২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল গঠনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলেও এনসিপিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে দলটির নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ, বৈঠক ও মতবিনিময় সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে, দেশের বড় ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশ কাটিয়ে তরুণ একটি দলকে বিদেশিদের এমন গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে এরই মধ্যে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে এনসিপি যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পরও তার খুব একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও পশ্চিমা কূটনীতিকদের আনাগোনা ও এনসিপির সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ নতুন করে সামনে আনছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— রাজনীতিতে তরুণদের এই উত্থান কি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও হিসাব?
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনসিপি বিদেশিদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। ওই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রনেতৃত্ব ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পেছনের শক্তি বা মাঠের শক্তি। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগদাতা। সে সময় কোনো রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনায় না থাকায়, সংস্কার ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বিদেশিরা মনে করেছিলেন, বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি ছাত্রনেতৃত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার। সে কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে এনসিপি ও ছাত্রনেতৃত্বের বিশেষ গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল।’
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব অর্জনের মাধ্যমে এনসিপি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের ধারাবাহিক আলোচনা ও সংযোগ অব্যাহত রয়েছে
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। এনসিপি এখন একটি সংসদীয় রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশের তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি। তাই বিদেশিরা স্বাভাবিকভাবেই দলটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে, এই গুরুত্বকে অতিমাত্রায় বা বিশেষ কোনো পক্ষপাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এনসিপি গুরুত্ব পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সংসদ ও সংসদের বাইরে দলটির তরুণ নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি উন্নত করার চেষ্টা করছে। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলোকে তারা রাজনৈতিক এজেন্ডায় প্রাধান্য দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো কর্মকাণ্ড এনসিপি করেনি, যার কারণে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডাররা দলটির প্রতি হতাশ হয়েছেন।’

সূত্র মতে, এনসিপির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের ধারাবাহিক বৈঠক ও মতবিনিময় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, তুরস্ক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দলটির ধারাবাহিক যোগাযোগের চিত্র পাওয়া যায়। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, নির্বাচন ও সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
সবশেষ ১২ আগস্ট এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চের সিনিয়র ডিরেক্টর সোনজা গ্লকলে নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। এ সময় এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে তারা বৈঠক করেন। আইআরআই প্রতিনিধিদলে ছিলেন রেসিডেন্ট প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জন ফ্লুহার্টি, টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অমিতাভ ঘোষ ও রুয়াকসানা হক।
নির্বাচনে সাফল্য এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণার ফলে যেকোনো জোটগত পরিচয়ের বাইরে এনসিপিকে একটি স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দল হিসেবে মূল্যায়ন করছে বিদেশিরা। সুশাসন, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি এবং প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে প্রগতিশীল তরুণ নেতৃত্বের আত্মপ্রকাশই মূলত আন্তর্জাতিক নজর কাড়ার প্রধান কারণ
এর আগে ৬ আগস্ট এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক।
কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে গত ২২ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। মার্কিন প্রতিনিধিদলে দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এরিক গিলান ও রাজনৈতিক সচিব জেমস স্টুয়ার্ট উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, এনসিপির পক্ষে ছিলেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দীন মোহাম্মদ এবং সদস্য মনিরা শারমিন ও নাভিদ নওরোজ শাহ্। আলোচনায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এছাড়া, গত ২৮ জুলাই স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিস্তিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেত্রু, ২৭ জুলাই ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে ও জার্মানির চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আনজা কার্স্টেন এবং ৮ জুলাই ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হোকন আরাল্ড গুলব্রানসেন ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস এনসিপি নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। গত ৯ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল, ৭ জুন এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রতিনিধিদল এবং ৬ জুন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এনসিপির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
কেবল সুশাসন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে তরুণ এই শক্তির ওপর নজর রাখছে কূটনীতিকেরা। তবে বিএনপির মতো বড় দলগুলোর বাইরে গিয়ে এনসিপির প্রতি বিদেশিদের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি সংক্রান্ত আলোচনা-বিশ্লেষণও তৈরি হয়েছে
বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক এমন আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘এনসিপি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে’— প্রশ্ন রাখা হয় দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের কাছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা বিদেশিদের কাছে ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছি। বিশেষ করে নির্বাচনে আমাদের ইতিবাচক ফলাফলের পর বিদেশিদের আগ্রহ বহুগুণ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা নিয়মিত আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসছেন এবং আগামীতে আরও কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকের সময়সূচি রয়েছে। এতেই স্পষ্ট হয় যে আমাদের সংগঠন দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মহল আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।’

