বিজ্ঞাপন

এক ইঞ্চি কাজ নেই, পকেটে ৯১ কোটি : সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মহাজালিয়াতি!

এক ইঞ্চি কাজ নেই, পকেটে ৯১ কোটি : সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মহাজালিয়াতি!

কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আর খাতা-কলমে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৭ শতাংশ। এই চিত্রে উঠে এসেছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরের সাত উপজেলায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা পাকা করার জন্য নেওয়া ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে। ২০২১ সালে গৃহীত প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের জুন মাসে। প্রতি কিলোমিটারে খরচ ধরা হয়েছিল সোয়া কোটি টাকা, কিন্তু বিধিবহির্ভূতভাবে ৩ থেকে ৪ গুণ অতিরিক্ত বিল আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থে গৃহীত এই মেগা প্রকল্পে এমন জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন ও ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে।

ডিপিপি’র (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলায় মোট নিবন্ধিত গ্রামীণ সড়ক রয়েছে ৫ হাজার ৮১৯ কিলোমিটার। এর একটি বড় অংশ— প্রায় ৪ হাজার ৪৭৪ কিলোমিটার সড়ক এখনও কাঁচা। এই বিশাল গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা বদলে দিতেই নেওয়া হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দুর্গম এলাকার ৪৭৯.৬২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ। বিশেষ করে জেলার সদর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, ভান্ডারিয়া, কাউখালী, ইন্দুরকানি ও মঠবাড়ীয়া উপজেলার সাধারণ মানুষের জন্য গ্রাম, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যেই ২০২১ সালের ১৬ মার্চ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। এর মেয়াদ ছিল এপ্রিল ২০২১ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত।

পিরোজপুরের গ্রামীণ সড়ক পাকা করার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩১টি ভুয়া স্কিমে এক ইঞ্চি কাজ না করেই প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও নথিপত্রে অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৭ শতাংশ। এছাড়া, ৪৭টি প্যাকেজে আসল কাজের চেয়ে ৩-৪ গুণ অতিরিক্ত বিল তুলে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে

ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে এই প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৩১টি ভুয়া স্কিম বা প্যাকেজ দেখিয়ে কোনো প্রকার নির্মাণকাজ না করেই প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির চিত্র এখানেই শেষ নয়; প্রকল্পের ৪৭টি প্যাকেজে বাস্তব কাজের অগ্রগতির তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

dhakapost

ডিপিপির তথ্যের ভিত্তিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভান্ডারীয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভান্ডারীয়া মন্ত্রিবাড়ি রোড ভায়া খন্দকার বাড়ি রোডে বিসি রাস্তা এবং তিনটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করার কথা থাকলেও মাঠে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজের কোনো চিহ্ন না থাকলেও তিন কোটি ৭০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

একইভাবে শ্রীপুর শিকদার হাট থেকে শ্রীপুর বলগার ব্রিজ রোড ভায়া শিকদার হাউস রোডে বিসি রাস্তা এবং চারটি ক্ষুদ্রাকৃতির ও একটি বড় আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কথা ডিপিপিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে রাস্তাটি সম্পূর্ণ কাঁচা অবস্থায় পড়ে রয়েছে, গড়ে ওঠেনি কোনো কালভার্টও। অথচ কাজ না করেই এই খাত থেকে তিন কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক ও ছাড়পত্র ছাড়াই সরাসরি জেলা দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের (এজি অফিস) যোগসাজশে জালিয়াতি করে বিল পাস করা হয়েছে। ডিপিপির বাইরে অননুমোদিত বরাদ্দ, ভুয়া বিল পাস ও কেনাকাটায় জালিয়াতির কারণে উঠে এসেছে ১২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি। এছাড়া, পুরো ঘটনায় সাবেক পিডি ও আমলাদের দায়ও প্রকাশ্যে এসেছে

জালিয়াতির এই উৎসব এখানেই থামেনি। মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া বর্ডার রোডে বিসি রাস্তা এবং ২-ভেন্টসহ মোট ১২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে এই কাজের কোনো হদিস মেলেনি। অথচ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে দুই কোটি৭১ লাখ টাকা। এছাড়া, রাজপাশা স্টিল ব্রিজ থেকে মহিলা দাখিল মাদ্রাসা রোড এবং ধাওয়া রোড থেকে পোদ্দার খাল রোডে বিসি রাস্তা ও ১০টি বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে কিছু ইটের খোয়া ফেলে রাখা হলেও পরবর্তীতে কোনো কাজ করা হয়নি। এই অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতেও তিন কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

