বিজ্ঞাপন

বোমা উদ্ধার ও ‘আল-কায়েদা’ ইস্যু: নিরাপত্তা শঙ্কা কতটা জোরালো?

বোমা উদ্ধার ও ‘আল-কায়েদা’ ইস্যু: নিরাপত্তা শঙ্কা কতটা জোরালো?

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে একাধিক বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে নেমে ঢাকার সাভারে ‘নব্য জেএমবি’র একটি সম্ভাব্য বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান পায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান নামের এক যুবককে গ্রেপ্তারও করা হয়।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জোড়া এই ঘটনার পর দেশে জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে কোনো ধরনের জঙ্গি তৎপরতা নেই। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু মনে করছে না। তাদের দাবি, দেশে বড় ধরনের কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার শঙ্কা নেই; আর যারা আইন লঙ্ঘন করে দেশবিরোধী অপতৎপরতার চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা থেকে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং ‘নব্য জেএমবি’র সক্রিয়তার খবরের মধ্যেই বাংলাদেশে আল-কায়েদার গোপন সেল গঠনের চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এতে দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই বার্তাকে কেবল ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত।

অন্যদিকে, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখতে নারাজ। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-কায়েদা বাংলাদেশে তাদের স্থায়ী ঘাঁটি ও গোপন সেল গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, ‘নব্য জেএমবি’ সক্রিয় হওয়ার তথ্য এবং আল-কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের এই বার্তাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এসব ঘটনা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করছে।

dhakapost

পাশাপাশি, অতীতে জঙ্গি তৎপরতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে স্বীকার বা অস্বীকার করার যে অপসংস্কৃতি দেখা গেছে, এবারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তেমন কিছু করা হচ্ছে কি না— সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

এখনও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও গোয়েন্দা নজরদারিসহ সার্বিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্যের কিছুটা ঘাটতি থাকলেও অমূলক ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। মাঝে উগ্রবাদবিরোধী কার্যক্রমে কিছুটা ছেদ পড়েছিল, যা বড় সমস্যা তৈরি করেছে; কারণ এই খাতে ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন। তাই পুলিশের বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোর সক্ষমতা ও কার্যক্রম দ্রুত বাড়ানো উচিত।’

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা আছে

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়দার শাখা ‘একিউআইএস’ নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত আল-কায়দা ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর বৈশ্বিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একিউআইএস এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো গোষ্ঠী নয়; বরং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নিচ্ছে। বড় ইউনিটের বদলে তারা এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং শক্তিশালী লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এর উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার ঘটনায় সংগঠনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বড় কোনো নাশকতার ঝুঁকি অস্বীকার করলেও বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক স্বার্থে উগ্রবাদীদের ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকেও নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট তদন্তের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ঢালাওভাবে কাউকে দায়ী না করে আসল উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করা না গেলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং সুযোগ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের নাশকতা ঘটানোর ঝুঁকি তৈরি হবে

প্রতিবেদনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো— একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের গোপন সেল গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া, সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের তালেবানের দেওয়া বিশেষ পরিচয়পত্র (তাজকিরা) দেওয়া হয়েছে বলেও এতে দাবি করা হয়।

dhakapost

জাতিসংঘের এই বার্তা আসার আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের খবর সামনে আসে। সবশেষ গত রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ডেমরার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ সানারপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। 

সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট জানায়, সম্প্রতি যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার তদন্তে নেমে আসামির সন্ধান করতে গিয়ে এই বোমার হদিস মেলে। ঘটনার পর পুলিশ ‘ওস্তাদ জুয়েল’ নামে পরিচিত জুয়েল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে।

ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মীর মহসিন মাসুদ জানান, সানারপাড়ায় উদ্ধার হওয়া বোমাসদৃশ বস্তু দুটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় (ডিফিউজ) করা হয়েছে। এ ঘটনায় জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার সাংগঠনিক পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

‘নব্য জেএমবি’র সক্রিয়তা ও সিরিজ বোমা উদ্ধার

একসময়ের আলোচিত ও নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’ নতুন করে সক্রিয় হওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। সেখান থেকে নয়টি বিস্ফোরক ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধারসহ ২০২৩ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দেওয়া আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তকারীরা জানান, ইমরানের গুরু সংগঠনটির পরিচিত বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের নেপথ্যে নাম আসায় এই বোমারু মামুনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।

এর আগেও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বোমার সন্ধান মেলে। গত ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করা হয়। ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতরে রাখা শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।  ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করে পুলিশ সদর দপ্তর।

অথচ গত এপ্রিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। তবে একের পর এক বোমা উদ্ধার, নব্য জেএমবি সক্রিয় হওয়ার তথ্য এবং আল-কায়েদা সম্পর্কিত জাতিসংঘের প্রতিবেদন— এই পুরোনো দাবিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

dhakapost

যদিও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বড় কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার শঙ্কা নেই। প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে, আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু দেখছি না।’

তবে, বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠন সংক্রান্ত জাতিসংঘের দাবির বিষয়ে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। আল-কায়েদা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের প্রতিবেদন নিয়ে জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তা নিয়ে আমার মন্তব্যের কিছু নেই, বিষয়টি সরকার দেখবে।’

