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করেছি। এই সেলের কাজগুলো হলো— ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্ধারণ অর্থাৎ আগে চিহ্নিত ভবনগুলোর পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করতে মনিটরিং সেলের একাধিক টিম মাঠে নামছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মহড়ার মাধ্যমে আমরা ভবন মালিকদের সচেতন করছি, যাতে তারা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি আইন মেনে ভবন নির্মাণ করেন। কারণ, সম্পদের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। পাশাপাশি আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত নোটিশ জারি করা হচ্ছে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে, ম্যাজিস্ট্রেট স্বল্পতার কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

ঢাকা পোস্ট : বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অভিযান চালাতে বা দেশের যেকোনো স্থানে দ্রুত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব সক্ষমতা বা আইনি সহায়তার কোনো প্রয়োজন আছে কি?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : আমাদের ফায়ার সার্ভিস আইন ও ২০০০ সালের বিধিমালা রয়েছে, তবে বিধিমালাটি কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে এতদিন স্থগিত ছিল। আমরা সেটি সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি; ইতোমধ্যে ৯৯ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আইন ও বিধিমালার আধুনিকায়ন আমাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

তবে, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো— ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব কোনো ম্যাজিস্ট্রেট নেই। ফলে প্রশাসনিক ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়ার ওপর নির্ভর করতে হয় বলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।
 
এই জটিলতা নিরসনে আমরা সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি, যেন অন্তত প্রেষণে হলেও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্ত করা হয়। নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট সুবিধা পেলে আমরা পুরান ঢাকা কিংবা টঙ্গীর বিপজ্জনক কেমিক্যাল গুদামসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারব। এতে আইন অমান্যকারীদের মধ্যে যেমন জবাবদিহিতা আসবে, তেমনি কেমিক্যাল গুদাম ও ভবন মালিকরাও অগ্নিপ্রতিরোধ আইন মেনে চলতে বাধ্য হবেন।

ঢাকা পোস্ট : ফায়ার লাইসেন্স থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবকাঠামো বা সুরক্ষা সরঞ্জামের মিল পাওয়া যেত না। ভুয়া লাইসেন্স ও এসব অনিয়ম বন্ধে নতুন কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : অতীতে ফায়ার সেফটি লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ছিল এবং মাঠপর্যায়ে ভুয়া লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগও ছিল। তবে, নতুন প্রজ্ঞাপন জারির পর পুরো ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন নিয়মে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) সরেজমিনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের আয়তন, মালামালের মজুত ও সুরক্ষাসামগ্রীর সঠিক তথ্য ছবিসহ সিস্টেমে যুক্ত করার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কিউআর কোডযুক্ত লাইসেন্স ডাউনলোড করতে পারছেন। এতে ভুয়া লাইসেন্স তৈরি বা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে।

ধীরে ধীরে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে অটোমেটেড সেন্ট্রাল ডেটাবেজের আওতায় আনা হচ্ছে, ফলে সরকার যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এছাড়া, সফটওয়্যার ও ই-চালানের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি কোষাগারে ফি জমা হওয়ায় রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ হয়েছে। আগে যেখানে বছরে ফায়ার সার্ভিস ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেত, ই-লাইসেন্স চালুর ফলে চলতি বছর তা ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে আশা করছি।

ঢাকা পোস্ট : বহুতল ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালাকে কি পর্যাপ্ত মনে করছেন, নাকি এতে কোনো সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : বহুতল ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে মূলত দুটি সংস্থা কাজ করে— রাজউক ও ফায়ার সার্ভিস। রাজউকের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-এ ফায়ার সেফটি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে এবং আমাদের আইনেও অনুরূপ বিধান রয়েছে।

আমরা কোনো ভবনের ‘ফায়ার সেফটি প্ল্যান’-এর অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বা কার্যকারিতা সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব নিরাপত্তা শর্ত শতভাগ পূরণ না হলে অনুমোদন দিই না। তবে, বড় জটিলতা হলো পুরোনো স্থাপনাগুলোকে নিয়ে। বিশেষ করে পুরান ঢাকা বা অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহু বছর আগে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ভবনগুলোতে ফায়ার সেফটি আইন পুরোপুরি প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব ভবনের নকশাগত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সেফটি লাইসেন্স দিই না।

dhakapost

অন্যদিকে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা বা ঝিলমিলের মতো নতুন গড়ে ওঠা পরিকল্পিত আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলোতে আমরা কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করছি। আর আগে থেকে নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা কীভাবে নিরসন করা যায়, তা নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।