রাস্তা যেমন ছিল তেমনই আছে

সরেজমিনে অনুসন্ধানে গেলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, খাতা-কলমে রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের সুদৃশ্য চিত্র দেখিয়ে সমুদয় অর্থ পকেটে পুরেছেন অসাধু ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক তদারকির তীব্র অভাব ও জালিয়াতির নগ্ন রূপ।

স্থানীয় বাসিন্দা মহারাজ সিকদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানে কিচ্ছু হয় নাই, কিচ্ছুই হয় নাই! রাস্তাটা চরম ভাঙা অবস্থায় পইড়া আছে। এই ভাঙা রাস্তা দিয়া আমাদের হেঁটে যাতায়াত করতে হয়, মসজিদে ও মাদ্রাসায় যাইতে হয়। রাস্তায় হাঁটার উপায় নাই, এমন অবস্থা যে যেকোনো সময় ঠ্যাং-পাও ভাইঙা যাওয়ার উপক্রম হয়।’ তার অভিযোগ, ‘অফিস থিকা ঠিকাদার কাজ পাইছে, কোনো কাজ না কইরাই সব টাকা উঠাইয়া নিয়া খাইয়া ফালাইছে।’

সরাসরি ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের অভিযুক্ত করে আলহাজ খন্দকার নুরুল আমিন বলেন, ‘আমাদের এই রাস্তা পাস হইছে কিন্তু কোনো কাজ করা হয় নাই। অফিসে খোঁজ নিয়া শুনলাম টেন্ডারের বিল-টিল সব নিয়া চম্পট দিছে। কয়দিন আগে লোকদেখানো সামান্য কয়টা ইট ফেলাইয়া থুইয়া গেছে। রাস্তা এতোই খারাপ যে গাড়ি-ঘোড়া তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষও হাঁটতে পারে না।’

অনিয়ম ঢাকতে বারবার পিডি বদল করা হয় এবং সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাটের মেয়াদে থাকা কর্মকর্তাকেই পুনর্বহাল করা হয়েছে। বর্তমানে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক এমপি ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অনেকের বিরুদ্ধে দুদকের আটটি মামলা চলমান। তবে, আইনি জটিলতা কাটিয়ে স্থগিত হয়ে থাকা অসমাপ্ত কাজগুলো নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে

গোলাম মহসিন বলেন, ‘এখানে তিনটা কালভার্ট হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে একটারও অস্তিত্ব নাই। কোনোদিন কোনো সরকারি লোক বা অফিসার আইসা যে তদারকি করবে বা কাজ দেখবে, তা আজ পর্যন্ত কেউ দেখে নাই। চরম দুর্ভোগের মধ্যে আমরা বসবাস করতেছি।’

বাসিন্দারা জানান, কাজ না করে রাস্তা এভাবে ফেলে রেখে গেলেও কোনো কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি এসে কখনও খোঁজ নেননি। কাঁঠালিয়া-ভান্ডারিয়া সড়কের অংশটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে থাকলেও বছরের পর বছর তা মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ওমর সরদার নামের এক স্থানীয় জানান, এলাকার জনগণ নিজেরা চাঁদা তুলে তিন হাজার ইট আর বালি দিয়েছিলেন। কিন্তু একটু বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা কাদা হয়ে যায়; গাড়ি তো দূরের কথা, মানুষের হেঁটে চলাই দায় হয়ে পড়ে।

আক্কারখালের গোড়া থেকে ছাদনার বাজার পর্যন্ত ভেতরের রাস্তাগুলোর অবস্থা চরম নাজুক বলে জানান আরেকজন এলাকাবাসী মো. ইলিয়াস হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে যে হাসপাতালে নিয়া যাব, সেই গাড়িতে উঠাবার মতো সামান্যতম ব্যবস্থাও রাস্তায় নাই।’ 