তিনি আরও বলেন, ‘এনসিপি তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি নতুন রাজনৈতিক দল। আমরা পরিবর্তনের রাজনীতি করছি এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় আমাদের ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করে। নতুন রাজনৈতিক চিন্তা, তরুণ নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের জোরালো আকাঙ্ক্ষার কারণেই বিদেশিরা এনসিপিকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করছে।’
স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দলের অবস্থান তুলে ধরে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল ও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপি এখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিদেশিরা আমাদের কোনো জোটের সাধারণ অংশীদার হিসেবে দেখছে না; বরং একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। এমনকি ভবিষ্যতে এনসিপির রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাও তারা দেখছে। সে কারণেই আমাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, কৌশল ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে তাদের এই বাড়তি আগ্রহ।’
কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে এই নেতা বলেন, ‘বিদেশিদের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি সঠিক গণতান্ত্রিক ধারায় রাখা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে মূলত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতন্ত্র সংহতকরণ ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলোই প্রাধান্য পায়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও তুরস্কের কূটনীতিকদের সঙ্গে এনসিপির ধারাবাহিক যোগাযোগ দলটির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের বাড়তি আগ্রহেরই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনসিপিকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব বৈঠকে নির্বাচন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে, দেশের মূল ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলগুলোকে ছাড়িয়ে নতুন একটি দলকে বিদেশিদের এই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে নানা সংশয় ও প্রশ্নও উঠছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পেছনের শক্তি হওয়ার পাশাপাশি এর নেপথ্যে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বা ‘ডিপ স্টেট’-এর কোনো প্রভাব রয়েছে কি না, তা-ও আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় এনসিপির বর্তমান কূটনৈতিক গুরুত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম-সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা মনে করি বর্তমানে এনসিপির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এনসিপির নেতারা মূলত গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এখন তারা জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েছেন। অর্থাৎ, তারা এখন আর কেবল অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি নন, জনগণের ভোটে পরীক্ষিত ও নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশিরা বিষয়টিকে আরও ইতিবাচক ও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।’
অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল থাকা সত্ত্বেও এনসিপিকে বিদেশিরা কেন বাড়তি কদর দিচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এনসিপি একটি নতুন দল হলেও মাত্র কয়েক মাসের রাজনৈতিক যাত্রায় সংসদে তাদের ছয় থেকে আটজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছে। ফলে সংসদে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। সাধারণত বিরোধী দলগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের একটি স্বাভাবিক মনোযোগ থাকে। এর পাশাপাশি এনসিপির নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে তরুণ। মূলত এই তরুণ নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের দূরদর্শী এজেন্ডাই বিদেশিদের কাছে তাদের বাড়তি আগ্রহের মূল কারণ।’
জোটগত নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মহলে দলের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে জানতে চাইলে জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, ‘এনসিপি ১১ দলীয় জোটের একটি অন্যতম অংশীদার হলেও বিদেশিরা আমাদের কেবল জোটের অংশ হিসেবে দেখে না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবেই মূল্যায়ন করে। এর বড় প্রমাণ হলো, জোটে আরও বহু রাজনৈতিক দল রয়েছে এবং সংসদে তাদেরও প্রতিনিধিত্ব আছে। কিন্তু সবাইকে একই মাত্রায় কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এনসিপিকে আলাদাভাবে মূল্যায়নের প্রধান কারণ হলো, দলটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, নীতি ও রাষ্ট্র সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে রাজনীতি করছে।’
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিদেশিরা আমাদের কাছে কী চায়, তা তারাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে; এ নিয়ে আমরা আগেভাগে কোনো অনুমান করতে চাই না। তবে আমরা আশা করি, বাংলাদেশের উন্নয়ন, সামাজিক শান্তি ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক মহল সবসময় সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে। যেকোনো বৈশ্বিক সংকট বা দুর্যোগকালীন মুহূর্তেও বিদেশিরা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে— এটিই আমাদের প্রত্যাশা।’

এনসিপি নেতাদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন এই রাজনৈতিক শক্তির প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে গণতন্ত্র সংহতকরণ, মানবাধিকার রক্ষা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের বিষয়ে এনসিপির সুনির্দিষ্ট অবস্থান আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। দীর্ঘদিনের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এই তরুণ দলকে বিভিন্ন দেশ গভীর পর্যবেক্ষণে রাখছে। ফলে পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারাবাহিক যোগাযোগ ও গঠনমূলক মতবিনিময়কে দলটি ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছে।
এ বিষয়ে এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও রেমিট্যান্স সংক্রান্ত সম্পর্ক রয়েছে, তারা সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। এটি নতুন কিছু নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামোর একটি নিয়মিত অংশ হিসেবেই এনসিপি দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।’
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এনসিপিকে তাদের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ স্পষ্ট করেন, ‘বিদেশিরা এনসিপিকে কোনোভাবেই জামায়াতের চোখে দেখে না; বরং একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পৃথক রাজনৈতিক দল হিসেবেই মূল্যায়ন করে।’
এনসিপিকে নিয়ে কূটনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রত্যাশা সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এনসিপি একটি নতুন ও গুণগত মাত্রা যোগ করবে— এমনটাই তাদের প্রত্যাশা। তারা মনে করে, এনসিপি যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির রাজনীতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও সুসংহত ও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যেন এনসিপির মতো প্রগতিশীল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেয়, সেটিও তারা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ৩০-৩৫টি অর্থনীতির একটি উদীয়মান দেশ। ফলে এখানকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টিতে বৈশ্বিক অংশীদারদের গভীর আগ্রহ রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিদেশিরা চায় এনসিপি যেন সুশাসন, গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতার নীতি ধারণ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’
এমএসআই/এমএআর/
