বিজ্ঞাপন

ডিজাইনের টেবিলে ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন’

ডিজাইনের টেবিলে ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন’

দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন’ রেলপথ প্রকল্প। প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন এই রেলপথের বড় অংশই হবে উড়ালপথ (এলিভেটেড)। ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে, এখন চলছে চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেনে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা।

একই সঙ্গে বিদ্যমান রেলপথের দূরত্ব কমবে অন্তত ৮০ কিলোমিটার। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে সময়সূচি অনুযায়ী আন্তঃনগর ট্রেনে সময় লাগে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টা। আর লোকাল ও মেইল ট্রেনে যাত্রার সময় গড়ায় প্রায় নয় ঘণ্টা পর্যন্ত। নতুন কর্ড লাইন চালু হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ঢাকার পণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরের মধ্যেই নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ (ইআইবি) দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা প্রকল্পটিতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলেও অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

আছে নতুন কোচ ও ইঞ্জিন যুক্ত করার উদ্যোগ

নতুন রেলপথ নির্মাণের পাশাপাশি রেলের বহরে নতুন কোচ ও ইঞ্জিন যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ, ৩০টি লোকোমোটিভ, ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ, চারটি হুইল লেদ এবং চারটি রিলিফ ট্রেন সংগ্রহের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। তবে বিদ্যমান রেলপথটি টঙ্গী, ভৈরব ও আখাউড়া হয়ে ঘুরে যাওয়ায় এই রেলপথের মোট দূরত্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। নতুন কর্ড লাইন নির্মিত হলে দূরত্ব কমার পাশাপাশি ট্রেনের গতি বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রকল্পটি কৌশলগত ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন রেলপথ চালু হলে এই সময় কমে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায় নেমে আসবে। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে মোট পণ্য পরিবহনের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ রেলপথে হয়। নতুন কর্ড লাইন চালু হলে সেই হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় তিন দশক ধরে ঢাকা থেকে কুমিল্লার মধ্যে সরাসরি রেল সংযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠনের পরও বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পটি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। আগের সরকারের সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়নে দুটি প্রকল্পে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ট্রেনের গতি বাড়েনি। বরং গত দুই দশকে এই রুটে ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় ৬৬ কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় ৫৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।

যা বলছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা

ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইনের রূপরেখা সম্পর্কে রেলওয়ের কর্মকর্তারা ঢাকা পোস্টকে জানান, নতুন কর্ড লাইনটি ঢাকা থেকে ফতুল্লা, শ্যামপুর ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে শীতলক্ষ্যা নদী অতিক্রম করে সরাসরি কুমিল্লার সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে বর্তমানের মতো টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া ঘুরে কুমিল্লায় যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটের বড় অংশই উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উড়াল অংশ ঢাকা থেকে শুরু হয়ে দাউদকান্দির গোমতী এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

পুরো রুটে কোনো লেভেল ক্রসিং রাখা হবে না; এর পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। লেভেল ক্রসিং না থাকায় ট্রেনগুলো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারবে, যা উচ্চগতির (হাই-স্পিড) ট্রেন পরিচালনার সুযোগ তৈরি করবে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেনের সময় কমে মাত্র ৩ থেকে ৩.৫ ঘণ্টা হতে পারে, যা বর্তমানে ৫ থেকে ৯ ঘণ্টা। প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন এই রেলপথের অধিকাংশ উড়ালপথে নির্মিত হবে, ফলে দূরত্ব কমবে অন্তত ৮০ কিলোমিটার

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের অফিশিয়াল মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) প্রকৌশলী আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইনের ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হয়েছে, এখন ডিজাইনিংয়ের কাজ চলছে। প্রথমে আমরা জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড রিকুইজিশন) করব, তারপরে মূল কনস্ট্রাকশনে যাব। এর জন্য আলাদা ডিপিপিও তৈরি করা হবে।’

অর্থায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। তবে, এডিবি ও ইআইবি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনও শুরু হয়নি।’

কর্ড লাইনের ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে পণ্য পরিবহনেও বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে ১২-১৫ ঘণ্টা সময় লাগলেও, কর্ড লাইনে সময় কমে ৫-৬ ঘণ্টা হবে। রেলপথে পণ্য পরিবহনের হার ২-৩ শতাংশ থেকে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে

এর আগে ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ঢাকা-কুমিল্লা অংশে কর্ড লাইন নির্মাণ করা হবে, যার ফলে এ পথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমে আসবে। এর মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং চট্টগ্রামকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পরে ১৬ জুন সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রসঙ্গে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই লাইন নির্মিত হলে ঢাকা ও কুমিল্লার মধ্যে দূরত্ব কমে যোগাযোগে নতুন গতির সঞ্চার হবে।

এমএইচএন/এমএআর