স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি হাজি মো. নুরুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে শুধু নামকাওয়াস্তে একটু ম্যাকাডাম (ইটের গুঁড়ো/খোয়া) ফেলছিল, এরপর আর কোনো কাজই হয় নাই।’

dhakapost

উপজেলার ছাড়পত্র ছাড়াই অর্থ উত্তোলন! অভিযোগের তীর জেলা প্রকৌশলীর দিকে

পিরোজপুর পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম ও কাজ না করে শতভাগ অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে পিরোজপুর সদর উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নবনিযুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, উপজেলা পর্যায়ের কোনো প্রতিবেদন বা ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই এই অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয় থেকে এসব কাজের কোনো বিল প্রস্তুত বা মেজারমেন্ট বুকে (এমবি) সই করা হয়নি। তৎকালীন জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন) কার্যালয়, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে সরাসরি জেলা কার্যালয় থেকেই নথিপত্র ছাড়া ও অনিয়ম করে বিল ছাড় করা হয়।

তিনি আরও জানান, এই প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন রয়েছে এবং এ সংক্রান্ত অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে দুদকে আটটি মামলা দায়ের হয়েছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে এলজিইডির কাউখালী ও ভান্ডারিয়া উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রকৌশলী ইমতিয়াজ হোসাইন রাসেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জেলার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (এজি) কার্যালয়ের কতিপয় ব্যক্তি সরাসরি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কোনো প্রকার প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা ডকুমেন্টস ছাড়াই যারা বিল অনুমোদন ও স্বাক্ষর করেছেন, তারা এতে স্পষ্টভাবে দায়ী। পরবর্তীতে দুদক তদন্ত করে তাদের অভিযুক্ত বা আসামি করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মূলত কন্টিনজেন্সি ফরমে একটি ইস্যু বানিয়ে লামসাম টাকার পরিমাণ বসানো হয়েছিল। সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষর, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের নাম এবং নিচে এজি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্বাক্ষর রয়েছে। সেই কাগজ ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ বা নথিপত্র ছাড়াই বিল পাস বা বিলিং সম্পন্ন করা হয়েছে। অধিকাংশ বিষয়গুলোই তদন্তে উঠে এসেছে। যেহেতু বর্তমানে তদন্ত চলমান, তাই বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’

বরাদ্দ ছাড়িয়ে ব্যয়ের হিড়িক দুই অর্থবছরে

প্রকল্পটির আর্থিক গতিপ্রকৃতি ও ডিপিপি পর্যালোচনা করে বরাদ্দ ও ব্যয়ে চরম অসামঞ্জস্যতার চিত্র পাওয়া গেছে। একনেকে ২০২১ সালের মার্চ মাসে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই প্রকল্পটির বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নিয়মের বড় ধরনের ব্যত্যয় লক্ষ্য করা গেছে।

প্রকল্পটির জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে ডিপিপিতে ১৪৭ কোটি টাকার বিশাল সংস্থান রাখা হলেও বাস্তবে অর্থছাড় বা ব্যয় হয়েছে মাত্র ৬২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আর্থিক পরিকল্পনার এই অসামঞ্জস্যতা আরও প্রকট রূপ নেয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। এই অর্থবছরের প্রকল্প দলিলে ১১৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা থাকলেও সমস্ত নিয়মকে পাশ কাটিয়ে অস্বাভাবিকভাবে এডিপিতে ২১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার প্রায় পুরোটাই অর্থাৎ ২১২ কোটি ৪৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকাই ছাড় ও ব্যয় দেখায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ডিপিপির মূল প্ল্যান ভেঙে বরাদ্দ বাড়ানোর ধারা অব্যাহত থাকে। এই অর্থবছরে ডিপিপির সংস্থান ছিল ১১৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, কিন্তু এডিপি বা সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয় ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৪৯ কোটি ৯৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়।

লাগাম টানার চেষ্টা

তবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার দাবি থাকলেও সরকারিভাবে বরাদ্দ সংকুচিত করে আনা হয় মাত্র ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকায়; যার মধ্য থেকে ১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ও রহস্যজনক তথ্য মিলেছে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। ডিপিপির মূল প্ল্যানে এই অর্থবছরের জন্য কোনো ধরনের আর্থিক সংস্থানের উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও এডিপিতে রহস্যজনকভাবে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এই অর্থবছরটিতে কোনো টাকা ছাড় বা প্রকল্পে ব্যয় করা হয়নি।

নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো কোনো অর্থবছরে ডিপিপির মূল পরিকল্পনার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ বরাদ্দ নিয়ে ব্যয় করা হয়েছে, আবার কোনো অর্থবছরে কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ডিপিপির বরাদ্দের এই খামখেয়ালি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এবং আর্থিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

ডিপিপির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. এনামুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে কিছু ব্যত্যয় ঘটা অস্বাভাবিক নয় এবং সে ক্ষেত্রে সংশোধনী এনে অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়া হতে পারে। তবে, এর একটি নির্দিষ্ট আইনি সীমা রয়েছে। আইন ভেঙে বা অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেওয়ার পেছনে মূল দায় পিডির (প্রকল্প পরিচালক)। পেছনে যত লোকই থাকুক না কেন, নিয়মানুযায়ী প্রথমত পিডিকেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং সরকার তাকেই ধরবে।’

dhakapost

পিডির বদলি ও ফিরে আসার চক্র

আর্থিক এই হরিলুটের সমান্তরালে প্রকল্পটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণেও দেখা গেছে ঘন ঘন রদবদল ও নজিরবিহীন ওলটপালট, যা এর স্বচ্ছতাকে আরও বেশি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের মার্চে একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পরপরই মে মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রথম পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সুশান্ত রঞ্জন রায়কে। তিনি মাত্র তিন মাস দায়িত্বে থাকার পর এই পদে পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে আসেন মোহাম্মদ আদনান আখতারুল আজম। তার এক বছরের মেয়াদ শেষ হতে না হতেই এলজিইডি নতুন পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে নিয়োগ দেয় মো. ইব্রাহিম খলিলকে। মূলত ইব্রাহিম খলিলের দুই বছরের দায়িত্বকালীন সময়েই প্রকল্প থেকে অস্বাভাবিক ও বিতর্কিত অর্থ উত্তোলনের ঘটনাগুলো ঘটে।

এরপর আবারও মোহাম্মদ আদনান আখতারুল আজমকে দুই মাসের জন্য অতিরিক্ত পিডি হিসেবে ফিরিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, যে মো. ইব্রাহিম খলিলের মেয়াদের সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাট ও অস্বাভাবিক খরচের অভিযোগ উঠেছিল, তাকেই আবারও এই প্রকল্পের পূর্ণকালীন পিডি হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়। একই প্রকল্পে বারবার এমন পিডি বদল এবং বিতর্কিতদের পুনরায় শীর্ষ পদে ফিরিয়ে আনার এই চক্রটি ভেতরের কোনো গভীর অনিয়ম বা বিশেষ সিন্ডিকেটের ইশারাকেই স্পষ্ট করে।

অনিয়মে জড়িত পিডিদের পুনর্নিয়োগ বা প্রশাসনিক শিথিলতা প্রসঙ্গে ড. এনামুল হক বলেন, ‘সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করে। প্রকল্প পরিচালকদের অতিরিক্ত সরকারি বা প্রশাসনিক অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হলে তারা দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়। তাই যোগ্য ও প্রকল্প বোঝেন— এমন কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা তাদের কাজের জন্য সম্পূর্ণ জবাবদিহি করতে পারেন।’

মেয়াদ বাড়াতে এলজিইডির প্রস্তাবে আইএমইডির ‘না’

বাস্তবে এক ইঞ্চি কাজ না করেই পুরো টাকা তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পর তড়িঘড়ি করে সময় বাড়ানোর আবেদন— একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া এমন সব নজিরবিহীন জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। 
প্রকল্পের আওতায় মোট ৩১টি ভুয়া স্কিম বা প্যাকেজ দেখিয়ে কোনো প্রকার নির্মাণকাজ না করেই ৯০ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, যা থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাদে সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে ৭৭ কোটি ২৩ লাখ ২৬ হাজার ১৫০ টাকা। এই ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনায় ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে। দুর্নীতির চিত্র এখানেই শেষ নয়; প্রকল্পের ৪৭টি প্যাকেজে বাস্তব কাজের অগ্রগতির তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট অঙ্ক এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

