দেশের তামাক বাজারের অন্যতম প্রধান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) বিরুদ্ধে সাড়ে ২৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-মূসক)।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২৬ গুণেরও বেশি ব্যান্ডরোল বা সিকিউরিটি স্ট্যাম্প ‘অপচয়’ দেখিয়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার তথ্য মিলেছে। এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অডিট ও ভ্যাটের তদন্ত দল ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাসের দাখিলপত্র ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের হিসাব পর্যালোচনা করে এই ফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটন করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, সিগারেটের প্রতি প্যাকেটে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। ভ্যাট বিধিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১ শতাংশ স্ট্যাম্প অপচয় হিসেবে ছাড় পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে, বিএটিবি তাদের দাখিলপত্রে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে ৪.৪৯ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৬.৩১ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় দেখিয়েছে।
আরও পড়ুন
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ওই তিন মাসে মোট ৫৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮৩টি স্ট্যাম্প অপচয় হিসেবে দেখিয়েছে। এর মধ্যে নির্ধারিত ১ শতাংশ সীমার অতিরিক্ত হিসেবে মোট ১০ লাখ ৪ হাজার ৪৫৭টি সিকিউরিটি স্ট্যাম্প অপচয় বা বিনষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-মূসক) ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) বিরুদ্ধে সাড়ে ২৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন ত্রৈমাসিকে প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত ১ শতাংশ সীমার অতিরিক্ত প্রায় ১০ লাখ ৪ হাজার সিকিউরিটি স্ট্যাম্প অপচয় দেখিয়েছে। পরবর্তীতে সাভার কারখানায় তদন্ত দল পরিদর্শনে গিয়ে কার্টনে একদম নতুন ও সদ্য খোলা স্ট্যাম্প পেলেও এর কোনো বৈধ দাপ্তরিক বিনাশকরণ সনদ দেখাতে পারেনি
তবে, তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বিএটিবির সাভার কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে উল্টো চিত্র দেখতে পায়। অপচয় হওয়া স্ট্যাম্প রোলের কার্টনগুলো খোলা হলে দেখা যায়, কিছু স্ট্যাম্প একদম নতুন এবং কিছু স্ট্যাম্প প্যাকেট সদ্য খোলা। এমনকি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অনেক স্ট্যাম্প পড়ে নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ভ্যাট বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অপচয় দেখানো ওই ১০ লাখের বেশি অতিরিক্ত স্ট্যাম্পের মোট মূল্য ১ কোটি ৪৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ টাকা। এই স্ট্যাম্পের বিপরীতে ৬৫-৬৭ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক ১৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট ৪ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ১৮৭ টাকা। সবমিলিয়ে মোট ২৩ কোটি ২৪ লাখ ৭১ হাজার ২১ টাকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে ভ্যাট বিভাগের এলটিইউ ইউনিট বিএটিবির বিরুদ্ধে মূসক আইন, ২০১২-এর ৭৩ ধারা অনুযায়ী গত ৮ জুলাই কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে।
একই সঙ্গে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে, বিএটিবি চাইলে ৯০ দিনের মধ্যে কাস্টমস, এক্সাইজ ও মূল্য সংযোজন কর আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করার সুযোগ পাবে।
এ বিষয়ে বৃহৎ করদাতা ইউনিট-ভ্যাটের কমিশনার সৈয়দ আতিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভ্যাট বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো প্রায়শই অপচয়ের হার বেশি দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে এই রাজস্ব আদায় করা অত্যন্ত জরুরি। তবে দেখার বিষয় হচ্ছে, রাজস্ব বিভাগ শেষ পর্যন্ত কঠোর নীতিতে অনড় থাকে কি না। যদিও বিএটিবি তাদের লিখিত জবাবে বকেয়া দাবি বাতিলের আবেদন জানিয়েছে, তবে আপাতত এনবিআরের আইনি ভিত্তি বেশ শক্ত অবস্থানে আছে বলে মনে করছি।
আরও পড়ুন
এদিকে, রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএটিবির একাধিক দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রথমেই এলটিইউ-ভ্যাট বিভাগে বিএটিবির পক্ষে লিখিত জবাব দাখিলকারী কোম্পানি সেক্রেটারি সৈয়দ আফজাল হোসেনের ফোনে যোগাযোগ করা হলে ‘মিন্টু’ নামের এক কর্মী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটি বিএটিবির শেয়ার বিভাগের নম্বর। আফজাল হোসেন আর কোম্পানি সেক্রেটারি নেই। ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’
এনবিআরের কারণ দর্শানো নোটিশের লিখিত জবাবে বিএটিবি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে তাদের কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। এ সময় সর্বাধুনিক উচ্চগতির মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও পেপার জ্যামের ফলে বিপুল পরিমাণ স্ট্যাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া নষ্ট হওয়া সব স্ট্যাম্পের বিপরীতে কোনো সিগারেট উৎপাদিত বা বাজারে সরবরাহ করা হয়নি বিধায় কোনো করযোগ্য ঘটনা ঘটেনি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১ শতাংশের যান্ত্রিক প্রয়োগ অযৌক্তিক
এরপর বিএটিবির কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের মারুফা ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন ম্যানেজার বায়েজিদ হকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। বায়েজিদ হককে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও প্রথমে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে বক্তব্যের জন্য তিনি সোমবার (১৭ আগস্ট) পর্যন্ত সময় নেন। তবে, প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা পর্যন্ত তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অপচয়ের আড়ালে কর ফাঁকির কৌশল?