অবশ্য এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।
 
উদ্ধার করা বিস্ফোরকের সঙ্গে আল-কায়েদার কোনো যোগসূত্র আছে কি না— জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার পরই এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে। তবে, যেকোনো সন্ত্রাসী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতেই কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।”

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট: দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা ও জঙ্গি তৎপরতা

২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে দেশজুড়ে নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) তাদের উপস্থিতির জানান দেয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট মুন্সিগঞ্জ ছাড়া দেশের বাকি ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০টি পয়েন্টে একই সময়ে পরিকল্পিতভাবে এই বোমা হামলা চালানো হয়। এই হামলায় দুজন নিহত ও অন্তত ১০৪ জন আহত হন।

পুলিশ সদর দপ্তর ও র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর সারা দেশে ১৫৯টি মামলা হয়। এর মধ্যে ১৪২টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয় এবং ১৭টি মামলায় মূল আসামিদের শনাক্ত করতে না পারায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এসব মামলায় ৯৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১ হাজার ৭২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

dhakapost

পরবর্তী সময়ে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী তৎপরতার তথ্য সামনে আসে। তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে কারাগার থেকে কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি পালিয়ে যায়। পাশাপাশি জঙ্গিবাদের মামলায় আটক থাকা বেশ কয়েকজন পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিকভাবে এমন এক রূপ নিয়েছে যে তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা কঠিন। বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকায় বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি নানামুখী স্বার্থ ও অপতৎপরতার ঝুঁকি থেকেই যায়।

‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা বলে না এড়িয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত

বাংলাদেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের আস্ফালন অব্যাহত থাকার পেছনে চারটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, এর মধ্যে তিনটি দীর্ঘমেয়াদি এবং একটি সাম্প্রতিক সময়ের কারণ।

তিনি বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থান এর অন্যতম প্রধান কারণ। জঙ্গিবাদ দমনে নিয়োজিত ডিএমপির সিটিটিসি কিংবা পুলিশের এটিইউ-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এখনও সচল রয়েছে। বর্তমান সরকার এগুলো বন্ধ করেনি। তবে, এদের আরও সক্রিয় করে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র কিংবা গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’

ড. তৌহিদুল হক উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে আল-কায়েদার শাখা প্রতিষ্ঠা নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগটি কেবল তাদের একার নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদার প্রতিটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম ও রাষ্ট্রেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উদ্বেগের বিষয়। তাই বিষয়টিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বা ‘সামান্য কিছু ঘটনা’ বলে হালকাভাবে না দেখে সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা।

রাজধানী ও আশপাশের এলাকা থেকে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার, বোমাসদৃশ বস্তু ও সরঞ্জাম উদ্ধার এবং সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলো উগ্রবাদী কার্যক্রমেরই ইঙ্গিত বহন করে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যথাযথ তদন্ত ছাড়া তাড়াহুড়ো করে কারও ওপর বা ঢালাওভাবে জঙ্গিবাদের দিকে অভিযোগ ঠেলে দেওয়া ঠিক হবে না।’

dhakapost

গাজীপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সব ঘটনার পেছনেই যে জঙ্গিরা জড়িয়ে থাকবে, বিষয়টি তেমন নাও হতে পারে। এর পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য বা ‘কার্ড’ খেলা হতে পারে— যেমন বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করা কিংবা রাজনীতির বাইরে থাকা দলগুলোর পুনর্বাসনের চেষ্টা।’

ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, নিরপেক্ষ ও সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমেই ঘটনার পেছনে থাকা আসল উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন করা জরুরি। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া ঢালাওভাবে কারও ওপর দোষ চাপিয়ে দিলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে পার পেয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আর এই সুযোগকে একটি ‘পরীক্ষামূলক আত্মপ্রকাশ’ বা এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধীরা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের নাশকতামূলক ঘটনা ঘটাতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

উগ্রবাদীদের ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে

জাতিসংঘের উদ্বেগ ও দেশের বর্তমান জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে আল-কায়েদার গোপন সেল শক্তিশালী হওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বার্তাটি মূলত তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব ও কাজের যৌক্তিকতা প্রমাণের একটি চেষ্টা হতে পারে। তার মতে, জাতিসংঘের এই দাবি একেবারে অমূলক না হলেও, ঠিক কিসের ভিত্তিতে বা কোন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর নির্ভর করে তারা এ কথা বলেছে— তা পরিষ্কার করা হয়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চিত্র তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, পাকিস্তান, ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো বড় ধরনের কোনো রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশে ঘটেনি। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বোমা উদ্ধারের ঘটনাগুলো নিয়ে প্যানিক বা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ তিনি দেখছেন না। তবে, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী উগ্রবাদীদের নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করছে কি না—এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে বলে তিনি জানান।

জঙ্গিবাদ দমনে পূর্ববর্তী অগ্রগতির কথা স্বীকার করে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘এই ধরনের হুমকি দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের নিরাপত্তা ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানিক কৌশলগুলোকে নতুন করে সাজানো বা পুনর্নির্ধারণ করা উচিত। যারা সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়, তারা সরাসরি রাষ্ট্রের শত্রু। দেশের প্রচলিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

জেইউ/এমএআর/