একদিকে যেমন কাজ না করে শত কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে মোট ২১৩টি প্যাকেজের মধ্যে কাজের অগ্রগতি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বেশকিছু প্যাকেজের কাজ গত দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। অনেক প্যাকেজের অগ্রগতি ২০ থেকে ৩০ শতাংশে থমকে আছে, আর ৩২টি প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি একেবারেই শূন্য।

আইএমইডির প্রতিবেদনে আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতির তথ্য নিয়েও তীব্র অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রকল্পের শুরু থেকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ৪৪১ কোটি ১৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা অর্থছাড় ও ব্যয় দেখিয়ে বাস্তব অগ্রগতি ৭৭.৭৭ শতাংশ দাবি করা হলেও ভুয়া প্যাকেজের টাকা উত্তোলন ও অতিরিক্ত বিল প্রদানের পর এই হিসাব কীভাবে তৈরি করা হলো— তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে, মেয়াদের নিয়ম মেনে অন্তত তিন মাস আগে আবেদন করার বিধান থাকলেও মেয়াদের সময় পার হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর আইএমইডিতে সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হয়, যা সরকারি বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এসব মারাত্মক অনিয়ম ও আইনি জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে আইএমইডি তাদের চূড়ান্ত সুপারিশে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার এতদিন পর প্রস্তাব পাঠানোয় আইন অনুযায়ী এই প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো সম্ভব নয়। সংস্থাটির মতে, ভুয়া বিল উত্তোলন ও অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে আসল অগ্রগতি নিরূপণ করতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রকল্পটিকে দ্রুত সমাপ্ত ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য ই-পিএমআইএস সফটওয়্যারে নিয়মিত আপলোড করার তাগিদ দিয়েছে আইএমইডি।

অডিট আপত্তিতেও ১২৮ কোটি টাকার ক্ষতি

আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদিত ডিপিপিতে নির্ধারিত বছরভিত্তিক ব্যয়ের তোয়াক্কা না করে অননুমোদিতভাবে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া থেকে শুরু করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অডিট আপত্তিতে। প্রকল্পটির বিষয়ে বর্তমানে আটটি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যেখানে সবমিলিয়ে সরকারের ১২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিট আপত্তিতে বলা হয়, সবচেয়ে বড় অনিয়ম ঘটেছে বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে। ডিপিপিতে অনুমোদিত বছরভিত্তিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের তোয়াক্কা না করে অননুমোদিতভাবে ১২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকার অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ ও বিধিবহির্ভূত ব্যয় করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের প্রাক্কলন ও দরপত্র অনুমোদন দিয়ে সরকারের তিন কোটি ২৪ লাখ টাকা ক্ষতি করা হয়েছে।

এছাড়া, চেইনেজে অনুমোদিত রাস্তার আসল দৈর্ঘ্যের চেয়ে কাগজ-কলমে অতিরিক্ত দৈর্ঘ্য দেখানো এবং গ্রামীণ সড়কের ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড উপেক্ষা করে বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের পরিবর্তে ডেন্স কার্পেটিং অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।

ক্রয় প্রক্রিয়া ও চুক্তি ব্যবস্থাপনায় জালিয়াতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে অডিট প্রতিবেদনে। কোনো প্রকার কেনাকাটা বা কাজ সম্পাদন না করেই সম্পূর্ণ ভুয়া বিল বানিয়ে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, অর্থবছর শেষে বরাদ্দ দেওয়া টাকা শেষ করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও জুন মাসে কেনাকাটা দেখিয়ে অপচয় করা হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া, কার্যসম্পাদনে ব্যর্থ ঠিকাদারের জমা রাখা প্রায় ১৯ লাখ টাকার পারফর্মেন্স সিকিউরিটি বা জামানত বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে সেই অর্থ গায়েব করার কথাও উল্লেখ করেছে অডিট অধিদপ্তর।

সাবেক এমপি মহারাজ ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক

এই প্রকল্পটিসহ পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য (পিরোজপুর-২) মহিউদ্দিন মহারাজ, এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পৃথক আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিরোজপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম।