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, বিএটিবির এই অতিরিক্ত অপচয় নিছক কোনো কারিগরি ত্রুটি নয়; বরং আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
ভ্যাট বিভাগের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর সাভার কারখানা পরিদর্শনে যায়। পরিদর্শনকালে কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী নষ্ট বা অপচয় হওয়া স্ট্যাম্পগুলো কিছু কার্টনে রাখা আছে বলে দেখানো হয়। তবে তদন্ত দল কার্টনগুলো খুলে দেখে, কিছু স্ট্যাম্প একদম নতুন এবং কিছু স্ট্যাম্প প্যাকেট থেকে সদ্য খোলা অবস্থায় রয়েছে। যদিও কারখানাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে কারখানায় আন্দোলন চলার কারণে অনেক স্ট্যাম্প পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে, তবে তদন্তকালীন তারা এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

মূসক বিধিমালা, ২০১৬-এর ৮৬ বিধি অনুযায়ী, উৎপাদনে ব্যবহৃত কোনো ব্যান্ডরোল নষ্ট হলে তা সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে হয় এবং রাজস্ব কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিনষ্ট করতে হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএটিবি যে ১০ লাখের বেশি অতিরিক্ত স্ট্যাম্প নষ্ট হওয়ার দাবি করেছে, তার কোনো দাপ্তরিক বিনাশকরণ সনদ বা পরিদর্শকের স্বাক্ষরযুক্ত প্রমাণপত্র নেই।
ভৌত প্রমাণ ছাড়া বিপুল সংখ্যাক স্ট্যাম্প নষ্ট দেখানোকে আইনি পরিভাষায় ‘অবৈধভাবে প্যাকেটে ব্যবহার করে কর ফাঁকি দিয়ে বাজারে পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে’ বলেই ধরে নেওয়া হয়। ভ্যাট বিভাগের মতে, প্রমাণ ছাড়া স্ট্যাম্পের এমন অপচয় অনুমোদন দেওয়া মানে তামাক কোম্পানিগুলোকে হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া।
ভ্যাটের ২০১৯ সালের বিধান (এসআরইউ নং-১৮১-আইন/২০১৯/৩৮) অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের অপচয় কোনো অবস্থাতেই ১ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। ফলে আইনের বাইরে গিয়ে ১ শতাংশের অতিরিক্ত অপচয় মার্জনা করা বা ছাড় দেওয়ার কোনো আইনি এখতিয়ার রাজস্ব কর্মকর্তাদের নেই বলে মনে করে এলটিইউ-ভ্যাট কর্তৃপক্ষ।
কারণ দর্শানো নোটিশে যা রয়েছে
এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (মূসক)-এর উদঘাটিত ২৩ কোটি ২৪ লাখ ৭১ হাজার ২১ টাকা রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর একটি কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। নোটিশে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ফাঁকিকৃত এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায়, মূসক আইন অনুযায়ী বিএটিবির বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধসহ চূড়ান্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন
বিএটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পাঠানো নোটিশে বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৭৩ ধারা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, ২০১৬-এর ৮৬ বিধি অনুযায়ী, তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটে সিকিউরিটি স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত কারিগরি অপচয় ছাড় পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে, বিএটিবির দাখিল করা ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন মেয়াদের ত্রৈমাসিক বিবরণী ও তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত ১ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি স্ট্যাম্প নষ্ট বা অপচয় হয়েছে বলে দাবি করেছে।