ঢাকা পোস্ট : আমাদের ফায়ার ফাইটারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা পাওয়ার প্রয়োজন আছে কি?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : অবশ্যই। প্রতি বছরই আমরা বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছি। জাইকা, ফ্রান্স দূতাবাস, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার আমাদের এই সহায়তা দিয়ে থাকে।

সাধারণত কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। বর্তমানেও ১০ থেকে ১৫ জন কর্মকর্তা জাপান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পাশাপাশি বিদেশি প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে ফায়ার ফাইটারদের প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম প্রদান করছেন।

আমাদের বড় সীমাবদ্ধতা হলো নিজস্ব আধুনিক ট্রেনিং একাডেমি না থাকা। বর্তমানে পূর্বাচল ৩০০ ফিট এলাকায় ঢাকা বিভাগের জন্য একটি ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে ফায়ারকর্মীরা বিশ্বমানের প্রশিক্ষণে স্বাবলম্বী হবেন।

ঢাকা পোস্ট : অগ্নিনিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : অগ্নিকাণ্ড বা যেকোনো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আলাদা কোনো বড় ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই; সাধারণ মানুষ কেবল সচেতন হলেই প্রায় ৫০ শতাংশ দুর্ঘটনা এমনিতেই কমে যাবে। তাই আমরা সচেতনতা তৈরিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। গত বছরের (২০২৫) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমরা ২৭ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রেসপন্স করেছি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। মানুষ সচেতন হলে এই সংখ্যা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

গত বছর সচেতনতা ও আইন বাস্তবায়নে আমরা ব্যাপক মহড়া ও গণসংযোগ চালিয়েছি। সারা দেশে ১৫ হাজার ৮৬৫টি মহড়া, ১৪ হাজার ৯৮৭টি গণসংযোগ, তিন হাজার ৭২২টি ফায়ার ড্রিল এবং দুই হাজার ৭৮টি সুরক্ষামূলক সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে চার হাজার ৩৪৫টি সেশনের মাধ্যমে এক লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ জনকে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কেবল তৈরি পোশাক কারখানাতেই তিন হাজার ৯৮১টি সেশনে এক লাখ ৫৬ হাজার ৮৪০ জন শ্রমিককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুলগুলোতে ৩৩টি কোর্সের মাধ্যমে এক হাজার ৩৯ জন ছাত্র-ছাত্রীকে ভলান্টিয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফায়ার সেফটি আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক কোটি ৯৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে সেবা পৌঁছাতে ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ইমার্জেন্সি রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের অধীনে টোল-ফ্রি নম্বর ‘১০২’ চালুর ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যেকোনো সাধারণ ফোন থেকে বিনামূল্যে কল করলে ৯৯৯-এর মতোই আমাদের অপারেটররা দ্রুত নিকটস্থ স্টেশনকে ঘটনাস্থলে পাঠাতে নির্দেশ দেন।

এছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও আমরা প্রতিনিয়ত মানুষকে সচেতন করার কাজ অব্যাহত রেখেছি।

ঢাকা পোস্ট : আগামী পাঁচ বছরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে কোন উচ্চতায় দেখতে চান?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : মহাপরিচালক হিসেবে আমার ও আমাদের পুরো বাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো ফায়ার সার্ভিসকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত সেবাদানে সক্ষম এবং শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। আমরা চাই এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ পছন্দনীয় ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ নিক।

তবে, এই অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা অপরিহার্য। যেমন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আমরা সংবাদকর্মীদের পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ ও গঠনমূলক মতামতের সুযোগ দিয়েছিলাম। কাজের ভুলত্রুটিগুলো ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হলে আমরা দ্রুত সংশোধন করে সেবার মান আরও উন্নত করতে পারি।

ফায়ার সার্ভিসের সব স্তরের সদস্য আজ একতাবদ্ধ। দেশের মানুষ ইতোমধ্যে এই বাহিনীকে ভালোবাসে; আমরা আমাদের কাজের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার আস্থা ও মর্যাদা আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে চাই।

ঢাকা পোস্ট : সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : দেশবাসীর প্রতি আমার একটাই উদাত্ত আহ্বান— সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন। বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন বা শিল্পকারখানা— যাই নির্মাণ করুন না কেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ফায়ার সেফটি আইন মেনে চলুন।

সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো ব্যক্তিগত সচেতনতা। নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করলে দিনশেষে মালিক নিজে এবং তার বিনিয়োগই সুরক্ষিত থাকে। একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পরিবারে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ভবনের মালিক ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ— আইন মেনে চলুন এবং ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করুন।

ঢাকা পোস্ট : ব্যস্ততার মাঝেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল : আপনাকে এবং ঢাকা পোস্টের সকল পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীকেও আন্তরিক ধন্যবাদ।

এমএম/এমএআর/