তিনি জানান, আসামিরা নিজেদের ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মামলাগুলো বর্তমানে তদন্তপর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত শেষ করে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। প্রাথমিক অভিযোগের চেয়ে তদন্ত পর্যায়ে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিলের কাগজপত্রই পাঠানো হতো না: সাবেক পিডির দাবি

‘পিরোজপুর জেলা পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখে শতভাগ অর্থ তুলে নেওয়ার প্রসঙ্গে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. ইব্রাহিম খলিল। এই পিডির আমলেই প্রকল্পটির শতভাগ টাকা তুলে নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, কাজ না করে বিল তুলে নেওয়ার পেছনে পিডির চেয়ে মাঠপর্যায়ের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সইএন), জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস (এজি অফিস) এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ঠিকাদাররা মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

তিনি বলেন, ‘কাজের পারপাসে বিল পাস করা বা টাকা দেওয়ার দায়িত্ব সরাসরি পিডির নয়, এটা মাঠপর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিষয়। এই প্রকল্পে আমি যোগ দেওয়ার আগেই তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার পিরোজপুরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুরো প্রজেক্ট পিরিয়ডের প্রায় তিন-চার বছর উনিই সেখানে ছিলেন। জেলা এজি (হিসাবরক্ষণ) অফিসের সঙ্গে মিলে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা ফাইল ছাড়াই তারা কীভাবে অর্থ ছাড় করে দিয়েছে, তা আমরা নিজেরাও ফাইলপত্র খুঁজে পাই না। মাঠপর্যায় থেকে আমাদের কাছে বিলের কাগজপত্রই পাঠানো হতো না।’

প্রকল্পের ঠিকাদারি চক্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কথা তুলে ধরে সাবেক এই পিডি আরও বলেন, “সেখানে স্থানীয়দের প্রচণ্ড রাজনৈতিক দাপট ছিল, বিশেষ করে মহারাজ ও তার লোকজনের। তাদের নামেই বেশিরভাগ কাজের ঠিকাদারি ছিল। রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তারা কাউকে প্রকল্প এলাকায় ঢুকতে দিত না। ‘আমার টাকা আমি যাকে খুশি দিচ্ছি’— এমন মনোভাব নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ পরিচালনা করেছে এবং কাজ না করেই টাকা তুলে নিয়েছে।”

নিজের দায়িত্বের সময়কাল ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প শুরুর প্রায় এক বছর পর আমি পিডি হিসেবে যোগ দিই। আমার আগে অন্য একজন পিডি সম্পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এটি একটি বড় অনিয়ম, যার তদন্ত বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভাগীয় পর্যায়ে চলছে।’

কাগজপত্রে অসঙ্গতি না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী বিল পাস হয়: ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল

সরকারি খাতের যেকোনো নির্মাণ বা উন্নয়ন কাজের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেওয়াই প্রধান শর্ত বলে ঢাকা পোস্টকে জানান পিরোজপুর জেলার ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল পলাশ চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি দপ্তর থেকে অফিশিয়াল নিয়মে ফাইল বা কাগজপত্র এখানে জমা হয়। ঠিকাদারের সঙ্গে মূল চুক্তি বা কাজ বাস্তবায়নের বিষয়টি দেখভাল করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এখতিয়ার। ওই দপ্তরের মাধ্যমে কতটুকু কাজ সম্পন্ন হলো কিংবা কাজের বর্তমান অবস্থা কী, তা ওই দপ্তরই নিশ্চিত করে। আমাদের কাজ মূলত অফিশিয়াল কাগজপত্র ও নীতিমালার আলোকে যাচাই-বাছাই করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাজ শেষ করার পর সরকারি নিয়ম মেনে ঠিকাদারেরা যখন বিল জমা দেন, তখন বিলের সঙ্গে আবশ্যকীয় সহায়ক কাগজপত্র সঠিকভাবে যুক্ত আছে কি না— আমরা তা পরীক্ষা করে দেখি। কাগজপত্র নিয়মমাফিক থাকলে এবং কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসংগতি না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী বিল পাস করা হয়।’