তদন্ত অনুযায়ী, অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত অপচয় দেখানো ১০ লাখ ৪ হাজার ৪৫৭টি সিকিউরিটি স্ট্যাম্পের বিপরীতে প্রযোজ্য রাজস্ব পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘হালকা খায়েরি স্ট্যাম্প-১০’-এর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৬.৩১ শতাংশ অপচয় দেখানো হয়েছে। এছাড়া, ‘হালকা মেরুন স্ট্যাম্প-২০’-এর অপচয়ের হার ৮.৪৪ শতাংশ, ‘হালকা নীল স্ট্যাম্প-২০’-এর ক্ষেত্রে ১.০৬ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ‘হালকা সবুজ স্ট্যাম্প-২০’-এর অপচয়ের হার ০.৭৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
ভ্যাট কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ফাঁকি দেওয়া এই রাজস্বের মধ্যে ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্কের পরিমাণ ১৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাটের পরিমাণ ৪ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ১৮৭ টাকা। সবমিলিয়ে ফাঁকি দেওয়া রাজস্বের পরিমাণ মোট ২৩ কোটি ২৪ লাখ ৭১ হাজার ২১ টাকা।
নোটিশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে ভ্যাট বিভাগ। বিধি অনুযায়ী, উৎপাদনে অপচয়কৃত বা নষ্ট স্ট্যাম্প মূসক কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বিনষ্ট করা এবং তা নির্দিষ্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে, বিএটিবি এই অতিরিক্ত নষ্ট স্ট্যাম্পের কোনো ভৌত প্রমাণ বা বিনষ্টকরণের দাপ্তরিক রেকর্ড পেশ করতে পারেনি।
কারখানা বন্ধ রাখা, শ্রমিক অসন্তোষ কিংবা আধুনিক উচ্চগতির যন্ত্রপাতির যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অপচয় বেশি হয়েছে বলে বিএটিবি যে অজুহাত দিয়েছে— বিদ্যমান আইনের আলোকে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করে ভ্যাট কর্তৃপক্ষ।
কারখানা বন্ধ ও যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করছে বিএটিবি
এলটিইউ-মূসক বিভাগ থেকে পাঠানো কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে গত ২৪ মে বিএটিবির তৎকালীন কোম্পানি সেক্রেটারি ও হেড অব কমপ্লায়েন্স সৈয়দ আফজাল হোসেনের স্বাক্ষরে একটি দীর্ঘ লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেওয়া হয়। এতে এনবিআরের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু আইনি নজির তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
লিখিত জবাবে বিএটিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন মেয়াদে সংগৃহীত ও ব্যবহৃত সিকিউরিটি স্ট্যাম্প অপচয়ের ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃত এবং নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতার ফল।
এই বিরোধ কেবল ২৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লড়াই নয়, বরং এটি তামাক খাতের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মৌলিক আইনি দর্শনের সংঘাত। বিএটিবির মতে পরোক্ষ কর হিসেবে পণ্য সরবরাহ না হলে কর হয় না, বিপরীতে এনবিআরের দাবি ব্যান্ডরোল সরাসরি সরকারি রাজস্বের প্রতীক এবং হিসাবের ঘাটতিতে কর ফাঁকি হিসেবে ধরে নেওয়া বাধ্যতামূলক। উভয় পক্ষের এই আইনি লড়াই ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অপচয়জনিত রাজস্ব মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হয়ে থাকবে
ব্যাখ্যায় শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানা আকস্মিক বন্ধ হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরে বিএটিবি। তারা জানায়, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ রাজধানীর মহাখালী কারখানা এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ ১৮ মার্চ থেকে ৬ মে পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। সর্বাধুনিক ও অতি-উচ্চগতির প্যাকেজিং মেশিনগুলো চালু থাকা অবস্থায় হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মেশিনে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডরোল ক্ষতিগ্রস্ত ও অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে। পাশাপাশি পেপার জ্যাম বা যান্ত্রিক বিভ্রাটের কারণে একসঙ্গে হাজার হাজার স্ট্যাম্প নষ্ট হওয়াকে দায়ী করেছে কোম্পানিটি।
আরও পড়ুন
এছাড়া, তৃতীয় পক্ষের সরবরাহ করা কিছু স্ট্যাম্পের কাগজ ও আঠার নিম্নমান এবং কাটিং ত্রুটির কারণে মেশিনে লাগানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো ছিঁড়ে বিনষ্ট হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

এনবিআরের বিধিমালা (এসআরইউ নং-১৮১-আইন/২০১৯/৩৮-মূসক-এর বিধি ৬ ও ৮) উল্লেখ করে বিএটিবি জানায়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ১ শতাংশ অপচয় অনুমোদিত হলেও বিশেষ ও অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে তা শিথিলযোগ্য হতে পারে। তা ছাড়া যেসব স্ট্যাম্প অপচয় হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে কোনো সিগারেট উৎপাদিত বা বাজারে বিক্রি হয়নি। যেহেতু বাজারে কোনো পণ্যই সরবরাহ করা হয়নি, তাই করযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং রাজস্ব ফাঁকির প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করা হয়।
একই সঙ্গে তামাকজাত পণ্যের স্ট্যাম্প অপচয় সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রিট ও আপিল আদেশের নজির টেনে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করে— অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা কারিগরি ত্রুটির ক্ষেত্রে বাস্তব পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত নষ্ট স্ট্যাম্পের সংখ্যা বিবেচনা করার নির্দেশনা রয়েছে। ফলে কেবল ১ শতাংশ সীমার অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত রাজস্ব দাবি করার সুযোগ নেই।
এসব বাস্তব পরিস্থিতি, কারিগরি প্রমাণাদি এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বিবেচনায় নিয়ে এনবিআরের দাবি করা ২৩ কোটি ২৪ লাখ ৭১ হাজার ২১ টাকার বকেয়া রাজস্ব নোটিশটি বাতিল ও প্রত্যাহারের জোর আবেদন জানিয়েছে বিএটিবি।
আইনি মুখোমুখি এনবিআর ও বিএটিবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিতর্ক কেবল ২৩ কোটি ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব আদায়ের লড়াই নয়; এটি মূলত তামাক খাতের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুই পক্ষের আইনি দর্শনের মুখোমুখি অবস্থান।
আরও পড়ুন
বিএটিবির মূল আইনি যুক্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে মূসক ও সম্পূরক শুল্কের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। মূসক একটি পরোক্ষ কর, যা চূড়ান্ত ভোক্তা পরিশোধ করে থাকে এবং তা মূলত বাজারে পণ্য সরবরাহের ওপর ধার্য হয়। বিএটিবির স্পষ্ট কথা, ‘যেসব স্ট্যাম্প নষ্ট হয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে কোনো সিগারেট বাজারে সরবরাহ করা হয়নি। ফলে এখানে করযোগ্য কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’
অন্যদিকে, এনবিআরের স্পষ্ট অবস্থান হলো— সিকিউরিটি স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল সরাসরি সরকারি রাজস্বের প্রতীক। ফলে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের সঠিক হিসাব না মিললে আইন অনুযায়ী তা ‘কর ফাঁকি দিয়ে বাজারে সরবরাহকৃত পণ্য’ হিসেবে ধরে নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ কারণেই ভ্যাট বিভাগ তাদের নির্ধারিত বিধিমালাকে চূড়ান্ত মেনে ১ শতাংশের অতিরিক্ত অপচয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ।
যদিও বিএটিবি মনে করে, আইন কোনো যান্ত্রিক বা অন্ধ বিষয় হতে পারে না। কারখানার দীর্ঘকালীন বন্ধ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত যান্ত্রিক ত্রুটির মতো নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত পরিস্থিতিতে ১ শতাংশের যান্ত্রিক প্রয়োগ প্রাকৃতিক বিচারনীতি ও সংবিধানের ধারণার পরিপন্থী।
সবমিলিয়ে, বিএটিবি ও এনবিআরের এই আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তামাক খাতসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অপচয়জনিত বকেয়া রাজস্ব নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘নজির’ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা।
আরএম/এমএআর/