বাস্তব ক্ষেত্রে নির্মাণাধীন সড়ক বা প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে এজি অফিসের এই কর্মকর্তা জানান, হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তাদের সরাসরি প্রকল্প এলাকায় বা রাস্তায় গিয়ে সরেজমিনে কাজ দেখার প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা কিংবা সুযোগ থাকে না। সংশ্লিষ্ট কাজের তদারকি দপ্তর থেকে যে অফিশিয়াল প্রতিবেদন ও নথি অফিসে পাঠানো হয়, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা হয়।

dhakapost

দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বন্ধ থাকা উন্নয়নকাজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ

দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পিরোজপুর এলজিইডির সব উন্নয়নকাজ পুনরায় চালুর লক্ষ্যে আইনি জটিলতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন। 

তিনি জানান, বন্ধ থাকা কাজগুলো চালু করতে গত ৯ আগস্ট সচিবালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আইনি জটিলতা নিরসন করে খুব শিগগিরই নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থগিত হয়ে থাকা উন্নয়নকাজগুলো পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে পড়ে থাকা উন্নয়নকাজগুলো পুনরায় শুরু করতে এখন আর কোনো আইনি জটিলতা নেই। খুব দ্রুতই নতুন করে কাজগুলো শুরু করা হবে। যে কাজ যেভাবে বা যে অবস্থায় পড়ে আছে, সেখান থেকেই অসমাপ্ত অংশ সম্পন্ন করার জন্য নতুন করে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) প্রস্তুত করা হবে। এরপর নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা দুর্নীতি করেছেন এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখে পালিয়ে গেছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলমান থাকবে এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের এই কঠোর অবস্থান স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে পিরোজপুরের থমকে যাওয়া উন্নয়ন কার্যক্রমকে পুনরায় গতিশীল করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

উপজেলা প্রকৌশলীদের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া এবং কাজ না করে বিল তুলে নেওয়ার বিষয়ে বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. এনামুল হক বলেন, ‘কাজের সঠিক সত্যায়ন ছাড়া সরকারি অর্থ উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। কাজ না করে বিল নেওয়ার পেছনে অবশ্যই ভেতরের কারও না কারও ভুয়া সার্টিফিকেশন কাজ করেছে। অডিট অফিসার বা এজি অফিস সবসময় সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করে না; তারা ফাইলের কাগজপত্রের বৈধতা দেখে। পরবর্তীতে যখন মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিট হবে, তখন তারা নিশ্চিতভাবেই এই অনুমোদনহীন পেমেন্ট ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ওপর গুরুতর আইনি আপত্তি তুলবে।’

প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হওয়া এবং প্রতিকারের উপায় সম্পর্কে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যেহেতু কাজ না করেই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ ও দুর্নীতি। এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রধান দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের। এটি যেহেতু জনগণের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি প্রকল্প, তাই সরকারের প্রশাসনিক তদন্ত শেষে সংশোধনী এনে আবার নতুন করে কাজটি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি গণমাধ্যমের সামনে পিরোজপুরে প্রকল্পের নামে লুটপাটের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন। 

তিনি জানান, পিরোজপুর জেলাজুড়ে চলছে নজিরবিহীন উন্নয়ন স্থবিরতা। বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন এক প্রভাবশালী শীর্ষ আমলার প্রভাবে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাতের আঁধারে ডিপিপি অনুমোদন করিয়ে অন্তত ছয় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প সাজানো হয়। তবে, টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করেই ভুয়া বিল তৈরি করে ট্রেজারি থেকে চেক তুলে সটকে পড়েছেন ঠিকাদাররা। আর গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অভিযুক্ত ঠিকাদারদের বড় একটি অংশ দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিগত ১৮ মাস ধরে কোনো দাপ্তরিক আদেশ ছাড়াই কেবল একটি ‘মৌখিক নির্দেশনায়’ পিরোজপুর জেলার সব দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা প্রকৌশল, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলসহ বিভিন্ন দপ্তরের দুই হাজার ৪১০টি প্রকল্প অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পিরোজপুরের সাধারণ মানুষ।

কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার বিষয়ে স্থানীয়রা তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ ও ঠিকাদার মিরাজের নাম জানান। খোঁজ নিয়ে তাদের দুজনের কাউকেই পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানান, তারা উভয়ই বর্তমানে বিদেশে পলাতক। এছাড়া, পিরোজপুর জেলার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে এলজিইডির সদর দফতরে ও তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এসআর/এমএআর